একা মানুষের গল্প

  একা মানুষের গল্প




রাত

রাত গভীর। নির্জন রাস্তায় বাতিগুলো ফিকে হয়ে জ্বলছে। শহরের কোলাহল অনেক আগেই থেমে গেছে। তানভীর একা বসে আছে তার ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায়। হাতে এক কাপ ঠাণ্ডা চা, যা তার মতোই নিঃসঙ্গ।

দুঃখ দিয়ে দুঃখ ঢাকা
ভুল ছাপিয়ে দুখের নদী বয়ে চলে একা
এই জীবন ধুলোর খেলা
এই ভুবন মায়ার মেলা


তানভীর একজন কর্পোরেট কর্মী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, মিটিং, প্রেজেন্টেশন—তার জীবনের এই চক্র যেন থেমে নেই। কিন্তু কাজের পরেও তার জীবন যেন থেমে আছে, যেন শূন্য। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও একাকীত্ব তার পিছু ছাড়ে না। বন্ধুবান্ধব, পরিবার—সবাই তার জীবনে ছিল, তবুও কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে।


আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো ছিল না। অফিস থেকে ফিরে দরজা বন্ধ করার সাথে সাথেই সে অনুভব করলো তার মনের ভেতরে জমে থাকা শূন্যতার ভার। "মানুষ কি সত্যি একা?"—এই প্রশ্নটা তার মনে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল।


তানভীর হঠাৎ করে তার পুরনো একটা ডায়েরি বের করলো। ডায়েরিটা তার কলেজ জীবনের সঙ্গী। সেখানে সে তার স্বপ্নগুলো লিখতো। পাতা উল্টাতে উল্টাতে চোখে পড়লো এক জায়গায় লেখা—

বাঁচার স্বপ্ন


তানভীর বুঝতে পারলো, এত ব্যস্ততার মাঝেও সে নিজেকে ভুলে গেছে। নিজের জন্য বাঁচার যে স্বপ্ন, সেটা কোথাও হারিয়ে গেছে।


সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল, কিছুদিনের জন্য সবকিছু থেকে দূরে গিয়ে নিজেকে খুঁজে বের করবে। পরদিন সকালে অফিসে ই-মেইল করে একটা ছুটির আবেদন করলো।


একাকী যাত্রা


তানভীর একা পাহাড়ি এক গ্রামে চলে গেল। সেখানে প্রকৃতির মাঝে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করলো। ছোট্ট গ্রাম, সেখানকার মানুষগুলো এতটাই সরল যে তানভীরের মনে হলো, এখানে একাকীত্বের কোনো জায়গা নেই।


একদিন সকালে গ্রামের নদীর পাড়ে বসে সে দেখলো এক বৃদ্ধা চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। তানভীর এগিয়ে গিয়ে কথা বললো।


"আপনি এখানে একা বসে কী ভাবছেন?"


বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন, "মানুষ একা না থাকলে নিজের মনের কথা শোনে না। আমি এখানে বসে প্রকৃতির সুর শুনি, নিজের মনের সুর শুনি। এতে আমি একা বোধ করি না।"


তানভীরের মনে হলো, জীবনের মায়াজালে আমরা এমনভাবে জড়িয়ে পড়ি যে নিজেদের আসল সত্তাটাকে ভুলে যাই।


ফিরে আসা


তানভীর ঢাকায় ফিরে এলো নতুন উদ্যমে। সে তার জীবনের ছোট ছোট খুশিগুলো খুঁজে নিতে শিখলো। প্রতিদিন অফিস শেষে কিছু সময় শুধু নিজের জন্য রাখতো।

 অশ্রু নদীর ধারায়


তানভীরের একাকীত্ব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে । কিন্তু হঠাৎ করেই তার জীবনে ফিরে এলো পুরনো এক অধ্যায়—অর্ণা। অর্ণা ছিল তানভীরের কলেজ জীবনের প্রেম। তাদের স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে জীবন কাটানোর। কিন্তু বাস্তবতার কষাঘাতে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।


একদিন হঠাৎ করেই তানভীর একটি মেইল পেল অর্ণার কাছ থেকে। মেইলে লেখা ছিল:

"তানভীর, জানি অনেক দিন হলো কথা হয়নি। তবুও তোমার কথা ভুলিনি। কেমন আছো? তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল। দেখা করতে পারবে?"


তানভীরের হৃদয় ভারী হয়ে উঠল। এত বছর পরেও অর্ণা কেন তার জীবনে ফিরে এলো? সে কি নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চায়? নাকি এটা শুধুই পুরনো ক্ষতকে আরও গভীর করার জন্য?


তানভীর দ্বিধাগ্রস্ত হলেও দেখা করতে রাজি হলো।

পুরনো স্মৃতির ছোঁয়া


তারা দেখা করল শহরের এক কফি শপে। অর্ণা অনেকটা আগের মতোই আছে, শুধু চোখে-মুখে একটু ক্লান্তি আর বিষাদের ছাপ। প্রথম দিকে দুজনই একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। তারপর কথোপকথন শুরু হলো।


অর্ণা বলল, "তানভীর, জানো, তোমার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের সেরা সময় ছিল। কিন্তু আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম। জীবন যে এত জটিল হতে পারে, বুঝিনি।"


তানভীর কিছু বলল না। সে অনুভব করল, পুরনো ক্ষত যেন আবার খুলে যাচ্ছে।


অর্ণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "আমি জানি, আমরা আর একসঙ্গে হতে পারব না। তুমি এগিয়ে গেছ, আমিও আমার মতো করে চলেছি। তবুও তোমার কাছে এসে বলতে ইচ্ছে করল, আমি কখনোই তোমাকে ভুলিনি। তুমি আমার মনে এখনও রয়ে গেছো।"


তানভীরের চোখ ভিজে উঠল। এত দিন ধরে সে নিজেকে শক্ত রেখেছিল, কিন্তু আজ তার মনে হলো, সে আসলে অর্ণাকে কখনো ভুলতে পারেনি।



 

বিচ্ছেদ


অর্ণা বলল, "তানভীর, আমি কাল দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি। হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। 


তানভীর উত্তর দিল, "অর্ণা, কিন্তু তুমি ভালো থাকাে।   


তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অর্ণা উঠে গেল, চলে গেল কফি শপের দরজা দিয়ে। তানভীর চেয়ে রইল, তার জীবনের এক অধ্যায় আজ  শেষ হয়ে গেল।


 নদীর ধারায়


সেদিন রাতভর তানভীর বারান্দায় বসে থাকল। অর্ণার স্মৃতি যেন তার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, জীবন বড়ই অদ্ভুত। মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি চায়, তাকেই  হারাতে হয়।

নিজে নিজে ভাবছে , "আসলে সব মানুষই হয়তো একা।

মিছেই চোখে চোখ রাখা
আপন মনে আপন ভূবনে সবাই একা
এই জীবন ধুলোর খেলা
এই ভুবন মায়ার মেলা 
শেষের পথে সেই এক, একা।"

 





Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই