ভৌতিক গল্প কাঠেরপুতুল ও পান্ডুলিপি

 ভৌতিক গল্প 

 কাঠেরপুতুল ও পান্ডুলিপি 



   কাঠেরপুতুল ও পান্ডুলিপি



  


রাত তখন গভীর। বাইরে নির্জনতা এবং অন্ধকারের শাসন। বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু মাটির গন্ধ এবং ভেজা পাতার শিরশির শব্দ বাতাসে মিশে আছে। আকসার নিজের ঘরের ভেতর চুপচাপ বসে ছিলেন। ঘরের একমাত্র কুপি বাতির আলোতে তাঁর ছায়াটা দেয়ালে ঢেউ খেলছিল। তাঁর পায়ের কাছে শুয়ে থাকা এলশেশিয়ান কুকুরটা হঠাৎ গর্জন করে উঠল।


আকসার ধীর গলায় বললেন, “কি হয়েছে, মেজো?”


কুকুরটা কান খাড়া করল, তারপর ঘরের কোণায় তাকিয়ে গলাজোড়ে গর্জন শুরু করল। ঘরের কোণায় তেমন কিছুই ছিল না। তবে মিসির আলি জানতেন, কুকুরের এই আচরণ অবহেলার নয়। তিনি ঘরের কোণায় তাকালেন। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলেন না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার বাইরে কোনো এক ছায়া দ্রুত সরে গেল।


তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কুকুরটা লাফ দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আকসার দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে তাকালেন। কেউ নেই। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, চাঁদের আলো অনুপস্থিত।


“কেউ আছে?” তিনি জোরে জিজ্ঞেস করলেন।


কোনো উত্তর এল না। কিন্তু ঠিক তখনই তিনি শুনলেন 

মাটিতে পাতার চাপা মচমচ শব্দ। যেন কেউ খুব সন্তর্পণে হাঁটছে। আকসার চোখ মুহূর্তের জন্য সংকীর্ণ হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, কেউ আছে। কুকুর মেজো দাঁতে দাঁত ঘষে গর্জন করল, যেন কোনো অদৃশ্য শত্রুর জন্য প্রস্তুত।


আকসার কুপি বাতিটা হাতে তুলে নিলেন। বাতির আলো বাইরে ফেলতেই তিনি দেখলেন, কুয়াশার ভেতর একটা ছায়ামূর্তি দ্রুত সরে যাচ্ছে। একটা কালো আলখাল্লা পরা দীর্ঘদেহী মানুষ, যার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যায় না।


তিনি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাবলেন, এই গভীর রাতে এখানে কার কাজ থাকতে পারে? আশপাশের গ্রামে চুরি-ডাকাতির কোনো খবর কখনো শোনা যায়নি।


“কে আপনি? থামুন!” আকসার গম্ভীর গলায় বললেন।


কিন্তু কোনো উত্তর এল না। ছায়ামূর্তিটা দূরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।


কুকুরটা হাল ছাড়ল না। সে দরজা পেরিয়ে ছুটে গেল। আকসার তাকে ডাকলেন, “মেজো, ফিরে এসো!”


কিন্তু কুকুর কোনো কথা শুনল না। আকসার দ্রুত কুপি নিয়ে মেজোর পেছন পেছন এগোলেন।




বাড়ির সামনের বাগান পেরিয়ে একটা সরু পায়ে হাঁটা রাস্তা। চারদিকে মাটি ভেজা, পায়ের নিচে কাদা। তিনি লক্ষ করলেন, কুকুরটা ছায়ার পেছনে ছুটে গেছে। অদূরে একটা পুরনো গাছের গোড়ায় গিয়ে মেজো থেমে গেল। গাছের নিচে অন্ধকার এত গভীর যে, কিছুই দেখা যায় না।


তিনি সাহস করে গাছটার কাছে গেলেন। কিন্তু গাছের নিচে কাউকে দেখতে পেলেন না। কুকুরটা মাটি আঁচড়াচ্ছে, যেন কিছু খুঁজছে। আকসার গাছের গোড়ার মাটি আলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। সেখান থেকে একটা মানুষের হাত বেরিয়ে আছে।


শরীরের ভেতর একটা হিম শীতল স্রোত বয়ে গেল। তিনি দ্রুত পেছনে সরে এলেন।


“কী হচ্ছে এ!” তিনি বিড়বিড় করে বললেন।


মেজো গর্জন করেই চলল। আকসার দ্রুত ফিরে গিয়ে পাশের বাড়ির একজনকে ডাকলেন। রাত গভীর হলেও তিনি সাহস করলেন। প্রতিবেশী রহিম মিয়া একটা লন্ঠন নিয়ে বের হলেন। আকসার তার ঘটনাটা ব্যাখ্যা করলেন।


দুজন মিলে আবার গাছের কাছে এলেন। কিন্তু এবার গাছের গোড়ায় কিছুই নেই। মাটি একদম পরিষ্কার। হাতটি আর দেখা যাচ্ছে না।


“আপনি ঠিক দেখেছেন তো?” রহিম মিয়া সন্দেহ প্রকাশ করলেন।


“আমি মিথ্যে বলছি না,” আকসার দৃঢ়ভাবে বললেন। “কিন্তু এটা অসম্ভব! হাতটা এখানে ছিল!”


কুকুর মেজো এবারও গর্জন করছে। আকসার অনুভব করলেন, এই রহস্য খুব গভীর।


তারা ঠিক করলেন, সকালে আরও লোকজন নিয়ে পুরো জায়গাটা খোঁজ করা হবে। কিন্তু সেই রাতটা আর শান্তিতে কাটল না।


 ৫

পরদিন সকালের তদন্ত


সকালে সবাই মিলে জায়গাটা খুঁড়ে দেখল। গাছের নিচে সত্যিই একটা পুরনো কাঠের বাক্স পাওয়া গেল। বাক্সটা খুব শক্ত করে তালাবদ্ধ ছিল। তালা ভাঙার পর দেখা গেল, তার মধ্যে একটা পুরনো দিনের বইয়ের পাণ্ডুলিপি। হাতে লেখা।


 বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে কিছু পুরনো শ্লোক, এবং অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা ছিল। গ্রামের মুরুব্বি সবাইকে জানালেন, এই জায়গাটা নাকি একসময় কালো যাদুর চর্চার করা হতো। 


পাণ্ডুলিপিটা খোলার পর থেকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। এলশেশিয়ান কুকুরটা আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ল।


 আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে অদ্ভুত আওয়াজ শোনা গেল। সারারাত বাড়ির টিনের চালায় দুপদাপ শব্দ। কাকের কর্কশ ডাক। 

আকসার বারবার অনুভব করলেন, কেউ বা কিছু তাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।



এটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি সেই রাতে দেখা ছায়ামূর্তির সাথে এই বাক্সের কোনো সম্পর্ক আছে? রহস্য গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। কিন্তু সেই রহস্যের চাবি খুঁজে বের করার আগেই আকসারের জীবনে এক ভয়ানক সত্য উদ্ভাসিত হলো—তাঁর ঘরের দরজা  নিজে থেকেই খুলে গেল।


“এই দরজা কি বন্ধ করেছিলাম?” আকসার নিজেকেই জিজ্ঞেস করলেন। তারপরে ঘরের ভেতর পায়ের শব্দ শোনা গেল।

এবং কুকুরটি ভয়ে বিকটগলায় একটা চিৎকার করে উঠলো। সাথে সাথে তার প্রান বায়ু বের হয়ে গেল। দেখে মনে হলো,  কেউ বুজি তার সমস্ত রক্ত চুষে নিয়েছে।


 আরও অন্ধকার


বই বা পাণ্ডুলিপি কী রহস্য বয়ে এনেছিল, সেটি কেউ জানল না। আকসার এবং তার পরিবার সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হল। আর বাক্সটা? সেটাও অদৃশ্য হয়ে গেল।


গ্রামের লোকেরা বলে, বইটা আবার মাটির গভীরে ফিরে গেছে। আর সেই ছায়ামূর্তির দেখা আর কেউ পায়নি। তবে গভীর রাতে ওই পুরনো গাছের কাছে কুকুরের গর্জন শোনা যায়।


এই রহস্যের সমাধান কেউ করতে পারল না। কিন্তু একটাই জিনিস সবাই জানে— ওই গাছটা, ওই জঙ্গলটা এখন   রহস্যময় আধিভৌতিক ।

গ্রামের মানুষ এখন  আর কেউ ভুল করেও ওদিকে যায় না।


 



অমীমাংসিত রহস্য


আকসার তার পরিবার নিয়ে গ্রাম ছাড়ার পরে জায়গাটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। স্থানীয় লোকজন জানাল, রাত গভীর হলেই ওই গাছের আশপাশে অদ্ভুত সব আওয়াজ শোনা যায়। কখনো কান্নার শব্দ, কখনো কারো ফিসফিসানি। আর কুকুরগুলো কেন যেন গাছটার কাছে গেলেই অস্থির হয়ে ওঠে।




৮  

শাকিলের জেদ

একদিন গ্রামেরই এক যুবক, শাকিল, সাহস করে গভীর রাতে গাছটার কাছে গেল। তার মধ্যে ছিল জেদ—সে রহস্য উদঘাটন করবেই। হাতে টর্চলাইট আর পকেটে ছোট একটা ছুরি নিয়ে সে গাছের কাছে পৌঁছাল। চারদিক নীরব। বাতাসও থেমে গেছে। গাছটা যেন তাকে কোনো এক অজানা শক্তি দিয়ে টানছে।


গাছের গোড়ার মাটি আঁচড়ে কিছু খুঁজতে শুরু করল শাকিল। মাটি খুব শক্ত ছিল না। খানিকটা খোঁড়ার পর একটা কালো কাপড়ে মোড়ানো কিছু বেরিয়ে এলো।

 সে কাপড়টা খুলে দেখলো একটা পান্ডুলিপির মত , তা খুলে দেখতেই ভেতরে কোন পৃষ্ঠা আর নেই সেগুলো কাঠের  ছোট কাঠের মূর্তিতে পরিবর্তিত হযেছে। 

মূর্তিটা দেখতে মানুষের, কিন্তু মুখটা ছিল বীভৎস—বড় বড় চোখ আর বিকৃত হাসি। দেখে শাকিলের গা শিউরে উঠল।


হঠাৎ করেই চারদিক কেমন যেন পাল্টে গেল। বাতাস বয়ে যেতে লাগল অস্বাভাবিক জোরে। চারদিকে শোঁ শোঁ আওয়াজ, গাছের ডালপালা অদ্ভুতভাবে দুলছে। আর সেই মূর্তিটা যেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে। শাকিলের মনে হলো, মূর্তিটা তার মনের কথা শুনতে পাচ্ছে।



মূর্তিটা হাতে নিয়ে সে গাছ থেকে সরে আসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার পা যেন জমে গেছে। পুরো শরীর অবশ হয়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার কানে শোনা গেল একটি ফিসফিসানি:

“ফিরে এসো। আমার সাথে  মাটিতে ভীতরে চলো । এখানে কেউ বাঁচে না। সবাই মাটিতে হারিয়ে যায়, পান্ডুলিপির মত। পান্ডুলিপি থেকে আমার জন্ম। আমিই সেই বইয়ের পান্ডুলিপির।”


শাকিল ভয় পেয়ে মূর্তিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দৌড়ে গ্রামে ফিরে এল।


নতুন বিপদ


পরদিন সকালে শাকিল জ্বর নিয়ে শয্যাশায়ী হলো। তার ঘুমের মধ্যে বারবার সে চিৎকার করে বলছিল, “আমি ওকে ফিরিয়ে দেব। আমাকে আর ডেকো না!”


গ্রামের মুরুব্বিরা জানালেন, গাছটার নিচে যা কিছু লুকানো ছিল, তা ছিল বহু পুরনো। তাদের ধারণা, এটি কোনো এক শক্তিশালী তান্ত্রিকের কাজে ব্যবহৃত জিনিস, যা ভুলক্রমে খুঁড়ে তোলা হয়েছে। আর সেই কারণেই অশুভ শক্তি শাকিলকে তাড়া করছে।


আকসারের ঘটনার পর থেকে গাছটা নিয়ে গ্রামে যতই গুজব ছড়াক না কেন, শাকিলের ঘটনার পর পুরো গ্রাম আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। গাছটা কেটে ফেলার প্রস্তাব উঠল।



১০

শেষের আগে আরেকটি রাত


গ্রামের লোকেরা ঠিক করল, পাশের গ্রামে  এক তান্ত্রিক আছে তার কাছে যাবে।

তান্ত্রিক পরামর্শ দিলো পুজোর মাধ্যমে গাছটা কেটে ফেলা হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরের রাতেই শাকিলের বাড়ি থেকে হঠাৎ কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। তার পরিবার দৌড়ে গিয়ে দেখে, শাকিল ঘরে নেই।


একজন জানাল, তাকে গভীর রাতে গাছের দিকে যেতে দেখা গেছে। সবাই দল বেঁধে গেল গাছটার কাছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখল, তাতে সবার রক্ত হিম হয়ে গেল।


গাছটার গোড়ায় শাকিলের নিথর দেহ পড়ে আছে। তার চোখ খোলা, আর মুখে স্থায়ী হয়ে আছে এক বিকৃত হাসি। তার হাতে সেই কালো কাঠের মূর্তিটা।


১১

চূড়ান্ত পদক্ষেপ


এই ঘটনার পর গ্রামের লোকেরা আর দেরি করল না। তারা তান্ত্রিককে ডেকে পূজা করল এবং গাছটা কেটে ফেলে তার গোড়া পুড়িয়ে দিল। মূর্তিটা আবার মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হলো, তবে এবার লোহা আর পাথরের স্তরে ঢেকে।


কিন্তু রহস্য এখানেই শেষ হলো না। যে জায়গায় গাছটা ছিল, সেখান দিয়ে রাতের বেলা কেউ গেলে আজও ঠাণ্ডা একটা বাতাস বয়ে যায়। আর কিছু কুকুর সেই জায়গাটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে হঠাৎ করে গর্জন করে ওঠে।


গ্রামের মুরুব্বিরা এখনো বলেন, “কিছু জিনিস চিরকাল চাপা থাকাই ভালো। সেই রাতের অতিথি আর গাছের গল্প কখনো শেষ হবে না।”






Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই