অহংকার: মানব মনোজগতের এক অন্ধকার শক্তি

 অহংকার: মানব মনোজগতের এক অন্ধকার শক্তি






মানুষের হৃদয়ে এক অনন্য দ্বৈততা বিরাজমান, যা তাকে মহত্ত্ব এবং অন্ধকারের মধ্যে নিয়ে যেতে পারে। এই দ্বৈত শক্তির একটি দিক হলো ফেরেশতার গুণাবলি—সৎ, মহানুভব, এবং ক্ষমাশীল হওয়ার শক্তি। অন্য দিকটি শয়তানি স্বভাব, যা অহংকার, হিংসা এবং মন্দ কাজের দিকে পরিচালিত করে। এই দুই শক্তির পার্থক্য মানুষকে তার প্রকৃত চরিত্র চেনায় এবং সঠিক পথের সন্ধান দেয়।


মানবের ষড়্‌রিপু এবং অহংকার


আমাদের মনোজগতের ছয়টি শত্রু রয়েছে, যা আমাদের নৈতিকতা ও সত্তাকে নষ্ট করে দেয়। এই ষড়্‌রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, এবং মাৎসর্য—মানব চরিত্রের নিকৃষ্টতম প্রবণতাগুলির প্রতীক। এর মধ্যে "মদ" বা অহংকার অন্যতম মারাত্মক। অহংকার মানুষকে নিজের থেকে অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শেখায় এবং তা তার নৈতিকতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একে শয়তানের চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ এই স্বভাবই তাকে ফেরেশতা থেকে শয়তানে পরিণত করেছিল।


অহংকারের পরিণতি


আল্লাহ তাআলা কোরআনের সুরা বাকারা (আয়াত: ৩৪)-এ বলেন, ‘সে (ইবলিশ সম্মানিত আদমকে সিজদার মাধ্যমে সম্মান করতে) অস্বীকার করল এবং অহংকার করল, পরিণতিতে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ এই আয়াতটি ইবলিশের ঘটনা থেকে শিক্ষা দেয় যে, অহংকার মানুষকে মহান মর্যাদা থেকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। এই অহংকার ও ঈর্ষাই ইবলিশকে ফেরেশতাদের শিক্ষক থেকে শয়তানে পরিণত করেছিল।


রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী এবং অহংকারের ক্ষতি


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি বস্তু মানবের ধ্বংসের কারণ—প্রবৃত্তি বা নফসের পূজা, লোভ এবং আত্ম-অহংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, অহংকারই মানব স্বভাবের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রবণতা। এ থেকে বোঝা যায়, অহংকার কেবল মানুষকে আত্ম-নিমগ্ন করে না, বরং তাকে অন্যদের থেকে পৃথক এবং উচ্চ ভাবতে শেখায়।


আল্লাহর মহিমা ও অহংকারের সীমা


আত্মগৌরব করা বা অহংকার কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হাদিস কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অহংকার আমার সম্মানের উত্তরীয় আর সম্মান হচ্ছে আমার গৌরবের পোশাক; যে ব্যক্তি এ দুটির কোনো একটি নিয়ে আমার সঙ্গে টানাটানি করে, আমি তাকে আজাবে নিক্ষেপ করি।’ এর থেকে স্পষ্ট যে, যে কেউ অহংকারের পন্থায় আল্লাহর মর্যাদার সাথে তুলনা করতে চায়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন এবং তার সমস্ত গৌরব-প্রতাপ নস্যাৎ করেন।


অহংকারের প্রকৃতি: সত্যকে অগ্রাহ্য ও মানুষকে হেয় করা


হাদিস শরিফে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অহংকার হচ্ছে সত্যকে উপেক্ষা করা এবং মানুষকে অপমান-অসম্মান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।’ অহংকার মানে শুধুমাত্র নিজেকে বড় মনে করা নয়, বরং অন্যদের হেয় করা, তাদের মূল্য কমিয়ে দেখা। অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়, এবং তাকে এক অন্যায় আত্মতৃপ্তির মধ্যে নিয়ে যায়।


মানুষ কেন অহংকার করে?


আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করে, যখন সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।’ অহংকারের মূল উৎস এই আত্মতৃপ্তি, যখন মানুষ নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সবার উপরে মনে করতে শুরু করে। এই ভুল ধারণাই মানুষকে অহংকারের পথে ধাবিত করে। যখন কেউ নিজেকে প্রয়োজনের বাইরে মনে করে, তখন সে সহজেই অন্যদের চেয়ে বড় মনে করে।


অহংকারের থেকে মুক্তির উপায়


অহংকার থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন আত্মসচেতনতা, বিনম্রতা, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার অভ্যাস। যখন মানুষ নিজের অপূর্ণতাকে উপলব্ধি করে, তখন অহংকার তার মধ্যে স্থান পায় না। এভাবে অহংকার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং মানুষের মধ্যে ইতিবাচক গুণাবলি বিকশিত হয়।


উপসংহার


অহংকার মানব চরিত্রের একটি মারাত্মক দোষ, যা তার মনোজগতে অন্ধকার এনে দেয় এবং তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এই প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নিজেদের চেয়ে বড় কাউকে—আল্লাহকে সম্মান করতে হবে এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করতে হবে। মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও বিনম্রতা আমাদের জীবনকে উন্নত করবে, আর অহংকারের মতো ধ্বংসাত্মক দোষ থেকে দূরে রাখবে।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই