তন্ময়া সিরিজ গল্প: অচেনা অতিথি

 

তন্ময়া সিরিজ

গল্প: অচেনা অতিথি



তন্ময়া







সন্ধ্যা থেকেই মনটা কেমন যেন অস্থির লাগছিল। যদিও বিপদের কোনো সম্ভাবনা নেই, তবু তন্ময়া নিশ্চিত হতে পারছিল না। রাত দশটায় “রিজেন্সি প্যালেস” থেকে গাড়ি আসার কথা। ভোর চারটায় ফ্লাইট, তাই বাড়ি থেকে যাওয়াটাই নিরাপদ মনে করে তন্ময়া ছোট একটা লাগেজ গুছিয়ে রেখেছিল।


রাত নয়টার দিকে দরজার কলিংবেল বেজে উঠল। এত রাতে কে আসবে? রাজউকের এই প্রকল্পের ভবনগুলোতে অনেকেই নতুন এসেছে। সন্ধ্যা হলে শেয়ালের ডাক শুনলে মনে হয় কোনো জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে এসে পড়েছি। কেউ ইন্টারকমেও যোগাযোগ করেনি।


“মা, দেখো তো কে এসেছে।”


তন্ময়ার মা দরজা খুলতেই দুজন সাদা পোশাক পরা লোক ঘরে ঢুকে পড়ল। ভয় পেয়ে তন্ময়ার মা জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনারা কারা?”

“তন্ময়া কোথায়?”

“তন্ময়া? কে তন্ময়া? এখানে তো কেউ নেই।”

“আপনি চিনেন না তন্ময়া নামের কাউকে?”

দুজন লোক একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে ঠিক বাসা, তবে নাম পাল্টানো হয়েছে।”

“বাসায় কে কে আছেন?”

“আমার স্বামী আর মেয়ে।”

“আপনার মেয়ের নাম কী?”

“তনুশ্রী দাস।”

“তনুশ্রীকে ডেকে দিন।”


“তনু…” ডাকার আগেই তন্ময়া নিজের রুম থেকে বের হয়ে এলো। অচেনা দুজনকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আপনারা কারা? কী চাই?”

তন্ময়ার দিকে তাকিয়ে একজন বলল, “হ্যাঁ, ঠিক আছে। আপনাকেই নিতে এসেছি। আমরা গোয়েন্দা বিভাগ থেকে এসেছি।”

“গোয়েন্দা বিভাগ! কেন? কোথায় যাব আমি?”

“আপনাকে আমাদের সাথে যেতেই হবে। বেশি প্রশ্ন করবেন না।”


তন্ময়া উত্তেজিত হয়ে বলল, “না, আমি কোথাও যাব না। আমাকে একটা ফোন করতে দিন।”

“না, কোনো ফোন করা যাবে না। তানহা, ওনার ফোনটা নিয়ে নাও।”

ওদের সাথে আসা একজন মহিলা তন্ময়ার ফোনটা নিয়ে নিল। তন্ময়া বুঝতে পারল, পিছু হটার উপায় নেই। কিন্তু কিছু একটা করার সুযোগ নিতে হবে।


“ঠিক আছে,” শান্ত হয়ে তন্ময়া বলল। “ফোন আপনারা নেন। তবে আমি একটু ওয়াশরুমে যাব।”

পুরুষ লোকটি মহিলাকে ইশারায় ওয়াশরুমের সামনে দাঁড়াতে বলল। তন্ময়া মায়ের পুরোনো বাটন ফোনটা হাতিয়ে নিয়ে দ্রুত “রিজেন্সি প্যালেস”-এ টেক্সট পাঠিয়ে দিল:

“ডিবি নিয়ে যাচ্ছে। সাহায্য করুন।”



ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে তন্ময়া মাথায় একটা ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল। পেছনে তার বাবা-মা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

গত এক বছর ধরে তন্ময়ার ইনকাম ছিল বেশ ভালো। গ্রামের ছোট বাড়ি থেকে শহরে এসে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট নিয়েছে। নতুন আসবাবপত্র, গাড়িতে যাতায়াত, ঝকঝকে জীবনযাপন। কিন্তু আজ এই অচেনা লোকগুলো এসে তন্ময়াকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কেন?

তন্ময়া সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, রিল বানায়, ফলোয়ার লাখ লাখ। তবে কি সেটা নিয়েই সমস্যা?


যাওয়ার সময় তন্ময়া মাকে শুধু বলল,

“চিন্তা করো না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।”


তবে তার মনের মধ্যে ঝড়ের মতো প্রশ্ন:

কী এমন ঘটল, যা তার জীবনকে এভাবে ওলট-পালট করে দিল?


 


তন্ময়াকে গাড়িতে তোলা হলো। চারপাশ অন্ধকার। ঢাকার ফাঁকা রাস্তা গাড়ির শব্দ ছাড়া যেন মৃত। লোক দুজন সামনে বসে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল। তন্ময়ার কৌতূহল জাগল।

সে ঠান্ডা মাথায় বলল,
“আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
একজন গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অফিসে নিয়ে যাচ্ছি।”
“কিন্তু আমি কী করেছি?”
“সব জানবেন সময়মতো। এখন চুপচাপ বসুন।”

তন্ময়া আর কিছু বলল না। তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—“রিজেন্সি প্যালেস থেকে কেউ কি বার্তাটা পেয়েছে?”

গাড়ি থেমে গেল শহরের এক কোণায়, একটা পুরোনো ভবনের সামনে। তন্ময়াকে নিচে নামানো হলো। ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটা ঘরে বসানো হলো। ঘরটা ছোট, টেবিল-চেয়ার ছাড়া কিছুই নেই। একটা সিসিটিভি ক্যামেরা কোণে লাগানো।

পনেরো মিনিট পর একজন অফিসার ঘরে ঢুকলেন।
“আপনার নাম তন্ময়া দাস, তাই তো?”
তন্ময়া মাথা নাড়ল।
“আপনার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আপনি গত ছয় মাস ধরে কিছু সন্দেহজনক পোস্ট করেছেন। আপনি কি জানেন এগুলোর জন্য অনেক বড় সমস্যা হতে পারে?”
“সন্দেহজনক পোস্ট? কী ধরনের পোস্ট?” তন্ময়া রাগ চেপে বলল।
“যে পোস্টগুলোতে বিদেশি সংস্থাগুলোর সাথে যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আপনার সাম্প্রতিক কয়েকটি ট্রানজেকশন—এগুলো একদমই স্বাভাবিক নয়।”

তন্ময়া ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল, কিন্তু বাইরে শান্ত।
“দেখুন, আমি একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আমার ইনকাম সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। এগুলো যদি কারও সন্দেহজনক মনে হয়, তাহলে সেটা ভুল বোঝাবুঝি।”

অফিসার কাগজের ফাইল খুললেন।
“আপনার নামে কিছু টিকটক ও রিল ভিডিওতে আপত্তিকর বার্তা দেওয়া হয়েছে। আপনি কি এগুলোর বিষয়ে কিছু জানেন?”

তন্ময়া হতবাক।
“আপত্তিকর বার্তা? স্যার, এগুলো কেউ এডিট করে ছড়াচ্ছে। আমি এসব করিনি!”

অফিসার একদৃষ্টিতে তাকালেন।
“আপনার কথাগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সেটা ভুল প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু তার আগে আপনাকে আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে হবে।”

তন্ময়া জানত, সত্যি বলে নিজেকে রক্ষা করা কঠিন হবে। কারণ যারাই এ ষড়যন্ত্র করেছে, তারা খুব পরিকল্পিতভাবে করেছে।


অন্যদিকে...

রিজেন্সি প্যালেসে নীল বার্তা পেয়ে এক ব্যক্তি দ্রুত ফোন করল।
“তন্ময়া বিপদে পড়েছে। আমাদের এখনই কিছু করতে হবে।”

তন্ময়ার কাছের বন্ধুরা সক্রিয় হলো। তারা আইটি বিশেষজ্ঞ। দ্রুত তন্ময়ার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল খতিয়ে দেখা শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা অদ্ভুত কিছু পেল।
কেউ একজন তন্ময়ার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ভুয়া পোস্ট ছড়িয়েছে এবং বিদেশি সংস্থার সাথে তার নাম জড়ানোর চেষ্টা করছে।

রাত বাড়ছে। তন্ময়ার সামনে ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হলেও, বাইরে কোথাও থেকে আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে।

(চলবে...)




Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই