গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

 

গল্প

তোমাদের জন্য এই তো  যথেষ্ট







 


জবান আলি ও কুরবান আলির জীবনের পথ এক, কিন্তু মন আলাদা। বাবা-মা অনেক আগেই চলে গেছেন, আর সেই মৃত্যু যেন দুই ভাইয়ের জীবনের হিসেব-নিকেশ বদলে দিয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য সম্পত্তির অধিকার বড় ভাই হিসেবে পুরোপুরি নিজের হাতে নিয়েছে জবান আলি। 

ভদ্রলোক হিসেবে তার অনেক নাম।সমাজে সবাই তাকে সম্মান করে  । 

 বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন, আর সেই মৃত্যুর পর থেকেই জবান আলি বড় ভাই হিসেবে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। জবান আলি বাবার রেখে যাওয়া জমিজমা, ঘরবাড়ি আর সবকিছু নিজের বলে ধরে নিয়েছেন। ছোট ভাই কুরবান আলি এই বিষয়টা সহজভাবে মেনে নেয়নি, কিন্তু বড় ভাইয়ের কাছে কিছু বলতে পারেনি।কারন বড়ভাই তাকে কোলেপিঠে নিয়ে বড় করেছে। 



তারা বাবার রেখে যাওয়া ঘরটি ভেঙ্গে নতুন ঘর তোলেন। সে ঘরে  ছোট্ট একটি রুম ও তার সামনে সামান্য একটু জায়গা ছিল কুরবানের। সেটুকুই তাঁর জীবন। সেখানেই মিথি আর তাদের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটায় কুরবান।সমাজের চোখে বড় ভাই মানে পরিবারের কর্তা, সে যেভাবে চায়, সেভাবেই চলতে হবে।

জবান আলি তার স্ত্রী সম্পা আর সন্তানদের নিয়ে বাকি ঘরের সবটা দখল করে থাকে। কুরবান কখনো বাবার ঘরে আরেটু জায়গা চাইলেই, বা রান্নাঘরে একটু হাত বাড়ালেই শুরু হয় ঝগড়া। সম্পা কোনো সুযোগই ছাড়ে না কুরবান আর তার স্ত্রী মিথিকে গালমন্দ করার। মিথি বেচারি চুপচাপ মেনে নেয়।

তবে যখন তার ছোট্ট মেয়েটিকে রুমে বসে সম্পার ফোন ধরতে চাইলে,  সম্পা গালাগালি করে , তখন সে কিছুটা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে।



কুরবান আলির মেয়ে ছোট্ট হলেও তার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। রাতে মেয়ে কাঁদলে কুরবান নিজ হাতে কোলে তুলে নেয়, তাকে নিয়ে বারান্দায় হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে। বড় ভাই জবান আলি এসবের কিছুই দেখে না, বরং সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে কুরবানের পরিবারকে অবহেলা করে চলেছে।

কুরবান আলি প্রতিদিন রাতে তার মেয়েকে কোলে নিয়ে বারান্দায় হাঁটে। একদিন মেয়েটি কাঁদতে থাকলে সম্পা এসে বলল, “তোমাদের মেয়ে তো অনেক দুষ্ট। সারাদিন কাঁদে। তুমি মেয়ে সামলাতে পারো না?”


কুরবান আলি বলল, “সম্পা ভাবি, একটু কষ্ট করে সহ্য করো। ও ছোট।”


সম্পা তীব্রভাবে বলল, “ছোট হলেও আমাদের রুমের সামনে এসে এসব করবে কেন? করলে তোমাদের রুমে করুক।  যাতে শব্দ না হয়। ঠিকমত ঘুমাতে পারিনা ওর আর ওর মার জ্বালায় আমরা  আর কষ্ট সহ্য করতে পারব না?”

কুরবান আলি অপমানিত হলেও চুপ থাকে। সে জানে বড় ভাইয়ের কাছে কিছু বললে আরও বড় ঝামেলায় জড়াবে।



একদিন কুরবান আলি ভাবল, এই ছোট্ট ঘর ছেড়ে একটু পিছনে গিয়ে নিজের একটা ঘর তুলবে। জমিজমা অনেক হলেও জবান মিয়া এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। বাড়ির চারপাশে গাছপালা লাগিয়ে, নিজের অধিকার প্রমাণ করতে চেয়েছে জবান। কুরবান আলি তার বড় ভাইয়ের কাছে গিয়ে অনেক অনুরোধ করে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না।

কুরবান আলি বড় ভাইয়ের কাছে  বলল, “ভাই, আমি তো তোমার থেকে বেশি কিছু চাই না। আমার মেয়ে একটু বড় হচ্ছে। একটু জায়গা দাও, যাতে আলাদা একটা ঘর তৈরি করতে পারি।”

জবান আলি হেসে বলল, “ছোট ভাই, তুমি এত চিন্তা করো কেন? আমাদের বাবার সব জমি দিয়ে তোমার কি দরকার? তোমার বাড়িতে কি অভাব আছে? তোমাদের জন্য এই তো  যথেষ্ট।”




কুরবান আলির স্ত্রী মিথি মেয়েকে নিয়ে সেই ছোট্ট ঘরে থাকেন। মেয়েটির প্রতি কুরবানের ভালোবাসা অপার। অথচ জবান আলি ও তার স্ত্রী সম্পার জন্য যেন কুরবানের এই ভালোবাসা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক সন্ধ্যায়, কুরবান বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে এসে মিথিকে বলল, “মিথি, আজও বড় ভাইকে বললাম একটু জায়গা দাও, কিন্তু কোনো কথাই শুনল না।”

মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুমি এত অনুরোধ করো কেন? ওরা কি আমাদের কষ্ট বুঝবে?”

কুরবান মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি বুঝো না, মিথি। আমার মেয়েটা একটু বড় হচ্ছে। ওকে একটু নিরাপদে রাখতে চাই।”

মিথি বলল, “বড় ভাই আর ভাবি আমাদের সবার প্রতি কতটা অবিচার করছে, তুমি কেমন করে সহ্য করো, জানি না। আমি জানি তুমি খুব ভালো, তবে কিছুটা নিজের জন্য ভাবা উচিত। বড় ভাইকে তোমার এই সহানুভূতি একটুও দুঃখ দেয় না।”

কুরবান চুপচাপ থেকে যায়। সে জানে মিথি যা বলছে তা ঠিক।

কুরবান কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। সে জানে যে বড় ভাই তার কথা শুনবে না। কিন্তু সহ্য করা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই।



তারপর একদিন সে ভাবল, বোনদের কাছে গিয়ে অভিযোগ করবে। বোনদের কাছে গিয়ে কুরবান বলল, “দেখো, আমি তো আলাদা হতে চাই। বড় ভাই যদি কিছু জায়গা ছেড়ে দিতো, তাহলে আমি আমার মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারতাম। তবে বড় ভাই আমাকে জায়গা দিতে রাজি নয়।”


বোনেরা কুরবানকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “শোন, ভাই কুরবান। বড় ভাইকে নিয়ে ঝগড়া করো না। আমাদের সমাজে মানুষ তো সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। যদি তোমাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়, তাহলে শত্রুরা সুযোগ নেবে। আমাদের পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হবে।”

কুরবান আলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি জানি বোনেরা। কিন্তু এইভাবে বেঁচে থাকাটাও তো কষ্টকর। আমার মেয়ে দিনে দিনে বড় হচ্ছে, তাকে একটা নিরাপদ জায়গা দিতে পারছি না।”

বোনেরা কুরবানের কথা শুনে চিন্তায় পড়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, কুরবান সত্যিই কষ্টে আছে। তবে তাদের হাতেও কিছু করার উপায় নেই।



মিথি বোনদের বলে আপনারা জানেন আপনাদের ভাই, আপনাদের ও জবান ভাইয়ের সন্তাদের কে নিজের ছেলে মেয়ের মত ভালো বাসতো, তবে তারা মেয়েকে কতটা ভালোবাসে, তার মেয়েকে প্রতি সময়ে  অবহেলা। 

আমার ও মেয়ের সব কিছু নিয়ে ভাই ভাবির অভিযোগ।

গোসল করার সময় পানি পরা নিয়ে ঝগড়া। রাতে জোড়ে কান্নাকাটি করলে গালাগালি। একই ঘরে থাকি, এমন করলে তো হয় না। 

আর আমি কিছু বলতে গেলে উল্টো আপনার ভাই কোরবান আলির বকাঝকা শুনতে হয়।

মিথি বলে কোরবানের ছোট একটা মেয়ে তাকে কোন সময় তারা আদর যত্ন করেন না। আপনাদের ছেলে মেয়েকে কোরবান জান দিয়ে ভালোবাসতো । রাতে কাঁদলে উঠে কোলে নিয়ে হাটতো। অসুস্থ হলে হাসপাতালে দৌড়াতো। 

বোনেরা মিথির কথা শুনে কোনো উত্তর দিতে পারে না। তারা জানে, সত্যিই কুরবান তার পরিবারকে ভালোবাসে।                            বোনেরা কুরবান কে আবারও বড় ভাইয়ের কাছে যেতে বলেন। 



বোনদের পরামর্শে কোরবান আলি আবারও তার বড় ভাইয়ের কাছে গেল। ধীরে সুস্থে বলল, “ভাই, আমি তো তোমার থেকে কিছু চাইছি না। শুধু একটা ছোট জায়গা, যাতে আমি আমার পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারি।”

জবান আলি একটু হাসি দিয়ে বলল, “ছোট ভাই, পৃথিবীতে সবকিছু ভাগাভাগি করে নিলে চলবে না। তোমার বুদ্ধি কতটুকু? এসব নিয়ে চিন্তা করতে যেও না।”

কুরবান জানে, এই কথায় কিছু হবে না। সে নিরুপায়, কিন্তু তার পরিবারের  মুখের দিকে তাকিয়ে সে আবারও চেষ্টা করতে চায়।



কিছুদিন পরে আবার কুরবান তার বোনদের কাছে যায়। বোনেরা তার কষ্ট শুনে হতাশ হয়। বড় বোনরা বলল, "তুমি তো জানো আমাদেরও অনেক সমস্যা আছে, যে কারনে জবানে ভাইয়ের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে ভয় পাই।                         কুরবান ভাইয়া, তুমি এত কষ্ট পাচ্ছো, আর আমরা তোমার জন্য কিছু করতে পারছি না। তবে চেষ্টা করতে পারি কথা বলতে।”

 কুরবান একদিন সকালে উঠেই সিদ্ধান্ত নিল, এইসব দখল আর অবহেলার বিরুদ্ধে সে কোনোদিন মুখ খুলবে না, কারণ সে জানে ভাইয়ের প্রতি রাগ তাকে দূরে সরিয়ে দেবে। কিন্তু তার ভালবাসা আর সম্মানের মান ধরে রাখতে হবে।



শেষ

দিন যায়, রাত যায়। একদিন মিথি কুরবানকে বলল, “তুমি কেন এসব সহ্য করছো? আমাদের জীবনে কোনো শান্তি নেই।”

কুরবান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মিথি, জানি না কতদিন পারবো। তবে যদি একদিন এই কষ্টের স্রোত থামে, আমি তখনই যেন মুক্তি পাই।”

মিথি হতাশ হয়ে বলে, “একদিন হবে বিস্ফোরণ। তখন আর কিছু করার থাকবে না।”
কুরবান মেয়েকে কোলে নিয়ে চুপচাপ রয়ে গেল। মনেমনে ভাবলো
কতদিন পারবো জানি না। একদিন  হয়তো সত্যিকারে বিস্ফোরণ  ঘটবে।  তখন আর মান সম্মান বলতে কিছুই থাকবে না। 



Comments

Popular posts from this blog

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই