রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

 রঙ্গন জমিদার 


: অর্পন রহমান




রঙ্গন জমিদার ১


: অর্পন রহমান


আমার নাম রঙ্গন:



নাম: আরিয়ান আজিম চৌধুরী রঙ্গন

ছদ্মনাম: রঙ্গন জমিদার 


প্রকৃতি: বাউন্ডুলে,  প্রলাপ বকতে অভ্যস্ত। তার মধ্যে একটা দার্শনিক পাগলামি আছে, যেটা তাকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে। তার ভন্ডামির মধ্যেও কি যেন একটা আছে, যা সে নিজেও জানে না।


চরিত্র বিশ্লেষণ: রঙ্গন (একজন আধুনিক অলৌকিক মানুষ যার জর্দা-ধ্যান ও ধোঁয়াটে আধ্যাত্মিকতা জীবন)


১. জীবনদর্শন:


রঙ্গনের জীবনদর্শন হলো—“জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই, কারণ যা কিছু উদ্দেশ্য তা-ই মোহ।”


সে নিজেকে আধ্যাত্মিক বলে দাবি করলেও, তার আধ্যাত্মিকতা একধরনের গোঁজামিল যুক্তিহীন দর্শন—


> “আমি ধ্যান করি, কিন্তু আমি আসলে ঘুমাই। কারণ ঘুম হলো ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ।”


২. চালচলন ও পোশাক:

সে সবসময়  সাদা ফতুয়া পরে, পায়ের জুতো রাবারের । মাথার চুল এলোমেলো, একমাসের দাড়ি, মুখে জর্দার সুপাড়ির ঠোঁট লাল— কারণ সারাদিন জর্দা-সুপারি চাবায়।


সে দাবি করে, এই জর্দা চাবানোই তাকে মস্তিষ্কের অষ্টম স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে।


১. পারিবারিক পরিচয় ও গ্ল্যামার-বিপরীত দ্বন্দ্ব:


আলি আজিম চৌধুরী কামরান: রঙ্গনের বাবা, সারা দেশের পরিচিত বিজনেস আইকন।

টেক্সটাইল, ব্যাংক, গার্মেন্টস, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট—সবখানে প্রভাব।

রঙ্গনের জীবনধারা বাবার চোখে এক ধরনের বিদ্রোহ ও লজ্জা।


ইপসিতা আরা: সাবেক সেনা কর্মকর্তার মেয়ে। রঙ্গনের মায়ের মধ্যে শৃঙ্খলা, গর্ব ও সামাজিক সম্মানবোধ প্রবল।

তিনিও রঙ্গনের বস্তিতে অবস্থান, ছেঁড়া জামা, সুপারি-চিবানো জীবন দেখে কষ্ট পান।

কিন্তু কখনো তা রঙনকে বলেন না। মনে মনে বিশ্বাস করেন, সে হয়তো তার বাবার (দাদার) মতোই এক রহস্যময় পথ বেছে নিয়েছে।


আবদুল গফুর আজিম চৌধুরী (দাদা):

এক সময়ের জমিদারপুত্র ও প্রভাবশালী মন্ত্রী।

শেষ বয়সে মানসিক ভারসাম্য হারান।

বদ্ধ ঘরে কথা বলতেন, মাঝে মাঝে অদ্ভুত কবিতা লিখতেন, শেষ দিকে বলতেন, “আমার রক্তে ঈশ্বর কথা বলেন।”

ছোট রঙ্গন তাঁকে খুব ভালোবাসত, এবং তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই রঙ্গনের মানসিক পরিবর্তন শুরু হয়।


২. রঙ্গনের দর্শনের শিকড়:


দাদার স্মৃতি ও কথাগুলো এক সময় রঙ্গনের মাথায় ঘোরে।

রঙ্গন ভাবে, “আমার মধ্যেও সেই আত্মা বাসা বেঁধেছে কি না!”


এক সময় বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বস্তিতে চলে আসে। কেউ জানে না কেন।


৩. রঙ্গন ও রিবার সম্পর্ক:


শতরূপা খান রিবা:

ধনী, উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মেয়ে।

রঙ্গনের ইউনিভার্সিটি সহপাঠী।

প্রথমে তার রূপে মুগ্ধ হয়, পরে তার নীরবতা, ত্যাগ ও অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রেমে পড়ে।


রঙ্গনের দৃষ্টিভঙ্গি:

সে জানে রিবা তাকে ভালোবাসে।

কিন্তু নিজের “ভাঙা” ও “নির্জন” জীবনের পাশে কাউকে জড়াতে চায় না।

হয়তো লজ্জা, হয়তো আত্মঘাতী অহং—সে দূরে থাকে।


রিবা ভাবে, “এই পাগল লোকটাই বুঝি আসলে সব চেয়ে বেশি স্বাভাবিক।”


রঙ্গনের কাছে “ভালোবাসা তাপের মত, বায়ুর মত, ছায়ার মত, তুমি দেখতেও পারো না, কিন্তু শ্বাস ফেলা বন্ধ করলেই সেটা টের পাবে।”

সে রিবাকে দূরে রাখে, কারণ সে জানে তার ছায়াও কারো জীবন বরবাদ করতে পারে।


রঙ্গন মাস্টার্স পর্যন্ত পড়া শেষ করেছিলো— তখনও সে ‘স্বাভাবিক’ ছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যে ‘বোধ’ জন্মায়।

সে একদিন মাকে বলে—


  “আমি জীবন কিনে খেতে চাই না, আমি জীবনকে চিবাতে চাই।”


মা বিস্ময় আর অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে। 

আর ভাবে তার ছেলে কি দাদার মত পাগল হয়ে যাচ্ছে।   


৫. 


অলৌকিকতা ও বাস্তবতা:

সে দাবী করে, সে কিছু অলৌকিক কাজ জানে—


সে চোখ বন্ধ করে মানুষের জন্মতারিখ বলে দিতে পারে (যদিও ৩৫ ভাগই ভুল হয়)।


সে দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে ধ্যান করলে বলে—“এই বাড়ির ভেতর অতৃপ্ত আত্মা আছে।”

বাস্তবে, সে বাংলা উচ্চারণ দেখে কোরআন পড়ে। দুই এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। একান্ত ঠেকায় পড়লে।  

সে সব সময় ধ্যান করে। লোক দেখানো ধ্যান।

 এবং ধ্যান করার সময় ৭০% সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।


৬. চিন্তার জগৎ:

সে মাঝে মাঝে হুট করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে—


> “এই শহরে সব মরা মানুষ হেঁটে বেড়ায়, শুধু আমি একজন জীবিত ।”


“পৃথিবীতে সত্যিকারের পাগল তারাই, যারা নিজেকে পাগল নয় বলে ভাবছে।” যেমন তার বাবা, মা। এবং ধনী আত্মীয় স্বজন।


লোকজন হাসে, কেউ কেউ ভয় পায়, আর শিশুরা তাকে দেখে নাচে, কুকুর ঘেউ ঘেউ করে।


রঙ্গনের কথা:


 “আমার নাম রঙ্গন।


আমি হেঁটে হেঁটে বাঁচি, বসে বসে ধ্যান করি, আর সুপারি চাবাই।


আমি কিছুই চাই না— কিন্তু যখন কেউ কিছু দেয়, আমি বলি, ‘জগতের ভার তোমার কাঁধে থাকুক, আমার নয়।’


আমি অলৌকিক কিছু না, আমি শুধু মানুষ হবার ব্যর্থ চেষ্টা।”


যদিও তার ভীতরে অনেকে হিমুর ছায়া দেখতে পারেন। কারন হিমু স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ বলে গেছেন "পৃথিবীর সব পুরুষই হিমু আর সব নারীরাই রুপা" 


কিন্তু আসলেই সে হিমু নয়।


রঙ্গনের মুখেই শুনুন তার স্রষ্টার অবস্থা। 


    "আমি জন্ম নিচ্ছি, জন্ম নেয়াটা অতটা সহজ নয়। আমার জন্ম কোন মাতৃ বা পিতৃ গর্ভে হচ্ছে না। তবুও আমার জন্ম দাতার মায়ের প্রসব বেদনার মত ব্যথা।  সে এখন ঘোরের মধ্যে আছে। এক মহাজাগতিক যাত্রা শুরু হয়েছে তার।


 তার কাছে পৃথিবী বলে এখন কিছু নেই। সবার কথার উত্তর দিচ্ছে,  কিন্তু কেন দিচ্ছে,  কে কথা বলছে কোন হুশ তার নেই। 


লেখক, দার্শনিক, বিজ্ঞানি, কবি, সাহিত্যক, রংতুলি দিয়ে যারা ছবি আঁকে অথবা অভিনয়শিল্পী বা গায়ক যারা সৃষ্টিশীল কিছু করে তাদের সবারই একই অবস্থা হয়। তাদের পৃথিবীর কেনঅনুভূতি নেই, তারা জীবিত না মৃত নিজেই জানে না। বুঝতে পারছেন,  এখন তার অবস্থা,  তার ডিএন এ বা কলম দিয়ে তৈরির চেষ্টা করছে আমায়। সে পরিশ্রম আর কায়িক শ্রম যেমন মাটিকাটা বা রিক্সা চালনা এক নয়।  

পুরুষদের বুজতে একটু অসুবিধা হলেও নারীরা ঠিকই বুঝতে পারছে। কতবার গর্ভে বসে আমাকে পরিবর্তন করবেন, নানান ভুল হবে, কেটে দেবেন আবার নতুন করে লিখবেন। লিখবেন বলাটা ভুল সৃষ্টি করবেন "


শেষ কথা হলো সে আমাকে এই নশ্বর পৃথিবীতে  আনছেন। 

যত কষ্ট হোক সে আনবেন,  কারন আমি তার সৃষ্টি, তার সন্তান।



রঙ্গনের রাত্রির কান্না


পর্ব ১: ছায়াপথে হেঁটে যাওয়া এক পাগলের দিনলিপি


রঙ্গনের চুলগুলো আবারও এক মাসের ধূলি জমে এলোমেলো হয়ে গেছে। পাঞ্জাবিটা আগের মাসের মতোই—সাদা, তবে এখন তার রঙকে 'সাদা' বলার চেয়ে 'ধূসর-চা' বলা ভালো। সুপারির লাল রঙ ঠোঁটের আশপাশে এমনভাবে বসে আছে, যেন কেউ জ্বরার রঙে ঠোঁট রাঙিয়ে দিয়েছে।


রঙ্গন বস্তির মোড়ে বসে আছে, এক হাতে পুরনো একটা খয়েরি প্যাকেট থেকে সুপারি নিয়ে মুখে পুরছে, আরেক হাতে একটা বই—কোরআনের বাংলা উচ্চারণ সংস্করণ। মুখে মুখে শব্দ বলছে, মাঝেমধ্যে থেমে থেমে বলে উঠছে, "আরে এই লাইনটা কাল স্বপ্নে দেখছিলাম তো! কি বিচিত্র কাকতাল!"


বাচ্চারা ওকে ঘিরে আছে। কেউ তার চুল টেনে দিচ্ছে, কেউ তার গলার কাছে থাকা পুঁতির মালা নিয়ে টানাটানি করছে। রঙ্গন হাসে।


একটা বাচ্চা বলে উঠলো, “ওই রঙ্গন ভাই, তুমি কি সত্যি জিনের ডাক শুনো?”


রঙ্গন মুখ উঁচু করে আকাশের দিকে তাকায়। তারপর বলে, “জিন তো আর কথা বলে না রে, তারা কান্না করে। যারা শোনে, তারা পাগল হয়।”


কোনো উত্তর নেই চারপাশ থেকে। শিশুরা চুপ করে যায়। রঙ্গন আবার সুপারি চিবুতে শুরু করে।


রাত্রি, কান্না ও পীর হওয়ার ইঙ্গিত


সেই রাতে, বস্তির একপাশে তার ভাঙা টিনশেড ঘরে রঙ্গন চুপচাপ বসে ছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ে আছে তার পায়ের কাছে। হঠাৎ বাইরে একটা কান্নার শব্দ ভেসে আসে।


মানুষের না, কুকুরের না, নারী না পুরুষ—এই কান্নার কোনো পরিচয় নেই। রঙ্গন প্রথমে মনে করে স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু সে তো এখন ঘুমায়নি।


সে উঠে দাঁড়ায়। গায়ের ওপর একটা লাল চাদর জড়ায়, জুতো পায়ে না দিয়েই বেরিয়ে আসে। রাস্তা ধরে হাঁটে। বাতিগুলো নিভে গেছে। কিছু কুকুর তার দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে, কিন্তু কাছে আসে না।


রঙ্গনের পায়ে যেন কোনো ব্যথা নেই। হাঁটছে, হেঁটেই যাচ্ছে। কান্নার শব্দ সে ফলো করছে। মনে হলো, এটা কোনো মানুষের নয়, আত্মার আহাজারি।


একসময় এসে পড়ে পুরান রেলস্টেশনের কাছে। পরিত্যক্ত একটা কামরার দরজা অল্প খোলা। ভেতরে ঢুকতেই সে দেখে—একটা ছেলে কাঁদছে। তার বয়স আট-নয় হবে। ছেলেটার চোখে অস্বাভাবিক রকমের বেদনা। রঙ্গন কাছে গিয়ে বসে।


—তুই কাঁদিস কেন রে?


ছেলেটা কিছু বলে না। তাকায়। শুধু বলে,


—আমার নাম সাফি। আমি গতকাল মারা গেছি। কেউ জানে না। এই কামরায় আমি একা থাকতাম।


রঙ্গনের চোখ স্থির। ঠোঁটে আবার সুপারি রাখে। বলে,


—তুই স্বপ্ন না তো?


ছেলেটা মাথা নাড়ে।


—তুই স্বপ্ন না হলে, আমি তো পীর। জানিস, আমি একবার স্বপ্নে দেখছিলাম, আমি ওমর শরীফের ভেতর বসে তাফসির করতেছি...


সাফি হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। বলে,


—তুমি পীর না। তুমি জন্মগত পাগল। কিন্তু ঈশ্বরের খুব কাছের পাগল।


তারপর ছেলেটা অদৃশ্য হয়ে যায়। রঙ্গন বসে থাকে। সারারাত। ঘুমায় না। মনে মনে ভাবে, এটাই তার বোধোদয়ের শুরু।


রিবার কথা


পরদিন দুপুরে, রিবা এসে হাজির হয় রঙ্গনের মোড়ের চায়ের দোকানে। ছাতা হাতে, চোখে গাঢ় সানগ্লাস, আর সাদা সালোয়ার কামিজে সে যেন এই বস্তিতে এক অন্য জগতের দূত।


—তুমি গতকাল কোথায় ছিলে?


রঙ্গন চুপ করে থাকে। তারপর বলে,


—আমি পীর হয়েছি।


রিবা হাসে না। সিরিয়াস।


—তুমি অনেক কথা বলো। আমি জানি, তুমি নিজেও জানো না তুমি কে। কিন্তু তুমি জানো, আমি কে?


—তুই তো রিবা। আমার জীবনের অপ্রয়োজনীয় আবেগ।


রিবা কাঁদতে শুরু করে না, বরং বসে পড়ে পাশে। বলল,


—তুমি আমার জীবনের প্রয়োজনীয় পাগলামি। আমি তোমার ভিতরের নিরবতা ভালোবাসি। যে পাগল চিৎকার করে না, শুধু সুপারি চিবিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তুমি জানো, একবার আমি তোমাকে দেখেছিলাম—তুমি সিগারেট ফেলে দিয়েছিলে এক বৃদ্ধকে দেখে। তুমি বলেছিলে, 'ওনার ফুসফুসের জন্য আমি ত্যাগ করলাম, যদিও উনি জানেন না।' সেই দিন থেকে আমি জানি, তুমি ভালো। শুধু অদ্ভুত।


রঙ্গন কোনো কথা বলে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুপারির রঙ ঠোঁটে লেগে আছে। চা-ওয়ালা ফিসফিস করে বলে,


—রঙ্গন ভাইয়ের প্রেমিকা আইছে!


চায়ের দোকান ও হিউমার


একসময় বস্তির দারোয়ান খবির মিয়া আসে, পেছনে একটা ছেঁড়া প্যান্ট পরা ছোট ছেলে। বলে,


—রঙ্গন ভাই, এই পোলাডা বলে আপনারে নাকি সে চাঁদের দেশের মানুষ মনে করে!


রঙ্গন হেসে উঠে বলে,


—বুঝছ খবির ভাই, আমি তো আসলে চাঁদের এক্স-মামা। ওরে বলো, আমি ঈশ্বরের মোবাইল নম্বর জানি।


ছেলেটা জিজ্ঞেস করে, “দেন না তাহলে নম্বরটা?”


রঙ্গন বলে, “ওনার নম্বর ১, কিন্তু কেউ ধরেন না। উনি কেবল মিসকল দেন। যেইটা তোমার ভেতরের কষ্টের মতো—থাকে, কিন্তু বোঝা যায় না।”


সবাই হেসে ওঠে। শুধু রিবা হাসে না। সে চুপচাপ রঙ্গনের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানে, এই পাগলটা একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেই দিনটা আসার আগ পর্যন্ত সে থাকবে। পাশে। নীরব দর্শক হয়ে।


রিবা ঢাকার নাম করা এক ডাক্তার প্রফেসর হাসান চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে। সে অনেক কষ্টে রঙ্গনের এই ঠিকানা সংগ্রহ করেছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তারা এক সাথেই ফিজিক্সে  পড়তো। তখন রঙ্গন ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা এক মানুষ। সুন্দর চেহারার হাসি খুশিতে ভরপুর। আর রিবাও ছিলো ওদের ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সুন্দরী।  


রিবা রঙ্গনের সাথে বস্তিতে তার রুমে আসে। উৎকট বাজে গন্ধ রুম থেকে। রিবাকে রঙ্গন বলে

- চা খাবে। 

 রিবা বলে

 - খাবো না।  তোমাকে বানিয়ে দেই। 

রঙ্গন বলে 

- আমি চা তেমন খাই না, তুমি যখন চেয়েছো তাহলে দেও।

রিবা চা বানাতে যায়


রঙ্গন তখন  আবার ধ্যান করে। চোখ বন্ধ করে, দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে বসে থাকে।


হঠাৎ একসময় তার মুখ দিয়ে এক অজানা ভাষা বের হতে থাকে। সে বুঝতে পারে না, শুধু অনুভব করে যেন কেউ তার ভেতর কথা বলছে। তার শরীর কাঁপে, ঠোঁট নড়ে। সে ঘেমে যায়।


রিবা চা নিয়ে এসে তাকিয়ে দেখে রঙ্গন ধ্যান করছে, অলৌকিক লোক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে রঙ্গন এমন ভন্ডামি প্রায়ই করে। কিন্তু হঠাৎ রিবার মনে হয়, রঙ্গনের সত্যিই কিছু হয়েছে।


রঙ্গনকে ছায়ার মতো কেউ জড়িয়ে ধরেছে—বা সে নিজেকেই জড়িয়ে রেখেছে।


সে জানে না, এটা আধ্যাত্মিকতা, না মস্তিষ্কের বিভ্রম। কিন্তু সে জানে, রঙ্গন আলাদা। একদম আলাদা।


রিবা কয়েকবার ধাক্কা দেয়।  এরপর রঙ্গনের হু বলে অজ্ঞান হয়ে পরে যায়। দুই ঘন্টা পর যখন জ্ঞান ফের,  রঙ্গন আবিস্কার করে ও এখন রিবার বাবার হসপিটালে। 

পাসে একজন নার্স বসে আছে। 

রঙ্গন রিবার কথা জানতে চাইলে নার্স বলে

- ম্যাম এই মাত্র বাসায় গেছে। 

রঙ্গন চলে যেতে চাইলে নার্স তাকে আটকায়।

বলে - ম্যামের নির্দেশ সকালে সে না আসা পর্যন্ত আপনাকে আটকে রাখা।

নার্স রিবাকে জ্ঞান ফিরেছে জানাতে চলে যায় রিসিপশনে। 

জানিয়ে ফিরে এসে দেখে কোথাও রঙ্গন নেই।


"রঙ্গনদের কে আটকানো যায় না,  শিকলেও নয়, বন্ধ ঘরেও নয়, ভালোবাসা দিয়েও নয়"



রঙ্গনের অতীতের ট্র্যাজেডি: দাদার মৃত্যু ও 'আত্মা' প্রবেশের বিশ্বাস


রঙ্গনের দাদা—আবদুল গফুর আজিম চৌধুরী—এক সময় নামকরা মন্ত্রী ছিলেন। জমিদার রক্ত তার শরীরে, তার বাবা ছিলেন জমিদার। 


কিন্তু জীবনের শেষদিকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এক সময় রঙ্গন যখন ক্লাস নাইনে পড়ে, তখন সে দেখে, তার দাদা মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের দেয়ালে মাথা ঠুকে বলতে থাকেন—


“ওরা আমার ভেতর কথা বলে। আমি একজন পাথর নই। আমি কান্না শুনি।”


এক রতে দাদাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। পরদিন সকালে দাদাকে বাড়ির পাশে পুকুরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মুখে ফেনা, চোখ উল্টানো। চিকিৎসকেরা বলে ‘মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ’।

 কিন্তু রঙ্গনের বিশ্বাস, দাদার মৃত্যু অস্বাভাবিক ভাবে হয়েছিলো, কিন্তু ও কাউকে তা বিশ্বাস করাতে পারেনি।


সেই দিন থেকে রঙ্গনের মধ্যে জন্ম নেয় এক ভয়াবহ বিশ্বাস—তার দাদার আত্মা মরেনি, বরং কোনো 'মধ্যবর্তী স্তরে' আটকে আছে। মাঝে মাঝে রঙ্গন তার নিজেকে দাদার মতোই বোধ করে। 


সে ভাবে, দাদার 'আত্মা' তার ভেতর ঢুকেছে, আর সে শুধু একজন মানুষ নয়, একজন ধারক।


তার দর্শনের এক জায়গায় সে বলে:


“আমি একা নই। আমি দুইজন—আমি এবং সেই, যে কাঁদতে কাঁদতে আমার ভেতর ঢুকে গেছে।”



১. ভিতরকার অলৌকিক প্রবণতা (৩০%) – সেগুলো সত্যি কিনা, সেটা কখনো পরিষ্কার হবে না


কখনও রঙ্গন অদ্ভুত কিছু "অনুভব করে"—যেমন কারো মৃত্যুর আগে আগে অস্বস্তি হয়, স্বপ্নে কিছু সংকেত পায়।


সে নিজেই জানে না, এগুলো অলৌকিক না মানসিক বিভ্রম।


মাঝেমধ্যে নিজেকে বলে, “হয়তো দাদার আত্মাই আমাকে কিছু কিছু শিখিয়ে দিয়েছে… হয়তো আমি ‘রিসিভার’, যার অ্যান্টেনা একটু বেশি সংবেদনশীল।”


২. ভণ্ডামির স্তর (৭০%) – নিজে জানে, মিথ্যে বলছে বা নাটক করছে


মাঝে মাঝে মাজারে গিয়ে গলায় মালা, ধ্যানের সময় অদ্ভুত শব্দ, কিংবা হঠাৎ 'ভবিষ্যৎ বলা'—সবই কিছুটা অভিনয়, কিছুটা অভ্যাস।


সে নিজেই বলে, “মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, তাই আমি বিশ্বাসের মতো আচরণ করি। সেটাই তো প্রেম, নয় কি?”


৩. ভেতরের অদ্ভুত ‘দার্শনিকতা’ – কিছুটা সত্য, কিছুটা চালাকি


রঙ্গনের দর্শন জীবন থেকে নেওয়া, কিন্তু ভন্ডামি দিয়ে মিশিয়ে ফেলে।


অনেক সময় সে বলে,

 “সত্যির মধ্যে মিথ্যা না মেশালে মানুষ বিশ্বাস করে না। তাই আমি একটু মেশাই।”


রঙ্গনের শক্তি ও 'অলৌকিকতা' 


কেউ মারা যাওয়ার আগের রাতে রঙ্গনের ঘুম হয় না—এ নিয়ে সে বলে, “ওর আত্মা কাঁদছিল, আমি শুনেছি।”

এটা সত্যিই  যখন রঙ্গনের পরিচিত কেউ মারা যায়  রঙ্গন বুঝতে পারে।


একদিন এক বৃদ্ধ এসে তার কাছে বলে, “আমি শেষের পথে আছি, কিছু বলো।”

রঙ্গন বলে, “তোমার আপনজন আসছে।”


সত্যি সেইদিন বিকেলে তার ছেলে আসে বিদেশ থেকে।


সবাই ভাবে, রঙ্গনের অলৌকিক শক্তি আছে।


কিন্তু সে নিজেই জানে—বৃদ্ধ গত ৬ মাসে একা ছিলেন, ছেলে আসার দিন গুনছিলেন, তাই রঙ্গন আন্দাজ করে বলেছে।



বস্তির একপাশে, যেখানে রাস্তা শেষ হয়ে গেছে, আর পেছনে শুধু একটা ভাঙা ইটের দেয়াল, সেখানে রঙ্গনের ঘর।

দরজাটা অর্ধেকটা ভাঙা, অথচ ওটাই যেন তার প্রহরী। ভিতরে ঢোকার আগে মানুষ দুইবার ভাবে—এই ঘরে কী আছে?


ঘরে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়ে একটা পুরোনো আয়না। রঙ উঠা কাঠের ফ্রেম, আয়নার একপাশে ফাটল, মাঝে ধূসর দাগ।

এই আয়নাটার সামনে বসে রঙ্গন প্রতিদিন কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে।

না দাঁত মাজে, না চুল আঁচড়ায়, শুধু তাকিয়ে থাকে।


আজ সকালেও সে তাই করছে।

চুপচাপ বসে, আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে।

চোখের নিচে কালি, চুলগুলো আরও উসকোখুসকো।

তার পেছনে দরজা দিয়ে আলো এসে পড়ছে কাঁধে, যেন সে চুপ করে বসে আছেন কারও বিচারকের আসনে।


হঠাৎ দরজায় টোকা।


—“রঙ্গন ভাই?”


রঙ্গন কিছু বলে না। টোকা আবার।


—“রঙ্গন ভাই... একজন লোক খুঁজছে আপনাকে। কালো গাড়ি তে এসেছে।”


সে উঠে দাঁড়ায়। জামা বদলায় না। পাজামাটা একটু সামলে দরজার দিকে যায়।

কিন্তু ঠিক তখনই—এক মুহূর্ত থেমে যায়।

দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে সে আয়নার দিকে ফিরে তাকায়।

নিজের চোখে কিছু খোঁজে যেন।


তারপর ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।


গাড়ি ও গ্লানি


কালো প্রাডো গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড়ানো।

বস্তির ময়লা রাস্তায় তার চাকা যেন ভুল করেছে এই এলাকায় আসতে।

গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক লোক—সাদা পাঞ্জাবি, মুখে সানগ্লাস, গম্ভীর ভঙ্গিতে।


রঙ্গন চিনে ফেলে।


—“আব্বু?”


লোকটা সিগারেট ফেলে দেয়।

—“তুই এখনও আমাকে আব্বু বলিস? তুই যে বাবাকে মানুষ হিসেবে মানিস না, তাতে এই ডাকটা একটু বেশিই ঠেকে।”


রঙ্গন কিছু বলে না।


আলি আজিম চৌধুরী কামরান—রঙ্গনের বাবা। কোটি টাকার মালিক, ছেলেকে হেরোইন খোর ভাবতেন, এখন পাগল মনে করেন।


—“তুই কেমন আছিস?”


—“আমার আয়নার সঙ্গে কথা বলি। এখনও জবাব দেয় না। তবে গাল দেয় না এটুকু শান্তি।”


বাবা চুপ করে থাকেন। রঙ্গনের এই রকম ভাষার কাছে তিনি সব সময় পরাজিত হন।


—“তুই জানিস, তোর মায়ের হার্টের অবস্থা ভালো না। তোকে দেখতে চায়।”


—“আমার মতো ছেলের মুখ দেখলে আরও খারাপ হবে।”


আলি আজিম মাথা নিচু করে।


—“তোর দাদার ঘরে আমি একদিন গিয়েছিলাম... জানিস? সে আয়নার সামনে বসে বলেছিল, ‘আজিম, আয়নার পেছনের মানুষটা আমি না।’ আমি হেসে ছিলাম। পরে বুঝলাম, সে হাসছিল না। সে কাঁদছিল।”


—“আমার আয়নাটা দাদার ঘর থেকেই এনেছি। আমি মাঝে মাঝে দেখি, আমার চোখ নাড়ছে, অথচ আমি নাড়াইনি।”


একটা নিঃশব্দ পড়ে যায়।


বাবা ধীরে ধীরে বলে,


—“তুই ফিরিস।  তোর ব্যবসা লাগবে না। তুই শুধু বাড়িতে থাক।  আমি তোর পাশে থাকব।”


রঙ্গন হাসে।


—“আপনি পাশে থাকবেন? 


যেখানে আপনি ছিলেন, সেখানে আমি আর কোনোদিন যাব না। আর আমি যে জায়গায় আছি, সেখানে আপনি দাঁড়াতে পারবেন না। আমাদের মাঝে আয়নার একটা ফাটল আছে। সেটা এখনো কেউ মেরামত করতে পারেনি।”


বাবা আর কিছু বলেন না।


চুপচাপ গাড়িতে উঠে যান। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে রঙ্গন বলে ওঠে,


—“আপনি দয়া করে শতরুপা রিবাকে বলবেন না যে আপনি এসেছিলেন। ওর বিশ্বাস নষ্ট করতে ইচ্ছা করে না।”


রাত্রি ও পুরনো সময়ের গন্ধ


সেই রাতে রঙ্গন নিজের ঘরে বসে।

আয়নাটা তার সামনে।

সে চোখ বন্ধ করে।

ঠোঁট নাড়ে না, মুখে শব্দ নেই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শব্দ বেজে চলে—

কান্নার, দাদার গলা, মায়ের হাঁসফাঁস, বাবার নিঃশব্দ অভিমান।


রঙ্গন জানে, সে পীর নয়। সে ভবিষ্যৎ বলে না।

কিন্তু মাঝেমধ্যে তার ভেতরে কিছু শব্দ আসে—

নতুন নয়, পুরনোদের গন্ধমাখা শব্দ।


হঠাৎ ঘরের পেছনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।


এই দরজাটা কেউ চেনে না।

এটা এমনকি রঙ্গন নিজেও তেমন ব্যবহার করে না।

দরজাটা সরু, কাঠের, ওপর দিয়ে একটা ফাটল গেছে।

ওটা খুলে সে বেরোয় না, কিন্তু ভেতরে কিছু আসে।


আজ সে দরজা খুলে।

বাহিরে কেউ নেই।


কিন্তু মেঝেতে রাখা একটা কাগজে লেখা—


“আমি আবার আসব। আয়নাটা শুধু তোমার নয়।”— গফুর


রঙ্গনের গা কেঁপে ওঠে না।

সে শুধু কাগজটা রাখে আয়নার নিচে।


চোখ তুলে আয়নায় তাকায়।

এই প্রথম সে দেখে—

তার চোখে আজও সেই মানুষটা, যে আয়নার পেছনে থেকে কান্না করত।


শহরের শেষপ্রান্তে, একটি পুরনো ঝুপড়ি ঘর।

আগের বস্তিটা সে ছেড়ে দিয়েছে তিন সপ্তাহ আগে।

এখন এই নতুন জায়গায়, রাস্তার শেষে যে ঘরটায় কেউ ভাড়া থাকতে চায় না—

সেখানে রঙ্গন থাকে একা।


এই ঘরে কোনো আয়না নেই।

দেয়ালে নখের আঁচড়, সিলিং ভাঙা, ঘরজুড়ে ধুলো।

তবু রঙ্গন এখানে নিজের মতো করে টিকে আছে।



রাত গভীর হলে রঙ্গন চুপচাপ বসে।

বসে থাকে মাটিতে, দেয়ালে হেলান দিয়ে।

তার সামনে একটা লাল কাপড় বিছানো।

কাপড়ের ওপর কিছু ছোট ছোট কাঁচের টুকরো, কয়েকটা পাথর, দুটো শুকনো ফুল।

সে চোখ বন্ধ করে রাখে। মুখ নাড়ে না, কিন্তু নিঃশ্বাসের ভেতর একটা মৃদু গুঞ্জন।


তার বিশ্বাস—এই নির্জনতা, এই গভীর নীরবতা—

এইটাই “সংগ্রহ”।

সংগ্রহ মানে আত্মার গুঞ্জন শোনা।

তার দাদা বলতেন, “যা শব্দ নয়, তাই আসল শব্দ।”


রঙ্গন জানে, পুরোটা সত্যি নয়।

কিছুটা অভিনয়, কিছুটা প্রবঞ্চনা, কিছুটা আত্মা ছোঁয়ার ভান।


তবু সে বসে থাকে।

কারণ এই ভানটুকুই তাকে কিছু একটা দেয়।

হয়তো কেবল একাকিত্বের একটা শুদ্ধ রূপ।


সেইদিন খুব ভোরে, যখন আকাশ সাদা হয়ে আসে,

সে ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে।


বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ নেই।

তবু সে অনুভব করে, যেন কেউ একবার খুব নরম গলায় তার নাম উচ্চারণ করল—

“রঙ্গন...”


সে থামে। শোনে। কোনো শব্দ নেই।

তবু মাথার পেছনে, হাওয়ার দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে—


—“রিবা, তুমি কখন এসেছিলে?”


অবশ্যই রিবা নেই। সে তো জানেই না এই ঠিকানা।

সে শুধু খোঁজ করে বেড়ায়।

চোখে চশমা, হাতে পুরনো খাতা, একটা ছবির কপি যার নিচে লেখা “রঙ্গন”।



শতরুপা খান রিবা।


ঢাকার অন্যতম ধনী চিকিৎসকের একমাত্র কন্যা।

তার বাবার মেডিক্যাল কলেজ আছে, হাসপাতাল আছে, ছাত্র আছে, খ্যাতি আছে।

কিন্তু রিবার কাছে এইসব কিছুই একধরনের গ্লাস দেয়াল।


সে প্রতিদিন কিছু সময় কাটায় পুরনো জায়গায়, যেখানে রঙ্গন থাকত।

যদিও এখন সেসব জায়গা বদলে গেছে, লোক বদলে গেছে,

তবু সেখানে দাঁড়িয়ে রিবা ভাবে—

“রঙ্গন কি সত্যিই মাটি থেকে উঠে গিয়েছিল? না কি সে মাটিতেই মিলিয়ে গেছে?”


কখনও কখনও, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা এক হাওয়াই চপ পরা লোককে দেখে তার বুক ধড়ফড় করে ওঠে।

কখনও রিকশাওয়ালার মুখে রঙ্গনের চোখ খুঁজে পায়।


তবু সে জানে—এই দেখা হবে না।

রঙ্গন চায় না দেখা হোক।


একদিন, এক সন্ধ্যায় সে রিকশায় চড়ে ফিরছিল।


নিউ মার্কেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ এক অন্ধকার গলিতে সে দেখতে পেল—


একজন লোক হাঁটছে। তার গায়ের শার্ট ময়লা, চোখ নিচু, হাঁটা নিরুত্তাপ।


শতরুপার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

তার মনে হয়, এই লোকটা...


—“রঙ্গন...?”


রিকশা থামে না। গাড়ি চলে যায়।


সে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পায়, লোকটা চলে যাচ্ছে উল্টোদিকে।

একবারও ফিরে তাকায় না।


সেই রাতে রঙ্গন ঘরে বসে ছিল।

কাঁচের বোতল থেকে এক ফোঁটা তরল একটা পাথরের ওপর ফেলে।


ধোঁয়া ওঠে না। কিছু গন্ধও আসে না।


সে বলে—“আজ তুমি আসো না?”


কেউ নেই।


সে জানে কেউ আসবেও না।

তবু এই প্রশ্নটা করতে করতে, সে নিজেই নিজের প্রশ্ন হয়ে গেছে।


রাত্রি বাড়ে।

ঘরের একপাশে রাখা পুরনো ধাতব হাতঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে কাল রাত থেকে।


ঘড়ির কাঁটা আর চলে না।


সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবে—


“কিছু মানুষ আছে, যারা কাঁটার চেয়েও থেমে থাকে।

আর কিছু সম্পর্ক, সময় থেমে যাওয়ার পরও চলতে থাকে।

রিবা, তুমি হয়তো সেই দ্বিতীয়টি।”


রিবার সমাপ্তি


এই সময়ের মধ্যেই

শতরুপা খান রিবার বিয়ে হয়।

একজন আমেরিকাপ্রবাসী বাঙালি নিউরোসার্জনের সঙ্গে।

ছবির মতো অনুষ্ঠান, ছবির মতো হাসিমুখ।


রঙ্গনের কাছে এই খবর আসে এক বন্ধু মারফত।

সে শুধু বলে—

“ভালো হয়েছে। সে আমার গল্পের পাতায় ছিল না।”


তারপর আর কিছু বলে না।

কোনো ছবি রাখে না, কোনো স্মৃতি রাখে না।

কারণ তার সামনে এখন অন্য যাত্রা, অন্য ইতিহাস।



 পূর্বজের ছায়া


পঁচিশ কিলোমিটার দূরে, শহর ছেড়ে কাদামাটির পথ ধরে এগোলে

একটা ছোট গ্রাম পড়ে—চাঁনমহল।

সেখানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি,

যার ছাদ ধসে গেছে, দেয়ালে আগাছা গজিয়েছে,

আর তার প্রবেশপথের উপরে কালচে অক্ষরে লেখা—


“রঙ্গন চৌধুরী ভবন, ১৮৩২”


গ্রামের লোকেরা বলে, “ওই বাড়িতে এখনো রাত নামলে ছায়া চলে বেড়ায়।”

কেউ বলে পুরনো আত্মা, কেউ বলে ইতিহাসের গন্ধ।


কিন্তু কেউই নাম উচ্চারণ করে না জোরে।

কারণ রঙ্গন জমিদার নামটা এখানে ভয় আর ঘৃণার সমার্থক। ওই নাম নিলে গ্রাম জুড়ে বিপদ নেমে আসে।  ওই নাম অভিশপ্ত। 


এক নির্মম পূর্বপুরুষ: রঙ্গন জমিদার


রঙ্গন চৌধুরী ছিলেন সেই সময়ের একমাত্র জমিদার যিনি

অত্যাচারকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন।

তার জমিদারিতে ধান উৎপন্ন হলে—

কৃষককে কর দিতে হতো শুধু ফসলেই নয়,

তার স্ত্রীর গয়নাতেও।

তার আদেশ ছিল, কেউ অপারগ হলে তার বাড়ির কড়ি-বরগা খুলে এনে জমিদারীর খাজাঞ্চিখানায় জমা দিতে হবে।


গল্প আছে,

এক বিধবা নারী তার ছেলের চিকিৎসা করাতে জমিদার দরবারে গিয়েছিল।

রঙ্গন চৌধুরী তাকে বলেছিলেন—

“চোখের জল দামে বিকোই না। পায়ের বালির মূল্য আছে। পা ধুয়ে আয়, জল নিই।”


লোকমুখে শোনা, ওই নারীসহ অসংখ্য নারী পুরুষের  অভিশাপেই তার পরিবারে মানসিক রোগের ধারা শুরু হয়।


১০


স্মৃতি নয়, দাগ


বর্তমান রঙ্গনের জন্ম বহু বছর পরে হলেও

তার দাদার স্মৃতিচারণায় ওই নাম বারবার ফিরে আসে—

“রঙ্গন... তুই জানিস না, তোর নামের ভেতরেই আগুন আছে।

আমার বাপ, তার বাপ, সব ভেতরে আগুন জমিয়ে রেখে গেছে।”


রঙ্গন তখন হাসত, ভেবেছিল গল্প।

কিন্তু বড় হতে হতে সে বুঝতে শিখল—

তার ভিতরকার একধরনের অস্বস্তি,

একধরনের টান, যা তাকে জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তূপের দিকে ডেকে নেয়।


বাতাসে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস

তিন দিন আগে সে হঠাৎ ওই গ্রামে চলে যায়।

কারও কিছু না বলে।

একটা পুরনো বাইকে, ধুলো ওড়ে এমন রাস্তায় সে চলে আসে—

চাঁনমহল।


বাড়িটা দেখে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

দরজা নেই, দেয়ালে লতাপাতা, ভিতরে ঠান্ডা বাতাস।

তার মনে হয়, এই বাড়িটা নিঃশ্বাস নেয়।

তার বুক ভার হয়ে আসে।

সে ভিতরে পা রাখে।


ঘরের একপাশে একটা পাথরের গদি পড়ে আছে।

সেখানেই বসে সে।

নীরবতা, পাখির ডাক, আর এক অদ্ভুত হালকা মৃদু শব্দ।


সে কানে শোনে—

“তুই আমার নামে নাম ধরিস, কিন্তু শরীরে আমার সইফা নাই। তুই পারবি?”


সে তাকায় চারদিকে। কেউ নেই।


তবু তার মনে হয়, এই দেয়াল জানে,

এই মেঝে, এই সিঁড়ি,

সব তার পূর্বপুরুষের পায়ের শব্দ মনে রেখেছে।


ফিরে এসে রঙ্গন কিছু লেখে নিজের ডায়েরিতে—


 “আমার ভিতরে যা আছে, তা শুদ্ধ নয়।

ইতিহাসের দাগ ধুয়ে ফেলা যায় না শুধু ভালোবাসা দিয়ে।

আমি যদি বাঁচি, তবে নতুন এক রঙ্গন হয়ে।

পুরনো রঙ্গনকে বহন করেই।”




রঙ্গন জমিদার ২

: অর্পন রহমান


চাঁন মহল :


চাঁনমহল গ্রামের শেষপ্রান্তে এক সময় সূর্য ডোবার আগে সবার দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যেত। নারীরা রান্না ফেলে উঠোনে ছুটে যেত শিশুদের খুঁজতে। পুরুষেরা তাদের কণ্ঠ নিচু করত, যেন বাতাসেও যেন কারও কানে কোনো দুঃখভরা শব্দ না পৌঁছায়।


কারণ, রঙ্গন চৌধুরী তখন ওই জমিদার বাড়িতে ছিলেন।


একজন মানুষ কীভাবে এতখানি ভয় হতে পারে, সেটা যারা দেখেছে, তারা আর ভুলে যেতে পারেনি। তিনি মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভয়, অভিশাপ, এবং প্রয়োজন।


রঙ্গন জমিদার ছিলেন উনিশ শতকের শেষ দিকে পূর্ববাংলার অন্যতম শক্তিধর জমিদার। তার পূর্বপুরুষ ছিলো রাজবংশীয় জমিদার, কিন্তু রঙ্গন নিজের শাসনকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল—ভয়, ভোগ আর শোষণের পর্যায়ে।


প্রতি সপ্তাহে চার দিন সে চাঁনমহলের জমিদার বাড়িতে থাকত। বাকি দিনগুলো কাটাত শহরের নিজস্ব প্রাসাদসম বাড়িতে। ঢাকার ইংরেজ কালেক্টরের সঙ্গে তার গা-ঘেঁষাঘেঁষি সম্পর্ক ছিল। ইংরেজ সাহেবেরা তার দেওয়া দামী ওয়ারকশা জর্দা, বিদেশি রমণী, আর পুরনো সুরার নেশায় এতটাই মাতোয়ারা থাকত যে, রঙ্গনের নাম শুনলেই স্যালুট দিত।


রঙ্গনের জমিদার বাড়ির নামই ছিল ‘চানমহল’। কিন্তু সেখানে চাঁদের আলো ঢুকত না, ঢুকত শুধু বাঈজীর কণ্ঠ, ঢোলের আওয়াজ, শরাবের ঘ্রাণ আর নারীর কান্না। ওই প্রাসাদে মেঝে ছিল মর্মর পাথরের, ছাদে ছিল রঙিন কাচ, আর ঘরের প্রতিটি দেয়ালেই ঝুলে থাকত নগ্ন নারী শরীরের তৈলচিত্র, যেগুলো রঙ্গন নিজে বসে আঁকাত কাশ্মীরি চিত্রশিল্পী দিয়ে।


চানমহলে প্রতি রাতেই থাকত নাচগান। ঢোলের শব্দে কাঁপত আঙিনা। বাঈজীরা গাইত—“রঙ্গন বাবু রে, তুমি তেজের আগুন।” আর সেই আগুনে প্রতিদিন পুড়ত কোনো না কোনো মেয়ের মুখ, কোনো বিধবার সোনার নথ, কোনো গরিব চাষার শেষ হাঁস।


গ্রামের মানুষ তার কাছ থেকে ধান, চাল, গরু এমনকি সন্তানও হারিয়েছে। একবার কেউ খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে, সে লোকের মেয়ে বা বউকে বাড়িতে ধরে নিয়ে আসা হতো। কাগজে কিছুই লেখা থাকত না, শুধু মানুষ হারিয়ে যেত।


রঙ্গনের নায়েব আবু বকর আর সুবেদার মজিদের দম্ভ ছিল খোদ শয়তানের কাছ থেকেও ধার করা। আবু বকর বলত—"আমরা জমিদারের লোক, ইশ্বরওও ঘুষ খায়।" মজিদ বলত—"এই গ্রামে রঙ্গন চৌধুরীই ঈশ্বর। বাকি সবাই পাঁজরভাঙা প্রজা।"


যে মেয়েটা চিৎকার করত, তার কণ্ঠস্বর চিরতরে মাটির নিচে চলে যেত। যে ছেলেটা রাগ দেখাত, তার হাত-পা ভেঙে পুকুরে ফেলে দেওয়া হতো। যে বুড়ো খাজনা দিতে পারত না, তার ছেলের ঘরে ঢুকত সুবেদাররা।


মাঝেমধ্যে রঙ্গন জমিদার নিজেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত—এক হাতে বেলজিয়ান পাইপ, অন্য হাতে শরাবের বোতল। সে হাসত, আর বলত—“পৃথিবীটা আমার খেলার মাঠ। এখানে কান্না মানেই জিত।”


গ্রামের পুরোহিত, মৌলভি, গৃহস্থ সবাই জানত—জমিদারের চোখের দিকে তাকালে চোখ পোড়ে। তারা মুখ ফিরিয়ে থাকত। জমিদারের শৌখিনতার জন্য গ্রামের মেয়েরা বিয়ের আগে তিনবার গোসল করত, জানত না কোন রাতে কে হারিয়ে যাবে।


একবার একটি পরিবার গোপনে পালিয়ে গিয়েছিল পাশের গ্রামে। এক সপ্তাহ পরে পাওয়া গিয়েছিল সেই পরিবারের বৃদ্ধ পিতা এবং এক কিশোরী মেয়ে—দুজনেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছিল। কোনো বিচার হয়নি। কেউ জানত না, জানতেও চাইত না।


রঙ্গন জমিদারের জমিদারি কেবল ফসল বা খাজনার নয়, সে মানুষকে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল—ভয়ে, অপমানে, ও নীরবতায়।


তার প্রাসাদ ছিল ইট-সুরকির, কিন্তু ভিতরটা ছিল রক্তের। দেয়ালে দেয়ালে নারীদের চুল আটকে থাকত, জানালার ফাঁকে ফিসফিস আওয়াজ ভেসে আসত, যেন কেউ কাঁদছে—কিন্তু কাঁদার আওয়াজ তো অনেক আগেই জমিদারের ঘর গিলে ফেলেছে।


এই জমিদারের ছায়া এমনভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল, যে কেউ পুকুরে স্নান করতে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালে ভয় পেত। কারণ, রঙ্গন চৌধুরীর মুখ কেমন ছিল, তা কেউ স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত না, কিন্তু ভয়ের ছায়া মনে থাকত।


তার মৃত্যুর পরও এই জমিদার বাড়ি কেউ ছুঁয়েছিল না। গ্রামের মাঝখানে পড়ে থাকা বাড়ি, অথচ শত বছরেও কেউ সেখানে বিয়ে দেয়নি, খেলেনি, চাষও করেনি।


কিন্তু এখন, শত বছর পরে, আরেক রঙ্গন সেই নাম বহন করে। জানে না কি ছিল ইতিহাসে, কিন্তু গভীর রাতে কখনও কখনও তার কানে কেউ ফিসফিস করে বলে—


তুই আমার নামে নাম ধরিস, কিন্তু শরীরে আমার আগুন নাই। পারবি বহন করতে?


নীহারিকা :


জমিদার রঙ্গন চৌধুরীর জীবনে একমাত্র মানুষ যে তাকে স্থির করতে পেরেছিল, সে ছিল এক বাইজি। নাম—নিহারিকা। কিন্তু সে কেবল শরীর ছিল না, ছিল আলো, অন্ধকার, এবং মধ্যরাতের নিষিদ্ধ কান্না।


নিহারিকা আসত কলকাতা থেকে। কিশোরী বয়সে ধরা পড়েছিল ট্রেনে টিকিট ছাড়া ভ্রমণের সময়। এক পুলিশ অফিসার তাকে প্রটেকশনের নামে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় ঢাকার এক নাচঘরে।


সেখান থেকেই রঙ্গনের নজরে পড়ে সে। প্রথম দেখা চাঁনমহলের চিলেকোঠায়, এক বাঈজী সন্ধ্যায়। সে গাইছিল—আবহমান রাগ ভৈরবীতে—“রাত জাগা তারা আমি, তোর খোঁজে পুড়ি রে।” রঙ্গনের শরীরের রক্ত যেন কিছুক্ষণ থেমে গিয়েছিল। নিঃশব্দে সে তখন বলেছিল,


—এই মেয়েটাকে আজ থেকে কেউ ছুঁবে না।


নিহারিকার শরীর তখনও ক্লান্ত ছিল, কিন্তু চোখ ছিল জ্বলন্ত। সে জানত না এই ঘোষণার পেছনে প্রেম আছে, না শিকারির সিদ্ধান্ত। কিন্তু দিন না যেতেই সে বুঝে যায়—রঙ্গন চৌধুরীর স্পর্শ একাধারে ঈশ্বরের আশীর্বাদ, আবার অভিশাপ।


চাঁনমহলের তৃতীয় প্রান্তের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটায় তৈরি হয় একটি ঘর—নিহারিকার জন্য। সেখানে ছিল গুলাবজলের ফোয়ারা, কাশ্মীরি গালিচা, রাজস্থানী আয়না, আর মুর্শিদাবাদি পালঙ্ক। এই ঘরে কেউ ঢুকতে পারত না। শুধু রঙ্গন, আর রাতে রক্তের গন্ধে জেগে থাকা নিরব সানাই।


রঙ্গন চৌধুরী প্রতি রাতে নিহারিকার কাছে যেত। প্রথম প্রথম তা ছিল নিছক শরীরের লোভ। কিন্তু কিছুদিন পর একরাত সে এসে বলে,


—তুই আমার চোখে স্বপ্ন ঢুকায়ে দিস, আমি তোরে চাই না, আমি তোকে বুঝতে চাই।


নিহারিকা তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বলেছিল,


—তুমি বুঝতে না চাইলেই তো ভালো। কারণ আমি মানুষ না, আমি পাঁজরের খাঁচায় গলায় ঝুলে থাকা কাঁটার মতো। চাইলেই রক্ত ঝরে।


সেই রক্তই ছিল তাদের প্রেম। তারা একে অপরের শরীরের গন্ধ চেনে, ঘামের স্বাদ চেনে, কান্নার শব্দ চেনে। কিন্তু ভালোবাসা? সে ছিল না।


একদিন রঙ্গন বলেছিল,


—তুই থাকলে আমি শাসন ভুলে যাই। তুই না থাকলে আমি ঈশ্বর হয়ে যাই।


নিহারিকা উত্তর দিয়েছিল,


—তুমি কোনোদিন মানুষ ছিলে না রঙ্গন। তুমি ভয়, তুমি ক্ষমতা, তুমি সেই ছায়া, যা কোনো নারীর গর্ভে জন্ম নেয় না, কিন্তু কেবল নারীর মধ্যেই বাসা বাঁধে।


তাদের সম্পর্ক ছিল এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের। নিখাদ ভালোবাসা নয়, আবার নিছক ভোগও নয়।


চানমহলে যে রাতে সবচেয়ে নির্মম ঘটনা ঘটত, সেদিন নিহারিকা তাকে স্পর্শ করত না। সে চুপ করে থাকত। রঙ্গন ঠান্ডা হয়ে যেত। বলত,


—তুই আমায় বাঁচাস। আবার মারও। তোর চোখেই আমি সবচেয়ে পাপী।


নিহারিকা বলত না কিছু। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, চাঁদের আলো তার পিঠে পড়ত, আর সে যেন বোঝাতে চাইত, যতটা চোখে দেখা যায়, সে তার চেয়েও বেশি অন্ধকার।


একদিন, রঙ্গন তাকে বলেছিল,


—তুই পালিয়ে যা। এই চাঁনমহল তোকে শেষ করে দিচ্ছে।


নিহারিকা বলেছিল,


—আমার যাওয়ার জায়গা নাই রঙ্গন। আমি তোর চাঁনমহলের মতোই নিষিদ্ধ, উন্মুক্ত, আর অভিশপ্ত।


সেই কথার এক সপ্তাহ পরেই নিহারিকা নিখোঁজ হয়। কেউ খুঁজে পায় না। না নদীতে, না শহরের পেছনের ঘাটে, না বাজারের ভিড়ে।


লোকমুখে কেউ কেউ বলে, সে নিজেই বিষ খেয়ে শেষ করেছে। কেউ বলে, রঙ্গন নিজেই সরিয়ে দিয়েছে। কেউ বলে, সাহেবদের জন্য সপে দিয়েছে।


রঙ্গন তখন থেকে আর কাউকে ঘরে রাখেনি। সেই ঘর বন্ধ, কিন্তু তার দরজার কাছে মাঝরাতে দাঁড়ালে শোনা যায় এক নারীর নরম কণ্ঠ—


—তুমি বাঁচো রঙ্গন, কারণ তুমি মরতে পারো না। কারণ তুমিই মৃত্যু।



চাঁনমহল তখন নিস্তব্ধতার এক জটিল আবহে জর্জরিত। রঙ্গন জমিদার প্রতিদিনের মতো চুপচাপ ঘরে ঢোকে। একদিন আগে নিহারিকা বলেছিল, সে আর গাইবে না, নাচবেও না। সে শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। রঙ্গন কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়ে থেকেছে। সেদিন রাতে তারা একসাথে ছিল না। তারা কেউ কারও শরীরে ছিল না। তারা শুধু ঘরে ছিল। সেই ঘর আজও আছে, দরজা বন্ধ।


পরদিন সকাল। সবকিছু যেন ঠিকঠাক। চাঁনমহলের চাকররা নাস্তা তৈরি করছে, ঢোলের শব্দ আসছে দূরের বারান্দা থেকে। কিন্তু নিহারিকা নেই। তার ঘর খোলা, কিন্তু বিছানায় কেউ নেই। কাপড়চোপড় নেই, সিন্দুক খালি। কেবল আয়নার সামনে একজোড়া কানের দুল পড়ে আছে, সেই দুল যেটা রঙ্গন তাকে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছিল।


প্রথমে মনে করা হয়, হয়তো সে গিয়েছে গঙ্গার পাড়ে, প্রাতঃস্মরণে।


ঘণ্টা গড়ায়। দুপুর আসে। বিকেল নামে।


রঙ্গন অস্থির হয়ে ওঠে। সে কাউকে কিছু বলে না, নিজে ছুটে যায় ঘাটে, বাঈজীদের মহল্লায়, এমনকি সাহেবদের ক্লাবে গিয়েও খোঁজ করে। কোথাও নেই। কেউ দেখেনি। কেউ কিছু জানে না।


তৃতীয় দিন, তার ঘর থেকে এক চাকর নিঃশব্দে চলে যায় মঠপুকুরের দিকে। ফিরে আসে না। লোক পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, পুকুরের একপাশে, পচা শ্যাওলার স্তূপের নিচে পাওয়া গেছে সেই চাকরের মৃতদেহ। মুখ নেই। গলা কাটা।


রঙ্গন বুঝতে পারে, কেউ তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। কেউ তাকে থামাতে চেয়েছিল।


সে রাতের পর থেকে রঙ্গন আর কাউকে চাঁনমহলে ঢুকতে দেয় না। নিজেও রাত কাটায় শহরের নিজের বাড়িতে। শুধু সপ্তাহে একবার আসে, ঘরে ঢোকে, দরজা বন্ধ করে। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে শোনা যায়—


—তুই থাকলে আমি শাসন ভুলে যাই।


এই কণ্ঠ কার—রঙ্গনের, না নিহারিকার, কেউ জানে না। কেউ জানতেও চায় না।


দিন যায়, বছর পেরোয়। নতুন মুখ আসে, যায়। কিন্তু কেউ সেই ঘর খোলে না। কেউ সেই দুল পরে না। আর কখনও সেই ঘরে সানাই বাজে না।


একদিন, এক সাহেব এসে রঙ্গনকে জিজ্ঞেস করে,


—Where is your songbird?


রঙ্গন তাকিয়ে থাকে তার চোখে। ঠোঁটে একফোঁটা রক্ত জমে আছে সুপারির লালচে ছায়ায়। সে কেবল বলে,


—She flew too close to the fire.


সাহেব কিছু বোঝে না। মাথা নেড়ে চলে যায়।


কিন্তু সেই রাতে, চাঁনমহলের ফাঁকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, এক ভৃত্য দেখে—রঙ্গন ধীরে ধীরে মদের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে দেয় জানালার বাইরে। তারপর নিঃশব্দে বলে ওঠে,


—নিহারিকা, তুই কী আসলে গেছিস?


তারপর, অন্ধকার।



চাঁনমহলের সেই ঘর এখন ধুলোয় ঢাকা, বন্ধ দরজা, বন্ধ জানালা। তবু মাঝেমধ্যে, এক-একটি রাত আসে, যখন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, ফুলের গন্ধে নয়—একধরনের পোড়া আতরের গন্ধে।


নিহারিকা চলে যাওয়ার পরে রঙ্গন জমিদারের জীবন থেমে যায়নি, কিন্তু তার ভেতরের কোনো একটা চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। সে আসতো, যেতো, করতো জমিদারি, সাহেবদের সাথে পার্টি করতো, নতুন বাঈজীদের আনতো—but never in that room. সেই ঘরে সে আর ঢুকতো না।


কিন্তু যেদিন সে শহরের বাড়িতে থাকতো না, গ্রামে থাকতো, চাঁনমহলের চাকরদের মুখে গুজব ছড়িয়ে পড়তো। তারা বলতো—সেই ঘরে মাঝরাতে মৃদু নাচের শব্দ শোনা যায়। একতলার বারান্দা থেকে দেখা যায়, জানালার পর্দা ধীরে ধীরে ওঠে, পরে নামে, যেন কারও হাতে বাঁধা ছায়া ভেতরে নাচছে।


চৌকিদার নবীন একবার সাহস করে উঠে গিয়েছিল ঘরের সামনে। দরজায় কানে লাগিয়ে শুনেছিল কিছু—না গান, না কান্না, না বাতাসের শব্দ। যেন তিনটিই একসাথে। পরদিন তাকে পাওয়া যায় গরুর গোয়ালঘরে, কেবল চিৎকার করতে করতে বলে—“সে মানুষ ছিল না, সে বাতাসে গন্ধ হয়ে ছিল, ছায়ায় লুকানো মুখ।”


কেউ কেউ বলত, নিহারিকা আসলে কোনো বাইজি ছিল না। সে ছিল পুরনো অভিশাপের এক মুখচ্ছবি। বহু শতাব্দী আগে জমিদারদের এক রক্ষিতা আত্মহত্যা করে এই বাড়িতেই। তার অভিশপ্ত আত্মা জন্ম নিয়েছিল নতুন শরীরে—নিহারিকার রূপে। সে এসেছিল রঙ্গনের ধ্বংস টেনে আনতে। সে ছিল ভালোবাসার মুখোশ পরে আসা প্রতিশোধ।


রঙ্গন এ কথা কখনো বিশ্বাস করেনি প্রকাশ্যে। কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে, শহরের বাড়িতেও, সে ঘুম ভেঙে উঠে বসে। জানালার ফাঁকে চাঁদের আলো পড়ে তার ঘুমের বিছানায়। আর দেয়ালে ছায়া পড়ে এক নারীর, যে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দরজার দিকে।


সে চিৎকার করে না। কেবল চোখ বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়ে। যেন বিশ্বাস করতে চায়, কিছুই ঘটেনি। কিন্তু ঘুমের মাঝে, ঘেমে উঠে, সে বলে ওঠে—


—তুই মানুষ না হলে, আমি কী রে? আমি তো তোকে ভালোবেসেছিলাম।


চাঁনমহলের চাকরেরা একে একে সেই ঘরের পাশে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এক নবীন বাঈজি একবার সাহস করে সেই ঘরের পাশে গানের রেওয়াজ করছিল। হঠাৎ সে গান থামিয়ে ফেলে। রক্তশূন্য মুখে বলে—“একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল জানালার বাইরে। সে আমার গান শুনছিল। কিন্তু তার চোখ ছিল না। শুধু শূন্যতা।”


তখন থেকেই সেই ঘরের নতুন নাম হয় ‘নীলঘর’। কেউ সেখানে যায় না। সেখানে আলো জ্বলে না।


কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকে না।


এই ঘটনার শত বছর পরে, এই একই রক্তরেখা বইতে বইতে, জন্ম নেয় নতুন রঙ্গন। যার ঠোঁটে সুপারি, চোখে ক্লান্তি, শরীরে জীর্ণ ফতুয়া আর মনে এক অচেনা কান্নার ছায়া।


সে কখনো বোঝে না কেন তার স্বপ্নে এক মহিলা আসে, যার মুখ নেই, কিন্তু সে তার কাছে প্রেম চায়, ভালোবাসা চায়।


রঙ্গন ঘুমের মধ্যে উত্তর দেয়—“তুই আমার ঘর জানিস? আমার ইতিহাস জানিস?”


কোনো উত্তর আসে না। আসে শুধু বাতাসে ভেসে আসা সেই পুরনো গান:


“রাত জাগা তারা আমি, তোর খোঁজে পুড়ি রে…”


৫.


গভীর রাতে অরণ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা চান মহলটা যেন নিঃশব্দ কোনো অন্ধ গুহার মতন। জানালায় আলো নেই, বাতাস নেই, নেই কোনো শব্দ—শুধু হঠাৎ হঠাৎ দূরে রাতচরা পাখির ডেকে ওঠা আর শিয়ালের আর্তনাদ। চারদিকে শীতল ধোঁয়াটে কুয়াশা, আর সেই কুয়াশার ফাঁকে একবার দেখা যায়, একবার হারিয়ে যায় চান মহলের ভগ্নদশা।


এই বাড়িটার নাম কেউ মুখে আনে না এখন, গ্রামের লোকজন বলে, “ওইখানে গেলে ফিরে আসা যায় না। কেবল আগুনের গন্ধটা শরীরে লেগে থাকে।”


কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম। আজ গ্রামে রক্ত ফুটছে, ঘৃণার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।


গ্রামের লোকজন বলত, “জমিদার কালো বিদ্যার সাধক। ওর চোখে চোখ পড়লে হাড় পর্যন্ত কাঁপে।”


বিরুদ্ধ হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। আশ্বিন মাসের শেষ দিক। হঠাৎ করেই নদীতে জল বেড়েছে, মাঠে খেত শুকিয়ে গেছে, গরু মরছে একের পর এক। কেউ বলছে—এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু বৃদ্ধ গোপাল দা বললেন—

“এইসব সবই জমিদারের পাপের ফল।”


এমন সময় খবর এল, পাঁচ কিশোরী একসাথে নিখোঁজ।

সবারই বাড়ি পাশের দোহারপাড়ায়।


এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মেয়েগুলোর কেউই আর ফিরলো না। তৃতীয় দিন রাতে এক পাষণ্ড চিত্র দেখা গেলো গ্রামের এক বটগাছের নিচে—রক্তমাখা লাল শাড়ি, একটি মেয়ের ছেঁড়া ওড়না, আর একটি তামার তাবিজ—যেটা সেই মেয়েদের একটার গলায় দেখা গিয়েছিল।


তখনই শুরু হলো চিরতরুণ লোকটা—মঈন মাস্টার—তার গলায় চিৎকার: “আর না! ওরে পুড়াইয়া দাও! আগুন দাও চান মহলে!”


মানুষের ভেতরের ঘৃণা যেন দহনের তাপে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। টর্চ, কেরোসিন, বাঁশের লাঠি—সব জড়ো হতে থাকলো।


চান মহল ছিল এক রহস্যময় স্থান। ১৮১৩ সালে নির্মিত হয়েছিল এটি। মাঝখানে বিশাল খোলা উঠান, চারপাশে বারান্দা ও অন্ধকার ঘর। উত্তর দিকের ঘরে ছিল তান্ত্রিক শয়নকক্ষ। পূর্ব ঘরে ছিল ‘নারীকুঠুরি’—যেখানে আটকে রাখা হতো মেয়েদের।


লোকে বলে, চান মহলের নিচে এক লুকানো কুঠুরি আছে। সেখানে গোপন বলি হতো। কেউ কখনো ঢুকেছে কিনা, কেউ জানে না।


আজ সেই চান মহলকেই ঘিরে ফেললো প্রায় তিনশো গ্রামের মানুষ।


রাতে প্রায় ১১টা। চারদিকে নিঃশব্দ অন্ধকার। কেবল জ্বলছিল কেরোসিন বাতি আর টর্চের আলো। গ্রামের একেকটি দল ঘিরে ফেললো চান মহল।


“তালা ভাঙ!”

“রঙ্গন শয়তান, তোর বিচার হবে আগুনে!”


তালা ভাঙা হলো বাঁশ দিয়ে। দরজা খুলতেই এক ঝাঁক বাদুড় উড়ে গেলো অন্ধকার থেকে। যেন তারা ছিল কোনো পিশাচের আত্মা।


মহলের ভেতরে ঢুকে পড়ে মঈনের দল। চোখে পড়ে—রক্তমাখা মেঝে, ছিন্নবস্ত্র, দেয়ালে ঝোলানো নারী চুলের ঝাঁক, আর কিছু অদ্ভুত আঁকা প্রতীক—যেগুলো কোনো প্রাচীন অভিশপ্ত ধর্মের চিহ্ন।


আর তার সামনে দাঁড়িয়ে রঙ্গন জমিদার।


চুল এলোমেলো, চোখ জ্বলজ্বলে। কিন্তু গায়ে কোন কাপড় নেই, কেবল এক কালো তামার লকেট গলায়।


সে চিৎকার করলো,

“তোরা আগুন দিতে এসেছিস? আগুন আমার খেলা। তোরা জানিস না, আমি কে?”


মঈন এক লাথিতে ফেলে দেয় রঙ্গনকে মাটিতে।


“তোর বিচার আজ মানুষ করবে, আর তার নাম হবে আগুন।”


টর্চের তেল ছিটিয়ে ছিটিয়ে ভিজিয়ে ফেলা হলো সমস্ত মহল। এক ঘর, দুই ঘর, পুরো প্রাসাদ যেন কেরোসিনে সাঁতারে গেল।


তারপর কেউ একজন আগুন ধরিয়ে দিল। শুরু হলো দাবানল। শুরু হলো শয়তান ধ্বংসের উৎসব।


 কিন্তু...


আগুন যখন ছড়িয়ে গেলো ছাদ পর্যন্ত, তখন হঠাৎ করেই আকাশে গর্জে উঠলো এক অদ্ভুত শব্দ। যেন মেঘের আওয়াজ নয়, যেন আকাশ থেকে কে কাঁদছে।


চান মহলের আগুনের মাঝখান দিয়ে উঠলো ধোঁয়ার কুণ্ডলি, আর তার মাঝে দেখা গেলো—রঙ্গনের মুখ, চোখ বন্ধ, কিন্তু সে হাসছে।


মঈন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

“ও মরল তো?”


কেউ জবাব দিল না। কারণ ঠিক তখনই, আগুনের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত আওয়াজ এলো—

“তোমরা আমার দেহ জ্বালাতে পারো, আত্মা নয়। আমি ফিরে আসবো আগুন থেকে।”


 সাত দিন পরে


চান মহল এখন ছাই। কিন্তু আশেপাশের এলাকা ধোঁয়া ছাড়ে না। মেয়েদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনো। রঙ্গনের দেহও পাওয়া যায়নি। কেবল পুড়ে যাওয়া সেই তামার লকেটটা মাটিতে পড়ে ছিল।


সেই রাতের পর থেকে গ্রামের লোকেরা ভয় পায়। প্রতিদিন একেক বাড়িতে আগুন লাগে। কেউ বলেন এটা দুর্ঘটনা, কেউ বলেন—

“রঙ্গন জমিদার পুড়ে মরেনি, সে আগুন হয়ে ফিরে এসেছে। এখন যার ঘরে আগুন লাগবে, সে ছিল সেই রাতে চান মহলে!”



চান মহল ধ্বংস হয়েছে সাত দিন।

গ্রামে বৃষ্টি পড়েনি এক ফোঁটাও। বাতাসে এখনো পোড়া কাঠের গন্ধ। সন্ধ্যার পর দরজায় কড়া নাড়লে লোকজন আর খুলে না। শিশুরা আর উঠানে খেলে না, নারীরা আর গহনা পরে না। পুরুষেরা রাতে চুপচাপ হাড়িপাতিল ধুয়ে ঘরের এক কোনায় বসে থাকে।


রঙ্গনের ছাইখণ্ড এখন আর জমিদার প্রাসাদে নেই, সে ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে—কোনো কুয়াশার মতন, অন্ধকারের অভিশাপের মতন।


—কারণ, রঙ্গনের নাম নিলে রাত কাঁদে।


বিজয়ের চোখ কাঁপে। এক অন্ধকার মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে সে বলে—


—তাহলে আমরা কি পাপ করলাম ওকে পুড়িয়ে?


—না, তোমরা ওকে জন্ম দিলে আবার।


কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু সেই রাতে, গ্রামে আগুন লাগে তিনটি ঘরে—যারা চুপ করে ছিল সেই রাতে চাঁন মহলের ধ্বংসযজ্ঞে।


ঢাকার ব্রিটিশ ক্লাবে এক সাহেব দাঁড়িয়ে বলে—


—That Rangon guy? Strange fellow. We never found his bones, eh?


একজন দেশি ক্লার্ক হেসে বলে—


—হুজুর, ওর হাড় না, অভিশাপ ছিল শক্ত। ও আগুন হয়ে গেছে।


ঢাকা শহরের এক প্রান্তে, পুরনো এক প্রাসাদবাড়িতে তখন একজন যুবক এক ধাতব লকেট হাতে বসে আছে। চোখে অস্বাভাবিক লাল ছায়া। নাম তার—রঙ্গন


সে জন্মসূত্রে শহরের সন্তান, কিন্তু গ্রামের ইতিহাস তার রক্তে বইছে। রঙ্গনের তামার লকেট নাকি হঠাৎ এক রাতে তার ঘরের জানালায় পাওয়া যায়।


রঙ্গন এখন ঘুমাতে পারে না। রাতে কানে বাজে সেই গান—


“তুমি বাঁচো রঙ্গন, কারণ তুমি মরতে পারো না…”


একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নার ওপারে এক নারী দাঁড়িয়ে—কিন্তু সে আয়নার বাইরে নয়, ভেতরে। সে বলে—


—তুমি সেই আগুন। আমি সেই ছায়া। আমরা আবার এক হবো।


রঙ্গন আয়নাকে ছুঁয়ে বলে—


—তুমি... নিহারিকা?


নারী হাসে।


—তুমি রঙ্গনের শরীর, আমি রঙ্গনের অভিশাপ।


“যে আগুনকে ভয় করা হয়, তার জন্য আগুনই দাওয়াত। তাকে ফেরাতে হলে চাই আত্মা নয়, আত্মদানের আগুন।”


ঢাকা শহরে আজ রঙ্গনের ৩৫তম জন্মদিন।


সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আয়নায় আবার সেই নারী, সেই চুল-ভরা ছায়া, সেই গান—


“রাত জাগা তারা আমি…”


রঙ্গন বলে—


—আমি এখনো জানি না, আমি কে।

—আমি কি রঙ্গন, না আমি আগুন?


নারী বলে—


—তুই মানুষ না, তুই রক্ত। তুই পোড়া অতীতের পুনর্জন্ম। আমি তোর আত্মার দোসর। আজ রাতেই তুই নতুন ইতিহাস লিখবি।


রঙ্গন হাসে।


বাইরে তখন বাজ পড়ে। ঘড়িতে রাত ১২টা। তার ঘরের জানালায় হঠাৎ আগুনের ছায়া দেখা যায়।




রঙ্গন জমিদার ৩


: অর্পন রহমান


ছায়া ফিরে আসে


রঙ্গন ফিরে এসেছে।


না, আগুনে পুড়ে যাওয়ার গল্প নয়, মৃত্যুর পরে দেহ ফিরে পাওয়ার অলৌকিকতা নয়—সে ফিরেছে, হেঁটে, নীরবে, এক সাদা প্রাইভেটকারে করে। বয়স এখন পঁইত্রিশ, অথচ চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে নীলাভ ছাপ, আর হাঁটার ভঙ্গিতে এক ধরনের বিষণ্নতা।


গ্রামের মানুষ প্রথমে ভয় পেয়েছিল। তারপর অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কারণ এই রঙ্গন অন্যরকম।


সে জমিদার বাড়ির কোনো অংশে যায় না। যায় না চায়ের দোকানে, হাটে, বা নীলঘরের সামনে। দিনের বেশিরভাগ সময় সে নিজের ঘরে পড়ে থাকে, জানালার ফাঁক গলে বাইরে তাকিয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।


তার বাবা-মা—শহরের প্রগতিশীল শিক্ষিত মানুষ—চিন্তিত। তারা ভাবে, রঙ্গন হয়ত বিষণ্নতায় ভুগছে। ডাক্তার দেখায়, কাজের চাপ কমায়, একসময় তাকে ঢাকায় এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যায়।


সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারে বসে রঙ্গন বলে—


—আমি এক নারীকে দেখি, প্রতিদিন রাতে। নাম জানি না, চেহারাও স্পষ্ট না। কিন্তু সে আমাকে ডাকে। কখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, কখনও আয়নায়। কখনও বলে—“তুই আমার আগুনের সন্তান।” আমি জানি না সে কে। আমি ভয় পাই।


চিকিৎসক জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি ভুগেছেন কোনো মানসিক ট্রমায়?”


রঙ্গন চোখ বন্ধ করে। বলে না, যে তার ঘুম ভাঙে গভীর রাতে, ভেজা বিছানায়, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কারও নিঃশ্বাসে। সে বলে না, যে তার গায়ের দাগগুলো বদলায়, কখনও সিগারেট পোড়ার মতো, কখনও কামড়ের চিহ্নের মতো।


সাইকিয়াট্রিস্ট ওষুধ দেন। ঘুমের জন্য। কিন্তু ঘুমই এখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু।


প্রতি রাতে, সে ঘুমিয়ে পড়ে ভেবে। কিন্তু নিশ্বাসে বাজে এক পুরনো সানাই। সে চোখ খোলে না, তবু দেখতে পায়—জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। কালো চুল, সাদা শাড়ি, মুখ নেই। শুধু দুটো ফাঁকা চোখের জায়গা থেকে আলো বেরোয়।


সে বলে—“তুই ফিরে আসিসনি। তোর মধ্যে আমি এসেছি।”


রঙ্গন তখন বিছানায় কাঁপে। নড়ে না। চিৎকার করতে চায়, পারে না।


একদিন সকালে তার মা দেখে—ঘরের আয়নায় লিপস্টিক দিয়ে লেখা: "তুই আগুনের উত্তরাধিকারী"।


ঘরের সব দরজা ছিল বন্ধ। ঘরের চাবি একমাত্র রঙ্গনের কাছে। সে চুপ করে থাকে। তার মা আঁতকে ওঠে, কিন্তু কিছু বলে না। ওষুধ বাড়ানো হয়।


তবে পরিবর্তন তখনই টের পাওয়া যায়, যখন রঙ্গন হাঁটতে শুরু করে।


প্রথমে দুপুরবেলা—হাঁটে গ্রামের একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। যে মাঠে এখনো কেউ ফসল করে না, যেটা পুড়ে গিয়েছিল আগুনে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়। যেন কেউ নিচে ডাকে—মাটির নিচ থেকে।


সে একবার মাথা নিচু করে শোনে। তারপর ধীরে ধীরে বলে—“নিহারিকা?”


কেউ ছিল না, শুধু বাতাস ছিল ভারী, আর গন্ধটা—আতর না, আগুন পোড়া ও নারীর শরীরের ঘামের এক অদ্ভুত মিশেল।


দিন কয়েক পরে সে যায় পুরনো চান মহলের ধ্বংসাবশেষে। এখন সেখানে শুধু ছাই, আর কিছু পোড়া ইট। কিন্তু সেখানেও, পায়ের নিচে, সে খুঁজে পায় একটা তামার চাকতি। সেটার উপর লেখা ছিল—


"মৃত্যু নয়, পুনর্জন্মই অভিশাপ"


রঙ্গন সেটা কুড়িয়ে নেয়। তারপর সেই রাতেই, তার ঘরের জানালায় আগুনের ছায়া নাচতে থাকে।


এরপর থেকে প্রতিদিন তার শরীরে নতুন চিহ্ন দেখা দেয়—কখনো পুড়ে যাওয়া ত্বক, কখনো দাগ, যেন হাতের ছাপ কেউ রেখে গেছে।


তার মা একদিন বলে—“তুই কি ওসব বইপত্র আবার পড়ছিস? ওই ইতিহাস?”


রঙ্গন চুপ করে থাকে। জানে, ইতিহাস পড়ছে না, ইতিহাস তাকে পড়ছে। ঘুমের মধ্যে, স্বপ্নে, আয়নায়, জানালায়, সে ফিরে যাচ্ছে সেই ভয়ংকর মহলে। সেই নাচঘরে। সেই বাঈজীদের কণ্ঠে।


একদিন সকালে সে উঠে দেখে—ঘরের চারপাশে সাদা সাদা চুন লাগানো, কেউ যেন রাতেই তা দিয়ে রেখেছে। মা বলে—“ঝাড়ফুঁকওয়ালা এসেছিল। ও বলল, ঘরে ছায়া নাকি খুব ভারী।”


রঙ্গন তখন হেসে ফেলে—একটা ভাঙা, শূন্য হাসি। বলে—


—ছায়া না মা, ও আমি।


সে রাতে, আয়নায় দাঁড়িয়ে রঙ্গন নিজেকে দেখে না। দেখে এক নারীর চুল, সাদা ওড়না, লাল দাগ—আর পেছনে পুড়ে যাওয়া সেই চাঁদ, যা আগুনের রাতে ওঠে।


তারপর হঠাৎ করে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে খবর—


একজন কিশোরী নিখোঁজ।


ঠিক যেভাবে এক শতাব্দী আগে হারিয়ে যেত।


রঙ্গন সেদিন রাতে জেগে থাকে। ছাদে ওঠে। পেছনের বাঁশবাগানে হেঁটে যায়। আর হঠাৎ করে শোনে সেই কণ্ঠস্বর—


—“তুই আমার আগুন, আমি তোর ছায়া।”


তারপর, যেন মাটি কেঁপে ওঠে। মাটি ফেটে যেন কোনো মুখ উঠে আসতে চায়।


রঙ্গন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কাঁপা গলায় বলে—


—আমি আর চাই না। আমি মানুষ হতে চাই।


আওয়াজ আসে—


—মানুষ হতে হলে আগুন নিভাতে হয়। তুই আগুন নিজে।


সেই রাতে, এক বৃদ্ধ চাষী দেখেছে—রঙ্গন দাঁড়িয়ে আছে পুড়ে যাওয়া চান মহলের ছাইয়ের উপর। একহাতে সেই তামার চাকতি, আর এক হাতে জ্বলন্ত আগুন।


বৃদ্ধ বলে—“ও ফিরছে না। ও ফিরে এসেছে আগুন হয়ে।”



রঙ্গনের ভেতরে কেউ কথা বলে।

সে চুপ করে থাকে, কিন্তু তার ঠোঁট নড়ে। আয়নায় দাঁড়ালে নিজের নয়—অন্য কারও চোখ ফুটে ওঠে। নারী চোখ। পুড়ে যাওয়া চোখ। চোখের ভিতর এক স্থির অপেক্ষা।


কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার তিনদিন পর মিলল তার মৃতদেহ—গভীর জঙ্গলের ভেতর, অর্ধদগ্ধ, মুখ নেই, চোখ উপড়ে নেওয়া, গলায় বাঁধা পাঁশুটে ওড়না। পাশেই পড়ে ছিল একটি দুল। সেই দুল—নিহারিকার।


পুলিশ আসে, এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ। মিডিয়াও আসে। সবাই চায় উত্তর।


রঙ্গন তখন নিজের ঘরে। সে দরজা খুলছে না। একা বিছানায় বসে আছে, হাতের আঙুল দিয়ে বারবার নিজের বুক আঁচড়াচ্ছে। যেন কিছু খুলতে চাইছে।


তার মা বলে—“রঙ্গন কথা বলছে না। ওর শরীর গরম, চোখ লাল, রাতে জেগে থাকে। ও কি... পাগল হয়ে যাচ্ছে?”


সে রাতে আবার সে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এবার আর জানালার পাশে দাঁড়ানো নারী নেই। সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে, ওড়নায় মুখ ঢেকে, ঠোঁটে সেই পুরনো গান—


“রাত জাগা তারা আমি... তোর খোঁজে পুড়ি রে...”


হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। সে আয়নার দিকে তাকায়।


তার ঠোঁটে লিপস্টিক। সে লাগায়নি।


ঘরের দেয়ালে লেখা—"আমার মতো তোকে বানাচ্ছি। কারণ আমি বাঁচতে চাই, এবার তোর ভেতর দিয়ে।"


পরদিন, একজন ভৃত্য রঙ্গনের ঘরে ঢুকে কান্না করে বাইরে ছুটে যায়। সে বলে—“সাহেব আয়নায় নিজেকেই 'নিহারিকা' বলে ডাকছিল। কণ্ঠও বদলে গিয়েছিল। মহিলা কণ্ঠ ছিল।”


পুলিশ আসে। তদন্ত হয়।


এক সহকারী পুলিশ সুপার—মারুফ খান—তদন্তের দায়িত্বে আসে। সোজা প্রশ্ন করে রঙ্গনকে—“আপনি খুন করেছেন মেয়েটাকে?”


রঙ্গন জবাব দেয় না। শুধু বলে—


—খুন কেউ করেনি। মেয়েটা এসেছে ‘তাকে’ ডাকার জন্য।


—“কাকে?”


—“যে ফিরে এসেছে, ছায়া হয়ে। আমি না, সে। আমি তার শরীর, সে আমার স্মৃতি।”


পুলিশ বুঝতে পারে, ছেলেটি মানসিক ভারসাম্যহীন—বা সেটা ওর মুখোশ।


কিন্তু সে রাতে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।


মারুফ সাহেব ঘুমোতে পারছিলেন না। থানার ভেতরেই তিনি বিশ্রামে ছিলেন। রাত দেড়টার দিকে দেখেন—CCTV ফুটেজে রঙ্গনের ঘরের সামনে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। চুল খোলা, সাদা শাড়ি, পায়ে রক্ত।


কিন্তু রঙ্গন তখন ঘরের ভেতরেই তালাবন্ধ। অথচ সে বাইরেও হাঁটছে।


ফুটেজ জুম করে দেখা যায়—চেহারা স্পষ্ট নয়, কিন্তু মুখের গঠন যেন এক নারীর। কিন্তু পোশাক রঙ্গনের।


সেই রাতেই আরও একটি মেয়ে নিখোঁজ হয়। এবার থানার পাশের বস্তি থেকে। মেয়েটি থানায় বাবার সঙ্গে এসেছিল বকাঝকা খেয়ে।


পরদিন সকালে তার ওড়না পাওয়া যায় থানার পিছনে, আর রক্ত মাখা এক পাথরে লেখা—


"আমি ফিরে এসেছি। রক্ত দিয়ে আগুন লিখবো।"


মারুফ এবার আর দেরি করে না। রঙ্গনকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে—


—“নিহারিকা কে?”


রঙ্গন এবার সরাসরি তাকায়। বলে—


—“আমি। আমি নিহারিকা। রঙ্গন শুধু এক সময়ের নাম ছিল। এখন আমিই রক্ত, আমিই প্রতিশোধ, আমি সে আগুন যাকে থামানো যায় না।”


তারপর সে অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে। হাসিটা ছিল নারীর।


মারুফ বুঝতে পারে, এই ঘটনা সাধারণ নয়।


সে একজন ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেয়।


ড. সুরভি নামে একজন ডাক্তার রঙ্গনের ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’ সন্দেহ করেন। তিনি বলেন—“ওর মধ্যে একাধিক সত্তা কাজ করছে। কেউ একজন ধীরে ধীরে ওর ভেতর জন্ম নিচ্ছে। হয়ত সেই নিহারিকা নামে এক অতীতের সত্তা।”


ড. সুরভি রঙ্গনের সঙ্গে সেশন নেন। প্রথমে রঙ্গন চুপ করে থাকে।


তারপর হঠাৎ চোখ বড় করে, কণ্ঠ বদলে বলে—


—“তুইও মেয়েছেলে, না? দেখিস, কেমন লাগে যখন শরীর হয়ে যাই কেবল?”


তারপর মাথা নিচু করে গেয়ে ওঠে সেই গান। এবার গলার স্বর একেবারে বদলে যায়। পুরুষ নয়, নারীর।


ড. সুরভি কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে যান।


পুলিশ তাকে আর গ্রামে রাখে না। রঙ্গনকে নিয়ে যায় শহরের এক মানসিক হাসপাতালে।


কিন্তু সেখানেও ঘটে আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা।


একদিন হাসপাতালের নার্সদের একজন হারিয়ে যায়। তার রুমের আয়নায় লেখা ছিল—


"তোমরা ওকে বাঁচাতে পারবে না। ও তো আমি।"


রঙ্গনের চোখে তখন অদ্ভুত শূন্যতা। সে বলে—

—“আমি কে ছিলাম জানি না। কিন্তু এখন আমি শুধু এক শব্দ—রক্ত।”



ঢাকার আগারগাঁওয়ে তিনতলা বাড়িটা নিরিবিলি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না, ভিতরে ঘুমায় এক অতীত। আর সেই অতীত রাতের আঁধারে হাঁটতে বেরোয়—চুপি চুপি, নিঃশব্দে, যেন কেউ ডাকছে, কারও ছায়া টানছে।


প্রতি রাতে রাত ২টা ৩৮ মিনিটে, রঙ্গনের ঘরের দরজা খোলে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সে গেট পেরিয়ে হাঁটছে একা। মুখে ছায়া, চোখে শূন্যতা। কিন্তু অদ্ভুত বিষয়—বাইরে তার চলার ধরণ নারীসুলভ। চুল পেছনে বাধা থাকলেও তার ছায়া যেন ঢেউ খেলানো চুলে ভরা।


সে কোথায় যায়, কেউ জানে না।


কিন্তু এরপর থেকে শুরু হয় মেয়েদের হারিয়ে যাওয়ার রহস্য।


প্রথমে শহরের বনানী থেকে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নিখোঁজ। পরদিন তার রুমে পাওয়া যায় ছেঁড়া ডায়েরির পাতা—"এক মহিলা আমার স্বপ্নে আসে। তার ঠোঁট ছুঁয়ে সে বলে, তোর শরীর আমার লাগবে।"

পুলিশ ভাবে আত্মহত্যা। কিন্তু শরীর মেলে না।


তারপর পুরান ঢাকার এক পুরনো সংগীতশিল্পী মেয়ে নিখোঁজ।

তার হারমোনিয়ামের পাশে পাওয়া যায় একজোড়া কালো দুল।


এরপর মিরপুর থেকে গায়িকা সাদিয়া নিখোঁজ।

তার ফ্ল্যাটের দরজায় লিপস্টিকে লেখা—"রঙ্গন গাইবে এবার"


পুলিশ আবার রঙ্গনের ওপর নজর দেয়। কিন্তু সমস্যা একটাই—এই সময় সে হাসপাতালে ছিল, মনোরোগ চিকিৎসায় ভর্তি।

তবে ডক্টর সুরভি বলেন—“রাত ৩টার সময় তার আচরণ বদলে যায়। একবার আমি দেখেছি সে আয়নায় দাঁড়িয়ে বলছে—‘আজ আমি গাইবো, আর তোরা শুনবি। কারণ এই দেহ আমার নয়, আমি ওকে ধার দিয়েছি।’ ”


ডক্টর সুরভির সন্দেহ আরও বেড়ে যায়, যখন সে দেখতে পান—রঙ্গনের ক্যালেন্ডারে প্রতি রাত ২:৩৮ সময়টি লাল কালিতে গোল করা। নিচে লেখা—"চাঁদের আলো উঠবে, আর আমি নামবো।"


এই পরিস্থিতির মাঝে চট্টগ্রাম থেকে ডেকে আনা হয় ক্রাইম-প্রোফাইলার ডঃ ফারহান হোসেনকে।

তিনি বলেন—“এটি Possession Delusion নয়। এটি Patterned Displacement of Crime. খুনের ধরনগুলো পূর্ব নির্ধারিত। প্রতিটি ঘটনায় একটি ছায়া, একটি গান, এবং নিখোঁজ মেয়ের মধ্যে একটি সাধারণ সাদৃশ্য আছে—তারা সবাই গায়িকা বা বাঈজি-জাতীয় পরিবেশে যুক্ত ছিল।”


তিনি এক ভয়ানক সিদ্ধান্তে পৌঁছান—

"রঙ্গন নিজের মধ্যে একটি মিথ তৈরি করেছে—যেখানে নিহারিকা তার ভেতর বাস করে। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, এই mythology সে নিজেই তৈরি করেছে, নিজেকে অসুস্থ প্রমাণ করে খুনকে বৈধ করতে।"


ডঃ ফারহান ঢাকা শহরের সকল হারিয়ে যাওয়া কেস ফাইল বের করেন এবং খুঁজে পান—গত এক বছরে ১৩ জন নারী নিখোঁজ, যাদের সবাই কখনো না কখনো চান মহল এলাকায় গিয়েছিল।


এবং অবাক করা বিষয়—প্রত্যেক মেয়ের মোবাইল লোকেশন শেষবার রেকর্ড হয়েছিল... চান মহল এলাকায় রাত ৩:০৮ মিনিটে।


কিন্তু প্রশ্ন হলো—রঙ্গন তো তখন ঢাকায়?


CCTV ও GPS সব দেখায় সে ঢাকার মানসিক হাসপাতালে বা বাসায় ছিল।


তাহলে?


এক রাত, তদন্তকারী ফারহান নিজেই চান মহলের ধ্বংসস্তূপে গিয়ে অপেক্ষা করে।


ঠিক রাত ৩:০৮।

বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। হঠাৎ সে দেখে—জমিদার বাড়ির সামনে এক নারী হেঁটে যাচ্ছে। শাড়ি পরা। কিন্তু মুখটা পরিষ্কার নয়।


সে পেছন থেকে ডাক দেয়—“কে?”


নারী থামে। ধীরে ধীরে মুখ ঘোরায়। কিন্তু সেখানে মুখ নেই, কেবল ছায়া।


ফারহান ভয়ে পেছনে সরে আসে। আবার সামনে তাকাতেই কেউ নেই। কিন্তু তার পায়ের কাছে পড়ে থাকে একটি লকেট—তামার লকেট—রঙ্গনের।


সেই রাতেই ঢাকায়, রঙ্গন ঘুম ভেঙে উঠেই দেখে—তার পা ভিজে কাদা আর ঘাসে।


ঘরে বসে থাকা মায়ের চিৎকার—

“রঙ্গন, তোর পা কাদা কেমনে হলো? তুই তো ঘুমাইতেছিলি!”


রঙ্গন কিছু বলে না। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।


সে দেখে—পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। এইবার মুখও দেখা যায়। চুলে লাল ফুল, চোখে জ্বলজ্বলে অভিশাপ।


নারী বলে—

“তুই আমার শরীর নসাট করেছিস, আমি তোকে ব্যবহার করছি। তুই মরবি, আমি বাঁচবো।”


রঙ্গন কাঁদে। চিৎকার করে বলে—

“আমি খুনি না, আমি পাপী না! আমি কিছুই না! আমি কে?”


নারী তার কানে ফিসফিস করে—


"তুই আমি। আমিই তুই। আমরা এক। তোর হাতেই লেগে থাকবে রক্তের শেষ ছাপ। কারণ আমি ফিরে এসেছি—জীবন পেতে, প্রেম পেতে, প্রতিশোধ পেতে..."


সেই রাতেই শহরে আরও এক নারী নিখোঁজ হয়।



ঢাকার আগারগাঁওয়ের শেষপ্রান্তে, নিঃসঙ্গ গলির শেষ বাড়িটা দিনের বেলা নিরীহ মনে হয়। তিনতলা ভবনের সবক'টি জানালায় পর্দা টানা, ছাদে হাঁটাহাঁটি করে কেবল কাক আর একটি বেড়াল। কিন্তু রাত নামলে বাড়িটা যেন কিছু গিলে ফেলে।


এবং সেই গিলার শুরু—ঘরের এককোণে থাকা শিকলবদ্ধ রঙ্গন চৌধুরী থেকে।


সে এখন ২৫, কিন্তু চেহারায় বয়স নেই। চোখে গভীর গর্তের মতো অন্ধকার, যেখানে আলো ঢুকেও পথ পায় না।


তার মা রুমানা বেগম ও বাবা কামরুল চৌধুরী—ঢাকার সভ্য সমাজের সৌজন্যময় মানুষ, কিন্তু আজকাল তাদের মুখে সবসময় ভয়ার্ত ছায়া।


তারা কাউকে বলে না, কিন্তু প্রতিদিন রাতে—রঙ্গনকে শিকলে বাঁধা হয়।


স্টিলের শিকল, স্পেশাল লক।

ঘরের ভেতর বিশেষ ডিজাইন করা প্যাডেড ওয়াল, যাতে মাথা ঠুকেও রক্ত না ঝরে।


ঘরের কোণে ল্যাভেন্ডার সেন্ট দিয়ে রাখা হয়, যাতে তার হ্যালুসিনেশন কমে।


তবুও সকালবেলা যখন দরজা খোলা হয়, দেখা যায়—শিকল ঠিক জায়গাতেই, কিন্তু ঘরের বাইরে মেঝেতে পড়ে থাকে একজোড়া ভেজা পায়ের ছাপ। যেন সে বাইরে গেছে, আবার ফিরেছে।


আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার—


সিসি ক্যামেরায় কখনোই দেখা যায় না রঙ্গন। বরং দেখা যায়—একটা মেয়ে।

সাদা শাড়ি, খোলা চুল, ঘুরে দাঁড়ালে দেখা যায় চোখ নেই, কেবল ফাঁকা গহ্বর।


ডাক্তার, সাইকিয়াট্রিস্ট, রাবেয়া আক্তার বলেছিলেন—

“রঙ্গন suffers from highly complex delusional dissociative identity disorder with serial psychosis. তার মধ্যে নিহারিকা নামে এক পুরনো নারীর প্রতিচ্ছবি বেঁচে আছে। কিন্তু সমস্যা একটাই—এই প্রতিচ্ছবি তার ভেতরের তৈরি না, সে যেন বাইরের কেউ।”


এর মধ্যে আবার শহরের মেয়েরা হারিয়ে যেতে শুরু করে।

গত একমাসে ৪ জন তরুণী নিখোঁজ—সবাই গায়িকা বা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত।


সবশেষ কেস ছিল—তিথি রহমান।

নাট্যদলের অন্যতম অভিনেত্রী।

নিখোঁজ হবার আগে সে বন্ধুদের বলেছিল—

“রঙ্গন নামের এক ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আমি তার প্রাসাদে থাকি। আর এক নারী আসে, যে বলে—তোর কণ্ঠ আমার হবে।”


পুলিশ আসে, আবার চৌধুরী পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।


রুমানা বেগম বলেন,

“আমার ছেলে ঘর থেকে বের হতে পারে না। শিকলে বাঁধা থাকে।”


পুলিশ দেখে—ঘর পুরোপুরি সুরক্ষিত, রঙ্গন নীরব।


কিন্তু ঠিক সেই সময় পুলিশের কাছে পৌঁছায় সিসিটিভি ফুটেজ—তিথির বাড়ির সামনের রাস্তার ক্যামেরা থেকে।


রাত ৩:১০।

রাস্তা একদম ফাঁকা। হঠাৎ একটি ছায়া দেখা যায়—একজন নারী, কিন্তু শরীরের গঠন রঙ্গনের মতোই। হাঁটার ধরনে অদ্ভুত পুরুষ-নারীর মিশেল। তার গলায় টিমটিম করে এক লকেট ঝুলছে—তামার পুরনো লকেট।


আর তারপর দেখা যায়—


তিথি নিজে দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে, যেন কারও ডাকে বেরিয়েছে।


দুইজন হেঁটে যাচ্ছে, আর একটি গান ভেসে আসছে—

“তুই বাঁচিস রঙ্গন, আমি মরি... আজ তোর শরীর আমার...”


---


সেই রাতে মা-বাবা আর রঙ্গনের ঘরে ফিরে গেলে, তার ঘরের আয়নায় লেখা থাকে—

“তোমরা যাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখো, সে তো কেবল শরীর।

আমি তো ছায়া। আমি তো বাতাস। আমি তো গান।”


রুমানা বেগম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।


বাবা চিৎকার করে বলেন—

“তুই কে? তুই রঙ্গন না? তুই মানুষ তো?”


রঙ্গন কাঁপতে কাঁপতে চোখ তুলেই বলে—


“আমি রঙ্গন... কিন্তু আমার ভিতরে সে থাকে। সে নিশ্বাস নেয়, আমার শরীর চুরি করে নেয়। আমি কিছু জানি না...”


---


এদিকে তদন্তকারীরা চান মহলে ফেরত যায়।


ধ্বংসপ্রাপ্ত চান মহলের নিচে এক গোপন কুঠুরি খোঁজা হয়—

পাওয়া যায় তিনটি পুরনো রক্তে লেখা প্রতীক। প্রতিটা প্রতীকেই লেখা—

"নিহারিকা: পুনর্জন্ম হবে আত্মদানের আগুনে"


আর একটা পুরনো নোটবুকে পাওয়া যায় একটি লাইন—


“আমি তোর শরীর চাই না, তোর ভয় চাই। কারণ ভয়েই আমার চেতনা বাঁচে।”



সে জানে—সে মানুষ, আবার জানে না।


সে জানে—নিহারিকা কখন আসে, কখন যায়।

আবার এটাও জানে—সবটাই সে নিজে সাজিয়েছে। ভয় তৈরি করেছে, আতঙ্ক চাষ করেছে। মেয়েরা হারিয়ে যাচ্ছে? হারাচ্ছে সে-ই, নিজের হাতে। কিন্তু আবার বলে—“আমি ছিলাম না ওখানে।”


ডায়াগনোসিসে লেখা হয়েছে—


> Dissociative Identity Disorder with Retrograde Amnesia episodes

Hallucinatory Schizotypal Layers

Hypnagogic Possession Patterns


ডাক্তারের ভাষায়—সে একজন বিভ্রান্ত, ট্রমাটাইজড, দ্বৈত-সত্তার রোগী।

কিন্তু এক সন্ধ্যায় তার সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ তৃষা দে তার প্রশ্ন শুনে থমকে যায়—


“ডাক্তার, যদি আমি একজন দ্বৈত-সত্তার রোগী হই, তবে আমার প্রতিটা খুন এত নিখুঁত, কেবল অভিজ্ঞ একজন সিরিয়াল কিলারের মতোই কেন হয়?”


ডাক্তার উত্তর খুঁজে পায় না।


নিহারিকা কে?


নিহারিকা হয়ত সত্যিই এক অভিশপ্ত আত্মা, হয়ত কেবল রঙ্গনের ভিতরে গড়ে ওঠা "emotional architecture of violence"।

তার জন্ম রঙ্গনের শরীরে, কিন্তু অস্তিত্ব পুরোনো চানমহলের আগুন থেকে।


> সে রক্ত চায়। কারণ রক্ত ছাড়া স্মৃতি জেগে থাকে না।

সে গান চায়। কারণ নিঃশব্দে সে হারিয়ে যায়।

সে শরীর চায়। কারণ সে ছিল না, এখন হতে চায়।


এক রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রঙ্গন নিজেকে দেখে। আয়নায় সে একা নয়। নিহারিকা তার পাশে দাঁড়িয়ে। সে বলে—


“তুই একটা খেলোয়াড়। কিন্তু আমি যে খেলার মাঠ।”

“তুই মানুষ। কিন্তু তোর মধ্যে আমি এক অভিশপ্ত দেবী।”

“তুই খুন করিস। আর আমি সেটা উৎসব বানাই।”


রঙ্গন এবার উত্তর দেয়—

“তুই আমার ভেতরের ছায়া, আমি তোর অস্থি-মাংস। আমরা একে অপরকে ব্যবহার করি।”


সত্যি কী?


না।


সত্যি হলো—রঙ্গন এমন এক অস্তিত্বে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃত আলাদা করা যায় না।


একদিকে সে এমন অসুস্থ মস্তিষ্কের রোগী, যে সবকিছু বিশ্বাস করে ফেলে।


আরেকদিকে, সে নিজের রোগের সুযোগ নিয়ে পুরো এক খুনের উপাখ্যান সাজিয়ে নেয়, যাতে সে খুন করে, আবার অব্যাহতি পায়।


সেই সুযোগে ফিরে আসে "নিহারিকা"—

হয়তো আত্মা, হয়তো শুধুই এক কল্পিত ছায়া।


কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রক্তাক্ত যাত্রায় কে চালক?


রঙ্গন? নাকি নিহারিকা? নাকি ওরা একই—এক ভয়ঙ্কর সত্তা, এক ভয়ঙ্কর জাল, যেটা ধরা যায় না, বোঝা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়?


রঙ্গন জমিদার ৪

: অর্পন রহমান


অন্তর্গত শিকার:



ঢাকা শহরের বাইরে, এক পুরনো স্যানাটোরিয়ামে রঙ্গন এখন শুয়ে থাকে নিঃশব্দে।

তার ঘরের দেয়ালে কোনো আয়না নেই। দরজার তালা ইলেকট্রিক। প্রতিদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আসেন। তার নাম নেয় না কেউ। সবার কাছে সে এখন “কেস ১৯৩-সি”—এক ডকুমেন্টেড মাল্টিপল পার্সোনালিটি পেশেন্ট।


কিন্তু রঙ্গন এখন আর কিছু বলে না।


সে জানে, বলার কিছু নেই।


সে জানে, সে খুন করেনি।

তবে খুন হলো।

তার আশপাশে, তার ছায়ায়, তার নামের দাগে।


তবে এবার রঙ্গন নয়।

খুন করছে কেউ—যে রঙ্গনের নাম ব্যবহার করে, তার ইতিহাসকে আগুন বানিয়ে শহরের নিঃসঙ্গ মেয়েদের দেহ ছিঁড়ে প্রতিশোধের মিথ তৈরি করছে।



পূর্বাচলের কাছে ঝিলপাড়ে পাওয়া গেল এক তরুণী লাশ—নগ্ন, পুড়ে যাওয়া শরীর, মুখ নেই, গলায় কাঁচের টুকরো দিয়ে খোদাই করে লেখা—


"রঙ্গনের ঘরে আমি ছিলাম"


পুলিশ প্রথমেই দোষ দেয়—‘রঙ্গন চৌধুরী’। কিন্তু সে তো তখন হাসপাতালে, চব্বিশ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে, কড়া নজরদারিতে।

তদন্তে নামে ডিএমপি’র কাউন্টার-ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। নেতৃত্বে আছে অফিসার আফরোজা মাহির।

তিনি প্রথমে যান স্যানাটোরিয়ামে। রঙ্গনকে দেখে অবাক হন।


এই সেই রঙ্গন? যার নামে এত কাহিনি, এত রক্ত, এত ভয়?


সে নিঃসাড়, গলায় কথা নেই, চোখে পুরনো ঘুমহীনতা।


কিন্তু তার চেহারায় কিছু আছে।

একটা প্রশ্ন, এক চাপা চিৎকার।


অফিসার মাহির জিজ্ঞেস করেন—

“তুমি কি জানো, কে খুন করছে?”


রঙ্গন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তারপর এক শব্দে বলো

“ছায়া।”


“নিহারিকা?”


“না,” রঙ্গনের কণ্ঠ এবার কাঁপে, “নিহারিকার ছায়া নয়। এবার অন্য কেউ। যে আমি না, তবু আমার মতো। যে খুন করে, কিন্তু আমাকেই রক্তের মুখ বানায়।”



তদন্তে উঠে আসে এক নতুন নাম—তন্বী ঘোষ।

বয়স আনুমানিক ৩০, পেশায় সাইকোথেরাপিস্ট, বর্তমানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্র্যাক নেই।


তবে তার ল্যাপটপের সার্চ হিস্টোরিতে দেখা যায়—


Dissociation mimicry


Projected psychopathology


Identity hijacking through trauma link


অফিসার মাহির সন্দেহ হয়।

তন্বী ঘোষ কয়েকমাস আগে এক মনোরোগ গবেষণা টিমের অংশ হিসেবে রঙ্গনের রেকর্ডেড সেশন স্টাডি করেছিল।


তারপর হঠাৎ নিখোঁজ।


এবং তারপর থেকেই শুরু হয় খুন।



রাত ৩টা ১৭ মিনিট।

পুরান ঢাকার এক সংগীত শিক্ষিকার ঘর অন্ধকার।

সে ওঠে, কোলবালিশ সরিয়ে দেখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ। সাদা শাড়ি, লাল ওড়না, ঠোঁটে সেই পুরনো সানাইয়ের গান—

“তুই আগুন, আমি ছায়া…”


পরদিন তার খোঁজ পাওয়া যায় ধানমন্ডি লেকের জলে ভাসতে থাকা অবস্থায়। শরীরে খোঁচানো ক্ষত, একজোড়া কালো দুল, আর পায়ের গাঁটে লেখা—“আমি ফিরেছি, এবার রক্তের উৎসবে।”


ডিএনএ ম্যাচ করে না রঙ্গনের সঙ্গে।

কিন্তু টুকরো প্রমাণ—পুরনো চান মহলের এক পোড়া ইট, যেটা সে রাতে খুনির পাশে ছিল—রঙ্গনের বাড়ির ইতিহাসের অংশ।


অফিসার মাহির সন্দেহ এবার গাঢ় হয়।

এই খুনি রঙ্গনকে জানে। শুধু জানে না—পুরোপুরি ধারণ করে।


সে যেন রঙ্গনের ‘ছায়া-চেতনার সন্ত্রাস’ ব্যবহার করে বাস্তব খুন করে যাচ্ছে।



তদন্ত এগোয়। মাহির হাকিয়ে আনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ফারহান হোসেনকে।

ফারহান বলেন—


“কেউ রঙ্গনের ইতিহাসকে ‘প্যারাসাইটিক স্ট্রাকচারে’ ব্যবহার করছে।

একটি বিকৃত মস্তিষ্ক নিজের অপরাধ লুকোচ্ছে রঙ্গনের ছায়ায়।

এই খুনি নতুন নয়। সে প্রফেশনালি ট্রেইন্ড, সে জানে কীভাবে সাইকোলজিকাল প্রোফাইল বানাতে হয়।”


ফারহান আরও বলেন—“এবং সে নারী। অথবা পুরুষ, যে নারীর মতো চিন্তা করে—যে নিজেকে ভিক্টিম বানিয়ে প্রতিশোধ নেয়। হয়তো সে নিজেও কোন এক নিপীড়নের শিকার, এবং রঙ্গনের ‘নিহারিকা’ সত্তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে।”



রঙ্গন জানে না—তন্বী এখন কাকে খুঁজছে।

কিন্তু সে জানে, এই মেয়েটি এখন তাকে খুন করবে না।

কারণ তন্বী চায় সে বেঁচে থাকুক।

সে চায় রঙ্গনের ছায়ায় সে চিরকাল থেকে যাক।


সে চায় রঙ্গনের ভেতরের সব ভয় নিজের করে নিতে।

তখন আর দায় তার থাকবে না।

সে খুন করে যাবে, আর কেউ বিশ্বাস করবে না—কারণ সবার মনে রঙ্গনই খুনি।


রঙ্গন নিজে একদিন ডাক্তারের কাছে বলে—

“আমার মধ্যে নিহারিকা আর নেই। আমি জানি সে চলে গেছে।

কিন্তু এখন, আমি যাকে দেখি, সে আধুনিক। সে আমাকে ফলো করে, আমার ভয়ের ভিতর ঢুকে পড়েছে।

আমি চোখ বন্ধ করলে, সে আমার চোখ ব্যবহার করে দেখে।”


কে খুনি?


তন্বী ঘোষ?

রঙ্গন নিজে?

নাকি, তারা দু’জন মিলেই এক নতুন আতঙ্ক?


রঙ্গন কি শুধুই এক ‘কভার’?

নাকি সেই বীজ, যেখান থেকে জন্ম নেয় প্রতিটি খুন?


তদন্ত এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

পুলিশের হাতে সব তথ্য থাকলেও, নেই প্রমাণ।



তন্বী ঘোষ।

মনোরোগবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছিল, থিসিস করেছিল ‘ট্রমা-নির্ভর ডিপারসোনাল আইডেন্টিটি’ নিয়ে।

কিন্তু কেউ জানত না—এই গবেষণা ছিল তার নিজস্ব অভিশাপ থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা।


তন্বী আসলে কে?


না, সে কোনো সাধারণ গবেষক নয়।

সে—নীহারিকার রক্তবংশ।


সে সেই নারীর উত্তরসূরি, যে একসময় রঙ্গন জমিদার চৌধুরীর নাচঘরের আঙিনায় নেচেছিল সানাইয়ের সুরে।

সে সেই বংশের শেষ ছায়া—যার ইতিহাসে লেখা ছিল প্রতিশোধ।


১৮৮১ সালের এক রাতে, চান মহলের আগুনের মধ্যে নিখোঁজ হয়েছিল একটি শরীর—নীহারিকা।

বলা হয়েছিল, সে আগুনে পুড়ে গেছে।

আগুন দিয়েছিলো  রঙ্গন জমিদার। 

পুড়িয়ে দিয়েছিলো তার প্রেম কে।


কিন্তু আগুনের ভেতর থেকেও যদি কেউ বাঁচে?


নীহারিকা মরেনি।

সে পালিয়েছিল। নিজের গর্ভে জমিদারের সন্তান নিয়ে।


সে আশ্রয় নিয়েছিল নদীর ওপারে এক বিধবার কুঁড়ে ঘরে।

সন্তান জন্ম দিয়েছিল—মেয়েসন্তান।

কারও কাছে কিছু বলেনি। শুধু একখণ্ড পোড়া কাপড়ে বেঁধে রেখেছিল এক দুল—চান মহলের স্মৃতি।


এই দুলই ছিল তন্বীর কাছে উত্তরাধিকার।

মায়ের মায়ের কাছে শুনেছিল—“তুই আগুন থেকে জন্মেছিস, কিন্তু তোর রক্তে গান, আর প্রতিশোধ।”


তন্বী জানত, তার পূর্বপুরুষ ছিল এক বাঈজী—কিন্তু আর দশজনের মত নয়।

নীহারিকা ছিল বিশেষ, জমিদার রঙ্গনের প্রিয়তমা, যার কারণে জমিদার রাতে গান শুনত, নাচ ভুলে তাকিয়ে থাকত তার চোখে।


কিন্তু জমিদার ছিল অসুস্থ।

সে প্রেম জানত না, জানত ভোগ।

আর এক রাতে, নাচের পর, যখন নীহারিকা ‘না’ বলেছিল...

সেই ‘না’ই হয়ে উঠেছিল আগুনের শুরু।


নীহারিকা পালায়।

রঙ্গন খোঁজ করে না—বলে দেয়, সে পুড়ে গেছে।

নতুন বাঈজী আসে।

কিন্তু চান মহলের নাচঘরে সেই রাতে আগুন পড়ে থাকে।


সে আগুন—রক্ত হয়ে তন্বীর ভেতরে জন্ম নেয়।



তন্বী জানত, ইতিহাস হারিয়ে গেলে রক্ত কথা বলে।

আর রঙ্গন চৌধুরীর ইতিহাস তো গোপনে বেঁচে আছে—রঙ্গন নামে এক মানসিক রোগীর শরীরে।


তন্বী খুঁজে পায় তাকে।

প্রথমে গবেষণা, তারপর স্পর্শ, এরপর প্রতিস্থাপন।


সে জানত—রঙ্গনের ভেতরে ভয় আছে, দ্বৈততা আছে।

সে জানত, এই ছেলেটি নিজের ভেতরের ছায়া বোঝে না, বাঁচতে চায়।

তাই সে রঙ্গনের ভয়কে ‘নিহারিকা’ বলে সাজায়।

আর তার আড়ালে সে নিজে—তন্বী, নীহারিকার উত্তরসূরি—শুরু করে প্রতিটি খুন।


সে শুধু মারে না।

সে রঙ্গনের নামে ইতিহাস লিখে যায়।

সে খুন করে, আবার রক্ত দিয়ে দেয়ালে লেখে—“তুই আগুন, আমি ছায়া।”


সে নারীদের খুঁজে বের করে—যারা শরীরকে পণ্য করেছিল, যেমন একসময় তার পূর্বজাকে করা হয়েছিল।

সে চায় না প্রতিশোধ শুধু রঙ্গনের ওপর, সে চায় সমাজের ওপর।

সে চায় আগুনকে ফিরিয়ে আনতে—এইবার রক্ত দিয়ে।



তদন্তকারী অফিসার মাহির একদিন তন্বীর পুরনো বাড়িতে খুঁজে পান এক ডায়েরি।

সেই ডায়েরিতে লেখা—


 “আমি তার প্রেমিকা নই। আমি তার উত্তরাধিকার।

রঙ্গন জমিদার এক আগুন ধরিয়েছিল—আমি সেই আগুনের উত্তরসূরি।

সে চেয়েছিল দেহ, আমি দিচ্ছি রক্ত।

আমি ফিরেছি, কারণ ইতিহাস শুধু বইয়ে থাকে না—তার রক্তে ভাসে।”


আর একটি পুরনো পত্র—

নীহারিকার হাতে লেখা, পুড়ে যাওয়া চিঠি—


 “আমি তোমার সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখব। সে একদিন জানবে, প্রেম কীভাবে আগুন হয়। সে একদিন জানবে, জমিদার মানে ঈশ্বর নয়, শিকারী। আর সেই শিকারীর ছায়া যতদিন থাকবে, ততদিন আগুন নিভবে না।”


১০


তন্বী জানে—সে খুনি।

কিন্তু তার খুন পাপ নয়, ইতিহাসের উত্তরাধিকার।


সে রক্ত দিয়ে লেখা এক গোপন কবিতা।


আর সেই কবিতা একদিন রঙ্গনও পড়ে ফেলে।


সে বলে—

“তুই যদি নিহারিকার উত্তরসূরি হস, তবে আমি সেই রঙ্গন নই।

আমি তোর মতোই বন্দি।

তুই পুড়িসনি, তুই জ্বালাস।

আর আমি শুধু ছায়া দেখতেছি।”


তন্বী হেসে বলে—


“তুই ছিলি অগ্নিকুণ্ডের শাসক।

আমি সেই শিখার পিছু ধাওয়া করা ছায়া।

আজ তোর ভিতর দিয়ে আমি বাঁচবো, কারণ আমি শেষ নাচ গাইবো—তোর মৃত্যুর সুরে।”


১১


ডায়াগনসিস – বিভ্রান্তি, না মানসিক সংক্রমণ?


ডাক্তার ফারহান রঙ্গনের থেরাপির রেকর্ড রিভিউ করেন।

তিনি বলেন—


“এই কেসটি ফোলি আ ট্রোয়া—একাধিক মানসিক বিভ্রান্তির মধ্যে ভাগাভাগি হওয়া এক অভিজ্ঞতা।

কিছু চরিত্র হয়তো বাস্তবে নেই, কিন্তু রোগীর ভেতরের ভয়, লজ্জা ও অপরাধবোধ তাদের জন্ম দিয়েছে।”


তন্বী ঘোষ—মিথের জন্ম?


তদন্তে উঠে আসে এক নাম: তন্বী ঘোষ, এক মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক।

তার সার্চ হিস্টোরি অস্বাভাবিক, বিদ্বেষপূর্ণ, মানসিক ছায়ার পিছু ধাওয়া।


কিন্তু সে কোথায়?


পুলিশ অনুসন্ধান করে, কিছুই খুঁজে পায় না।


তবে আশ্চর্যজনকভাবে তন্বী ঘোষের কোনো পরিচয়পত্র নেই,  অস্তিত্ব নেই , কোনো আত্মীয়-স্বজন তার অস্তিত্বের কথা জানে না।

কি সত্যি ছিল, আর কি তৈরি?


তিনি আরও বলেন—


 “রঙ্গন কোনো খুনি নয়। সে নিজেই ভিক্টিম।

কিন্তু তার মন, তার ছায়াকে খুঁজে ফিরছে। তার স্মৃতি তাকে বিশ্বাস করিয়েছে—কারো অস্তিত্ব ছিল।

অথচ, মেডিকেল প্রমাণ বলে—সেই ‘কারো’ অস্তিত্বই কখনো ছিল না।”


সবশেষে উঠে আসে সেই পুরনো নাম—নীহারিকা।

চান মহলের নর্তকী, একসময় জমিদার রঙ্গনের প্রিয়তমা, অতঃপর আগুনে পুড়ে যাওয়া নারী।


কিন্তু ইতিহাসে এমন কোনো তথ্য নেই—নাচঘরের সেই রাতে নীহারিকা নামে কেউ মারা গিয়েছিল।

চিঠি, চিহ্ন, স্মৃতি—সবকিছু একান্তই রঙ্গনের কল্পনার অংশ।


ডকুমেন্টে লেখা থাকে:


 “Rongon may have re-constructed a myth from an emotional wound.

Niharika is not a ghost—she is guilt, grief, and a symbolic creation.”


তন্বী ঘোষ নিখোঁজ। নীহারিকা  কখনো ছিল না—অন্তত প্রমাণ নেই।


 তদন্ত রিপোর্ট 


ডিটেকটিভ মাহি রিপোর্ট জমা দেন:


Case Status: Unresolved but Closed

Conclusion: No physical evidence supports the existence of Tanvi Ghosh or Niharika.

Patient 193-C is under psychological recovery. No charges.

Remarks: All killings attributed to psychogenic factors—no traceable perpetrator.


“Rongon was not the killer.

He was merely the mirror—where others saw their own reflection, fear, and vengeance.”


রঙ্গনকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হয়।


সে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে—


“তুই কে?”


আর আয়না কিছু বলে না।


এই প্রথম আয়না চুপ থাকে।


এই প্রথম, রঙ্গন নিজেকে দেখে।


১২


 স্থানীয়রা রঙ্গনকে চান মহলে ঢুকতে দেখেছিলো,  কিন্তু সাত ঘন্টা পরও যখন বের না হয়,  তখন কিছু লোক ভেতর থেকে রঙ্গনকে অচেতন অবস্থায় বের করে আনে। রঙ্গন জমিদার বংশের ছেলে  প্রাক্তন মিনিস্টার আব্দুল গফুর সাহেবের নাতি, ওর বাবাও শিল্পপতি ।  


কিন্তু ও ছিলো দারুন মিশুক স্বভাবের। এদিকে বেশি একটা আসা যাওয়া নেই। তবুও সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারে।  কোন অহংকার ওর ভীতরে নেই। 


এতো বড় পরিবারের ছেলে কিন্তু চলাচল ছিলো একদম স্বাভাবিক বা এতো স্বাভাবিক যা অস্বাভাবিকতার মধ্যে পরে।  বাসে করে এসেছিলো গ্রামে। 


জমিদার বাড়ির কাছাকাছি একটা দোকানে চা খেয়েছিলো,  লোকজনের সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে,  হাসিঠাট্টা করে চান মহলে ভেতরে গিয়েছিলো।


তাই সবারই ওর দিকে সজাগ দৃষ্টি ছিলো। ওকে সবাই দড়াদড়ি করে সদর হসপিটালে নিয়ে যায়। তারপর জ্ঞান ফিরে এলে,  গাড়িতে ঢাকার ওদের বর্তমান বাসায় নিয়ে আসে,  এলাকার দুই তরুন।


১৩.


রঙ্গন ঘুমিয়ে আছে। ওর পাশে বসে ছিলো ওর মা। ইপসিতা আরা: সাবেক সেনা কর্মকর্তার মেয়ে। তার বা রঙ্গনের বাবার অতিপ্রাকৃত কোন ভয় নেই। তবুও রঙ্গনের পূর্বপুরুষ জমিদার এর কাহিনীর কারনে একটু ভীত তারা উভয়ে। ওর দাদাও শেষ বয়সে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলো, অনেকের মতে আত্মহত্যা 


আলি আজিম চৌধুরী: রঙ্গনের বাবা, সারা দেশের পরিচিত বিজনেস আইকন। বাবার তো মাথা পুরোপুরি গরম, একমাত্র ছেলে রঙ্গন।  তাও হয়েছে বাউণ্ডুলে স্বভাবের৷।  বস্তিতে থাকে,  রাস্তায় হাঁটা হাটি করে। ইদানিং প্রায়ই যায় চানমহলে।  চান মহল নিয়ে ওর বাবার মনে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। তাদের পূর্বপুরুষ রঙ্গন চৌধুরী, যার নামে রঙ্গনের ডাক নাম। তাকে,  সেই জমিদার কে ওই মহলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিলো গ্রামবাসি। 


রঙ্গন নামটি তারা রাখতে চায়নি কিন্তু ওর দাদা আবদুল গফুর আজিম চৌধুরী  শখ করে নামটি রেখেছিলো।  পূর্ব পুরুষের নামে।


এদিকে রঙ্গনও কিশোর বয়স থেকে হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত ছিলে চাল চলন তাই হিমুর মত। এই নিয়ে  বাবা-মা মহা বিরক্ত তার উপড়ে।   


আবার ছোটবেলা থেকে দাদা মানে সাবেক মিনিস্টার আব্দুল গফুরের বাসায় যতক্ষণ থাকতো ততক্ষণই রঙ্গন তার কাছেই থাকতো। 


পাগল অবস্থায়ও সারাদিন রঙ্গনকে ডাকতো। রঙ্গনের সাথে তার সব কথাবার্তা হতো। 


তার প্রভাবও কিছুটা পড়েছে রঙ্গনের উপড়।


রঙ্গন ঘুমিয়ে গেলে ওর মা নিজ রুমে ফিরে আসে। রঙ্গনের জন্য কাঁদছে। আর রঙ্গনের বাবা কে বলছে " এতো সুন্দর একটা ছেলে কেন এমন হয়ে যাচ্ছে? " 


রঙ্গনের বাবার মাথায়ও চিন্তা কিন্তু তিনি রঙ্গনের মা ইপসিতা আরা কে সান্ত্বনা দিচ্ছে।  

"সব ঠিক হয়ে যাবে,  এ বয়সে মাথায় নানান ধরনের খেয়াল দেখা দেয়। মুভি বা গল্পের বই টই পড়ে এমন করছে হয়তো। "


১৪


রঙ্গন ঘুমিয়ে আছে,  ঘুমের ভেতর কেঁপে কেঁপে  উঠছে। 

রঙ্গন স্বপ্ন দেখছে....


ঢাকা শহরের এক পুরনো অলিগলি, যেখানে দিনের আলোও ঢোকে সংকোচে। সেখানেই রঙ্গন এখন এক ফ্ল্যাটে বাস করে। চারদিকে বইয়ের স্তূপ, কিছু পুরনো আয়না, আর এক কোণে সেই তামার লকেট, যেটা পাওয়া গিয়েছিল চান মহলের ছাইয়ের ভেতর থেকে।


সে জানে না কেন, কিন্তু প্রতিদিন ঘুম ভাঙে ঠিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে—রাত ৩:৩৩। আর তখনই বাজে সেই গান—


"রাত জাগা তারা আমি, তোর খোঁজে পুড়ি রে…"


এই গানই কি তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে? না কি গানই সে আগুন, যার ভেতর লুকিয়ে আছে কেউ?


একদিন সে রাস্তায় হাঁটছিল। শহরের দক্ষিণ দিকে, পুরনো বটতলার কাছে। হঠাৎ এক নারী এসে তার সামনে দাঁড়াল। লাল শাড়ি, খোলা চুল, চোখে বিদ্ধ করা দৃষ্টি। রঙ্গন থমকে গেল। মেয়েটি বলল—


—তোমার চোখে আগুন, কিন্তু মুখে কান্না। তুমি আগুন নাকি ছায়া?


রঙ্গন তাকাল। সেই চোখ… কোথায় যেন দেখেছে আগে।


—তুমি… কে?


মেয়েটি হাসল।


—নাম রাখলে ভালোবাসা বদলায়। তুমি শুধু জানো, আমি আবার এসেছি।


রঙ্গন তার নাম জানে না, পরিচয় জানে না। কিন্তু মেয়েটির শরীরে ছিল সেই আতরের পোড়া গন্ধ, যা কেবল চাঁনমহলের বাতাসে ভেসে বেড়াত।


তাদের দেখা হতে লাগল প্রায় প্রতিদিন। মেয়েটি কখনও বলে—"আমার নাম ইরা।" আবার বলে—"আমি নামহীন, যেমন তুমি স্মৃতিহীন।"


ইরা একদিন বলল—


—তুমি জানো, ভালোবাসা কখনও কখনও পাপ হয়? আমি চাই না তুমি পাপ করো।


রঙ্গন জিজ্ঞেস করল—


—তুমি আমার কে?


ইরা তাকিয়ে রইল আয়নার দিকে। বলল—


—তুমি যদি আগুন হও, আমি তাহলে ছায়া। আগুন আলো দেয়, কিন্তু ছায়া তাকে ভাঙে। আমরা দুই বিপরীত, কিন্তু একই সত্তা।


সেই রাত থেকে রঙ্গনের স্বপ্ন আরও ঘন হয়ে আসে। ইরা তার পাশে দাঁড়ায়, কখনও রক্তাক্ত, কখনও হাসিমুখে, আর বলে—


—তুই আমায় চিনিস না রঙ্গন? আমি সেই… যে তোকে মৃত্যুর ঠিক আগেই ভালোবেসেছিল।


রঙ্গন চিৎকার করে ওঠে ঘুমে—


—তুই… নিহারিকা?


কিন্তু তখন সে একা, কেবল আয়নার কাচে এক নারীর ছায়া, যেটা ভোর হলে মিলিয়ে যায়।




রঙ্গন জমিদার ৫


: অর্পন রহমান


রাজনীতি অতীত না কি বর্তমান  :


ঢাকার ধানমন্ডির পুরনো এক বাসায়, সাদা পর্দার আড়ালে রঙ্গন নিঃশব্দে ঘুমাচ্ছে। গালের পাশে স্যালাইনের টিউব বেয়ে নামছে ধীরে ধীরে ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ। জানালার ওপাশে বিকেলের আলো এসে পড়ে বিছানার পাশে রাখা তামার লকেটে। তার ভেতর এখনো একটা অচেনা জ্যোৎস্না আটকে আছে।


ইপসিতা আরা, রঙ্গনের মা, চুপচাপ বসে আছেন পাশে। তাঁর চোখে চাপা উদ্বেগ। হাতের চুড়ির শব্দও যেন আজ নীরব হয়ে গেছে।


রঙ্গন একটানা সাত ঘণ্টা ছিল চানমহলে, কেউ জানে না সে ভেতরে কী করেছিল, কী দেখেছিল। কিন্তু যখন ওকে বের করে আনা হয়, তখন ওর শরীর নিস্তেজ, চোখ খোলা, তবু সাড়া নেই। শুধু ঠোঁটের কোণে কিছু ফিসফিস শব্দ—


“আমি আগুন ছিলাম না মা, আমি তো ছায়া খুঁজতেছিলাম…”


ইপসিতা কিছু বলে না। তার বিশ্বাস, ছেলে এসব কল্পনা করে। তবে ভেতরে কোথাও একটা ভয় সেঁধিয়ে গেছে—ছেলের দাদার মতো, ছেলেও কি সেই অভিশপ্ত উত্তরাধিকার টেনে নিচ্ছে?


আরেকদিকে, আলি আজিম চৌধুরী কামরান, তার বাবা, দেশের নামকরা শিল্পপতি, এখন নিজ ঘরে অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করছেন। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তার মনের ভেতরে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—একদিকে ভালোবাসা, আরেকদিকে অসম্ভব রাগ। ছেলেটা রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে, পুরনো প্রাসাদে পড়ে থাকে, অথচ নিজের ব্যবসা, ভবিষ্যৎ, এমনকি নিজের পরিচয় নিয়েও উদাসীন।


তার বিশ্বাস, এই ছেলেকে এই নামে ডাকার মধ্যেই ভুল ছিল।

রঙ্গন—এক নামেই যত সর্বনাশ।


তবুও, আলি আজিম চৌধুরী মাঝেমধ্যে ছেলের ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে ঢোকে না। কেবল দাঁড়িয়ে থাকে।


তার মনে পড়ে যায় নিজের বাবাকে—আব্দুল গফুর চৌধুরীকে—একসময় যিনি পূর্ববাংলার সবচাইতে প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে তিনি কেবল একটাই নাম বলতেন বারবার—


“রঙ্গন… রঙ্গন… রঙ্গন ফিরবে… ওর চোখে আগুন, ওর মুখে কান্না… আমি চিনি ওকে।”


কেউ বিশ্বাস করেনি তখন। বলেছিল, বার্ধক্য ও মানসিক অবসাদের ফল। কিন্তু রঙ্গন যখন জন্ম নিল, গফুর চৌধুরীই বলেছিলেন—এই নাম রাখতেই হবে। যেন পূর্বপুরুষের কাহিনি বেঁচে থাকে।


আর সেই নামেই আজকের ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে দুঃস্বপ্নের কিনারায়।


রঙ্গনের জ্ঞান ফিরে এলো সন্ধ্যার কিছু আগে। সে চোখ খুলে প্রথমেই জানালার দিকে তাকাল।

আলো ঝাপসা, বাতাস নিস্তব্ধ।

সে বলে উঠল ধীরে—


“তুই আবার আসলি… তুই আবার আমায় খুঁজলি…”


ইপসিতা তার হাত ধরল।


—কাকে তুই বলছিস, রঙ্গন?


সে কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। চোখে তখনও ভয় নয়—কোনো গভীর অনুশোচনা।


একদিন পর হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে রঙ্গন বাসায় ফেরে।

তখন থেকেই সে অনেক চুপচাপ। ফোন ধরে না, কারও সঙ্গে দেখা করে না। কেবল এক অদ্ভুত অভ্যাসে পড়ে—প্রতিদিন রাতে আয়নার সামনে বসে থাকে।


এক রাতে তার মা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখে, রঙ্গন আয়নার দিকে তাকিয়ে কিছু বলছে।


—তুমি নাচো না কেন আজকাল? তোমার চোখে পানি কেন?


তার মা জানে না, আয়নার ভেতরে সে কাকে দেখে।

কিন্তু রঙ্গনের চোখে তখন কাঁপতে থাকা এক আত্মার ছবি—

এক নারী, যার শরীর নয়, কেবল চুল, কণ্ঠ, আর ছায়া।


নাম—ইরা।


সে মেয়েটিকে রাস্তায় প্রথম দেখেছিল চানমহল যাওয়ার আগের দিন। সাধারণ, কিন্তু অদ্ভুত এক চোখ। যেমন করে কেউ অতীত চেনে। ইরা সহজেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল।

তারপর একদিন সন্ধ্যাবেলা, চা খেতে খেতে রঙ্গন হেসে বলেছিল—


—তুমি কী চাও?


ইরা চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল—


—আমি চাই, তুমি চিনে ফেলো কে আমি।


রঙ্গন হেসে বলেছিল—


—তাহলে তুমি আমার প্রাক্তন জন্মের কেউ?


ইরা তাকিয়ে ছিল, বলেছিল—


—হয়তো, অথবা তোমার ভবিষ্যতের ছায়া।


তারপর থেকেই মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেল।


চানমহল থেকে ফিরে রঙ্গনের মাথায় এখন শুধু একটাই নাম—ইরা।


সে জানে না কেন, কিন্তু তার ভেতরে যেন প্রতিটি ধমনীতে বাজে সেই পুরনো গান—


“রাত জাগা তারা আমি…”


সে রাতে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলে ওঠে—


—তুই সত্যি নিখোঁজ না ইরা। তুই তো আমার ছায়া হয়ে ফিরে এসেছিস। আমি কি তোর আগুন হবো?


আয়নার কাচে এক ঝাপসা ছায়া, যেন মুখ নেই, কেবল একজোড়া দৃষ্টি।


আর সেই দৃষ্টির গভীরে—

রক্ত,

ভালবাসা,

আর অভিশাপ।



ঢাকার ধানমণ্ডির পাঁচতলা অফিস ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে রঙ্গন। নিচে ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির হর্ন, কাঁচের ভিতর কর্মীদের কিমিয়া মতো নীরবতা।


ওর কাঁধে একটা জীর্ণ ফতুয়া, মুখে পুরোনো অভ্যেসমতো হালকা হাসি, চোখে ক্লান্তি।


এবার সে এসেছে নিয়মিতভাবে তার বাবার অফিসে।


আলি আজিম চৌধুরীর একমাত্র উত্তরসূরি এখন হিসাবের খাতার চেয়ে ভবিষ্যতের মঞ্চের প্রতি বেশি আগ্রহী। রঙ্গনের মনে এখন বাজে অন্য সুর—বাবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা নয়, দাদার অপূর্ণ রাজনীতি।


তার ঘরে এখন নিয়মিত আসেন রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণ নেতারা। কেউ কেউ মনে করেন, এই ছেলেই হতে পারে নতুন প্রজন্মের মুখ। কেউ কেউ বলে—এ আবার কিসের খেলা, পিতার ব্যবসা ফেলে দাদার অভিশপ্ত পথ?


এক রাতে ডিনার টেবিলে আলি আজিম চৌধুরী বললেন,

—রাজনীতি? তুমি জানো ওটার মানে কী, রঙ্গন?

—মানুষের হাত ধরা, বাবা। যারা জানে না কিভাবে হাঁটতে হয়, তাদের হাত ধরে হাঁটিয়ে দেওয়া।


মা, ইপসিতা আরা, থেমে গিয়েছিলেন এক চামচ খাবার তুলতে তুলতে।

—তুই আবার কোথায় গেলি রে? আবার চান মহলে গেছিস?


রঙ্গন কিছু বলেনি।

সে এখন অনেক শান্ত, অনেক হিসেবি। যেন আগুনে পুড়ে গিয়ে ছাই না হয়ে পাথর হয়ে উঠেছে।



রাজনীতির ময়দান ঢাকায় গরম হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের তরুণ নেতৃত্বে একটা জায়গা খালি, এবং সেখানে রঙ্গনকে বসাতে চাইছে দলে কেউ কেউ।


রঙ্গন জানে, নামটা যথেষ্ট। রঙ্গন চৌধুরী—একটা নাম, যেটা ইতিহাসে দাগ রেখে গেছে আগুন দিয়ে, এখন সে দাগ দিতে চায় মানুষের মনে ভালোবাসা দিয়ে।


কিন্তু তার প্রতিপক্ষও জানে—এই নাম আগুন বয়ে আনে।


একদিন অফিসে তার ডেস্কে একটা খাম এসে পৌঁছায়। খুললে দেখা যায়, একটা ছবি—চান মহলের ধ্বংসাবশেষ, আর নিচে লেখা—

“তুই আগুন থেকে পালাতে পারিস না, তুই আগুনই।”


সে রাতে রঙ্গনের ঘুম ভাঙে।


জানালার পাশে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। মুখ দেখা যায় না।


—তুই রাজনীতি করতে চাস?

—তুই ভালো হবি ভেবে আগুন তোর ভিতরে হাসে।


রঙ্গন চোখ বন্ধ করে বলে,

—আমি এখন রঙ্গন নই। আমি নতুন ইতিহাস।


ছায়া বলে,

—ইতিহাস শুধু লেখা হয় না, পুড়িয়ে লেখা হয়।



আলি আজিম চৌধুরী, একদিন রঙ্গনের কাঁধে হাত রেখে বলেন,

—আমার সবকিছু তোর জন্য, কিন্তু ওই পথে গেলে আমি আর তোর পাশে থাকব না।


রঙ্গন হেসে বলে,

—আপনি পাশে থাকবেন না, জানি। কিন্তু আমি আমার দাদার অভিশাপের শেষ অংশটুকু ভালোবাসা দিয়ে শেষ করতে চাই। আমি আমার পূর্বপুরুষদের ভুল শোধ করতে চাই, ক্ষমতা নিয়ে নয়—সততার আগুনে।


আলি আজিম চৌধুরী চুপচাপ সরে যান।


আরেক প্রজন্মের ছেলেটা ধীরে ধীরে শহরের রাজপথে হাঁটা শুরু করে—হিমুর মত, কিন্তু এবার কাঁধে আগুনের ইতিহাস নিয়ে।


আর আয়নার পাশে, আবার কেউ একজন বলে ওঠে—

—তুই পারবি না রঙ্গন। আগুন ভালোবাসে না কাউকে।


রঙ্গন চুপ করে থাকে।


তাকে ভালোবাসা শিখিয়েছে এক ছায়া, যে হারিয়ে গেছে স্বপ্নের ভিতর।

আর শিখিয়েছে ভয়, যে এখন দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতিপক্ষ হয়ে।


রঙ্গনের রাজনীতি তাই শুধুই ক্ষমতার খেলা নয়—

এটা পূর্বপুরুষদের অন্ধকারকে আলোর মুখ দেখানোর এক প্রচেষ্টা।

যেখানে প্রতিপক্ষ শুধু মানুষ না, অতীতের আগুনও।



পোস্টার গুলো প্রথম দেখা যায় গাবতলীর ফুটপাতে।

সাদা-কালো ছাপা মুখ—রঙ্গন চৌধুরী। নিচে লেখা নেই কোনো দলে নাম, নেই কোনো প্রতিশ্রুতি, নেই কোনো রঙিন স্লোগান।


শুধু একটি লাইন—

“ভবিষ্যতের নাম জানতে চাও? আয়নায় নিজেকে দেখো।”


মানুষ হাসে, কেউ ঠাট্টা করে বলে—এই হিমু টাইপ পাগল আবার নেতা হবে?


কিন্তু ঢাকা শহরের পুরনো অলিগলিতে একটা সাড়া পড়ে যায়।

একটা নতুন নাম, যার পিছনে নেই কোনো বড় ব্যানার, নেই টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি, কিন্তু আছে এক চুম্বকের মত টান।


কারণ রঙ্গনের চোখে এমন কিছু আছে, যা ভোটের মৌসুমে ছাপানো ব্যানারে থাকে না—তীব্র শোক, স্থির জেদ, আর ভয়হীন গলায় বলা কথার স্পষ্টতা।



আলি আজিম চৌধুরী কামরান একদিন বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের জন্য লাঞ্চ পার্টির আয়োজন করেন।


রঙ্গন সেখানে উপস্থিত হয় একজোড়া হাওয়াই চটি পায়ে, সাদা পাঞ্জাবি পরে, হাতে একটা চটের ব্যাগ।


কেউ একজন ফিসফিস করে—

—এই ছেলেই তো গাবতলীর পোস্টারে ছিল।

—এইটাই কামরান মানে আলি আজিম চৌধুরী সাহেবের ছেলে?


এক শিল্পপতি হেসে বলে,

—নেতা হতে হলে তো অন্তত একটা টাই লাগানো শিখতে হয়।


রঙ্গন হেসে বলে,

—টাই গলায় চাপ দেয়, আমি মানুষের গলার কাঁটা হতে এসেছি।


আলি আজিম চৌধুরী কামরান  গ্লাস নামিয়ে চোখে তাকায়।

সে জানে, তার ছেলে আর ফিরে যাবে না।



‘রক্তে আগুন’ দল নয়, আন্দোলন


রঙ্গন রাজনীতি শুরু করে কোনো দলের ব্যানারে না গিয়ে, ‘রক্তে আগুন’ নামের একটা সামাজিক আন্দোলন দিয়ে।


মঞ্চ নেই, লাউডস্পিকার নেই, নেই ফ্ল্যাগ।

আছে শুধু রাস্তায় রাস্তায় হাঁটা, ছাত্রদের সঙ্গে আড্ডা, বস্তির ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা, আর অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো।


পত্রিকায় কেউ কেউ লিখে—

“রঙ্গন চৌধুরী হচ্ছে রাজনৈতিক হ্যালুসিনেশন, যে জনগণ চায়, কিন্তু দল চায় না।”


নওশের আলম—এক সাবেক এমপি, ক্ষমতাবান, দুর্নীতিগ্রস্ত, নিজের এলাকা দিয়ে সব রকম অনিয়মের রাজত্ব চালায়।


রঙ্গন একদিন হেঁটে হেঁটে তার এলাকায় যায়।

কোনো মিছিল নয়, স্রেফ একটা খোলা মাইক হাতে নিয়ে দাঁড়ায় বাজারে।


—আপনারা আমাকে ভোট দেবেন না। কিন্তু আমাকে ভয় পাবেন না।

—ভয় পাবেন তাদের, যারা আপনাকে চুপ থাকতে শিখিয়েছে।


ভিডিও ভাইরাল হয়। নওশের আলমের লোকজন রঙ্গনের উপর হামলার চেষ্টা করে।


কিন্তু ততদিনে রঙ্গনের আশপাশে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত প্রাচীর—মানুষ। বুড়ো চা-ওয়ালা, রিকশাচালক, ছাত্র, এমনকি কিছু পুলিশ সদস্য।


রঙ্গন আঘাত পায় না। কিন্তু খবরের শিরোনাম হয়—

“রঙ্গন চৌধুরী—নতুন আগুনের নাম?”



মা, ইপসিতা আরা কাঁদেন।

—তুই কিসের জন্য এই পথ নিচ্ছিস? তোর দাদাকে দেখিসনি?

—তুই জানিস না আগুন খেলে আগুন পোড়ায়?


রঙ্গন বলে,

—আমি পোড়াতে আসিনি মা। আমি শুধু দেখাতে চাই, আগুন কাকে পোড়ায় আর কাকে আলো দেয়।


আলি আজিম চৌধুরী সেই রাতে ছেলের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বলেন,

—এই বাড়িতে আর রাজনীতির কথা বলবি না।


রঙ্গন উত্তর দেয় না।

সে জানে, এই লড়াই ঘরের না, মাটির।



বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে বসে রঙ্গন। তার সামনে একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে।

—বাবা, আমরা তো জানি না কে ভালো, কে মন্দ। কিন্তু তোমার চোখে দেখি ভয় নেই।


রঙ্গন জবাব দেয়,

—আমিও ভয় পাই দাদার মতো, শুধু পালাই না।


আর ঢাকার পুরনো অলিগলিতে আবার ছড়িয়ে পড়ে সেই পোস্টার—

“ভবিষ্যতের নাম জানতে চাও? আয়নায় নিজেকে দেখো।”


রঙ্গনের জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। ইরা স্বপ্নে ছিলো, স্বপ্নেই হারিয়ে যায়। সে এখন বাবার অফিসে বসা শুরু করেছে। প্রতিদিন সকালে হাফশার্ট পরে বের হয়, টিফিন ক্যারিয়ার হাতে, মাথায় সামান্য কাঁচাপাকা চুল এলোমেলো। কেউ বুঝতে পারে না—এই ছেলেটা একসময় চানমহলে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল।


রঙ্গনের আগ্রহ এখন রাজনীতিতে। সে দাদার মতো হতে চায়। কিন্তু ওর বাবা-মা কিছুতেই রাজি নয়। ইপসিতা আরা বলে,


—রক্তে যা ছিল, তা তো জেগেই উঠছে। ওর দাদা শেষ বয়সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়েছিল, মনে নেই?


আলি আজিম চৌধুরী মুখে কিছু না বললেও ছেলের চোখে এখন সেই অদ্ভুত দীপ্তি দেখে ভীত হয়।



রঙ্গন এখন নিয়মিতভাবে পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় যায়—সেখানে ছোট ছেলেমেয়েদের পড়ায়, মা-বোনদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের কথা শোনে।


একদিন এক বৃদ্ধ বলে,


—তুমি জমিদারের বংশ, তবু আমাদের মতো করে হাসো। ভয় করে না?


রঙ্গন হেসে বলে,


—ভয় তো আগুনে পুড়েই গেছে কাকু।


এইসব দেখতে দেখতে কিছু মানুষ রঙ্গনের চারপাশে জমে ওঠে। তারা কেউ পলিটিক্স করে না, কেউ কাউন্সিলর না, কিন্তু সবার চোখে রঙ্গনের জন্য আলাদা এক শ্রদ্ধা জন্ম নেয়।


ঠিক তখনই শুরু হয় চাপ। টেলিভিশনে, পত্রিকায়, অনলাইন পোর্টালে—“চান মহলের উত্তরসূরি”, “আত্মা নিয়ে খেলা করছে এক যুবক”, “ভবিষ্যতের রাজনীতিতে আসছে আগুনের মানুষ”—এই সব শিরোনাম ঘুরে বেড়াতে থাকে।


রঙ্গনের অফিস ডেস্কে একদিন একটা খাম পাওয়া যায়। ভেতরে পোড়া ইটের টুকরো, আর একটা চিরকুট:


“আগুনে প্রবেশ করেছো, এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।”


রঙ্গন তাকিয়ে থাকে ইটের দিকে।


তার ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়। সে জানে, এ কেবল রাজনীতি নয়—এ এক উত্তরাধিকার। ভয় নয়, সম্মুখীন হবার দায়িত্ব।


শেষ নয়। আগুন এখনো জ্বলছে।


১০


ষড়যন্ত্র


ঢাকার এক হোটেলের রেস্তোরাঁয় পাঁচজন মানুষ বসে আছে—কেউ ব্যারিস্টার, কেউ প্রাক্তন আমলা, কেউ এক মিডিয়া হাউজের মালিক, আরেকজন এক মন্ত্রীর বেয়াই।


মাঝখানে একটিই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে—রঙ্গন চৌধুরী।


—"বাচ্চা ছেলের মত আচরণ, কিন্তু মানুষ জড়ো হয়ে যাচ্ছে ওর চারপাশে," ব্যারিস্টার বলল।


—"তুমি কী জানো, ওর দাদা ছিল গফুর আজিম চৌধুরী? ষাটের দশকে ইয়াহিয়া খানের সাথে যে নৈশভোজ করেছিল? ওই রক্তের লোক কিন্তু হঠাৎ কিছু করে না," সাবেক আমলা বলল।


—"তুমি ভুল বলছো," মিডিয়া মালিক মাথা নাড়ল, "এই ছেলেটা নতুন ধরণের পপুলারিজম আনছে। কবিতা, কান্না, আড্ডা, চায়ের টেবিল, বাইকারদের মতো ফ্যানবেস—বুঝছো না, ও একেকটা লাইভে দুই লাখ মানুষ দেখে।"


—"তাহলে থামাও," মন্ত্রীর বেয়াই বলল, ঠাণ্ডা গলায়।

—"গুজব ছড়াও। ভয় তৈরি করো। অতীতের ভূত জাগাও। লোকজনকে মনে করাও—এই ছেলের পূর্বপুরুষ ছিল জমিদার। কালীপূজায় মেয়েদের বলি দিত। মানুষ হারিয়ে যেত।"


—"তাহলে চাইলে একটা দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া যায়," ব্যারিস্টার বলল, ঠোঁটে শুষ্ক হাসি।


—"অথবা একটা নারী কেলেঙ্কারি," মিডিয়া মালিক বলল।

—"তুমি বলো, প্রেমিকার মুখ কেউ দেখেছে?"


ঘর নীরব হয়ে যায়।


১১


পরের দিন সকালে ‘সত্যবার্তা’ নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে হেডলাইন আসে—

“চান মহলের উত্তরসূরি আবারও আগুনের খেলায়?”

সাথে যোগ হয় একটি বিভ্রান্তিকর ছবি—রঙ্গনের পাশে দাঁড়িয়ে এক নারীর ছায়া। মুখ অস্পষ্ট।


আরও খবর ঘোরে—

“পূর্বপুরুষের পিশাচচর্চার সাথে সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চায় সচেতন মহল।”

“রাজনীতির আড়ালে কি কেউ আগুন নিয়ে খেলছে?”

“এক নারীর আত্মহত্যা—রঙ্গন কি দায়ী?”


রঙ্গন কিছু বলে না।

সকাল থেকে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়।

তার বাবা বলেন,


—"তুই থেমে যা রঙ্গন। এটা এখন রাজনীতি না, এটা এখন নরক।"


রঙ্গন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের নিচে গাঢ় ছায়া, কিন্তু ঠোঁটে একপ্রকার কৌতূহল।


সে শুধুই বলে,


—"তারা ভয় পেয়েছে, মানে ঠিক পথে হাঁটছি।"


১১


ঠিক সেই সময়, কেউ একজন ফোন করে রঙ্গনকে।


এক অচেনা গলা। নারী কণ্ঠ।


—"তুমি জানো না, তোমার ছায়া তোমার থেকে বড় হয়ে গেছে। তুমি হাঁটছো, কিন্তু তোমার পেছনে হাঁটছে ইতিহাস। সাবধান হও রঙ্গন, তুমি রক্ত নিয়ে এসেছো, এবার আগুন তোমাকে নেবে।"


রঙ্গন ফোন রেখে দেয়।

সে বুঝে গেছে—এই লড়াই কেবল রাজনীতি নয়, এটা স্মৃতির বিপ্লব। কেউ কেউ তাকে খাঁচায় পুরে রাখতে চায়, আবার কেউ চায় সেই খাঁচা পুড়িয়ে দিতে।


সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নায় আবার সেই ধোঁয়াটে মুখ।

নারী বলে,


—"তোর বিরুদ্ধে ওরা যা করছে, তার নাম ষড়যন্ত্র না, তার নাম উত্তরাধিকার। তুমি কি তাতে তৈরি?"


রঙ্গন হাসে।


—"আমার গায়ে আগুনের গন্ধ লেগে গেছে। এখন যদি পুড়তে না পারি, তবে জন্ম কেন?"


রঙ্গন সিদ্ধান্ত নেয়, সে পালাবে না।


সে বলে,


—"আমার পূর্বপুরুষ যদি আগুন হয়ে থাকেন, তবে আমি হবো তার ছায়া—যা সবকিছু দেখে, কিন্তু নিজে পোড়ে না।"


কিন্তু সে জানে না, ঠিক তখনই তার অফিসের টেবিলের নিচে রাখা হচ্ছে একটি প্যাকেট।


ভেতরে রাখা আছে একটি পুরনো চিঠি।

তাতে লেখা—


“যে আগুন ইতিহাসে পোড়েনি, সে ভবিষ্যতে বিস্ফোরণ ঘটায়।”


১২


শহরের দক্ষিণে এক নির্জন অফিসঘরে সন্ধ্যার পরে আলো জ্বলে ওঠে।

রঙ্গনের সবচেয়ে পুরনো বন্ধু—তানভীর বসে আছে। চোখে ক্লান্তি, হাতে একটা চা, কিন্তু হৃদয়ে দ্বিধার গন্ধ।


সে এবং রঙ্গন একসাথে স্কুলে পড়েছে।

তানভীর জানে, রঙ্গনের ভেতর আলোও আছে, আবার আগুনও।

কিন্তু আগুন নিয়ে কেউ দীর্ঘদিন পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।


তানভীর বলে,

—"ওই কাহিনিগুলো শুধু গল্প ছিলো। তুই সেগুলো সত্যি করতে চাইছিস। এভাবে হিরো হওয়া যায় না রে, রঙ্গন।"


কথাটা সে বলছে, কিন্তু তার সামনের ডেস্কে একটা মোটা খাম রাখা।

তার ভেতরে নগদ টাকা, আর সাথে একটা ফাইল—রঙ্গনের ফোন কল রেকর্ড, কিছু সন্দেহজনক ছবি, আর এক অপ্রকাশিত মেডিকেল রিপোর্ট।


রাতের এক বৈঠকে তানভীরকে বোঝানো হয়েছিল—

“তুই ওর বন্ধু না হলে, ওকে থামাতে কেউ পারবে না। তোকে ওর ছায়া হতে হবে। তারপর সেই ছায়া দিয়েই ওকে গিলে ফেলতে হবে।”


তানভীর প্রথমে রাজি হয়নি।

কিন্তু তারপর... তার ছোট ভাইয়ের স্কলারশিপ বাতিল করে দেওয়া হয়। মায়ের চিকিৎসার ফাইল আটকে রাখা হয় হাসপাতালের প্রশাসনে।


তানভীর টেবিলের ওপর ফাইল রাখে, চোখ নামিয়ে বলে,

—"ক্ষমতার সঙ্গে কেউ লড়াই করে না। শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হয়।"


ওই রাতে রঙ্গন ফোন দেয় তানভীরকে।

—"আমার একা লাগছে রে। সবাই দূরে চলে যাচ্ছে।

তুই পাশে থাকিস।"


তানভীর উত্তর দেয়,

—"সবসময় রে ভাই। তুই তো জানিস, তুই পড়লে আমি তো আগে পড়ি।"


সেই কথার ঘণ্টাখানেক পরেই, সে ফাইলটা পৌঁছে যায় একজন সাংবাদিকের হাতে।

শর্ত একটাই—

রঙ্গনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে তার 'অতীতের টান' নামের কল্পনার রাজ্য।


রাত বাড়ে।

রঙ্গন তার বাসার জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশে চাঁদ, কিন্তু বাতাসে আগুনের গন্ধ।


সে বলে,

—"তানভীর, তুই জানিস তো, আমার সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে—আমার ছায়াটাও যদি একদিন পাল্টে যায়।"


পরদিন খবর ছড়ায়—

“রঙ্গনের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, আত্মীয়-বন্ধু মহলে উদ্বেগ।”

“জমিদার প্রপিতামহের মতো আচরণ—বন্ধুর মুখ খুললেন!”


তানভীরের ছবি, সাথে একটা ক্যাপশন—

"আমরা শুধু চাই, ও ভালো থাকুক। ও নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।"


রঙ্গন সব দেখে। কিছু বলে না।

তার ঠোঁটে একরকম নির্লিপ্ত হাসি।

তার চোখের নিচে ছায়া।

সে জানে, বন্ধুত্ব যদি ছায়া হয়, তবে বিশ্বাসঘাতকতা সেই ছায়ার শীতল বিষ।

আর ছায়া একবার বিষাক্ত হলে, আগুনই তার শেষ প্রতিকার।


১৩


ঢাকার এক অভিজাত এলাকায় এক পুরনো রেস্টহাউসে, পর্দা টানা একটি ঘরে বসে তিনজন মানুষ।

একজন—রাজনীতির মঞ্চের পুরনো খেলোয়াড়, নাম—মোজাম্মেল হক, সবাই তাকে 'মো হক ভাই' বলে চেনে।

দ্বিতীয়জন—রঙ্গনের ছোটবেলার ভাই,  নাম—সাব্বির আলম।

আর তৃতীয়জন—তানভীর, রঙ্গনের বন্ধু।


এই তিনজন এক টেবিলে বসে আছে।

ঘরটা নীরব, শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে।


মো হক ভাই চোখ তুলে বলে—

—“ছেলেটা আগুন নিয়ে খেলে। তার ঠাকুরদা আগুনে পুড়েছে, আর সে কিনা আবার সেই আগুন জ্বালাতে চাইছে।

ক্ষমতা মানে শুধু মানুষকে আপন করে নেওয়া না, ওকে শিখতে হবে—কোন আগুন জ্বালালে মানুষ ছায়া হয়ে যায়।”


সাব্বির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে—

—“ও আমাদের সবাইকে ভুলে গেছে। বাসে করে গ্রামে যায়, বস্তিতে থাকে। নিজেকে যেন কেউ ভাবতে শুরু করেছে।

আমার নাম পর্যন্ত কেউ জানে না। রঙ্গনের নামেই সবাই মুগ্ধ।”


তানভীর ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়। বাইরে হালকা বৃষ্টি।

সে নিচু গলায় বলে—

—“রঙ্গন দুর্বল না। কিন্তু ওর একটা জায়গা আছে, যেখানে ও অন্ধ। ওই অতীত... ওই চান মহল, ওই ইতিহাস।

ওখানে আঘাত করলে ও ভেঙে যাবে। আমি জানি।”


মো হক ভাই হেসে বলেন—

—“তুই তো ওর আত্মার ছায়া রে। ছায়াই তো ছুরি হয়ে ঢোকে।

আমরা শুধু দরজা খুলে দিচ্ছি, বাকি তুই করবি।”


সাব্বির কাগজের এক টুকরো টেবিলে রাখে—একজন অপ্রকাশিত চিকিৎসকের রিপোর্ট।

যেখানে লেখা—“Subject shows signs of genetic dissociation. Family history of delusional psychosis.”


তানভীর রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে বলে—

—“ওকে খারাপ বানাতে বেশি কিছু লাগবে না। শুধু এই রিপোর্ট আর একটা ভিডিও...

যেখানে ও চাঁন মহলের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—‘আমি সেই রঙ্গনের উত্তরাধিকার।’”


মো হক ভাই ঠান্ডা গলায় বলেন—

—“রাজনীতি মানে রক্ত। কিন্তু রক্ত কেবল তখনই ভয়ংকর, যদি সে চেনে তার বংশের ছায়া।

তাকে তার ছায়া দিয়েই গিলে ফেলতে হবে।”


১৪


রঙ্গনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে আশ্চর্য দ্রুততায়।

ঢাকার রাস্তায়, মফস্বলের হাটে, কলেজপাড়ার দেয়ালে—

একটাই নাম: রঙ্গন

একটাই বাক্য:

“আগুন থেকে উঠে আসা এক মুখ—ভবিষ্যতের জন্য।”


কিন্তু আগুন কেবল আলো দেয় না, পোড়ায়ও।

এই জনপ্রিয়তা কিছু মানুষকে অস্থির করে তোলে—

যারা তাকে সামনে এনেছিলো, এখন তার ছায়াতেও দাঁড়াতে ভয় পায়।


মোজাম্মেল হক—‘হক ভাই’ নামে পরিচিত—

রাজনীতির এক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, বহু বছর পর খেলার নতুন মুখ খুঁজছিলো।

রঙ্গনের কণ্ঠ, চোখের ভাষা, অস্বাভাবিক ইতিহাস—

সবই তাকে আকর্ষণ করেছিল।


প্রথম দিকে হক ভাই নিজে গাড়ি পাঠাতো, মিডিয়ার সামনে রঙ্গনের পাশে দাঁড়াতো,

বলে বেড়াতো—

“এই ছেলেটা হলো ভবিষ্যতের উত্তরাধিকার।”


কিন্তু একসময় হক ভাই বুঝে ফেলেন—

রঙ্গন “চিত্র” নয়, “শিল্পী” হয়ে উঠেছে।

সে নিজের রাস্তা তৈরি করছে, নিজের ভাষা বলছে।

আর মানুষও তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। খুব তাড়াতাড়ি।


হক ভাইর চোখে তখন শুধু রাজনীতি নেই, আছে ভয়—

এই ছেলেটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই।

আর যদি একদিন সে হক ভাইয়ের চেয়ারটাই চায়?


সাব্বির, রঙ্গনের কাছের ছোট ভাই, একই পাড়ার, তাকে ছোটবেলা থেকে চিনে।

ছোটবেলায় রঙ্গনের সাইকেল ছিলো, সাব্বিরের ছিলো না—

রঙ্গন ভাগ করে দিতো। কলেজে রেজাল্ট খারাপ হতো, রঙ্গন সুপারিশ করতো স্যারদের। 


রাজনীতিতে নামার আগে, রঙ্গনের পোস্টার কে ছাপাতো?

সাব্বির।


সব কিছুতেই ছিলো সে।

কিন্তু কোনোদিন পেছন থেকে সামনে ওঠার সুযোগ পায়নি।

রঙ্গন যখন স্টেজে উঠে বক্তৃতা দিত, সাব্বির তখন ব্যাকস্টেজে জল দিত।

রঙ্গন যখন মানুষের ভালবাসায় ভাসত,

তখন সাব্বির নিজেকে ভাবত—

“সবচেয়ে কাছের হয়ে যদি আমি কিছু না পাই, তাহলে বাইরের লোকেরা এত কিছু পায় কেন?”


এই ঈর্ষা ধীরে ধীরে জমে যায়।

আর মোজাম্মেল হক সেটাই কাজে লাগায়।


তানভীর, রঙ্গনের বন্ধু।

একসাথে টিউশনি করেছে, চানমহলের গল্প নিয়ে রাত কাটিয়েছে,

রঙ্গনের দুর্বলতাগুলোও তার জানা।


তানভীর জানত রঙ্গন মানসিকভাবে ভঙ্গুর।

কখনো নিজের ইতিহাস নিয়ে হঠাৎ গভীর আবেগে ভেঙে পড়ে,

আবার কখনো নিঃসঙ্গ রাতে বলে—

“আমি আগুন না, আমি ছায়া।”


এই ভঙ্গুরতাই হক ভাই আর সাব্বিরের জন্য ছিল হাতিয়ার।

তারা একদিন তানভীরকে ডেকে বলে—


—“বন্ধু তো বন্ধুই থাকে, তাই না? কিন্তু ক্ষমতায় বন্ধুর পাশে তুমি থাকতে পারো, নাকি তার পেছনে?”

—“ভাবো তুই যদি ওর জায়গায় থাকিস?”

—“আমরা শুধু একটা ভিডিও চাচ্ছি, যেটায় ও চাঁন মহলের সামনে দাঁড়িয়ে একটা কথা বলেছে—

‘আমি সেই আগুনের উত্তরাধিকার।’ বাকিটা আমরা দেখবো।”


তানভীর টাকা নেয়।

বন্ধুত্ব গিলে ফেলে।

একটি পুরনো রাতের ভিডিও দেয়—

রঙ্গন, অন্ধকার উঠানে দাঁড়িয়ে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলছে—


“আমি সেই রঙ্গন। আমি আগুনের পুত্র।”


হক ভাই হাতে ভিডিও পায়,

সাব্বির তখন হাসে—

“দেখবি, একদিন ও চিৎকার করে বলবে—সব মিথ্যে। কিন্তু মানুষ তখন শুনবে না।”


আর তানভীর...

সে চলে যায় দূরে কোথাও।

চুপচাপ, কিছু বলার মতো মুখ থাকে না তার।


রঙ্গন তখনও কিছু জানে না।

সে একদিন টেবিলের ওপর এক কাগজ দেখে—

এক গোপন মিটিংয়ের নোট।

তাতে লেখা—“মো. হক, সাব্বির আজিম, তানভীর—চূড়ান্ত পর্যায়ে।”


রঙ্গন ঠান্ডা গলায় বলে—

“যারা ছায়ার পেছনে ছুরি লুকায়, তারা আলো দেখলে অন্ধ হয়ে যায়।”


চান মহলের ছাই যেন আবার উড়ছে।


১৫


সেদিন রাতেই, রঙ্গনের মেইলে আসে এক অদ্ভুত ছবি—

চাঁন মহলের পোড়া একটা দরজা, তার ওপর লাল কালিতে লেখা—


“আগুন ফিরে আসবে, কিন্তু এবার সে জানে, কে প্রথম জ্বালিয়ে দিয়েছিল।”


রঙ্গন চুপচাপ বসে থাকে। তার মুখে হাসি নেই। চোখে ক্লান্তি।

সে জানে, আঘাত এসেছে ভেতর থেকে।


কিন্তু সে শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে বলে—

—“তোরা জানিস না... আগুন কীভাবে বদলায়। আগুন পোড়ে না, আগুন বদলে দেয়।”


১৬


রক্ত ও ছায়ার সন্ধিক্ষণ


রঙ্গন জানে না, তার পায়ের নিচের জমিন কবে থেকে এত ঠুনকো হয়ে গেছে। জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে হকের দলের লোকজন হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ঘিরে ফেলে।


জুমার নামাজের পরেই সে ফিরছিলো পুরনো ঢাকার নিজের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে। রাস্তার মোড় পেরোতেই, তিনটা বাইক ঘিরে ধরে তার গাড়িকে। এক মুহূর্তেই নামিয়ে ফেলা হয় রঙ্গনকে।


কেউ মুখোশ পরা, কেউ খালি মুখে। তাদের হাতে লোহার রড, পাইপ, ছুরি। কেউ বলছিল—

—“তুই বেশি বড় হয়ে যাচিস রে!”

—“ভবিষ্যতের মুখ আমরা থেতলায়ে দেব!”


রঙ্গন পালানোর চেষ্টা করে না। কারণ ও জানে, এই পালানো কোনো ভবিষ্যত নয়, কেবল বিলম্ব।


কিন্তু ঠিক তখনই, ছায়ার মতো কেউ একটা প্রাইভেট কার নিয়ে এসে পড়ে, হামলাকারীদের উপর। সবার দৃষ্টি ঘোরে।  একটি মেয়ে নামে গাড়িটি থেকে, মেয়েটি একটা পিস্তল বের করে পরপর তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে । তার গায়ে কালো চাদর, কিন্তু চোখ দুটি অদ্ভুতভাবে পরিচিত।


কেউ যেন বলে উঠল —

—"এই মেয়ে তো… এই মুখ তো…"


রঙ্গন ততক্ষণে রক্তাক্ত। এক হাত দিয়ে রাস্তার রেলিং ধরে রাখে। তার চোখ কুয়াশার মতো ঝাপসা, কিন্তু সেই নারীর মুখে  আলো।


সে বলতে চায়—“তুমি কে?”

কিন্তু গলার স্বর ভেঙে যায়।


মেয়েটি তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ঢাল হয়ে। এক হাতে সে রঙ্গনের কাঁধ ধরে, আরেক হাতে পিস্তল ধরে সন্ত্রাসীদের দিকে।


কিন্তু দেরি হয়ে গেছে আগেই সন্ত্রাসীদের আঘাতে রক্তাক্ত রঙ্গন। রঙ্গন ঢলে পরে মেয়েটির কোলে।


সন্ত্রাসীরা দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অন্ধকারের গলিতে হারিয়ে যায়।


রঙ্গন জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে শুনতে পায় সেই মেয়ের স্বর—

—“তুমি মরতে পারো না, রঙ্গন। কারণ তোমার মৃত্যু আমারও মৃত্যু।”


সে চমকে ওঠে। সেই স্বরটা তো সে বহুবার শুনেছে—ঘুমের মধ্যে, আগুনের মাঝে, আয়নার ভেতর।


সে চিৎকার করে উঠতে চায়—“তুমি কি নীহারিকা?”


কিন্তু ততক্ষণে অজ্ঞান।


চারদিক নিস্তব্ধ। একটা পাখি ডেকে ওঠে দূরে। আর একটা ছায়া—নীরবে মিলিয়ে যায় শহরের এক অন্ধ গলিতে।


শেষ নয়। এটা কেবল শুরু।


রঙ্গনের গল্প এখন ছায়া থেকে রক্তে, রক্ত থেকে ইতিহাসে ঢুকছে।

আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি—সে কার পুনর্জন্ম, তা সময় বলবে।


তবে একটাই নিশ্চিত—চানমহলের আগুন এখন শহরের রক্তনালী দিয়ে বইছে।


রঙ্গন জমিদার ৬


: অর্পন রহমান


উৎপত্তির কাহিনি : অরিজিন 



চান মহল 


চান মহলের ইট-পাথর যেন এখনো গুঞ্জন তোলে নিঃশব্দে, যেভাবে চাঁদের আলো নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে অন্ধকার রাতে। এই বাড়ি শুধু প্রাসাদ ছিল না, ছিল ইতিহাস, আতঙ্ক আর রহস্যে মোড়া এক শতাব্দীর চিহ্ন।


সেই ইতিহাসের শুরু অনেক আগেই, যখন এই এলাকা ছিল ‘সিদ্ধ বাড়িয়া’ নামে পরিচিত—a forgotten name whispered only in dusty manuscripts and broken tombstones. তখন ছিল না কোনো চান মহল, না ছিল আতঙ্কের রঙ্গন।


সিদ্ধ বাড়িয়া গ্রামটি চান মহল করার পর  নাম হয়ে যায়

" চান মহল" গ্রাম। 

 

কথিত আছে এই চান মহলের ইট, পাথর, বালি সব জ্বিনরা সুদূর কলকাতা থেকে চান চৌধুরীর বাবার আদেশে নিয়ে আসে, এবং এই বাড়ি তৈরি করে দেয়।

 এই বাড়ির পাশাপাশি গ্রামে পাঁচ টা মসজিদও তৈরি করে।

চান চৌধুরীর বাবা।


এই গ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল যে প্রাসাদ, তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন জমিদার আইনুদ্দিন চৌধুরী চানের বাবা।


তার একমাত্র সন্তান  'চান' নামে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন তার আধ্যাত্মিক সাধনার কারণে। 

কেউ ডাকত চান চৌধুরী বলে—কারণ রাতে তিনি হাঁটতেন জ্যোৎস্নার নিচে, চোখে ছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি। স্থানীয়রা বলত, তাঁর মুখে এমন এক আলো ছিলো, যা অন্ধকারের ভেতর দিয়েও পথ দেখাতে পারত। আইনুদ্দিন ছিলেন জমিদার, কিন্তু জমিদারির থেকেও বেশি পরিচিত ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির জন্য। কেউ বলত তিনি অলৌকিক, কেউ বলত ফকির, কেউ বলত পীর।


তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাতেন নামাজ, তসবি, ও কোরআন পড়ে। আর রাতের অন্ধকারে ধ্যানস্থ হতেন পুরোনো কুয়া আর শিমুল গাছ ঘেরা এক নির্জন বাগানে। তাঁর কথা শুনতে, আশীর্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। 


মানুষ বলত, তিনি চাঁদের মতই নির্মল, কিন্তু যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানতেন—চাঁদ যেমন কলঙ্ক নিয়ে বাঁচে, তেমনি চান চৌধুরীর জীবনেও ছিল এক অদৃশ্য অন্ধকার।


কিন্তু কেউ জানত না, এই জমিদার একাকীত্বের ভেতর লুকিয়ে রাখছেন এক গোপন বেদনা—তিনি নিঃসন্তান।


তিনজন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর কোনো সন্তান হয়নি। একে একে সবার মুখ ফ্যাকাশে, সংসার শূন্য, রাত নিঃসঙ্গ। 



আইনুদ্দিন চৌধুরী চান ছিলেন ধর্মভীরু, তিন বার হজ করে আসা মানুষ। তার জমিদারিতে কোনোদিন কাউকে না খাইয়ে রাখা হয়নি। গ্রামের পাঁচটি মসজিদ নির্মাণ করেন, এবং এমনকি রাতের বেলা নিজের হাতে খাবার বিতরণ করতেন লঙ্গরখানায়। তার স্ত্রী ছিল তিনজন, কিন্তু কোনো সন্তান হয়নি। চিকিৎসক, হাকিম, কবিরাজ—সব চেষ্টা ব্যর্থ।


এই অবস্থায় এক রাতে স্বপ্নে তিনি দেখেন—এক অগ্নিকুণ্ড থেকে একটি নারী উঠে এসে বলছে, “পূর্বজন্মে তুমি আমার কাছে ঋণী, আমি আবার আসব সন্তানরূপে।” সেই স্বপ্ন তাঁকে বিচলিত করে তোলে। তারপরই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা।


এর মাঝেই একদিন, চানমহলের লঙ্গরখানায় আশ্রয় নেয় এক হিন্দু কিশোরী। নাম—হেমা।



হেমা কুমারী


১৭৭৬ সাল। ব্রিটিশ শাসকরা কালীপুজা, শবসাধনা, এবং হিন্দু তান্ত্রিকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। পূর্বভারতের অনেক তান্ত্রিক গুরুকেই ধরে নিয়ে পুড়িয়ে মারে। সেই আগুনে পুড়ে মারা পড়েন হেমা কুমারীর পিতা, তন্ত্রসাধনার বিখ্যাত এক গুরু। তার সাধনা ছিল শ্মশানে—কর্ণ পিশাচী, তারা, এবং কালী—সব সাধনায় সিদ্ধহস্ত। মৃত্যুর আগে হেমাকে বলেছিলেন, “তোর শরীরে আছে আগুন, আর পেছনে ছায়া। পালিয়ে যা, না হলে তোর জীবনও শ্মশান হয়ে যাবে।”


হেমা পালিয়ে আসে। কলকাতা থেকে নদী পথে, তারপর গাড়ো পাহাড় ঘুরে এসে আশ্রয় নেয় সিদ্ধ বাড়িয়ায়, যেখানে তখনো চেনা যায়নি ভবিষ্যতের চান মহল। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল লঙ্গরখানা, যেখানে খাবার বিতরণ হতো গরিবদের জন্য। হেমা সেখানেই কাজ নেয়।


প্রথম দেখা সেখানেই। চান চৌধুরী প্রতিদিনের মত খাবার বিতরণে যান, আর তখনই তার চোখ পড়ে এক অনাহারক্লিষ্ট, কিন্তু চিত্তাকর্ষক নারীর দিকে। হেমা তখনো মুখ ঢেকে রাখে, বলে না তার পরিচয়।


হেমার চোখ ছিলো অভিশপ্ত জলের মত—দেখলে মনে হত গভীর কিছুর ডুবসাঁতার। সে ছিল এক মৃত তান্ত্রিকের মেয়ে। তার বাবা কালীসাধনায় সিদ্ধ ছিলেন, কলকাতার বেনিয়াটোলার এক মন্দিরে যিনি শবসাধনার গুরু বলে খ্যাত। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা 'তান্ত্রিক উচ্ছেদ অভিযান' চালায়। অগ্নিদগ্ধ হয় অসংখ্য আশ্রম ও মন্দির। সেখানেই মারা যান হেমার বাবা। পালিয়ে বাঁচে কিশোরী হেমা।


ভয়, রক্ত, আর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে সে পৌঁছায় পূর্ববঙ্গের সিদ্ধবাড়িয়া গ্রামে। ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে পড়ে যায় লঙ্গরখানার আঙিনায়। লাল টকটকে পাড়ের শাড়ি, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, আর চোখে অস্বাভাবিক নির্লিপ্তি। কেউ প্রথমে এগিয়ে আসে না। কিন্তু সেই রাতেই চান চৌধুরী নিজে এসে দাঁড়ান তার সামনে। হেমাকে দেখে থমকে যান তিনি।


তাকে প্রথমে আশ্রয় দেওয়া হয় লঙ্গরখানার পাশে নারীকুঠুরিতে। 

কিন্তু দিনের পর দিন, রাতের পর রাত—চোখে চোখ পড়ে যায়। এবং যেদিন হেমা অসুস্থ হয়ে পড়ে, এবং তার সেবা করতে গিয়ে চান চৌধুরী তার কপালে দেখে এক অদ্ভুত চিহ্ন—একটি চাঁদ এবং তার নিচে অন্ধকার রেখা, তখনই যেন কিছু বুঝতে পারেন তিনি।

কিছুদিন পর, সবার অজান্তে চান চৌধুরীর হৃদয় জয় করে ফেলে হেমা।


তিনি অনুভব করেন, এ কন্যা সাধারণ নয়। সে যেন কোথাও এক সুপ্ত অশান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। হেমা যখন বলে, তার কোনো ঠাঁই নেই, তখন জমিদার বলেন, “এই চানমহলই তোমার ঠাঁই।”



বিয়ে


হেমা ছিলো যেমন সুন্দরী, তেমনই রহস্যময়। রাতের বেলায় প্রাসাদের ছাদে গিয়ে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, কখনো কখনো মৃদু স্বরে মন্ত্র জপ করত। জমিদার সেটা জানতেন, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর ঈমান টলতো না। বরং মনে হতো, হেমার মধ্যে কোনও অলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব আছে।


ধীরে ধীরে তাঁরা কাছাকাছি আসেন। জমিদার জানতেন না হেমা হিন্দু, বা তার পূর্বপুরুষের পরিচয়। 


পরবর্তীতে তার পরিচয় জানলেও, ততদিনে সে হারিয়ে গেছে হেমার দৃষ্টির গভীরতায়। 


এক রাতে, আকাশে পূর্ণচাঁদ, চান চৌধুরীর প্রাসাদের গোপন কক্ষে বিয়ে হয় গোপনে।


 ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে তাকে বিয়ে করেন, নাম দেন রাহিমা। কিন্তু হেমা নিজের ভিতরের তান্ত্রিক শক্তিকে দমন করতে পারে না। চান চৌধুরীর অজান্তে সে রাতের বেলা শ্মশান ঘাটে যায়, সাধনা চালিয়ে যায়। সে জানত, তার গর্ভে আসবে এক সন্তান, যে হবে আগুনের সন্তান।


বিয়ের এক মাসের মাথায় হেমা গর্ভবতী হয়। তখন চান চৌধুরীর বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, আর আশপাশে গুঞ্জন ওঠে—“হেমা আসার পরেই জমিদার বদলে গেছেন। হাসেন, কথা বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ান।”


কিন্তু চাঁদের আলো যত উজ্জ্বল হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।


রঙ্গনের জন্ম: 


১৭৭৮ সালে জন্ম হয় রঙ্গন চৌধুরীর। জন্মের মুহূর্তে, রাত আকাশে দেখা যায় তিনটি চাঁদ—কোনো ব্যাখ্যা ছিল না, শুধু গঞ্জনার ছড়া ছিল গ্রামের বয়স্ক নারীদের মুখে।


রঙ্গনের শৈশব ছিল অদ্ভুত। সে আগুনকে ভয় পেত না। যখন তার বয়স পাঁচ, তখন লঙ্গরখানার চুল্লিতে হাত ঢুকিয়ে দেয়—কিন্তু পোড়ে না। তার দেহে আগুনে কোনো দাগ পড়ে না।


আরও অদ্ভুত ছিল তার ছায়া। ছায়া পড়ত না সূর্যের আলোয়, কিন্তু পড়ত মোমবাতির আলোয়। এবং সে আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না কাঁপত, ফেটে যেতো কখনো কখনো।


চান চৌধুরী বেঁচে থাকতেই ছেলেকে জমিদারির শিক্ষা দেন, কিন্তু মন থেকে যেন দূরে সরিয়ে রাখেন। তিনি বুঝেছিলেন, এই সন্তান তার রক্ত নয়—এ এক শক্তির সন্তান। হেমার সাধনার ফল।


রঙ্গন বেড়ে ওঠে এক অদ্ভুত পরিবেশে—একদিকে তার পিতা ধার্মিক, দয়ালু জমিদার; অন্যদিকে তার মা, এক মগ্ন তান্ত্রিক নারী। সে পিতার কোরআন তিলাওয়াত আর মায়ের কালীমন্ত্র, উভয়ই শুনে ঘুমাতো। তার ভেতরে জন্ম নেয় এক দ্বৈততা—আলো ও অন্ধকার, বিশ্বাস ও ভয়, প্রেম ও প্রতিশোধ।


কিশোর বয়সে সে প্রথম বুঝতে পারে, সে অন্যদের থেকে আলাদা। সে যাকে ছুঁয়েছে, সে পুড়ে গেছে; যে তাকে ভালোবাসতে চেয়েছে, সে হারিয়ে গেছে। তার চারপাশে এক অদৃশ্য ঘূর্ণি—কেউ বোঝে না, কেউ বোঝাতে চায় না।


১৮১১ সালে চান চৌধুরী মারা যান। তার দাফন করা হয় না, বরং নিখোঁজ হয় তার মৃতদেহ। হেমা বলেছিল, “সে এখন আলো হয়ে গেছে।” কেউ খোঁজ করে না, সবাই চুপ করে যায়।


চান মহলের উত্তরাধিকার সে পায় আইনুদ্দিনের মৃত্যুর পরে। হেমা তখন তাকে বলেন, “তুই রক্তের উত্তরাধিকার, আর আমি তোর রক্ষাকবচ। মনে রাখিস, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় তান্ত্রিকতা হলো—মানুষের ভয়।”


১৮১১ সালের পর থেকে রঙ্গনের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ পেতে থাকে। তার নির্দেশে গ্রামে কয়েকজন কুমারী মেয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ জনে না,  তারা হারিয়ে গেছে,  চান মহলের গোপন কুঠুরিতে, যেখানে মন্দির গড়ে তুলেছিলো হেমা কুমারী।  সেখানেই রঙ্গন জমিদার  মায়ের নির্দেশে দেবির পায়ের কাছে বলি দিতো গ্রামের  কুমারী মেয়েদের কে। 

রঙ্গনের শক্তি, ক্ষমতা আর ঐশ্বর্য বাড়াতে এই বলি প্রথা শিখিয়েছিল তার মা হেমা কুমারী। 


আসলে কি কোন দেবি মন্দির না কি শয়তানের মন্দির তা কেউ জানতো না। জানার উপায়ও নেই।


এবং তারপর থেকে রঙ্গন হয়ে উঠে এক নিরঙ্কুশ, ভয়ংকর শাসক। তিনি শুধু জমিদার ছিলেন না, ছিলেন রক্তপিপাসু এক ছায়ার সন্তান। সে বলত, “আমার রাজ্যে আলো থাকবে না। ছায়াই যথেষ্ট।”



বলি ও ভয়


চান মহলের দক্ষিণ কোণার এক গোপন কক্ষে বসানো ছিল একটি কালো পাথরের আসন।

সেই আসনের নিচে লুকানো ছিল রক্তমাখা জমিন—যেখানে প্রতি পূর্ণিমায় একজন কুমারী মেয়ে নিয়ে আসা হতো।

কে আনে, কবে আনে—তা কেউ দেখত না। শুধু সকালে লঙ্গরখানার পাশে একটি দড়ির দাগ দেখা যেত।

আর গ্রামের একটি ঘর হঠাৎ করে হয়ে যেত শোকস্তব্ধ।


হেমা কুমারী তখন প্রায় অবসন্ন, কিন্তু এখনো তার চোখে ছিল তন্ত্রের অভিশপ্ত শক্তি।

সে বলত,

—তন্ত্র মানে দয়া নয়, তন্ত্র মানে উৎসর্গ।


রঙ্গন শুনে বলত,

—আমি কোনো কৃপা চাই না। আমি চাই মানুষ আমাকে দেখে কাঁপুক।


সে কাঁপিয়ে তুলেছিল।

একবার এক গরীব মুসলমান জেলে তার মেয়েকে লুকিয়ে রাখে।

সেই রাতে রঙ্গনের লোকজন পুরো পাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়।

সকালে সেই জেলে তার মেয়েকে বাঁচাতে পাথরে মাথা ঠুকে আত্মহত্যা করে।


আরও একবার, এক বামুন পরিবার নিজের মেয়েকে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়।

তাদের পুরো পরিবারকে এক কুয়োয় বন্দি করে দেওয়া হয়—দরজা বন্ধ করা, বাতি নিভিয়ে ফেলা, শুধু রোজ রাতে এক মাটির হাঁড়িতে চাল ফেলা হতো।

তিন দিন পর তাদের দরজা খুললে কেউ বেঁচে ছিল না, শুধু দেয়ালে লেখা ছিল এক লাইন—

“আলো দিয়েছিস, এখন নে অন্ধকার।”


মেয়েদের গায়ের গন্ধ ছিল বলির পাথরে। কেউ যখন সেই ঘর পরিষ্কার করতে যেত, সে রাতে আর ঘুমাতে পারত না।

কারণ, কান পাতলেই শোনা যেত—

“মা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম।”


রঙ্গনের শাসন ছিল নিয়মবিহীন—শুধু ভয়ের নিয়মে চলত।

নতুন বিয়ের মেয়েরা প্রথম তিন রাতে নিজের স্বামীর পাশে ঘুমাতে পারত না।

তাদের রাখা হতো ‘মধুর ঘরে’—যেখানে সুবেদার মজিদ আগে যাচাই করত।

তারপর যাকে ভালো লাগত, তাকে পাঠানো হতো চান মহলের ‘পূজাবেদি’তে।


গ্রামে এমন কুসংস্কার চালু করা হয়েছিল—

“যাকে জমিদার পছন্দ করে, সে অভিশপ্ত নয়, সে পবিত্র।”


এমনকি মহররম বা দুর্গাপূজার সময়েও রঙ্গনের শাসন থেমে থাকত না।

সে বলত,

—আমার রাজ্যে ঈশ্বরও উৎসব করে আমার অনুমতিতে।


খাজনা আদায় হতো লাঠি দিয়ে, কথায় নয়।

যারা দিতে পারত না, তাদের জমি কেড়ে নিয়ে, সেখানে কবর খোঁড়া হতো—‘ভবিষ্যতের প্রয়োজনে’ বলে।

কয়েকজনকে তো জীবন্ত কবর দেওয়া হয়, যাতে বাকিরা ‘সময়মতো দেয়।’


চান মহলের প্রতিটি দরজার গায়ে ছিল এক শব্দ খোদাই করা—"নীরবতা"।

কারণ, এখানে কথা বলার অনুমতি ছিল না।

শুধু হুকুম ছিল, আর সেই হুকুম পালন না করলেই,

ঘর হারাত, পরিবার হারাত, অথবা মুখ।


এক সময় গ্রামের লোকেরা হাসত না।

বাচ্চারা খেলত না।

পুরুষেরা চোখ তুলে তাকাত না, আর মেয়েরা কথা বলত না—কারণ তাদের গলায় ছিল সেই মন্ত্র—


“চুপ থাকলেই প্রাণ বাঁচে।”


মাঝে মাঝে চান মহলের ভিতর থেকে আসত কান্নার মতো শব্দ।

কেউ জানত না, সেটা কার।

হয়তো কোনো মেয়ে, হয়তো কোনো আত্মা,

হয়তো শুধু এক বন্দি আত্মচিৎকার, যেটা কেউ শুনলেও বলতে পারত না।


একবার এক বালক বলেছিল,

—আমি এক মেয়েকে দেখছি, ও কান্না করে না।

তার মা বলে, —চুপ কর, না হলে ও তোকে নিয়েও যাবে।


এভাবেই চান মহল হয়ে ওঠে শুধু একটি প্রাসাদ নয়,

এক দমবন্ধ স্মৃতির ঘর।

যেখানে প্রতিটি দেয়ালে লেখা ছিল—


“ভয়ই নিয়ম। দয়া শুধু দুর্বলদের জন্য।”



নীহারিকা :


জমিদার রঙ্গন চৌধুরীর জীবনে একমাত্র মানুষ যে তাকে স্থির করতে পেরেছিল, সে ছিল এক বাইজি। নাম—নিহারিকা। কিন্তু সে কেবল শরীর ছিল না, ছিল আলো, অন্ধকার, এবং মধ্যরাতের নিষিদ্ধ কান্না।


নিহারিকা আসত কলকাতা থেকে। কিশোরী বয়সে ধরা পড়েছিল ট্রেনে টিকিট ছাড়া ভ্রমণের সময়। এক পুলিশ অফিসার তাকে প্রটেকশনের নামে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় ঢাকার এক নাচঘরে।


সেখান থেকেই রঙ্গনের নজরে পড়ে সে। প্রথম দেখা চাঁনমহলের চিলেকোঠায়, এক বাঈজী সন্ধ্যায়। সে গাইছিল—আবহমান রাগ ভৈরবীতে—“রাত জাগা তারা আমি, তোর খোঁজে পুড়ি রে।” রঙ্গনের শরীরের রক্ত যেন কিছুক্ষণ থেমে গিয়েছিল। নিঃশব্দে সে তখন বলেছিল,


—এই মেয়েটাকে আজ থেকে কেউ ছুঁবে না।


নিহারিকার শরীর তখনও ক্লান্ত ছিল, কিন্তু চোখ ছিল জ্বলন্ত। সে জানত না এই ঘোষণার পেছনে প্রেম আছে, না শিকারির সিদ্ধান্ত। কিন্তু দিন না যেতেই সে বুঝে যায়—রঙ্গন চৌধুরীর স্পর্শ একাধারে ঈশ্বরের আশীর্বাদ, আবার অভিশাপ।


নীহারিকা প্রথম যে রাতে রঙ্গনের পাশে ঘুমিয়েছিল, কোনো শব্দ করেনি। রঙ্গন তাকিয়ে ছিল—সে বুঝতে পারছিল,  নীরবতা কাকে বলে।

সে বলেছিল,

—তুই চুপ থাকলে আমার ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।


নীহারিকা চোখ বন্ধ করেই বলেছিল,

—ভেতরটা হাহাকার করলে বুঝবেন, আমি মানুষের শরীর না। 


রঙ্গন প্রথমে এ কথায় হাসত। সে ভাবত, সব বাঈজীরাই এমন করে কথা বলে। কিন্তু কিছুদিন পর সে দেখতে পায়, এই মেয়েটার চোখে পানি জমে না—শুধু থেমে থাকে।

সে বলেছিল,

—তুই কাঁদিস না কেন?


নীহারিকা বলেছিল,

—কারণ আমার কান্না কেউ টের পায় না। যেদিন পাবেন, সেদিন আপনি আমাকে পাবেন না।


চাঁনমহলের তৃতীয় প্রান্তের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটায় তৈরি হয় একটি ঘর—নিহারিকার জন্য। সেখানে ছিল গুলাবজলের ফোয়ারা, কাশ্মীরি গালিচা, রাজস্থানী আয়না, আর মুর্শিদাবাদি পালঙ্ক। এই ঘরে কেউ ঢুকতে পারত না। শুধু রঙ্গন, আর রাতে রক্তের গন্ধে জেগে থাকা নিরব সানাই।


রঙ্গন চৌধুরী প্রতি রাতে নিহারিকার কাছে যেত। প্রথম প্রথম তা ছিল নিছক শরীরের লোভ। কিন্তু কিছুদিন পর একরাত সে এসে বলে,


—তুই আমার চোখে স্বপ্ন ঢুকায়ে দিস, আমি তোরে চাই না, আমি তোকে বুঝতে চাই।


নিহারিকা তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে বলেছিল,


—তুমি বুঝতে না চাইলেই তো ভালো। কারণ আমি মানুষ না, আমি পাঁজরের খাঁচায় গলায় ঝুলে থাকা কাঁটার মতো। চাইলেই রক্ত ঝরে।


সেই রক্তই ছিল তাদের প্রেম। তারা একে অপরের শরীরের গন্ধ চেনে, ঘামের স্বাদ চেনে, কান্নার শব্দ চেনে। কিন্তু ভালোবাসা? সে ছিল না।


ওরা একসঙ্গে খাবার খেত না। রঙ্গন খেত বিছানায় বসে, আর নিহারিকা চুপচাপ গান গাইত। মাঝে মাঝে সুর ছিঁড়ে গিয়ে থেমে যেত।

রঙ্গন সেই থেমে যাওয়া সুরকেই ভালোবেসে ফেলেছিল।


এক রাতে, নিশুতি নির্জনে, রঙ্গন বলেছিল—


—তোকে দেখে আমার ভিতরকার সব খালি জায়গাগুলো কান্নায় ভরে যায়।

আমি তোকে ছুঁয়ে কিছু পেতে চাই না। আমি চাই, তুই আমার ভেতরকার সেই শব্দহীন ঠাঁইগুলোয় থাকিস।


নীহারিকা কিছু বলে না। কেবল তার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠে, যেন জানে—এই ভালোবাসা রঙ্গনের পক্ষে টিকবে না।


সেই ভালোবাসার কষ্ট হয়তো সে আগেই বুঝে গিয়েছিল।



যেদিন নিহারিকা হারিয়ে গেল, কেউ জানত না সে কোথায় গেল। কেউ বলল পালিয়েছে, কেউ বলল আত্মহত্যা করেছে, আবার কেউ বলল—চান মহলের পেছনের মন্দির ঘরে সে নিজেই নিজেকে উৎসর্গ করেছে।


কিন্তু রঙ্গন কেবল একটি বাক্যে স্থবির হয়ে গেল—


“নীহারিকা নেই।”


সে চিৎকার করল না, কারো শাস্তি দিল না, কেবল বিছানায় বসে রইল। চোখে কোনো দৃষ্টি ছিল না, ঠোঁটে কোনো শব্দ ছিল না। প্রতিরাতে সে বিছানায় এসে দাঁড়াত—যেখানে একসময় নিহারিকা বসত, তার গায়ের গন্ধ ছিল। সে হাঁটত সেই পথে, যেখানে নিঃশব্দে ওরা একদিন পাশাপাশি হেঁটেছিল।


একদিন নায়েব আবু বকর তাকে জিজ্ঞেস করল—

—সাহেব, আপনি শরাব ছুঁইছেন না বহুদিন। কিছু বলবেন?


রঙ্গন বলেছিল,

—তুই কোনোদিন কুয়োর পানি খাইছিস?


আবু বকর ভেবে বলে, —হ, ছোটবেলায়।


রঙ্গন শান্ত গলায় বলল,

—একদিন যদি সেই কুয়ো ভরে উঠে, আর তুই চাও, পানি খাবি না—কারণ তুই জানবি, সেই কুয়োর পানি আজ অন্য কারো নামে। আমি এখন সেই কুয়োর দিকে তাকায় থাকি, শুধু তৃষ্ণা নিয়ে।


সেই দিন থেকেই রঙ্গনের চোখে ঘুম নামেনি। সে গভীর রাতে নিজের সাথেই কথা বলত।


—নীহারিকা, তুই তো বলতি আমি তোকে বুঝব না।

আমার দোষ কী ছিল, তুই কেন ফাঁকা করে গেলি?


আধো জেগে, আধো ঘুমে, সে কখনো চিলেকোঠায় উঠে যেত—যেখানে একদিন ওরা গান শুনত, কখনো সেই ঘরে গিয়ে দাঁড়াত যেখানে নিহারিকার গায়ের চাদর এখনো পড়ে আছে।


একবার সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে বলেছিল—


—আমি কি মানুষ? না কি তোর খেলার পুতুল?


এরপর থেকে রঙ্গনের হুকুমে আর কোনো বাঈজী চান মহলে ঢুকতে পারে না। কেউ গান গাইলে সে ঘর ভাঙার নির্দেশ দেয়।

সে চুপচাপ থাকে, কিন্তু কেউ জানে না, প্রতি রাতে সে একটি চিঠি লেখে—“নীহারিকা, আমি এখনো তোর গন্ধ খুঁজি।”


চিঠিগুলো জমে ওঠে এক লোহার সিন্দুকে—যার চাবি রঙ্গনের গলায় লটকে থাকত।


কেউ জানে না, সেই চিঠিগুলোর শেষে কোনো নাম ছিল কি না।


১০


রঙ্গনের মানসিক অবনতি


১৮২০ সাল।

রঙ্গনের বয়স তখন চল্লিশ।

চান মহল তখন তার ক্ষমতার চূড়ায়।

কিন্তু ঠিক এই সময়েই রঙ্গনের ভিতরে শুরু হয় এক অদৃশ্য ভাঙন—যেটা চোখে দেখা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।


সে হঠাৎ করে কথা বলা কমিয়ে দেয়।

বেশিরভাগ সময় থাকে একা—মাঝরাতে চিলেকোঠায় হাঁটে, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

—তুই কে? আমি তোর নাম জানি না।


কেউ না বুঝলেও, রঙ্গন বুঝতে শুরু করে—তার ভিতরে কেউ বাসা বেঁধেছে।

সে নিজের ছায়াকে সন্দেহ করে না, বরং নিজের চিন্তাকে ভয় পায়।


রোজ রাতে সে জেগে ওঠে কাঁপতে কাঁপতে।

সিদ্ধ ভৈরবী  নদীর পাশে গিয়ে বসে থাকে, বলে—


—এই জায়গাটায় আমি কিছু করেছি কি?

আমি কাউকে এখানে পুঁতে ফেলেছি?


নিজের নায়েবদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলে—


—তোমরা কে? আমি কেন চিনি না তোদের মুখ?


একদিন, মজিদকে ডেকে বলে,


—তুই একেকদিন একেক রকম লাগিস। তোর গায়ের গন্ধ বদলে যায় কেন?


মজিদ ভয় পেয়ে বলে,

—সাহেব, আপনি ঠিক আছেন?


রঙ্গন তখন হেসে ওঠে,

—আমার ভেতরে কেউ আছে, মজিদ।

তুই কখনো নিজের ভেতর কাউকে দেখে ফেলেছিস?


সেই রাতেই সে নিজেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে খাটে।

চিঠি লিখে রাখে দরজার পাশে—

“যদি আমি মানুষ না থাকি, তবে আমাকে মানুষ হিসেবে দাফন কোরো না।”


পরদিন সেই চিঠি কেউ পড়ে না।

কারণ চান মহলে আর কেউ সাহস করে ভোরবেলা রঙ্গনের ঘরে ঢোকে না।


এক রাতে সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে থেমে যায়।

আয়নার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অন্য কেউ—একদম তার মতো দেখতে, কিন্তু চোখে রক্তবর্ণ লালিমা।


সে বলেছিল,

—তুই কে?


অন্য রঙ্গন বলেছিল,

—আমি তোর মধ্যেই ছিলাম। এখন আমি বাইরে এসেছি।


রঙ্গন হাঁটু গেড়ে পড়ে, গলার স্বর ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে,


 আমার ভিতরে এই শয়তান জন্ম নিলো কিভাবে?


কেউ উত্তর দেয় না।

শুধু দেয়ালের আড়াল থেকে শোনা যায় এক নারীর হাসি।

সেই হাসি কার, কেউ জানে না।

হয়তো হেমার, হয়তো নিহারিকার, হয়তো কোনো সেই বলি দেওয়া মেয়েটার—যার নাম রঙ্গন কোনোদিন জানেনি।


রঙ্গনের কানে সারাদিন শোনা যায় এক বাক্য—


“তুমি যা করেছো, তার মূল্য চুকোতে হবে।”


সে নিজের খোলা ছাদে গিয়ে বসে থাকে দুপুরে, মাথা উঁচু করে সূর্যের দিকে তাকায়।

চোখ লাল হয়ে আসে, কিন্তু সে চোখ সরায় না।

সে বলে—


—তুই দেখ, আমি এখনও ভাঙিনি।


কিন্তু সূর্য কোনো উত্তর দেয় না।


১১


রক্তের পিপাসার অবসান নয়, রূপান্তর


পরের মাসে পাঁচটি কুমারী মেয়ে ফের নিখোঁজ হয়।

রঙ্গন তাদের চায় না।

সে বলে—


—এবার কাউকে বলি দিও না। আমি যদি কিছু চাই, সেটা ওদের ক্ষমা।


হেমা তেলে মাখা হাত উঁচিয়ে বলে—


—ক্ষমা শক্তি নয়। ক্ষমা দুর্বলতা।


রঙ্গন তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে—


—তাহলে আমি দুর্বল হতে চাই।


তবে হেমা থেমে যায় না।

বলিপ্রথা চলতে থাকে, রক্ত ঝরে, চিলেকোঠায় আবার কান্না ভেসে আসে।


রঙ্গন তখন নিজ ঘরে বসে শুধু মাথা নেড়ে বলে—


"জীবন বলতে কিছুই নেই সবই মিথা, সবই মায়া সব"

" এই মায়া,  এই মিথ্যা জীবন নিয়ে কত অংহকার, কত  ঘৃনা, কত প্রতিশোধের খেলা"


—আমার বিরুদ্ধে কেউ নেই। আমি নিজেই আমার শত্রু।


সে চায়, কেউ এসে তাকে থামাক।

কেউ এসে তার সমস্ত সাম্রাজ্য ভেঙে দিক।


কিন্তু কেউ আসে না।

কারণ সবাই ভাবত, রঙ্গন আর রঙ্গন নেই—সে এখন শুধু একটি শাসকের দেহে বন্দি এক দুর্ভাগ্য।


আর রঙ্গন একা বসে থাকে, নিজের হাতে লেখা শত শত চিঠি নিয়ে—

সবগুলো চিঠির উপরে লেখা—

“নীহারিকা, আমি ভুল ছিলাম।”


১১


ইরাবতী: 


ইরাবতী ছিল এক চিকিৎসকের কন্যা। একদিন তার পিতা চান মহলে আসেন জমিদার রঙ্গনের চিকিৎসা করতে। তখন রঙ্গন একটানা কয়েক রাত ঘুমাননি, চোখের নিচে কালি, শরীর কাঁপছিল অজানা ভয়ের ছায়ায়—not from ghosts, but from his own deeds.


তখনই দেখা ইরাবতীর সাথে।

সে বাবার ওষুধপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল—চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস, অথচ মুখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।


রঙ্গন তাকিয়ে বলে,

—তুমিও কি ডাক্তার?


ইরাবতী কপালে হাত দিয়ে নম্র স্বরে বলেছিল,

—না, আমি ওষুধ দিই না, আমি শুধু দেখতে এসেছি আপনি মানুষ আছেন কি না।


এই একটা বাক্যে যেন ভিতরটা ধসে পড়ে রঙ্গনের।

সে হেসে ওঠে বহুদিন পর।

বলে,

—তুমি ভাবো আমি মানুষ না?


ইরাবতী বলে,

—আপনি যেভাবে তাকান, মনে হয় আপনি কিছু হারিয়েছেন।

আর মানুষ কিছু হারালে, সে মানুষই থাকে, রাক্ষস নয়।


এই মেয়েটা কাঁদে না, ভয় পায় না, আর রঙ্গনের চোখের দিকে চোখ রাখে।


প্রেম:


রঙ্গন দিনে দিনে বদলে যেতে শুরু করে।

সে আর কাউকে শাস্তি দেয় না, আর বলিপ্রথার উপর প্রশ্ন তোলে।

আবু বকর একদিন বলে,

—সাহেব, আপনি যেন এখন অন্য মানুষ।


রঙ্গন বলে,

—আমার ভিতরে কেউ একজন আলো এনেছে।


এক দুপুরে, চিলেকোঠার পাথরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রঙ্গন ইরাবতীকে বলে—

—তুমি জানো, আমি তোমাকে বিয়ের করতে চাই, কিন্তু তোমার মত একটা মেয়ে কেন আমাকে গ্রহণ করবে?


ইরাবতী একটু হাসে, মুখ ঘুরিয়ে বলে,

—আপনি আগুনের মতো ভয়ঙ্কর ছিলেন। এখন আপনি পাথরের মতো নীরব। আমি বুঝি না আপনি আমাকে চাইছেন কেন।


রঙ্গন বলে,

—তুমি কি আমায় ভালোবাসো না?


ইরাবতী চোখ নামিয়ে বলে,

—ভালোবাসি। কিন্তু ভয় পাই। এই ভালোবাসা কবে আপনাকে বদলে ফেলবে, কবে আপনি আবার বদলে যাবেন—আমি জানি না।


রঙ্গন তার হাত ধরে, একদম নীচু গলায় বলে,

—তুই শুধু আমার পাশে থেকো, আমি যদি দানবও হই, তোমার সামনে মানুষ হয়ে দাঁড়াব।


সেই বছর, কোনো উৎসব না করে, গোপনে বিয়ে হয়।

ইসলামী রীতি মেনে, ইরাবতী হয় রঙ্গনের স্ত্রী।


সে এক নতুন জীবন।

রঙ্গন রাতে বই পড়ে, ইরাবতীর হাতের রান্না খায়, প্রথমবার চা খেতে শেখে।


একদিন বলে,

—তোমাকে পেয়ে  মনে হয়, আমি মানুষ ছিলাম না, এখন হয়েছি।


ইরাবতী বলে,

—মানুষ হতেই তো আপনার জন্ম হয়েছিল। আপনি শুধু ভুলে গিয়েছিলেন।


রঙ্গন বলে,

-- "আমরা সবাই ভুলে যাই। মানুষ হতে পারি না।

একমাত্র নারী পারে,  মানুষকে মানুষ হতে শেখাতে। হোক সে নারী মাতা, স্ত্রী অথবা কন্যা।

  আমার পিতা মহান  হয়েছিলো তার মায়ের কারনে আবার  ভুল করেছিলো তার স্ত্রী মানে আমার মায়ের প্রেমে অথবা ছলনায়।"

-- "ছি: মা কে নিয়ে এমন মন্তব্য করতে হয় না। আপনি কখনো আর তাকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন না।"

" আচ্ছা বলবো না"


১২


সন্তান ও ঢাকায় স্থানান্তর :


১৮২২ সালের এক বসন্ত সকালে, ইরাবতীর কোলে আসে এক পুত্র সন্তান।

রঙ্গন ছেলেকে কোলে নিয়ে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর বলে,


—তুই আমার না। তুই আলোর উত্তরাধিকার।


ইরাবতী পাশে বসে বলে,

—তবে আপনি ছায়ার উত্তরাধিকার?


রঙ্গন নিঃশ্বাস ফেলে বলে,

—ছায়াও তো আলো থেকে জন্ম নেয়।


কিন্তু কিছুদিন পরই ইরাবতী লক্ষ করে, শিশুটির আচরণ অস্বাভাবিক।


সে একদম চুপচাপ, কারো চোখে চোখ রাখে না, আয়নার সামনে দাঁড়ালে কাঁদে, আর মাঝে মাঝে ঘুমের ভেতর ফিসফিস করে বলে—


"দাদিমা ডাকছে"


হেমা কুমারী  প্রায়ই রঙ্গনের সন্তানকে  নিয়ে,  তার অন্ধকার কুঠুরিতে যেতে চায়। কিন্তু রঙ্গনের নিষেধাজ্ঞার কারনে পারে না।


  একদিন  হওয়ার রঙ্গনের ছোট্ট শিশুটি হাঁটতে হাঁটতে ওর দাদি হেমার পূজোর ঘরে চলে যায়

সেদিন ছিলো পূর্নিমার রাত। সেখানে ছেলেটি দেখতে পায়,  

-- ওর দাদি হেমা কুমারী ধ্যানে মগ্ন, তার সামনে একটা মূর্তি, বেদিতে একটা মাথা ছিন্ন দেহ। এই দেখে বাচ্চা এক চিৎকারে অজ্ঞান হয়ে যায়। 


ওর দাদি ধ্যান ভেঙে দৌড়ে ওকে কোলে তুলে ইরাবতীর কাছে নিয়ে আসে। ওর দাদির চোখে অশ্রু।

রঙ্গন খবর শুনে ইরার বাবাকে আনতে লোক পাঠায়। 


 মা কে কিছুই বলে না। কারন ওর মা হেমার এমনিতে নাতির শোকে কাঁদতে কাঁদতে  একাকার। 

ইরাবতীও কাঁদছে,  যদিও জানে না কি হয়েছে?

কিন্তু রঙ্গন জানে আজ পূর্নিমার রাতে কি হতে পারে। 


ইরার বাবা এসে  চিকিৎসা করে বলে,  "ঠিক হয়ে যাবে,  হয়তো অন্ধকারে ভয় পেয়েছে।"


কয়েক ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরে আসে।  জ্ঞান ফিরে শিশুটি তোতলানো গলায় রক্ত,  মাথা, দাদিমা বলতে থাকে। 

আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না কারো।


ইরাবতী একদিন কাঁদতে কাঁদতে রঙ্গনকে জড়িয়ে ধরে বলে,

—আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই সন্তান আপনার অভিশাপ পাবে না। কিন্তু আমি সেই ছায়া দেখতে পাচ্ছি।


রঙ্গন স্থির গলায় বলে,

—তোমার পেট থেকে এসেছে, তুমি রক্ষা করবে। আমার চাইতে শক্ত তুমি।


এরপরই রঙ্গন একটি সিদ্ধান্ত নেয়।


ঢাকার লালবাগে সে একটি বিশাল প্রাসাদ  নির্মাণ করে দেয়।

বলে,

—এটা হবে তোমার ঘর, ইরাবতী।

তুমি থাকবে এখানে, আমার সন্তানকে নিয়ে। আমি আর চাই না, কেউ তাকে জানুক ‘রঙ্গনের ছেলে’ হিসেবে।


ইরাবতী চোখে জল নিয়ে বলে,

—আপনি কি আমাদের ত্যাগ করছেন?


রঙ্গন কাঁপা গলায় বলে,

— "ত্যাগ করছি না,  কিন্তু আমি চাই না, আমার অতীত তোমাদের গায়ে লাগুক।

আমার জীবনটা অভিশপ্ত,  এই অভিশাপ থেকে আমার সন্তান কে দুরে রাখতে চাই।

আমার হাতে অনেক নিরীহ মানুষের রক্ত লেগে আছে। "


"তাই বলে কি আপনি দূরে চলে যাবেন"


" কে বলেছে দুরে চলে যাবো, আমি প্রায়ই আসবো,  কিন্তু আমার ছায়ায় আমার সন্তান থাকলে মানুষ হবে না, তোমার আলোয় ওকে আলোকিত করো"


 কিন্তু রক্তের দাগ  কি এত সহজে শুকায়? রক্তের ঋণ রক্ত দিয়ে শোধ করতে হয়।


রঙ্গন জমিদার ৭


: অর্পন রহমান 


 রক্তের ঋণ :



পুরান ঢাকার গলির ধুলো আর জর্দার গন্ধ এখনও রক্তে লেগে ছিল রঙ্গনের। তার দেহটা ঝাঁঝালো, ছিন্নভিন্ন হয়ে যখন প্রাইভেট ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো, তখন তার চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি নেই। পাঁজরের কাছে ছুরির আঘাত, মাথায় চেঁচে-যাওয়া রডের দাগ, আর ডান হাতের শিরা বেয়ে বয়ে চলেছে হালকা, অবিরাম রক্তপাত।


তাকে যে নারীটি এনেছে, সেই কালো চাদর পরা অচেনা মেয়েটি নিজের পরিচয় দেয়নি। সে শুধু রিসেপশনে গম্ভীর গলায় বলেছিল—


—“রোগীর নাম আরিয়ান আজিম চৌধুরী রঙ্গন। আজিম পরিবার এখানেই চিকিৎসা করায়।”


তারপর একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

চোখের পাতা একবারও না ফেলে, নিঃশব্দে।


ডাক্তারেরা ছুটে আসে। এই ক্লিনিকে আজিম পরিবারের সুনির্দিষ্ট কেবিন আছে।

মাঝে মাঝে আলি আজিমের হার্ট চেকআপ, ইপসিতার রুটিন স্ক্যান, সব এখানেই হয়।

কিন্তু আজ কোনো নিয়ম নেই, কোনো প্রটোকল নেই—

শুধু জরুরি অপারেশন।


নাম শুনেই শোরগোল পড়ে যায় ভিতরে।

“আরিয়ান আজিম… মানে আলি সাহেবের ছেলে?”


নার্স, ওয়ার্ডবয়, ফ্লোর ম্যানেজার—সবাই চমকে ওঠে।

আর যারা চেনে না, তাদের মনে পড়ে যায় বছরখানেক আগে এই ছেলেটার মুখ নিয়ে একটা বিতর্ক হয়েছিল টেলিভিশনে—

‘বস্তিতে থাকা এক প্রাক্তন মন্ত্রীর নাতী’, ‘আধ্যাত্মিক প্রতারক, নতুন রাজনৈতিক ’, ‘নব্য জমিদারপন্থী ভাবুক’—যার নানা পরিচয়।


ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ করেন।

মাথার পেছনে চুল কামানো হয়।

ছুরির আঘাতটা পাঁজরের কাছ ঘেঁষে থাকলেও, ফুসফুস অবধি পৌঁছায়নি।

রক্তক্ষরণ থামছে না।

বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে।


আর ঠিক সেই সময়, দুইটা কালো গাড়ি একসাথে ঢোকে ক্লিনিকের গেট দিয়ে।


একটা থেকে নেমে আসেন ইপসিতা আরা।

সাদা শাড়ি, তাতে নীল বর্ডার, চোখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।

পেছনে দাঁড়িয়ে একজন সিকিউরিটি—পুরো রাস্তা সে গাড়ির সামনে ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে।


আরেকটা গাড়ি থেকে নামেন আলি আজিম চৌধুরী কামরান।

তার মুখে সেই বিখ্যাত ধীর স্থিরতা নেই।

চোখে প্রবল রাগ, আর ঠোঁটের কোণায় চাপা কষ্ট।


তারা দুজনেই কিছু না বলে, দ্রুত রিসেপশনে যান।

—“আমার ছেলে কোথায়?”

—“কার কীসের সাহস হয় তাকে হাসপাতালে এনে ফেলে?”


স্টাফরা ভীত কণ্ঠে জানায়—

—“উনি এখন অপারেশন থিয়েটারে, স্যার।”


ইপসিতা আরা হঠাৎ সিঁড়ির রেলিং ধরে বসে পড়েন।


তার চোখে জল নেই।

তিনি কাঁদেন না।

কিন্তু ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে।


—“সে আমাকে কোনোদিন কিছু জানায় না। আমি কী করে মা হলাম?”


আলি আজিম কিছু বলে না।

তার চোখের সামনে যেন বাবার মুখ ভেসে ওঠে—

আবদুল গফুর আজিম চৌধুরী—শেষ বয়সে যার মুখেও একইরকম আঘাত লেগেছিল।

সেই একই রক্ত, সেই একই পথ।


তিনি ফিসফিস করে বলেন—

—“এই পরিবারে পুরুষরা কি কেউই সুস্থ থাকে না?”


রিসেপশন ডেস্কে তখনো সেই রহস্যময় নারী দাঁড়িয়ে।


নিরব, শীতল চোখে তাকিয়ে দেখছে ঘটনাপ্রবাহ।


তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—

—“আপনি কে? আপনি রঙ্গনের সঙ্গে কীভাবে জড়িত?”


মেয়েটি একটু হাসে। না ঠোঁট খুলে, না চোখ সরিয়ে।

তার গলার স্বর তীব্র নয়, কিন্তু কেমন যেন রক্তচাপ কমিয়ে দেয় এমন এক নিঃশব্দতা:


—“আমি তার ছায়া। আমার নাম বললে আপনারা বুঝবেন না। আমাকে মনে রাখার দরকার নেই।”


এরপর সে ক্লিনিকের দরজা দিয়ে ধীরে বেরিয়ে যায়।


ইপসিতা আরা মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তার বুক কেঁপে ওঠে।

কেন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা পুরনো ছবি—

চানমহলের সেই নারীমুখ, যাকে একদিন নিষিদ্ধ বলেছিল আজিম পরিবার।


ডাক্তার এসে বলে—

—“ম্যাডাম, স্যার… আমরা চেষ্টা করছি। এখন জ্ঞান ফেরার জন্য কয়েকটা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু উনি ভীষণ জখম হয়েছেন।”


আলি আজিম কামরান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন।

তার চোখে কিছু পুরনো প্রেতের ছায়া।


আর দূরে, হাসপাতালের করিডোরে, এক পুরনো নার্স ধীর গলায় বলছে আরেক নার্সকে—


—“এই ছেলেটার চোখের মধ্যে আমি সেই মন্ত্রীর পাগলামি দেখি।”

—“সে তো বলত, ঈশ্বর তার রক্তে কথা বলেন, না?”

—“হুম... এখন বোধহয় সেই কথাগুলো আবার রক্তে ফিরেছে।”


রক্ত চলছে।

চাপ বাড়ছে।

আর ভেতরে অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা রঙ্গন নিজের রক্তের ভিতর শুনতে পায়—


একটা নারীকণ্ঠ…


—“তুমি মরতে পারো না, রঙ্গন। কারণ আমার গল্প এখনো শেষ হয়নি।”



তিনদিন পর।


রঙ্গনের জ্ঞান ফেরে হাসপাতালের বেসরকারি আইসোলেশন ইউনিটে। চোখ খুলে প্রথম যেটা সে দেখে, সেটা আলো নয়, ছাদে ছায়া। তারপর আসে শব্দ—কারও কণ্ঠস্বর নয়, অচেনা একটা ঘড়ির টিক টিক। নাকে জ্বালা দেয় স্যালাইনের গন্ধ। ধীরে ধীরে মাথা ঘোরে—তার বুক বাঁধা, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, পাঁজর ব্যথায় টনটন করছে।


দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইপসিত আরা। মা।


চোখে শীতল উদ্বেগ, ঠোঁটে দুঃখকে পিষে রাখা এক নিষ্ঠুর প্রশ্রয়।


—"কেমন লাগছে তোমার?"


রঙ্গন কথা বলতে পারে না, ঠোঁট নড়ে, কিন্তু গলা চেপে আছে ব্যথা।


ইপসিত আরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, —"তুমি আবার উঠে দাঁড়াবে। তুমি তো রঙ্গন চৌধুরীর উত্তরাধিকার।"


এই নামটাতেই যেন তার চোখ আরও লাল হয়ে ওঠে। সে চোখ বন্ধ করে, যেন ভেতরে কিছু বলে ওঠে:


"রক্তের উত্তরাধিকার... ছায়া কোথায় রাখবো মা?"



তিনদিন আগেই আলি আজিম ছুটে গেছেন মিন্টো রোডে, তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ সাহেবের কাছে।


চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে মন্ত্রী কাঁধ ঝাঁকায়, —"রাজনীতি করবে, করুক। কিন্তু আমার দলে আসলে সুবিধা পেতো। বিরোধী দলে গিয়ে ও তো নিজের গর্ত নিজেই খুঁড়লো।"


আলি আজিম ঠান্ডা গলায় বলে, —"তুই রঙ্গনকে চেনিস না এমন ভান করিস না। ও কারো কথা শোনে না। কালকে বিজ্ঞানী হবার ঝোঁক, পরশু ব্যান্ড মিউজিক, আজ রাজনীতি। এই ছেলেটা একেক সময় একেক রাস্তায় হাঁটে। আমি ভাবছি, কিছুদিন পর আবার ফিরে আসবে আগের মত। কিন্তু এবার ওর রক্ত ঝরেছে। এবার আমি চুপ থাকতে পারি না।"


মন্ত্রী কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে, —"তোর ছেলের নাম এখন দেশের অর্ধেক ক্যাম্পাসে লেখা। বাকি অর্ধেক তাকে নিয়ে মিম বানাচ্ছে। এইখানে নায়ক হয়েও মরতে হয়, জানিস না?"


আলি আজিম চোখ তুলে বলে, —"আমি চাই না রঙ্গন নায়ক হোক। আমি চাই যারা ওর রক্ত জড়িয়েছে, তাদেরও রক্ত ঝরুক।"


মন্ত্রী ঘাড় কাত করে মোবাইল তোলে। পরপর দুইটা কল—ডিএমপি কমিশনার ও গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালককে।


—"তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট চাই। যারা এটা করিয়েছে, তাদের নাম। কাউকে বাদ দিও না। প্রয়োজনে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করো।"


তোলপাড় হয়ে যায় গোটা রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে।


ডিবির স্পেশাল টিম রাতারাতি অভিযান চালায় পুরান ঢাকার এক কনভেনশন সেন্টারে—সেখানেই হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন বৈঠক।


মিডিয়া মালিক আটক।

একজন সিনিয়র ব্যারিস্টার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়।

তানভীর ও সাব্বির—নিরুদ্দেশ।


সেই রাতেই, একটা খুনসুটে খবর ফাঁস হয়—সাব্বিরের ফোন ট্র্যাকিং করে দেখা যায়, সে শেষবার অবস্থান করছিল উত্তরার এক বিদেশি কনস্যুলেটের কাছাকাছি। গুজব ছড়ায়—সাব্বির পালিয়ে যাচ্ছে।


আর তানভীর?


ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, “ও নিখোঁজ না। আত্মগোপন করেছে।”



ফিরে আসি রঙ্গনের কাছে।


তার চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক বলেন, “এই রোগী কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে আহত।”


তিন মাসের মতো বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়।


কিন্তু রঙ্গন বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। সে বলে না কিছুই।


শুধু একটা ডায়েরি খুলে লেখে—


“আমার কণ্ঠ না থাকলেও আমার ছায়া হাঁটবে।

আমার শরীর না থাকলেও আমার রক্ত চিনে নেবে কাকে পোড়াতে হয়।

আমি কোনোদিন নেতা হতে আসিনি।

আমি এসেছি দেখতে—কে আগুনে দাঁড়াতে পারে, আর কে ছায়া নিয়ে পালিয়ে যায়।”


সেদিন সন্ধ্যায়, চ্যানেল ৭১-এ একজন নিউজ প্রেজেন্টার বলে—


—"রাজনীতির নাট্য মঞ্চে এক নতুন দৃশ্য—প্রতিপক্ষরা গায়েব, চেনা মুখরা ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। সামনে এসেছে নতুন এক বাস্তবতা—রঙ্গন চৌধুরী। এখন প্রশ্ন একটাই, সে কী রাজনীতির আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে দেবে? নাকি সেই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করবে?"


সেই সময় রঙ্গনের বাবার ফোন বেজে ওঠে।


—"সাব্বির ধরা পড়েছে। সে ডায়েরি আছে আমাদের হাতে। গোপনে রেকর্ড করেছিল সব মিটিং। হক ভাই পালিয়েছে। মিডিয়া মালিক বিচারে যাবে।"


আলি আজিম চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলেন—


—"আমি রঙ্গনের পিতা। কিন্তু আজ আমি শুধু একজন রক্তাক্ত বাবার প্রতিশোধ দেখছি।"



তানভীর


নিখোঁজ।

তিন সপ্তাহ ধরে কোনো খোঁজ নেই।


তাকে নিয়ে কেউ কিছু বলে না, কেউ খোঁজও নেয় না। মিডিয়া প্রথমে হাইপ তোলে—“বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু কোথায় গেলেন?”

তারপর ধীরে ধীরে অন্য খবরে মাটি চাপা পড়ে।


কিন্তু সেগুনবাগিচার একটি পুরনো ফটোকপি দোকানের ছাদে রাতের বেলায় মাঝেমাঝে আলো জ্বলে।


সেই ঘরে বসে থাকে তানভীর। চুল-দাড়ি বাড়ানো, চোখে ঘুমহীনতা। সামনে এক ল্যাপটপ। তাতে টাইপ করা হচ্ছে একটি বই—

“আমি রঙ্গনের ছায়া ছিলাম”


কেউ জানে না, এই বইয়ের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে রঙ্গনের জীবন, বিশ্বাস, খোলা পিঠের ছুরি, আর এক বন্ধুর আত্মবিচার।


শেষ অধ্যায়ের নাম:

“আমার চেয়ে বেশি ওকে কেউ ভালোবাসেনি। আমি ছাড়া কেউ এত ভয়ও পায়নি।”


সাব্বির আলম


জামিন পেয়েছে।


কিন্তু পুরনো পাড়ায় আর ফেরে না।

শুনা যায়, সে এখন উত্তরা-সেক্টর ১৭ তে একটা অফিস খুলেছে—“Alam Strategy & Media” নামে।


পলিটেকনিক ছাত্রলীগের নতুন প্রজন্মকে "স্মার্ট রাজনীতি শেখানো" তার কাজ।


কিন্তু একদিন মধ্যরাতে সে তার নিজের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। কারণ একটা দেয়ালে কেউ বড় করে লিখে দিয়েছিল—


“তুই যে আগুনে পোড়াসি, সেটা রঙ্গনের চুলার ধোঁয়া ছিল।”


সাব্বির চুপ করে সেদিন।


আর কখনো নিজের নামের পাশে “রঙ্গনের ভাই” শব্দটা যোগ করে না।


মিডিয়া মালিক - সালমান রুহেল


মামলা চলেছে, জামিনও হয়েছে।


কিন্তু তার চ্যানেল ‘সত্যবার্তা ২৪’ এখন আর কেউ দেখে না। বিজ্ঞাপন নেই। টিআরপি শূন্য।


একদিন চুপচাপ নিজের স্টুডিওতে বসে সে পুরনো ফুটেজ দেখে—রঙ্গনের সেই লাল ফতুয়া পরা ভাষণ, যেখানে সে বলেছিল—


“আপনারা আমাকে ভয় পাবেন না। আমি আগুন না। আমি ছায়া।”


সালমান মুখ নিচু করে ফিসফিস করে বলে—


—"ভুল করেছিলাম। ও আগুন না, ছায়া হয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল।"


মোজাম্মেল হক ভাই


পালিয়ে যায়।

অভিযোগপত্র জমা পড়ে “রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র” শিরোনামে।


তার দেখা শেষ রাজনীতি ছিল এক ছেলের চোখে আগুন।

সে চোখ দেখে সে ভয় পেয়েছিল। এখন বিদেশে, মধ্যপ্রাচ্যের এক ছোট শহরে, পেনশনের টাকায় বাঁচে।


মাঝে মাঝে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে—


—"আমি রাজনীতি শিখাইছিলাম, কিন্তু ছেলেটা আগুন শিখে ফেলছিলো।"



ইপসিত আরা - রঙ্গনের মা


তিনি একদিন তার আলমারির ভেতর থেকে বের করেন এক পুরনো চিঠি।


লিখে দিয়েছিলেন ছেলেকে, যখন সে প্রথম ব্যান্ড করছিলো:


> “তুমি যা করো, করো পুরোটা হৃদয়ে।

কিন্তু মনে রেখো—সব থেকে ভয়ানক যন্ত্রটা হচ্ছে হৃদয়। ওটা যখন ভেঙে পড়ে, তখন শব্দ হয় না, বিস্ফোরণ হয়।”


তিনি এখনো সামরিক স্টাইলে বাড়ি চালান। কিন্তু একা দাঁড়িয়ে জানালার কাছে বলেন—


—“আমার ছেলে কখনো রাজনীতি করেনি, সে ছায়ার নাচ শিখেছিল। শুধু ভুলটা হলো—সে বিশ্বাস করেছিল মানুষ আগুন ভালোবাসে।”


আলি আজিম চৌধুরী - রঙ্গনের পিতা


কোনোদিন প্রকাশ্যে আসেন না।


কিন্তু কূটনীতিক মহলে গুঞ্জন আছে—রঙ্গনকে আঘাত করা মাত্রই তিনটি বড় চ্যানেলের মালিকানা শিফট হয়েছে। দুটো ব্যারিস্টারকে আইনজীবী ক্লাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এক ডিআইজি পদোন্নতি পাননি।


আলি আজিম বলে না কিছু।


শুধু এক পুরনো ডায়েরির শেষ পাতায় লিখে রাখেন—


 “আমার ছেলেটা রাজনীতি বোঝে না,

কিন্তু আমি বুঝি আগুন কতটা মূল্যবান হয়

যখন তা ছেলের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজ্যে।”



চাঁন মসজিদের পেছনে একটি ডোবা।

ডোবার পাড়ে ভোরবেলা হাঁটতে বের হওয়া এক বৃদ্ধার চোখ পড়ে একটি মৃতদেহে।


মাথায় গুলি নয়, গলায় দাগ নেই।

তবু সে নিথর, নিঃসাড়। মুখের একপাশে গলে যাওয়া শিরার মতো কিছুর ছাপ।

চোখদুটি খোলা, কিন্তু মণিগুলো নেই—শুধু ফাঁকা, গহ্বরের মতো অন্ধকার।


পরে জানা যায়—সেটা ছিল মোজাম্মেল হকের লাশ।

কাগজপত্রে লেখা: “হার্ট অ্যাটাক।”

কিন্তু পুলিশের ছবি ফাঁস হলে দেখা যায়, মাটিতে তার আঙুলের আঁচড়—শেষ মুহূর্তে যেন সে কাউকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল।


এর দুইদিন পর রমনা পার্কের কাছে পাওয়া যায় সাব্বির আলমের লাশ।

গলা অক্ষত, ত্বকে কোনো ক্ষত নেই।

তবু তার শরীর থেকে গন্ধ আসছিল পোড়া চামড়ার।


সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সে পার্কে ঢুকেছিল একাই।

কিন্তু বের হয়নি।


ক্যামেরার শেষ দৃশ্যে, তার পেছনে ঝোপের আড়াল থেকে দেখা যায় এক আবছা ছায়া। মাথায় কালো হুড, হাতে ছাতা।

ছায়াটা একঝলক বাতাসে কাঁপে, কিন্তু মানুষের মতো হাঁটে না।


তানভীরের লাশ পাওয়া যায় সব শেষে।


কোনো সংবাদমাধ্যমে খবর আসেনি।

শুধু কয়েকজন ডিবি অফিসার মুখচুপ করে হঠাৎ বদলি হয়ে যান এক দূরবর্তী জেলায়।


তানভীরের শরীর ছিলো ঠান্ডা, কিন্তু শুষ্ক।

তাকে পাওয়া যায় এক পরিত্যক্ত প্রেসের ভেতরে। দেয়ালে লেখা:


  "আমি যা লিখেছিলাম, তা ছিলো সত্য।

কিন্তু সত্য যে ছায়া হয়ে দাঁড়ায়, সেটা বুঝতে পারিনি।"


ডায়েরির শেষ পাতায় রক্ত দিয়ে আঁকা একটা বাক্য:


  “সে আমাদের সবাইকে আগুনে পোড়ায়নি, ছায়ায় রেখেছিলো। আমরা ঠকেছিলাম। আমরা ছায়াকে বিশ্বাস করেছিলাম।”



এই খুনগুলোর তদন্ত শুরু হয়, কিন্তু প্রতিবারই একটা অদ্ভুত বিষয় ধরা পড়ে—

তিনটি লাশের আশপাশে ছিল না কোনো আঙুলের ছাপ, না কোনো ডিজিটাল ট্রেস।


তবে তিনটি জায়গায়ই কিছু একটা ছিল—একটা সাদা কাগজ।


প্রতিটা কাগজে লেখা:


 “স্মৃতি মুছে ফেলা যায়,

কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের ছায়া টিকে থাকে।

আমি তাদের ছায়া কেটে দিয়েছি।”


প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন—


—“এই মৃত্যু তিনটি ‘অস্বাভাবিক’। তবে আমরা নিশ্চিত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ এতে জড়িত নয়। রহস্যজনকভাবে কেউ এসব করেছে।”


সাংবাদিক জিজ্ঞেস করে—


—“তবে কি এ কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ?”


কমিশনার চুপ করেন।

শুধু বলেন—


—“এটা ছায়ার খেলা। যেখানে আলো পড়ে না, সেখানে ছায়ার বিচার হয়।”


এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।


সামাজিক মাধ্যমে হঠাৎ এক ছায়ার ফ্যানবেস গড়ে ওঠে—

একজন বলে, “সে ফিরেছে।”

আরেকজন লেখে, “রঙ্গন হাসপাতালে, তবু শহরে আগুন ধরেছে। তবে কি ছায়াই এখন আগুন?”


কেউ কেউ বিশ্বাস করে, রঙ্গনই এ সবের পেছনে।

কেউ বলে, “না, রঙ্গনের শরীর সেরে ওঠেনি। সে তো হেঁটে উঠতেই পারে না।”


তবে ঠিক সেই সময়, শহরের এক পুরনো ভবনের দেয়ালে দেখা যায় নতুন একটি গ্রাফিতি।

রক্তের মতো লাল রঙে লেখা—


 “যাদের বিশ্বাসঘাতকতা গন্ধ ছড়ায়, আমি তাদের ছায়া ছিঁড়ে ফেলি।”


আর তার নিচে আঁকা একটি মুখ—রঙ্গনের নয়।


এক নারীর মুখ।

অস্পষ্ট। ধোঁয়ার মতো টানা চোখ। ঠোঁটে বিষাক্ত হাসি।


পুরনো কথা মনে পড়ে এক সাংবাদিকের—

কোনো এক লাইভে রঙ্গন বলেছিল—


—“আমার ছায়া আমি নই। আমার ছায়া একদিন নিজের জীবন নেবে। আমি শুধু তার বাহক।”


সেই সাংবাদিক রাতেই তার ব্লগে লেখে—


 "রঙ্গন নয়।

রঙ্গনের ছায়া ফিরেছে।

এবং এবার সে কাউকে ক্ষমা করবে না।"



নামটা তার নীরা।


কে বলেছে—নীরবতা শব্দহীন? নীরবতা শোনে, ভাবে, আর সময় মতো ছোবল দেয়।

যেদিন প্রথম রঙ্গনের চোখ খুলল ক্লিনিকের শ্বেত শয্যায়, কাঁপতে থাকা চোখের সামনে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়েছিল সেই মুখ।

হাসেনি, চোখের নিচে নীল রেখা, ঠোঁট যেন আদিম কোনো অভিশাপ বহন করে।

তখন কেউ জানত না, এই মেয়েটিই হাসপাতালের কাগজে 'গার্ডিয়ান' হিসেবে নাম লিখেছিল,

তবু কোনো সাংবাদিক, পুলিশ, এমনকি পরিবারের কেউ তার খোঁজ নিতে পারেনি।


নীরা।

সে ডাক্তার নয়, নার্স নয়, আত্মীয়ও নয়।

তবু রঙ্গনের ঘরে শুধু তাকেই ঢুকতে দেওয়া হতো নিয়মিত।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, সে আসে—দুপুরের আলো ঝিমিয়ে পড়ার সময়,

আর চলে যায় ঠিক আগেভাগেই, যখন ক্লিনিকজুড়ে ডাক্তাররা টেবিল গুছিয়ে যান।


অদ্ভুতভাবে কেউ তার মুখ মনে রাখতে পারে না।

তবে পরিচ্ছন্নভাবে সবাই বলে, তার পায়ের শব্দ হালকা ছিল না—ধ্বংসযজ্ঞের মতো গম্ভীর।


ঢাকা শহরের তিনটি জায়গা থেকে প্রায় একসাথে তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়—

একজন মিডিয়ার প্রভাবশালী মালিক, মোজাম্মেল হক,

একজন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক সাব্বির আলম,

এবং সবচেয়ে বিস্ময়ের—তানভীর। রঙ্গনের পুরনো বন্ধু।


তাদের শরীরে কোনো ছুরির দাগ নেই, গুলির চিহ্ন নেই,

তবু চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁট কাটা, আর হৃদস্পন্দন নেই।


ময়নাতদন্তে লেখা হলো—“Cause unknown. But externally induced psychological trauma suspected.”


তিনজনের চোখ খোলা ছিল। যেন তারা কিছু দেখেছিল, এমন কিছু, যা মানুষ দেখে না—

কিন্তু দেখলে আর বাঁচেও না।


রঙ্গন তখন ক্লিনিকে। হাঁটতেও পারে না। তার কণ্ঠ তখনও ভাঙা।

তার হাতে নেই কোনো অস্ত্র, তার ফোন রেকর্ড পরিষ্কার,

তবু ডিবির এক উপ-পরিদর্শক বলে উঠল—

“যদিও রঙ্গনের শরীর ধ্বংসপ্রাপ্ত, কিন্তু এই তিনটি মৃত্যুর কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসে তার নাম।

কোনো না কোনোভাবে, এ যেন তার পাপের প্রতিধ্বনি।”


আরেক কর্মকর্তা ফাইল বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে, —“না ভাই, এটা কেস না... এটা শাস্তি।”


১০


সেদিন রাত তিনটা।

চান মহলের পুরনো দেয়াল ছুঁয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক নারী।

ক্যামেরা নেই, আলো নেই।

সে হাঁটে এমনভাবে, যেন জায়গাটা তার চেনা।

নতুন নয়, পুরনো কোনো অঙ্গের মতোই আত্মার ভিতর আঁকা।


চান মহলের ধুলোয় তখনও কুয়াশা জমে।

দেয়ালে পুরনো ছবির ফ্রেম, জানালায় কাঁপতে থাকা পর্দা,

আর একসময়, হঠাৎ নিঃশব্দে দরজা খুলে যায়।


ভেতরে কেউ নেই। শুধু রঙচটা আয়না।

সেই আয়নার দিকে তাকিয়ে দাঁড়ায় নীরা।

তার ঠোঁট নড়ে না। তবু আয়নার ভেতরে কেউ ফিসফিস করে বলে ওঠে—


—“তুই তো ফিরবি... আমাদের কেউ হারায় না। ইতিহাসের বুকের নিচে আমরা থাকি।

তোর রক্তে সেই ইতিহাস, আর তুই তার উত্তর।"


নীরার চোখ স্থির।

সে তার জামার পকেট থেকে কিছু একটা বের করে রাখে আয়নার সামনে—

একটা চিঠি। পুরনো, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ।


চিঠিতে লেখা—


"নীহারিকা,

তুই না থাকলে আমি কিছুই বুঝতাম না।

আজ আমি শিখেছি, মানুষ শুধু রাজনীতি করে না।

সে বংশ ধরে পাপ বয়ে বেড়ায়।

আর তুই আমাকে শিখিয়েছিলি—প্রেমের চেয়ে ভয় বড়।

কারণ ভয় হলে মানুষ সত্যি হয়।"


নীরা চিঠি রেখে যায়। দরজা বন্ধ করে চলে যায়।


ক্লিনিকের এক নার্স পরে বলেছিল,

—“সেদিন রঙ্গনের ঘরে গিয়েছিলাম রাতে। জানালা খোলা ছিল, বাতাস ঠান্ডা।

আর বিছানায় রঙ্গনের পাশে কেউ বসে ছিল। মুখ ঢেকে রাখা, কিন্তু সেই নারীর চোখে ছিল এমন কিছু...

যা আমি মনে রাখতে চাইনি। তারপর আমি ছুটে বের হয়ে আসি।”


"হয়তো এই মেয়েটি সেদিন রঙ্গন কে উদ্ধার করে,  ক্লিনিকে নিয়ে এসেছিলো,  তখন তো এমন ভয় পাইনি"


রঙ্গনের পাশে তখন কেউ বসে ছিল।

কিন্তু ঘরের ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের জন্য।

অন্যবার এমনটা হয়নি।


১১


এরপর, রহস্যভাবে থানায় পৌঁছায় তিনটি জিনিস—

একটা পেনড্রাইভ, যার ভেতরে মোজাম্মেলের আর সাব্বিরের ফোনালাপের রেকর্ড।

একটি ভিজে কাগজে লেখা সাব্বিরের স্বীকারোক্তি—তানভীরকে ফাঁদে ফেলার।


আর একটা ছোট্ট খাম, যার ভেতরে ছিল একটাই প্রশ্ন—

“যদি তোমার সবকিছু সত্যি হয়, তবে সত্যির দুনিয়ায় তোমার শত্রু কে?”


খামটার পেছনে শুধু লেখা ছিল একটা নাম।


নীহারিকা 


ডিবি অফিসার বলে, —“এই নাম খুঁজে পাচ্ছি না। এই নামে কোনো ভোটার আইডি নেই,

না কোনো জন্মনিবন্ধন, না কোনো নাগরিক তথ্য।

কেউ জন্মায় না এমন করে। তাহলে কী সে ছিল?”


কেউ জবাব দেয় না।


কিন্তু এক জুনের সন্ধ্যায়, রঙ্গন ক্লিনিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে,

পেছনে থেকে একজন এসে বলে,


—“তোমার বাবার মতো তুমি ভুল করো না।

বংশকে নিয়ে চলা যায় না। বংশ যদি বিষ হয়ে যায়, তাকে মুছে ফেলতে হয়।

আমি এসেছি সেই মুছে ফেলার দায় নিয়ে।

তুমি বাঁচো, কিন্তু আমি থামব না।”


১২


রঙ্গন ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে—


—“তুমি কি তার উত্তরাধিকারী?”


নীরা একটুখানি হাসে, উত্তর দেয় না।


আলো কমে আসে। বাতাস থেমে যায়।


তখনই রঙ্গনের চোখে পড়ে—নীরার চোখে সেই গভীর দৃষ্টির রেখা,

যেটা একদিন সে দেখেছিল পুরনো এক ছবিতে—নীহারিকার চোখে।


রঙ্গন শুধু ফিসফিস করে বলে—


—“তুমি কার ছায়া?”


নীরার ঠোঁট কাঁপে। যেন একটা পুরনো ইতিহাস আবার জেগে উঠতে চায়।


—“ছায়ারা কোনোদিন নিজেরা জন্মায় না, কিন্তু কেউ কেউ তাদের ঘুম ভাঙায়। তুমি শুধু ঘড়ি দেখো না, ইতিহাসের ঘুম কবে ভাঙে সেটা বুঝো।”


রঙ্গন তাকিয়ে থাকে।

পিছনে শুধু শোনা যায় ক্লিনিকের ঘড়িতে রাত তিনটার শব্দ।


টিক।


টিক।


টিক।


আর নীরার ছায়া অদৃশ্য হয়ে যায় দেয়ালের দিকে এগিয়ে।


নাম?

নীরা।


কাজ?

পরিচিতদের মধ্যে অপরিচিত হয়ে ঘুরে বেড়ানো।


উদ্দেশ্য?

অতীত যেখানে থেমে ছিল, সেখান থেকে আবার শুরু করা।


রক্ত নয়,

প্রমাণ নয়,

শুধু চোখের ভাষা দিয়ে কাউকে নীরবভাবে মেরে ফেলার সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে।


নীরা ফিরে এসেছে।

তার নিজের নামে নয়,

তাদের হয়ে, যারা কোনোদিন শেষ হয়নি।


১৩


নীরা—এই নামটা এখন যেন বাতাসেও জড়িয়ে আছে। কেউ জানে না সে কোথা থেকে এসেছে, কেউ দেখেনি তার পূর্ণ পরিচয়। সে নিঃশব্দে আসে, বসে থাকে রঙ্গনের পাশে, কখনো চোখে চোখ রাখে না, অথচ যেন সব বুঝে ফেলে।


রঙ্গন ক্লিনিকের ঘরে যখন বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে, সেই মুহূর্তে তার শিরা-উপশিরায় যে শীতল স্পর্শ বইতে থাকে, সেটা শরীরের বাইরে কিছু নয়, যেন ভেতরের কোনো অনুরণন।


সিসিটিভি ক্যামেরা মাঝে মাঝে অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কেউ টের পায় না সে কখন ঢোকে, কিভাবে বসে থাকে, আবার কখন চলে যায়।


তার আসা যাওয়ার পথ আছে কি? নাকি সে কোনো পুরনো ইতিহাসের গোপন দরজা খুলে চলে আসে?


আলি আজিম চৌধুরী—রঙ্গনের পিতা—নিজেও যেন দ্বিধায়।

কিছুদিন আগে এক পুরনো বন্ধু তাকে বলেছিল,

—“তোমার ছেলের পাশে যে মেয়ে বসে, তাকে তুমি ঠিকঠাক চেনো তো?”

আলি আজিম উত্তর দিয়েছিলেন,

—“আমি জানি, সে অজানা। কিন্তু আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি, কারণ আমার ছেলে তার পাশে নিশ্চিন্ত ঘুমায়।”


কিন্তু কথাগুলোর নিচে ছিল সন্দেহ।

কারণ কেউ কেউ বলছে, আলি আজিম নিজের ঘনিষ্ঠ চ্যানেল দিয়ে একজন প্রশিক্ষিত প্রহরী নিযুক্ত করেছেন—নীহারিকা নামের ছায়ায়, পরিচয়ের অন্ধকারে।


১৪


তবে সবচেয়ে ভয়াবহ গুঞ্জনটা ছড়িয়েছে চানমহলের পুরনো কর্মচারীদের মুখে মুখে।

ওখানে এক পুরনো আর্দালি, যে প্রায় বোবা হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ একদিন বলে ওঠে—


—“জমিদার  রঙ্গন চৌধুরী এক বাঈজীকে ভালোবেসেছিলেন, কলকাতার, নাম ছিলো নীহারিকা। সে গর্ভবতী ছিলো। কিন্তু হঠাৎ একরাতে সে হারিয়ে যায়। কেউ খুঁজে পায়নি। সবাই বলত, সে চলে গেছে। কিন্তু চানমহলের দোতলার উত্তর-পূর্ব কক্ষটিতে এখনো মাঝরাতে এক নারী বসে থাকে, মুখ দেখা যায় না, কিন্তু চোখ থেকে পানি পড়ে। আর আজকাল যাকে আমি দেখি ছেলের পাশে... তার হাঁটার ধরণ, তার চোখের আকৃতি, তার গলা—সবকিছু সেই হারিয়ে যাওয়া নীহারিকার মতো।”


১৫


ঢাকার ডিবির এক কর্মকর্তা, যিনি হামলার তদন্ত করছিলেন, নিজের রিপোর্টে লেখেন—


“নীহারিকা নামক একজন নারী, যার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, চিকিৎসার কোনো ইতিহাস নেই, ব্যাংক হিসাব নেই। তার ডিজিটাল ছায়া শূন্য। কোনোকিছুই তাকে নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে না।”


চিকিৎসক, যিনি রঙ্গনের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে আছেন, নিজের ডায়েরিতে লেখেন—


“তার চোখে এক গভীর দৃষ্টির রেখা। সে যেন সব আগে থেকেই জানত। এমনকি রক্তচাপের ওঠানামা, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও... যেন তার অনুমানেই চলে। এই নারী চিকিৎসাবিজ্ঞান জানে না—তবু রোগী জানে তার স্পর্শে নিরাপদ।”


এক রাতে, ক্লিনিকের বাইরে এক আগন্তুক দাঁড়ায়। পোশাকে ধুলোমাখা, হাতে এক পোটলা। সে রিসেপশনিস্টকে বলে—


—“এই চিঠিটা দিন রঙ্গন চৌধুরীকে। নীহারিকার কথা লিখা আছে তাতে।”


চিঠির মধ্যে এক ভাজ করা ছবি, পুরনো কলকাতার এক নাচঘর, যেখানে এক নারী বসে আছে ঝুমুর কাঁপানো হাতে। ছবির নিচে লেখা—


“নীহারিকা (১৮০০) – শেষ সন্ধ্যা।”


সেই ছবির মুখ আর নীরার মুখ একই না হলেও… কিছু আছে, একরকম সাযুজ্য, যা সময় মুছতে পারেনি। যেন সময় তাদের আলাদা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারল না।


রঙ্গন এখনো জানে না—এই নারী তার দেহরক্ষী, নাকি পূর্বপুরুষের অপরাধবোধের পুনর্জন্ম।

সে প্রেমিকা? নাকি পাপের সাক্ষ্যবহনকারী?

সে মানবী? নাকি কারো উত্তরসূরি, যে এসেছে দাবি তুলতে?


নীরার ঠোঁটে এখনো সেই দ্ব্যর্থহীন রহস্যময় হাসি।

তার চোখে যেন দুটো জীবন—একটি বর্তমান, অন্যটি সেই অতীত, যা কারও হাতে লেখা হয়নি।


রঙ্গন হয়তো ভালোবাসতে পারে তাকে, কিন্তু সে জানে না, নীরা কি তাকে বাঁচাতে এসেছে...

নাকি ফিরিয়ে নিতে?


এবং এর মাঝেই রঙ্গনের ঘুমের মধ্যে একদিন সে শুনে—


—"তুমি তো আমারই উত্তরাধিকার, কিন্তু তুমি জানো না—আমি কী রেখে গিয়েছিলাম তোমার জন্য।"


সেই গলায় ছিলো স্মৃতি, প্রতিশোধ, আর কিছু এমন যেটা কখনো জন্মেইনি, তবু হারিয়ে গেছে।


রঙ্গন জমিদার ৮


অর্পন রহমান 


ভালোবাসা নাকি মায়া :


ক্লিনিকের ঘরটা নীরব। জানালার পাশে একটা পুরনো ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু তার শব্দও যেন কিছু বলতে পারছে না। বেডে শুয়ে রঙ্গনের চোখ আধখোলা, নিঃশ্বাস ভারী, আর মন যেন দুলছে এক অদ্ভুত চিন্তার বুকে।


তার চারপাশের বাস্তবতা—এই ঘর, এই শরীর, এই যন্ত্রণা—সব কিছুই কি সত্য? না কি শুধুই এক স্তর, এক ছদ্মবেশ?


সে চোখ বন্ধ করে। কিছু মুহূর্তে মনে হয়, সে জেগে নেই—বরং ভাসছে। কোথাও। যেখানে সবকিছু অস্পষ্ট, অথচ ভীষণ চেনা।


তার মনে পড়ে যায় একটা বাক্য—


 “ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা, জীব ব্রহ্মেরই অংশ।”


সে ভাবে—তাহলে এই জগৎ, এই যন্ত্রণাগুলো কি সত্যিই তার নিজের? এই লড়াই, এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই ভালবাসা, এই প্রতিশোধ... সবই কি মায়ার খেলা?


শঙ্করাচার্যের কথা মনে পড়ে যায়—মায়া, যা আলো না থাকলে রশিকে সাপ মনে হয়। তাহলে কি সে এতদিন ধরে এক মিথ্যে ভয়কে সত্য ভেবে তাড়া করছিল?


নাহ, সে নিশ্চিত না।


কিন্তু তার মধ্যে এক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে। নিরবভাবে।


সে জানে, মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে, তা হয়তো অনেকটা স্বপ্নের মতন—বাস্তব মনে হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না ঘুম ভাঙে। তার এই হাসপাতালে থাকা, এই রক্ত, এই ষড়যন্ত্র—সব কিছু কি কেবল এক নাটকের অংশ?


রঙ্গন গভীরভাবে অনুভব করে—শরীর, নাম, পরিচয়... এসব কিছুর গভীরে কোনো এক অনন্ত কিছু আছে। যা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, অথচ প্রতিনিয়ত অনুভব করা যায়।


একসময় তার মনে পড়ে যায় সেই মেয়েটিকে—নীরা।


সে কি সত্যি? না কি মায়া? একটা ছায়া মাত্র?


সে ঠিক করতে পারে না।


হয়তো ঠিক করাও সম্ভব নয়।


তার মুখে এক হালকা হাসি খেলে যায়। যেন বোঝার চেয়ে অনুভব করাটাই বেশি সত্য।


এই দেহ যদি ক্ষণিক হয়, যদি সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হয়, তবে সে কীসের জন্য এত দুঃখ কষ্ট বহন করছে?


সে নিজের চেতনার গহীনে ধীরে ধীরে অনুভব করে, মায়া এক বিভ্রান্তি নয়—বরং এক শিক্ষা।


প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিটি প্রেম, প্রতিটি যন্ত্রণা তাকে একটু একটু করে নিজের ভেতরের সত্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।


সে ভাবে—


 যদি আমি মায়া পার হয়ে সত্যে পৌঁছাতে পারি, তাহলে এই ব্যথা, এই প্রতারণা, সবই তো আর্শীবাদ।


হয়তো সে এখনও জানে না কে বন্ধু আর কে শত্রু।


হয়তো সে জানেই না, সে নিজেই কি সত্যি।


কিন্তু সে বুঝতে শুরু করেছে—সব কিছুই একটা পথ। এক অনন্ত পথ যেখানে পরতে পরতে পর্দা সরানো হয়, মায়া খসে পড়ে, আর মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরকার আলোকে চিনতে শেখে।


এই শুয়ে থাকা, এই একাকীত্ব... আর কিছুই না।


এ এক প্রস্তুতি।


রঙ্গন জানে, বাস্তবতা শুধু চোখ দিয়ে দেখা যায় না।


বাস্তবতা অনুভবের জিনিস।


আর সেই অনুভব—হয়তো শুরু হয়েছে।


তার ঠোঁটে আবারও একটা হাসি খেলে যায়।


নীরা তখনো পাশে বসে।


তাকে দেখে রঙ্গনের মনে হয়, সে বুঝতে পারছে না—সে কাউকে দেখছে, না নিজেরই প্রতিচ্ছবি।


শুধু একটা কথা মনেই থাকে—


 

“মায়া ভেদ করে যে দেখে, সে আর চোখে দেখে না, সে দেখে হৃদয়ে।”



ঢাকার  এক ক্লিনিকের দোতলায়, জানালার ধারে হুইলচেয়ারে বসে রঙ্গন চুপচাপ আকাশ দেখছে। হাসপাতালের বাগানে শিশির পড়ে, পাখিরা ডাকছে, নার্সরা হাঁটছে—সবই যেন এক সাজানো দৃশ্যপট। ঠিক সিনেমার সেটের মতো, যেন কিছুই বাস্তব নয়।


রঙ্গনের পা এখনও ঠিক হয়নি। শরীরে যন্ত্রণা, কিন্তু মন তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত। তার চোখের কোণে এখন সারাক্ষণ এক বিষণ্ন নির্লিপ্তি। মা-বাবা বলেছে, ফিরে আয়। রাজনীতি থেকে দূরে থাক। এ জীবন তোকে মানায় না।


সে মাথা ঝুঁকিয়ে বলেছিল, “ফিরবো মা,  আমি ফিরবো ।”


কিন্তু সে জানে, আসলে কী ভাবছে সে।


সে ভাবছে মহামানবদের কথা। যারা নিজেদের পুড়িয়ে মানুষকে আলো দেয়। কিন্তু শেষে... নিজেরাই কি আলোয় থাকে?


তার মনে পড়ে যায় শঙ্করাচার্যের সেই উক্তি—


 "জগৎ মিথ্যা, ব্রহ্ম সত্য।"


তাহলে, যা সে এতদিন সত্য ভেবেছিল—ক্ষমতা, বিপ্লব, প্রেম, প্রতিশোধ—সবই কি মায়ার জাল?


রঙ্গন এখন বুঝে গেছে, মায়া কেবল সাধারণ মানুষের সমস্যা নয়। মহামানবদের ঘাড়েও বসে সে। স্নেহ, ভালোবাসা, রাজনীতি, স্বপ্ন—সব কিছুর ভিতর দিয়ে সে ছদ্মবেশে ঢুকে পড়ে।


প্রথমে মায়া তাকে প্রেম দিয়েছে—ইরাবতী।


তারপর রাজনীতি—জনতার ভালবাসা।


তারপর প্রতারক বন্ধু—তানভীর, সাব্বির।


শেষে এই মেয়ে—নীরা।


নীরা প্রতিদিন আসে। গল্প করে, খোঁজ নেয়, বোঝাতে চায়—তুমি ফিরে এসো। সব ভুলে যাও।


কিন্তু রঙ্গন শুধু তাকায়। বলে না কিছু। তার চোখে এখন একরকম ধৈর্যশীল শূন্যতা। সে জানে, কথা বলে মায়া টেকে। নীরবতা হলেই মায়া কাঁপে।


রঙ্গনের কাছে এখন ইতিহাসও এক প্রহেলিকা। রঙ্গন জমিদার? নীহারিকা? ইরাবতী?


সবই একধরনের নাটক, যেটা কোনো রহস্যময় নাট্যকার লিখে রেখেছে। সে শুধু অভিনয় করছে। মাঝে মাঝে সে ভাবে, হয়তো তাকেই দেওয়া হয়েছে সেই স্ক্রিপ্ট ভুলে গিয়ে নতুন একটা পথ খুঁজে বের করার দায়িত্ব।


সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি সত্যের প্রতিনিধি? নাকি মায়ার প্রতিচ্ছবি মাত্র?”


নীরাকে দেখে মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এ মেয়েটা সত্যিই আছে কি না। নীহারিকার উত্তরসূরি? নাকি বাবার নিযুক্ত বডিগার্ড? নাকি আরেক ছদ্মবেশী ছায়া?


কিন্তু এখন সে আর জানতে চায় না।


তাকে কেউ ভালোবাসে কি না, কে বিশ্বাসঘাতক করেছে, কে ব্যবহার করেছে—এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।


সে জানে, মহামানবরা এইভাবেই বাঁচে—সবকিছু ভাঙার পরে, নীরবতার মধ্যে, সব চিন্তা পুড়িয়ে।


রঙ্গন ধীরে ধীরে মাথা তোলে, জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে।


তার মনে হয়, সেই পাখিটাও মায়া।


সে চোখ বন্ধ করে। তার মনের ভিতর দিয়ে যেন এক গম্ভীর নদী বয়ে যায়।


এক সময় সে নিজেই ভাবে—


 আমি কিছু করতে চাই না। কিছুই না। শুধু বসে থাকবো, দেখবো। কে হাসে, কে কাঁদে, কে পালায়, কে প্রতারণা করে।


সবই যেন কাচের পুতুল।


সবাই নিজেকে বাস্তব ভাবে।


কিন্তু আমি জানি, ওরা সব চরিত্র। একটা মহা-নাটকে।


রঙ্গন এবার হাসে।


নীরার চোখে সেই হাসি ধরা পড়ে।


সে প্রশ্ন করে না কিছু। শুধু জিজ্ঞেস করে, “চলে যাবো?”


রঙ্গন উত্তর দেয় না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।


কেননা সে জানে, যতবার চোখ বন্ধ করবে, ততবার নতুন একটা মায়া তৈরি হবে।


তবে একদিন...


তাকে হতেই হবে সেই দর্শক—যে মায়াকে চেনে, ভালবাসে, তারপর ছেড়ে দেয়।



নীরার প্রেম আর রঙ্গনের মায়া—দুটো যেন দুই নদী, গোপনে এক মোহনায় মিলেছে। কিন্তু সেই মোহনা দেখা যায় না, শুধু অনুভব হয়।


রঙ্গন জানে, নীরা তাকে ভালোবাসে। অথচ সে প্রেমে আর বিশ্বাস করে না। তার মনে হয়, প্রেমও একধরনের ছদ্মবেশ। একটা আবরণ, যেটার ভেতর লুকিয়ে থাকে আকাঙ্ক্ষা, ভয়, কিংবা উত্তরাধিকার। 


নীরার চোখে তাকিয়ে তার মনে হয়—এই চাহনিই হয়তো তার পূর্বপুরুষ দেখেছিলো, সেই নীহারিকার চোখে। 


হয়তো এই নারীর রক্তেই ঘুমিয়ে আছে কোনো অসমাপ্ত ভালোবাসা, কোনো অভিশপ্ত অপেক্ষা।


অন্যদিকে, নীরা চায় রঙ্গন বাঁচুক। ওর মধ্যে সে দেখেছে এমন কিছু, যা সে ভাষায় ধরতে পারে না। কোনো ইতিহাসের প্রতিধ্বনি? না কি নিছক এক মনস্তাত্ত্বিক ধাঁধা? সে জানে না। 


কেবল জানে, ওর পাশে থাকতে চায়। কিন্তু প্রতিবার যখন ওর চোখে ক্লান্তি, অবিশ্বাস, কিংবা সেই পুরনো নির্লিপ্ত হাসি দেখে—সে অনুভব করে, সে আর কিছু না, হয়তো রঙ্গনের মায়ারই অংশ। ওর তৈরি এক চরিত্র, যাকে সে কখনো বিশ্বাস করে, আবার কখনো সন্দেহ করে।


রঙ্গনের কাছে, নীরার স্পর্শ—এক ধরণের আনন্দ, কিন্তু একই সাথে এক আতঙ্ক। সে ভাবে, "এই আনন্দ যদি মায়া হয়, তবে ব্যথাই সত্য?" অথচ নীরার হাত ছাড়তে চাইলেই তার ভিতরটা কেঁপে ওঠে।


সে ভাবে,

"আমি যদি মায়া দেখি, তবে নীরা কি মায়ার ছায়া?

না কি সেই সত্য, যা এতদিন চোখের আড়ালে ছিল?"


নীরা কখনো ওর পাশে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো কথা বলে না। 


শুধু ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে, হয়তো মনের ভেতরে প্রার্থনা করে—"ও যেন বুঝে, আমি বাস্তব। আমি কোনো ষড়যন্ত্র নই। কোনো পেছনের দরজার চাবি নই। আমি ওরই একটা খণ্ড, যেটা ও নিজেই হারিয়ে ফেলেছে।"


আর রঙ্গন তখন ভাবে,

"আমি কি ভালোবাসতে পারি?

নাকি আমি শুধু সেইসব মায়ার ছবি, যা কারো প্রেমে প্রতিফলিত হয়?"


প্রেম আর মায়া।

দুটি শব্দ, দুটি পথ।

কিন্তু কখন যে তারা একে অপরের ছায়া হয়ে যায়, কে জানে?


নীরা প্রেমে পড়ে গেছে।

রঙ্গন মায়ায় ডুবে আছে।

এখন তারা একে অপরকে ছুঁতে চায়, কিন্তু জানে না—কে আসলে ছুঁতে যাচ্ছে কাকে?


প্রেম যদি চেতনা হয়, মায়া তবে তার প্রতিচ্ছবি।

আর রঙ্গন যদি এক প্রতিচ্ছবি হয়—

তবে নীরা কি আসল মুখ?

নাকি তারও পেছনে লুকিয়ে থাকা আরেক মায়া?


এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।


তাই তারা কেবল পাশে বসে থাকে।

ভাষাহীন।

আলোর নিচে, অথচ ছায়ায় ঢাকা।


ঠিক যেমন প্রেম আর মায়া—

একাকার, অথচ ভিন্ন।

একই নদীর দুই তীর, যাদের মাঝে বয়ে যায় এক নিরব কান্না।


রঙ্গনের রুমে জেমসের গান চলছে-


" একটি নদীর দুইটি কুল

দুইটি মনের দুইটি ভুল

ভালবেসে হতেই পারে

একটি প্রেমের রঙিন ফুল.।


ছোট ছোট কিছু কথা

ছোট ছোট কিছু আশা

সুখের ঘরে ভিড় করে

ছোট ছোট ভালবাসা

ভালবাসা।


ছোট ছোট কিছু ভুল

ছোট ছোট ভালবাসা…।


দুজন মোরা দুইজনা

দুইয়ে মিলে একাকার

দুঃখ যদি আসে কভু

কেউ হবোনা কারো পর

কারো পর

যতন করে রেখ সখি

সেই প্রেমের ফুল।


হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রঙ্গন এখন ধীরে ধীরে হাঁটে। ব্যথা পায়ে, স্ট্রেচারে ভর দিয়ে—চলাফেরা করে। কিন্তু তার ভেতরের হাঁটা অনেক গভীর। সে এখন নিজের ভিতর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়, প্রশ্ন করে নিজেকেই।


এক বিকেলে, ছাদে বসে আছে সে।

পায়ের নিচে মেঝে নয়, যেন অস্তিত্বের শূন্যতা।

পাশে নীরা।


হাওয়া এসে চুল ওড়ে। রঙ্গন চুপ।

নীরা বলে,


—"তুমি চুপচাপ হয়ে গেছো রঙ্গন। আগের মতো রাগ করো না, হাসো না, ভাঙো না। শুধু তাকিয়ে থাকো… কেন?"


রঙ্গন মাথা ঘোরায় না। দৃষ্টি সোজা পশ্চিম আকাশের দিকে।


—"কারণ আমার কাছে এখন সবকিছু—কবিতা, প্রেম, রাজনীতি, প্রতিশোধ—সব মিথ্যা মনে হয়।"


—"তবে আমি? আমি কি মিথ্যা?"


—"তুমি কি সত্যি?"

—"তুমি কি জানো, তুমি কে?"


নীরা চুপ করে যায়। একটু পরে বলে,


—"আমি শুধু জানি, আমি তোমার পাশে থাকতে চাই। তুমি যেন আবার হারিয়ে না যাও।"


রঙ্গন মাথা নিচু করে। বলে,


—"আমি তো কখনো ছিলামই না।

যাকে তুমি ভালোবেসেছো, সে এক ‘ছায়া’—এক অতীতের ধোঁয়া, এক বংশধারার অসমাপ্ত দুঃস্বপ্ন।"


নীরা এবার বিরক্ত। উঠে দাঁড়ায়।


—"সবকিছু মিথ্যা? আমি মিথ্যা? আমাদের কথা, আমাদের যন্ত্রণাগুলো?"


রঙ্গন ধীরে বলে,


—"আমার কাছে সত্য একটাই—আল্লাহ। বাকিটা সব মায়া।

আসক্তি, প্রেম, দুঃখ—সবই ভ্রম। এই দুনিয়া এক স্বপ্ন, যার ঘুম ভাঙলেই আর কিছু থাকবে না।"


নীরা ধীরস্বরে বলে,


—"তুমি তাহলে এখন সন্ন্যাসী হয়ে যাবে?"


—"না। আমি এখনও তৃষ্ণার্ত।

তবে সেই তৃষ্ণা এখন জলের জন্য নয়—

সত্যের জন্য।

আমি এখন বুঝেছি, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মানে কেবল ধর্মীয় উচ্চারণ নয়—এটা অস্তিত্বের অভিজ্ঞান।

আল্লাহ ছাড়া কিছুই নেই।

যা কিছু তুমি আঁকড়ে ধরো—তা মিথ্যা।"


নীরা বসে পড়ে রঙ্গনের পাশে। একদম কাছাকাছি।


—"তাহলে আমি যদি ভালোবাসি তোমাকে,

সে ভালোবাসা কি মিথ্যা?"


রঙ্গন চোখ বন্ধ করে।


—"ভালোবাসা যদি আল্লাহর দিকে ঠেলে দেয়,

তবে সে সত্য।

আর যদি শুধু আমাকে আঁকড়ে ধরে রাখে,

তবে সে বন্ধন—মায়া।

আমি মুক্তি খুঁজি, নীরা। আমি তো আর মুক্ত নই।"


নীরার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।


—"তুমি কি আমাকে ছেড়ে যাবে?"


রঙ্গন তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব নিচু গলায় বলে,


—"আমি তো নিজেকেই ছাড়ছি।

তোমাকে কি করে রাখি?"


আকাশে তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

আলোর রেখা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলে যাচ্ছিল শেষের রঙ।


নীরা আর কিছু বলে না।

শুধু বসে থাকে।

কাছে, অথচ দূরে।


রঙ্গনের চোখে তখন

না প্রেম, না তৃষ্ণা—

শুধু সেই চিরন্তন এক উপলব্ধি:


আল্লাহ ছাড়া কিছু নেই।

তাই যা কিছু হারাই, তাতেই একধরনের মুক্তি।


আর সেই মুক্তির নামই, তার কাছে এখন—সত্য।

নীরার ভালোবাসা, ইরাবতীর চোখ, জমিদারের উত্তরাধিকার—

সবই যেন এক মহাভ্রমের অংশ।


তার অন্তরের গভীরে এক ধ্বনি ঘুরে ফেরে—


লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

আর কিছু নেই।

আর কিছু থাকতেও নেই।



রঙ্গন হেডফোন কানে দিয়ে বসে আছে।

চোখে ধূসর ভাব। চারদেয়ালের ভিতরে বসে থেকেও যেন দূরে কোথাও, এক নির্জন জগতে।


গান বাজছে খুব নিচু ভলিউমে—

"এই সংসারে সবাই একা…"

জেমসের কণ্ঠ যেন কানের ভেতর দিয়ে মগজের গভীরে ঢুকে পড়ে।

"অবশেষে জেনেছি মানুষ একা… নিজের কাছে নিজেই একা…"


রঙ্গনের দৃষ্টি জানালার বাইরে।

রোদের রেখা পড়ছে বিছানার চাদরে, তবুও তার চোখে যেন কোনো আলো নেই।

সে এই পৃথিবীর চেনা জিনিসগুলোকে এখন চেনে না।

চায়ের কাপ, দেয়ালের ঘড়ি, বইয়ের আলমারি—সব কিছুই যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে।


একসময় সে যেসব কথায় আগুন ধরাতো,

যেসব বক্তৃতায় মানুষের চোখ ভিজে যেত,

যেসব তর্কে সে বুক বাজিয়ে বলত—“আমি ইতিহাসের সন্তান”—

তখন মনে হতো, এ ছেলেকে ঠেকানো যাবে না।


আর এখন?


সে কারো সঙ্গে ঝগড়া করে না।

ফোন বাজলেও দেখে না।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তার হাজার হাজার ফলোয়ার অপেক্ষায় থাকে,

কিন্তু সে আর কিছু লেখে না।


বিছানায় বসে থাকে, মাঝে মাঝে গান শোনে,

আর কখনো কখনো খাতার পেছনে লিখে রাখে অদ্ভুত সব কথা—

“আমি কি বাস্তব?”

“আল্লাহ ছাড়া কি কিছু আছে?”

“নীহারিকা কি কল্পনা?”

“নীরা কি ছায়া?”

“আমার অস্তিত্ব কি কিছুই নয়?”


নীরা একদিন আস্তে করে তার পেছনে এসে দাঁড়ায়।

সে কিছু বলে না।

শুধু দেখে—রঙ্গন টের পায় না, যেন অন্য জগতে আছে।

হঠাৎ রঙ্গন বলে ওঠে, গলায় দুঃখের ঢেউ,


—“জানো নীরা, আমরা সবাই একা। মঞ্চে দাঁড়ালে হাজার লোক চিৎকার করে,

তবু পেছনের আলোটা জ্বলে না।

জীবনের সব চরিত্রই যেন দর্শক।

আর আমি?

আমি তো নিজেকেই চিনতে পারিনি।"


নীরা কাছে এসে বসে।

চুপচাপ।

তার হাতে একটা চাদর, ওটা ওর কাঁধে গায়ে জড়িয়ে দেয়।


—"তুমি সব ফেলে দাও, সব ভুলে যাও, কিন্তু নিজেকে মুছে দিও না রঙ্গন।

তুমি তো শুধু ইতিহাস নও—তুমি একজন মানুষ।

যে কাঁদতে পারে, ভালোবাসতে পারে।

একা হলে ঠিক আছে,

কিন্তু হারিয়ে যেও না।"


রঙ্গন তাকায় না।

শুধু বলে,


—"আমি যদি হারিয়ে গিয়েই থাকি, তাহলে তুমি যে পাশে বসে আছো—

সেটাও কি সত্যি নীরা?

তুমি কি সত্যি?"


নীরার চোখের কোনা জ্বলে ওঠে।

সে জানে না সে কে।

উত্তরাধিকার, ইতিহাস, নীহারিকার রক্ত…

না কি কোনো চক্রান্তের অংশ—সব একমিশ্র অনুভব।

তবু সে শুধু বলল,


—"যদি আমি মায়া হই, তবে আমাকেই ভেদ করো।

আর যদি আমি সত্যি হই, তবে হারিও না আমাকে।"



রঙ্গনের মা দরজার ফাঁক দিয়ে ছেলেকে দেখেন।

চোখে জল।

বলে ওঠেন না কিছু।


এই ছেলেটা যে একদিন মা বাবা-মার সাথে রাগ করে পাগলের মতো ঘর ছেড়ে চলে যেত,


যে হঠাৎ করে চিৎকার, চেচামেচি করতো। 

মা-বাবার সাথে হাসি ঠাট্টা করতো।  ফুল ভলিউমে গান শুনতো। 


মানুষকে কাঁদাতো, হাসাতো, আশার আগুন জ্বালাতো—

সে এখন দিনভর একটা জায়গায় বসে থাকে,

মাঝে মাঝে খালি চোখে শূন্যে তাকিয়ে বলে,


—"সব মিথ্যা।"

"এই ভুবন মায়ার মেলা

শেষের পথে সেই একা…"


 কিন্তু মা জানেন—এই ছেলের ভিতরে কিছু একটা নড়ছে,

যেমন অশান্ত নদীর নিচে জমে থাকা স্রোত।

যা মুখে না বললেও, গান শুনে বোঝা যায়।

চোখে জমে থাকা নির্লিপ্তি জানিয়ে দেয়—

শান্তি নয়, কিছু একটা দহন চলছে ভিতরে।


সে আগুন নয়—আলো নয়—

তা যেন এক অদ্ভুত নির্জনতা,

যেখানে শব্দ নেই, কেবল একটা অনুভব—

“আমি আর আগের আমি নেই।”



রাত প্রায় দুটো।

রঙ্গনের ঘরের দরজা বন্ধ।

ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই, আলোটা ম্লান।

দরজার বাইরে বসে আছেন আলি আজিম চৌধুরী আর ইপসিতা আরা।

দুজনের চোখে ঘুম নেই, কথা হচ্ছিল ধীরে ধীরে—কিন্তু ব্যথা থেমে থাকেনি।


—"তুমি দেখেছো ওর চোখের দিকে?"

ইপসিতার কণ্ঠে ঝিম ধরা ভাঙচুর।

—"ওর চোখে এখন একটা জিনিসও নেই... রাগ নেই, কষ্ট নেই, এমনকি আগুনটাও নেই। শুধু এক ধরণের শূন্যতা। আমি আমার ছেলেকে চিনতে পারছি না, আলি।"


আলি আজিম কামরান অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তার চোখে ছিল অভ্যস্ত কাঠিন্য।

কিন্তু এখন সেই চোখেও দেখা যাচ্ছে ক্লান্তি, হেরে যাওয়ার ক্ষীণ রেখা।


—"আমি সব সময় ভেবেছিলাম, এই ছেলেটা শুধু দিকহীন। একবার ব্যান্ড, একবার গবেষণা, একবার রাজনীতি—এত ছটফট করতো যেন কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজছে। আমি ভাবতাম, ও একদিন ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে। এখন দেখি, ফিরে আসলেও সে আর নেই।"


ইপসিতা মুখ নামিয়ে ফেলেন।

চোখের নিচে কালি, ঠোঁট কাঁপছে।


—"তুমি জানো? আমি একদিন ভেবেছিলাম ও মরেই যাবে। হাসপাতাল থেকে যখন ফোন এলো... আমি তো কিছু শুনতেই পারিনি। শুধু মনে হচ্ছিল, আমার বুকের ভেতরে কেউ ধাক্কা মারছে—আমার ছেলে... আমার ছেলে...!"


আলি আজিম কামরান চোখ ঘুরিয়ে তাকান বন্ধ দরজার দিকে।


—"ও আমাদের কথা শুনবে না, ইপসিতা। কখনো শোনেনি। আর এখন, এখন মনে হয়—সে শুধু মানুষ না। 

সে যেন কোনো একটা যন্ত্রণার প্রতিমা হয়ে গেছে। 


তুমি বোঝো, ওকে বোঝানো মানে হলো আগুনকে জিজ্ঞেস করা—তুমি কেন পোড়াও?"


—"কিন্তু আমি মা, আমি কিভাবে ওর পোড়া মুখটা দেখে চুপ থাকি?"

ইপসিতা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেন।

—"ও রাতে ঘুমোয় না। অথচ এই ছেলেটা তো একদিন মাইক হাতে গান করতো,  মিছিলে স্লোগান দিতো।"


আলি আজিম এবার মাথা নিচু করেন।

তার কণ্ঠে ভর করা এক ধরণের হেরে যাওয়া ক্লান্তি।


—"আমি ওকে রাজনৈতিক ছক থেকে বের করে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানো ইপসিতা, আমার ছেলেটা এখন শুধু রাজনীতি করে না... সে এখন নিজেকেই প্রশ্ন করে—সে কে।"


—"আমার ভয় হচ্ছে আলি... ও যদি এইসব প্রশ্ন করতে করতে একদিন... হারিয়ে যায়!"

ইপসিতার মুখে আতঙ্ক।


আলি আজিম কামরান  এবার স্ত্রীর হাত চেপে ধরেন।


—"হারানোর আগেই আমরা তাকে ফিরিয়ে আনব। ও যদি আলো ভুলে যায়, আমরা আলো জ্বালাবো। কিন্তু, ইপসিতা, তুমি তৈরি থেকো... এই পথ সহজ হবে না।


 আমাদের ছেলে এখন আর শুধু আমাদের ছেলে নেই—সে এখন একটা প্রতীকের নাম হয়ে গেছে। আর সেই প্রতীক নিজেকে ভুলে গেলে তাকে খুঁজে পেতে হয় ছায়ার ভিতরে।"


দুজনে চুপচাপ বসে থাকেন আরও কিছুক্ষণ।

দরজার ভেতর থেকে হালকা শব্দ আসে—

একটা লাইন বারবার বাজছে—

"এই ভুবন মায়ার মেলা..."


আর সেই শব্দে যেন দুইজন প্রৌঢ় মা-বাবা বসে থাকেন,

নিঃশব্দ কান্নার পাশে অপেক্ষা করে—

একটা ফিরে আসা,

একটা ছেলের জন্য।



ড্রয়িংরুমে বসে আছেন ইপসিতা আরা, পাশে আলি আজিম চৌধুরী কামরান। ঘরটায় অদ্ভুত একটা ভারী নিরবতা। রঙ্গন নিজের ঘরে। সে কথা বলে না, হাসে না, এমনকি কারো চোখের দিকেও তাকায় না ঠিকমতো।


দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নীরা।


সে এক পা সামনে এগিয়ে আসে। তার পোশাক, ভঙ্গি, চোখের ভাষা—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত সংযম। যেন বহুদিন ধরে সে কারও শোক বহন করে চলেছে।


ইপসিতা ধীরে উঠে দাঁড়ান। তাঁর চোখ লাল।


—" তুমি রক্ষা করে ছিলে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে, তুমি তখন  ছিলে থেকে ওর পাশে।

হাসপাতালের বেডের পাশে। আমরা তো ছুটে এসেছিলাম পরে... তুমি ছিলে।"

এক মুহূর্ত থেমে তিনি ফিসফিস করে বলেন,

—"তুমি আমার ছেলের জীবন বাঁচিয়েছিলে।"


নীরার চোখ কেঁপে ওঠে।

সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু মুখ খুলে না।


আলি আজিম সোজা তাকান নীরার চোখে।


—"তুমি কে, আমরা জানি না। তোমার অতীত কী, জানি না। কিন্তু আমরা এটুকু বুঝি—তুমি এই ছেলের জীবনে এসেছো এক বিশেষ সময়।"


ইপসিতা এবার এগিয়ে এসে নীরার হাত ধরে ফেলেন।


—"মা, আমি জানি না তুমি কে... কিন্তু তুমি আমাদের মতো কিছু হারাওনি, বুঝবে না। একজন মা যখন দেখে তার সন্তান বেঁচে আছে, অথচ তার ভেতরটা মরে গেছে—তখন সে হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে একটা আশ্রয়, একটা হাত।"


তার গলার স্বর কেঁপে ওঠে।


—"তুমি হতে পারো সেই আশ্রয়। আমি চাই তুমি আমার ছেলের সঙ্গী হও। পাশে থাকো।"

একটু থেমে জোর গলায় বলেন,

—"তোমাকে আমার ছেলে রঙ্গনকে সুস্থ করে তুলতেই হবে। আমি আর পারছি না, মা... আমি ভেঙে পড়ছি।"


নীরার চোখে জল টলমল করে ওঠে।


সে আস্তে বলে—


—"আমি জানি না সুস্থ করে তুলতে পারব কি না। কিন্তু আমি পাশে থাকব। যতদিন ওর চোখে নিজেকে খুঁজে না পাই, ততদিন আমি ওকে ছাড়ব না।"


আলি আজিম গম্ভীর গলায় বলেন—


—"আমি বিশ্বাস করি না সহজে। কিন্তু আজ আমি বিশ্বাস করছি—তুমি ওর জীবনে এসেছো কোনো এক রহস্যময় কারণেই।"


নীরা এবার চোখ নামিয়ে ফেলে।

তার ভেতরে যেন শব্দহীন কাঁপুনি।


রঙ্গনের ঘরের ভেতর থেকে তখন হালকা আওয়াজ ভেসে আসে—

বইয়ের পাতা উলটে যাওয়ার শব্দ।

চিন্তার একটা ছায়া।


নীরা জানে—এই ছেলেটাকে সে শুধুই ভালোবাসে না,

সে এও জানে—এই ভালোবাসার নিচে রয়েছে শত বছরের একটা ইতিহাস,

আর তার ওপরে উঠেই তাকে তৈরি করতে হবে

একটা নতুন ভবিষ্যৎ।


চুপচাপ, ধীরে,

মায়া আর বোধের মাঝের সীমারেখা ধরে—

তারা তিনজন দাঁড়িয়ে থাকেন

একটা অস্পষ্ট সকালকে সামনে রেখে।


১০


রঙ্গনের জীবনে মেয়ের অভাব ছিল না।


কলেজে স্বর্ণা ছিল—লাজুক, চোখে আলো, ছেলেমানুষি প্রেম। ফাঁকা ক্লাসে দুজনে একসাথে বসত, প্রশ্নের বদলে হাত ধরার সাহস খুঁজত। প্রেম? ছিল ? হয়তো না।


তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে রিবা।

রিবা ছিল বন্ধু, বুদ্ধিদীপ্ত, ঝলমলে হাসি, তর্কে-তর্কে মেতে ওঠা। জীবনের দুঃসময়েও পাশে ছিল, কিন্তু রঙ্গনের উন্মাদ দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।


আরও এসেছিল কেউ কেউ,  জেবা, ফারিয়া, তন্দ্রা —আরও অনেক নামহীন, মুখচেনা, সময়ের ভিতর এসে আবার হারিয়ে যাওয়া।


কিন্তু কেউই নীরার মতো নয়।


নীরার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল  জীবন এবং যুদ্ধের মাঝে,  কোন দেবী যেন এসে রক্ষা করলো। 


একজন অপরিচিত, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হওয়া নারী।

তার চোখে কোনো দাবি ছিল না, ছিল শুধু উপলব্ধি।

রঙ্গনের ভাঙা শরীর, জর্জর আত্মা—সবকিছুই যেন নিরার উপস্থিতিতে একটু করে নিরাময়ের পথে হাঁটতে শিখেছিল।

ও ছিল একরকম স্নিগ্ধ, স্বস্তি,  তীব্র আকর্ষন।


রঙ্গন বুঝতে পারে—


নীরা প্রেম না, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু।

নীরা এমন এক সঙ্গী, যে চুপচাপ পাশে বসে থাকে, ঠিক তখন, যখন কেউ পাশে থাকে না।


নীরা সত্য, আবার মায়া—রক্তমাংসের শরীরে, অথচ ছায়ার মত ধরা যায় না।


নীরা যুক্তি নয়, অনুভব।

নীরা কোনো চিঠি নয়, বরং চুপচাপ লেখা হয়ে যাওয়া একটা কবিতা।


সে ভাবে, ভালোবাসা কি এটাকেই বলে?

নাকি ভালোবাসার ভাষা ভুলে গেছে সে?


ভালোবাসা যদি হঠাৎ চলে যাওয়া হয়, তাহলে নীরা কীভাবে থেকে যায়?


রঙ্গন জানে না—নীরার প্রেম আছে কি না,

তবে সে জানে—নীরা চলে গেলে, তার এই নির্মম পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।


নীরা তার হৃদয় জুড়েই নেই,

সে ছড়িয়ে আছে তার একঘেয়ে দিন, নিঃশব্দ সন্ধ্যা, একাকী দুপুরে।


আর সে জায়গা কেউ কখনো নেয়নি, নেবেও না।

কারণ, রঙ্গনের সমস্ত উন্মাদনা, সমস্ত প্রহেলিকা, সমস্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব—


সবশেষে নীরার মুখের একটুখানি নিরবতায়ই যেন স্থির হয়ে থাকে।


১১


নীরার দিকে তাকিয়ে রঙ্গন কখনো বুঝে উঠতে পারে না—সে ঠিক কী দেখছে।


মাঝেমধ্যে, তার ঠোঁটের নীরবতায় রঙ্গনের মনে পড়ে সেই পাথরের চিলেকোঠা, যেখানে একদিন ইরাবতী তাকে বলেছিল—

“ভালোবাসি, কিন্তু ভয় পাই।”


আবার কোনো সন্ধ্যায়, যখন নীরা হঠাৎ করেই হারিয়ে যায় মানুষের ভিড়ে, যখন তার পায়ের শব্দ পড়ে না, চোখ থাকে না মুখে—তখন রঙ্গনের মনে হয় সে হয়তো তাকিয়ে আছে নীহারিকার দিকে।

সেই বাঈজী, যে ভালোবাসার বদলে দিয়েছিলো প্রেতের চিহ্ন।

যার গর্ভে জন্মেছিলো এক অনাত্মীয় উত্তরাধিকার—রক্তের, কিন্তু শূন্যতার।


নীরা দুই রমণীর ছায়া বয়ে বেড়ায়।

রঙ্গন জানে না, সে ছায়া স্পর্শযোগ্য কিনা।

কখনো ইরাবতীর মতো সে তাকে বুঝিয়ে বলে—

"তোমার এই চিন্তাগুলো তোমাকে মাটিতে রাখছে না।

তুমি কোথাও যাচ্ছো, যেখানে কেউ যেতে পারে না।"


আবার কখনো নীরা এমন কথা বলে, যেন তার জিভে আগুনের মতো প্রাচীন অভিশাপ—

"তুমি জানো না, তুমি আসলে কে। তোমার রক্তে যা আছে, তা ঘুমিয়ে নেই, জেগে ওঠে চুপিচুপি।"


রঙ্গন তখন কেবল তাকিয়ে থাকে।

সে চুপ করে যায়।

কারণ, এ দুই কণ্ঠ সে শুনেছে—

একটা তার ঘরের ঘরনী হয়ে উঠেছিল, আরেকটা বংশের ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল।

নীরা যেন সেই দুই সত্তার যোগফল।


সে ভালোবাসে কিনা, সেটা রঙ্গন ঠিক জানে না।

তবে সে বোঝে—নীরা যদি না থাকত, তবে সে হয়তো নিজের ভেতরের নরকেই আজও জ্বলছিল।


নীরা তাকে দেখে, ভাবে না—সে সুস্থ কি না।

নীরা ভাবে, রঙ্গন আসলেই এই জগতের জন্য তৈরি কিনা।

আর রঙ্গন ভাবে—নীরা কি সত্যিই মানুষ?

নাকি শুধুই এক আয়নার প্রতিবিম্ব, যা তার পূর্বপুরুষদের অপরাধ, প্রেম আর অভিশাপের ঘন সুতায় বোনা?


রঙ্গনের মন বলে—

ইরাবতী তার পূর্ব পুরু জমিদার রঙ্গনকে মানুষ করেছিল।


আর নীরা?


নীরা তাকে তার ‘আমিত্ব বা নিজেকে’ দেখায়।

যে ‘আমি’ জন্মেছিলো বহুকাল আগের এক প্রেমে, হারিয়েছিল ভালোবাসায়, আর  বয়ে চলেছে, শুধুই এক অলৌকিক উত্তরাধিকার অভিশাপ নিয়ে।


সে জানে না, নীরাকে সে প্রেমিকা ভাবে, না বাস্তবতার এক সঙ্গী।

সে জানে না, এই নারী তাকে মুক্তি দেবে না কি পিছু টানবে।


তবে সে জানে— ইতিহাসের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এক জমিদার বলেছিল, “তুমি শুধু পাশে থেকো, আমি যদি দানবও হই, তোমার সামনে মানুষ হব।”


আজকের রঙ্গনও তেমন কিছু বলতে চায়। কিন্তু ইরাবতীর মতো নিরা চুপচাপ পাশে বসে থাকে।


শুধু একদিন, রাতে, খুব আস্তে বলে— “তোমার ভেতরে এত মানুষ, এত রক্ত, এত ছায়া— কিন্তু তুমি নিজে কই রঙ্গন?”


রঙ্গন জবাব দেয় না।


কারণ উত্তরটা সে জানে না। 


সে শুধু জানে,

নীরা যদি একদিন হঠাৎ চলে যায়,

তাহলে সে একসাথে হারাবে

নীহারিকাকে,

ইরাবতীকে,

আর নিজেকেও।


রঙ্গন জমিদার ৯

: অর্পন রহমান


রাত গভীর


দুপুরটা ছিলো অস্বস্তিকর নিঃশব্দে ভরা। ঘরের পর্দাগুলো আধভেজা আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে চোখে, মাথায় একটা ভারি ক্লান্তি। শুয়ে পড়লাম—চোখটা ঢেকে রাখতে চাইলাম। এখন প্রায়ই এমন হয়, ঘুম আসে না, আসে একরকম টান। সময় যেন বালির মতো গড়িয়ে যায়, অথচ দেহ পড়ে থাকে।


হঠাৎ টের পেলাম—কেউ মাথার পাশে বসে আছে।

গা ছমছম করে উঠলো না, কারণ সেই ঘ্রাণটা খুব চেনা।

আমার মা।


আম্মা যেদিন মারা গিয়েছিলেন, আমি চিৎকার করতে পারিনি।

কিন্তু এখন তিনি এসে বসেছেন, যেন কিছু বলতেই।


আমি চোখ খুললাম না। পাশে বসে বললাম ধীরে—

—“তুমি কি আবার আসলে?”


আম্মার কণ্ঠটা আসে ঠিক স্বপ্নের ভেতর থেকে না, আবার সম্পূর্ণ জাগরণেও না।

—“তুই এখনো ওকে রক্ষা করতে পারিস নাই, আলি। তোর ভাইটা কী করতেছে তুই জানিস না?”


আমি কিছু বললাম না।

আম্মা বললেন,

—“ইমরান আজিম... ও তো বরাবরই চালাক। মানুষকে ব্যবহার করে। রঙ্গনকে সরিয়ে দিলে বাকি সব ঠিকঠাক হয়—এই ধারণা ওর।”


আমি বললাম,

—“ওর কোনো প্রমাণ নেই। শুধু সন্দেহ...”


আম্মা গলা কাঁপিয়ে বললেন,

—“তুই প্রমাণ খোঁজ, আর ততদিনে ছেলেটা হারিয়ে যাবে। ও এখন দুর্বল, নিঃসঙ্গ। এই সময়টা ভাঙে মানুষ, গড়ে না।”


আমার ভিতরে কিছু একটা কাঁপলো।

জিজ্ঞেস করলাম—

—“তুমি কি জানো কে করেছে রঙ্গনের ওপর হামলা?”


আম্মা বললেন না কিছুক্ষণ। তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাসে,

—“রক্তের মধ্যে যারা বিষ ঢালে, তারা প্রিয়জন হয়েও সবচেয়ে দূরের হয়ে যায়। আমি তোর ভাইয়ের মা, কিন্তু সে এখন শুধুই এক সংখ্যা আমার জন্য—একটা ভুল জন্ম।”


আমি থম মেরে গেলাম।

আমার ভিতরে মনে হলো—এই সময়টা বাস্তব না, অথচ মিথ্যাও নয়। এখানে সময় নেই, এখানে চিন্তা আছে। এখানে কে কাকে দেখে, কে কাকে বলে—তা ঠিক স্পষ্ট না, কিন্তু অনুভব স্পষ্ট।


সময়ের বাইরের একটা কক্ষ, যেখানে মৃতেরা কথা বলে, ভবিষ্যত শোনে।


আম্মা আমার হাত ধরে বললেন,

—“তুই তো বেঁচে আছিস, আলি। ওকে রক্ষা করা তোর দায়িত্ব। ওর মা পারবে না, ও নিজেও পারবে না—কারণ এখন যে মেয়েটা ওর পাশে আছে, সে নীরার মতো না, সে ইরাবতীর মতোও না। সে হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু।”


আমার গা শিউরে উঠলো।


আম্মা বললেন,

—“ও মেয়েটার কান্না শুন। ওর ভিতর এক অন্য জগত আছে। তার শব্দে কান দে।”


ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন এক চিৎকার শুনতে পেলাম।

একটা নারীকণ্ঠ। ছেঁড়া, অস্থির, কান্নাভেজা।


চোখ খুলে দেখি—ঘরে আমি একা।


নীরার গলা ভেসে আসছে বারান্দা থেকে।

রঙ্গনের পা আবার ফুলে উঠেছে। ব্যথায় কাতর।


আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম।


ভেতরে তখনও দুলছে একটা প্রশ্ন— আমি কি তখন ঘুমিয়েছিলাম, না চেতনার বাইরে গিয়েছিলাম?

তখন সময়কে কে থামিয়ে রেখেছিলো? আমি, আম্মা, না সেই মেয়েটি?


আমার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। কিন্তু মনে শুধু একটাই শব্দ ঘুরছে— ইমরান...

তুমি আমার ভাই, কিন্তু এখন তুমি... কে?



আলি আজিম চৌধুরীর ডাক নাম কামরান তার বুকের ভেতর ধ্বনি ওঠে।

এই ভাইকে তিনি ছোটবেলা থেকে আগলে রেখেছেন,


— “ভাইকে সব সময় বলতো, বাবার পর তুই মন্ত্রী হবি একদিন।”

এই ভাই যখন পলিটিক্সে উঠতে পারছিল না,

তখন আলিই একে একে তৈরি করেছেন তার পথ:

ডোনার তৈরি, ব্যবসায়ী সমিতি, চেম্বার, মিডিয়া—সব নিয়ন্ত্রণে রেখে তৈরি করেছিলেন তার সিংহাসন।


এবং যখন ইমরান মন্ত্রী হলো,

তখন কেউ জানল না—

আসল রাজা তো ছায়ায় বসে আছেন,

নামের দরকার নেই, ক্যামেরার দরকার নেই,

শুধু প্রয়োজন হলে জুতো পালিশ করে দিয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকা ভাইয়ের গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া।


কিন্তু আজ তার মা বলছেন—

এই ভাই-ই রঙ্গনের মৃত্যুর ছক করেছে।


— "আম্মা, আপনি কি নিশ্চিত?"

— "আজিম, আমি আর স্বপ্নে আসি না। শুধু যখন আমার রক্তে আগুন লাগে, তখনই আসি।"


তারপর অন্ধকার ঘরে ঠাণ্ডা বাতাস ঢোকে,

আলি আজিম চোখ খুলে দেখে

ঘরের দরজা অল্প খোলা,

আলো নিভে গেছে,

কেউ নেই।


তিনি উঠে বসেন,

ঘামছে, কিন্তু মুখ পাথরের মতো।


ইমরান আজিম চৌধুরী।

বর্তমান বানিজ্যমন্ত্রী।

তাকে যে বানিয়েছিলো রাজনীতি,

আসলে তো বানিয়েছিলো আলি আজিম চৌধুরী কামরান।


কে কাকে কোথায় বসাবে, কে কোন মিডিয়া চালাবে,

কোন ব্যবসায়ী কোথায় ফান্ড দেবে,

প্রতিটা ডিনার, প্রতিটা ফাইল—

সব করেছিলো তিনি।


এখন, সেই ভাই-ই চেয়েছে তার ছেলের রক্ত।


আলি আজিম চৌধুরী  কামরান জানেন—

তার দেখা মাকে স্বপ্ন বা তন্দ্রায় দেখা কথাগুলো কখনো মিথ্যা হয় না।

কারণ তিনি আলি আজিম চৌধুরী সেই আইনুদ্দিন চৌধুরী চানের বংশধর, রঙ্গন চৌধুরীর বংশধর। যার মধ্যে এই দুজনই প্রতিফলিত হয়।



নিশুন্ধ রাত।

আলি আজিম চৌধুরী একা বসে ছিলেন চান মহলের পুরোনো গ্রন্থাগারে, যেখানে মশারির ভেতর ধুলো জমে থাকে না, জমে থাকে ইতিহাস।

ঘরের মেঝেতে পিতলের বাতি, দেওয়ালে ধূসর কাঠের তাক, আর চোখের সামনে একটি বিবর্ণ চামড়ার খাতা—

রঙ্গন চৌধুরী জমিদার নিজ হাতে লিখে গিয়েছিলেন।


তার লেখা:


 "ভয় দিয়েই শাসন চলে।

ভালোবাসলে, মানুষ কথা বলে।

ভয় পেলে, মানুষ নত হয়।

ঈশ্বরও ভয় দেখান, কারণ তিনি চান—নতমস্তক প্রার্থনা।"


আলি আজিম পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলেন ধীরে, ঠান্ডা হাতে।

এই মানুষ ব্যবসায়ী ছিলেন ঠিক, কিন্তু তার রক্তে ছিল অন্য কিছু।

তিনি জানতেন, তিনি শুধু ধনীর ঘরে জন্মাননি—তিনি জন্মেছেন আদিম এক নিয়মের বংশে, যেখানে বেঁচে থাকার নিয়ম মানেই—

কেড়ে নাও, চুপ থেকো, আর পেছনে তাকিও না।


তাঁর পিতামহ, আব্দুল গফুর আজিম চৌধুরী, রাজনীতি করতে গিয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।

লোকেরা হাসত—"পাগল মন্ত্রী।"

কিন্তু আলি জানতেন, সেটা পাগলামি ছিল না—

ওটা ছিল অতীতের বোঝা, যা তার রক্তে ছিল, আর কেউ বোঝেনি।


তিনি জানতেন—নিজেকে শুদ্ধ রাখার একমাত্র উপায়, প্রয়োজনে নোংরা হওয়া।


সেই জন্যই মোজাম্মেল, তানভির, সাব্বির—এই নামগুলো আর থাকবে না কাগজে, থাকবে না কোন তদন্ত ফাইলে।

আলি আজিম নিশ্চিত করেছেন, কেউ কিছু টের না পায়।

তিনি হাতে অস্ত্র ধরেননি, গলা চেপে ধরেননি—

তবু, আটজন মানুষ নিঃশব্দে ঝরে গেছে।


তিনি জানতেন, এই যুগে কেউ পাপ খোঁজে না—

সবাই প্রমাণ খোঁজে।

আর আলি আজিম কখনো প্রমাণ রেখে কাজ করেন না।


এই খুনের পেছনে কোনো ছিল হিংসা,

রঙ্গনের রাজনীতিতে উত্তরনকে ভয় পেয়েছিলো বড় চাচা ইমরন।


এক প্রাচীন নিয়ম:

"যে আমার উত্তরাধিকারকে আঘাত করবে, সে থাকবে না।"


তাঁর মা অনেকবার বলেছিলেন আলি আজিমকে—

" কামরান তুই জমিদার হবি না, মানুষ হবি।"

কিন্তু মায়ের বংশ চিরকাল শহরের, কাগজে বাঁধা, নীতিতে গড়া।

আলি আজিম কামরান জানতেন, বংশরক্ত কেবল বাবার দিকেই বয়ে চলে।


এবং তার ভেতরের সেই বিস্মৃত পুরুষ—

রঙ্গন চৌধুরী জমিদার,

একদিন বলেছিলেন তাঁর খাতায়:


 "দয়াহীন শাসনই টিকে থাকে।

আর মন্দিরে দেবতা নয়,

মানুষের ভয় রাখো।

তাহলেই শাসন হবে পূর্ণ।"


আজ, আলি আজিম কামরান ঘর অন্ধকার রাখেন।

তিনি প্রার্থনায় বসেন না, তিনি কাউকে মাফ করেন না।

তিনি কেবল মনে রাখেন, কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কে কখন হোঁচট খাবে—

আর সেই মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে দেন নিজে।


তার কাছে ক্ষমা মানে দূর্বলতা।

তার কাছে ন্যায় মানে—যার কাছে শক্তি আছে, তার সিদ্ধান্তই আইন।


সেই রাতে, চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে আলি আজিমের চোখে ফের ভেসে ওঠে—

চোখ রাঙানো এক বৃদ্ধা মুখ।

তার মা।


মা বলেছিলেন—

"তুই ভাইয়ের নামে যা করেছিস, তার খেসারত একদিন তোর ছেলেকে দিতে হবে।"


আলি চোখ বন্ধ করে ভাবেন,

"আমার ছেলের জীবনের দায় এখন আমার হাতে। যদি প্রহরী হতে হয়, আমি হবো; যদি ঘাতক হতে হয়, তাও হবো।"


কোনো একদা জমিদার বলেছিলেন,

"নির্বিকার হও, তাহলেই তুমি শাসক।"


আলি আজিম কামরান জানেন—

তিনি ব্যবসায়ী নন।

তিনি উত্তরসূরি।

আর রক্ত শুধু চলমান জল নয়,

ওটা এক জন্মজ বিকার—যেটা পালানো যায় না।


তাকে ভয় করে না কেউ।

কারণ, কেউ জানেই না—

কে সে।



আলি আজিম চৌধুরী কামরান জানতেন—এই সময়টায় কোনো ভুল চলবে না।

এই দেশে ভুল ক্ষমা করে না, আর ক্ষমাশীলতা দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হয়।

তিনি তাই নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন ছায়ার জাল।

সেই জালের সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু সবচেয়ে ধ্রুব কাঁটা—নীরা।


না, নীরা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়।

সে ছিল তার নিখুঁত সিদ্ধান্তের ফল।

একজন প্রশিক্ষিত, স্থির, মায়ার চেহারায় গড়া বডিগার্ড।

রঙ্গনের চোখে সে বন্ধু, সহচর। কিন্তু আদতে রঙ্গনের প্রাণরক্ষার জন্যই তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন কামরান।

সেই সিদ্ধান্তই আজ রঙ্গনকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

তবে তার বিনিময়ে সে কী হারাচ্ছে—তা ভাবলে কামরানের বুক ভারী হয়ে ওঠে।


রঙ্গন কিছু টের পায়নি, কেউ পায়নি।

কিন্তু কামরান জানতেন, কোনো একদিন না-জানা সত্যের সঙ্গে এই ছেলেটার মুখোমুখি হতেই হবে।

সে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু তখন যদি রঙ্গন নীরাকে হারায়?

এই ছেলেটা আরেকবার ভেঙে গেলে, পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে জোড়া লাগাতে পারবে না।


কামরান জানতেন, তিনি এখনো নীরার কাছে ঋণী।

তবু, তিনি ভাবছিলেন—এই ঘনিষ্ঠতা কি শুধুই নিরাপত্তার পরিণাম?

নাকি কিছু এমন জন্ম নিচ্ছে, যা কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না?


আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘর যেন কুয়াশায় ঢেকে আসে।

হালকা দুলে ওঠে বাতাস।

তন্দ্রায় ডুবে যেতে যেতে তিনি বুঝলেন, তিনি আবার সেই সীমারেখায় পৌঁছে গেছেন—ঘুম আর জাগরণ যেখানে হাত ধরাধরি করে থাকে।

আর সেখানেই আবার তার মা এসে দাঁড়ায়।


সাদা দোপাট্টা মাথায়, মুখে গাম্ভীর্য আর চোখে পুরনো অভিমান।

মা চুপ করে পাশে বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হালকা কণ্ঠে বলে—


—“তুই যা করছিস, আমি সব বুঝি।

তোর ভাই... ইমরান... আমি জানি সে কী করেছে।

কিন্তু আমি বলব না তাকে ক্ষমা করিস।

তুই ওকে মারিস না, এইটুকু বলি।

এক ভাই আরেক ভাইকে খুন করলে,

কবরে মাটি তখন বিষাক্ত হয়ে যায়  ।”


কামরান কিছু বলতে পারে না। গলার কাছে এসে আটকে যায় সব শব্দ।


তিনি জানেন, প্রতিশোধের পথে একবার হাঁটলে আর ফেরার রাস্তা থাকে না।

তিনি জানেন, বড় ভাই ইমরান আজিম চৌধুরী তাকে শুধু ঠকায়নি, রঙ্গনকে শেষ করে দিতে চেয়েছে।

তার ক্ষমতালিপ্সা, রাজনৈতিক লোভ, আর ঈর্ষা—সব কিছুই খালি করেছে এক সময়ের বন্ধন।


তবু মা যা বলেছে, তাতে কিছু আছে।

একটা কথা, একটা অনুরোধ, যা কামরানকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।


তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেন।

একটানা নিঃশ্বাস ছাড়েন।


মনে মনে বলেন—

“ভাইয়ের রক্ত নিয়ে রাজত্ব করব না আমি।

কিন্তু তার ছায়া আমার ছেলের গায়ে পড়বে না—এই শপথ আমার।”


ঘর আবার নীরব হয়ে যায়।

এই নীরবতাই হয়তো কামরানের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ।

একটা শূন্যতা, যেটার নাম দেওয়া যায় না।

শুধু বোঝা যায়—যুদ্ধে নামার আগে ঠিক এইরকম নীরবতা নামে হৃদয়ে।

অন্য কেউ টের পায় না, কিন্তু যিনি বোঝেন, তিনি আর কখনো আগের মতো থাকেন না।



রাত গভীর।


চান মহলের শহর-বাড়ির দোতলার ছোট লাইব্রেরির ঘরে আলো জ্বলছে। কামরান একা বসে আছেন জানালার ধারে। বারান্দা থেকে দেখা যায়—ফুটপাথের পাশে শুয়ে থাকা মানুষেরা, হেডলাইটে ভেসে যাওয়া কিছু অস্পষ্ট মুখ।


পেছন থেকে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় ইপসিত আরা।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলে,


— “ঘুমাচ্ছ না?”


কামরান ধীরে বললেন,

— “ঘুমাতে গেলে আজকাল আর ঘুম আসে না।”


ইপসিত কাছে এসে দাঁড়ায়। টেবিলে রাখা জলভর্তি গ্লাসের দিকে তাকায়।


— “আপনি কিছু লুকোচ্ছেন, জানি।

কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করব না।

কারণ আপনি যা ইচ্ছা, করবেন—আমার জিজ্ঞেস করারও অধিকার নেই।”


কামরান এবার সরাসরি তাকালেন স্ত্রীর চোখে।


— “তুমি ভয় পাও আমাকে?”


ইপসিত কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নোয়ায়।

নম্র কণ্ঠে বলে,


— “ভয় পাই না... কিন্তু আপনার মধ্যে একটা কিছু আছে... যেটা বোঝা যায় না।

আপনি রেগে যান না, চিৎকার করেন না, কাউকে তাচ্ছিল্য করেন না—তবু...

আপনার চারপাশে যেন সব চুপ হয়ে যায়।”


কামরান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

বলে উঠলেন,


— “আমি জানি আমার ভেতরে কী আছে।

আমার বাবা গফুর আজিম উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।

আমার রক্তে আছে সেই জেদ, সেই বিষ, সেই আগুন।

কিন্তু আমি সেটাকে জলে রাখি।

কেউ জানে না, সেই আগুন কবে আবার জেগে উঠবে।”


ইপসিত আরা এক চুল নড়ে না।

সে জানে, এখন কোনো সান্ত্বনার প্রয়োজন নেই।


তবে সে বলে,


— “আমি শুধু চাই, আপনি রঙ্গনের জন্য শক্ত থাকুন।

আপনার রাগ, ভয়, আগুন—সব যেন ওর আগুনকে না জ্বালায়।”


কামরান চুপ করে থাকেন।

অন্ধকার জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকেন অনেকক্ষণ।

তারপর বলে ওঠেন,


— “আমার ছেলে আগুনে পুড়েছে, এখন তার জন্য জল দরকার।

তুমি ওর পাশে থেকো।

আমি বাঁচার ব্যবস্থা করব।”



ইমরান আজিম চৌধুরীর আগমন


এরই মধ্যে তিনবার এসেছেন ইমরান আজিম চৌধুরী।

প্রথমবার একা।

পেছনে গাড়ির ছায়া রেখে ঢুকেছেন ঢাকার বেসরকারি এক ক্লিনিকের ইনডোরে, যেখানে রঙ্গনের চিকিৎসা চলছে।


সাদা পাঞ্জাবি, চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা, মুখে ক্লান্ত এক সহানুভূতির রেখা।


চোখে-মুখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই।

চুপ করে রঙ্গনের মাথার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তারপর ডাক্তারদের কিছু প্রশ্ন করেছেন।

একবার চোখাচোখি হয়েছিল নীরার সঙ্গে, কোনো কথা হয়নি।

তবে সেই চাহনিতে যেন কিছু পরিমাপ করছিলেন তিনি।


বড় চাচা ইমরান দ্বিতীয়বার এসেছিলেন স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে।

স্ত্রী অতি বিনীতভাবে বলেছিলেন,

— “রঙ্গন তো আমার নিজের সন্তানের মত, আমরা নিজের সন্তানের মত কোলে পিঠে বড় করেছি।

 ছোটবেলায় আমাদের বাসায় দিনের পর দিন থাকতো,  তোমাদের সাথে রাগ করে প্রায়ই আমাদের বাসায় চলে যেতো,  সাত-আট মাস আগেও গিয়ে উঠেছিলো  বাসায়, সপ্তাহ খানিক থেকেছিলো।  ওর চাচা ওকে প্রচন্ড ভালোবাসে ,  আমার মেয়ে নীলা তো রঙ্গন ভাইয়া বলতে অজ্ঞান।  আমরা তো সবাই ওকে ভালোবাসি। ... এখন এই অবস্থায় ওকে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে।” বলতে বলতে রঙ্গনে চাচি কেঁদে ফেলেন।


ওর বড় চাচা বলেন, " কামরান তোকে তো আগেই বলেছি।


রঙ্গনের দিকে তাকিয়ে ছিলো নীলা নামের মেয়েটি, বয়স বিশ - একুশ  হবে।

কোনো শব্দ করেনি সে, শুধু কিছু সময় ধরে তাকিয়ে ছিল, চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো শুধু।


তৃতীয়বার এসেছিলেন রঙ্গনের মা ইপসিত আরাকে দেখতে।

একটানা পঁচিশ মিনিটের মতো ছিলেন।

আলাপ হয়েছিল এক কাপ চায়ের সঙ্গে, অতীতের গল্পে।

রাজনীতির কোনো আলোচনা হয়নি, কেউ কাউকে কিছু বোঝাতে যায়নি।


সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক, ভারসাম্যপূর্ণ।

কিন্তু কামরান জানেন—সব স্বাভাবিকতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা।

আর তিনি ভুল করেন না।


সে কারণেই তিনি নীরাকে নিযুক্ত করেছিলেন আগেই,

আর এখন নিজের নীরব কৌশলে অদৃশ্যভাবে ঘিরে ফেলেছেন প্রতিটি সম্ভাব্য বিপদের উৎসকে।

কারণ তিনি জানেন—যারা বাঘের মত আঘাত করে না, তারাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

আর ইমরান আজিম চৌধুরী ঠিক এমন একজন।



নীলা তখন মাত্র ষোলো কি সতেরো। স্কুলের শেষ বছর, চোখে স্বপ্ন, মনে বিস্ময়। আর তার সেই বিস্ময়ের কেন্দ্র ছিল একজনই—রঙ্গন। পরিবারে, প্রতিবেশে, আলোচনায়, এমনকি নিঃশব্দ অভিমানে যার নাম উচ্চারিত হতো বারবার। নীলা তাকে দেখেছে কখনো চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকতে, কখনো গভীর রাতে ছাদে হেঁটে বেড়াতে, কখনো মা-বাবার সাথে ঝগড়া করে চলে যেতে—রঙ্গন যেন কোনো বইয়ের চরিত্র নয়, সে-ই যেন গল্প।


সেদিন ছিল গ্রীষ্মের শেষদিক। নীলাদের বাসার ছাদে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় রঙ্গনের সাথে। রঙ্গন তখন মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে, মাথাভর্তি চিন্তা, চোখে অনিদ্রার ছাপ।


নীলা ধীরে ধীরে কাছে এসে বলে,


— “রঙ্গন ভাইয়া…”


রঙ্গন তাকায়, কাঁধে ব্যাগ, হাতে বই। ক্লান্ত চোখে বলে,


— “হুঁ?”


নীলা একটু থেমে, বুকের গভীর থেকে সাহস জড়ো করে বলে,


— “তোমায় আমি... আমি ভালোবাসি।”


কোনো কিশোরীর প্রথম ভালোবাসার মত, সরল, অগভীর, অথচ হৃদয়বিদারক।


রঙ্গন স্থির হয়ে যায়।


একদম গভীরভাবে তাকিয়ে বলে,


— “এই কথাটা কখনো কারও সামনে বলো না নীলা। তুমি আমাকে কী চোখে দেখো জানি না, কিন্তু আমি তোমাকে ছোট বোনের মতো দেখি।”


নীলা চোখ নামিয়ে নেয়। আর কিছু বলে না। ছাদের বাতাস থেমে যায় যেন। গলা কাঁপে না, চোখ কাঁপে না—কিন্তু ভেতরে কিছু ধসে পড়ে।


রঙ্গন পা বাড়িয়ে নিচে নামার আগে বলে,


— “ভালোবাসা খেলনা না, নীলা। তোমার বয়স কম। তুমি একদিন বুঝবে, আমি ঠিকই বলেছি।”


সেদিনের পর থেকে নীলা আর কখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি। শুধু দূর থেকে দেখেছে। কখনো আশেপাশে এলে চুপ করে সরে গেছে। কিন্তু তার হৃদয়ের প্রথম ভালোবাসা রয়ে গেছে অমলিন। সেই ভালোবাসা, যা বলা হয়ে গিয়েছিল, তবুও অপূর্ণ থেকে গেছে।


রঙ্গনের মনে তখন অন্য রকম লড়াই। রাজনীতি, দর্শন, একরাশ বিষণ্নতা, এবং নিঃসঙ্গতার দেয়ালে বন্দি সে। সে জানত না, সেই দিনটিই এক নিষ্পাপ হৃদয়ের ইতিহাস হয়ে থাকবে নীলার জীবনে—শুধু একটা 'না' দিয়ে শুরু হওয়া প্রেম, যে প্রেম কখনো শেষই হলো না।



কামরান চৌধুরীর ঘরে তখন আলো কম, একটা নরম বাতি শুধু তাঁর মুখে ছায়া ফেলে রেখেছে। চোখ দুটো স্থির, ঠোঁট কড়া করে বন্ধ, সামনে ছড়িয়ে রাখা নথিপত্র, রিপোর্ট আর কিছু ছবি।


লোক পাঠিয়েছিল, নিজের নির্ভরযোগ্য লোক—নাম নেই, মুখ নেই এমন লোক, যারা নড়তেও শব্দ করে না। তথ্য এসেছে ধীরে ধীরে।


তারা অনেক খোঁজ নিয়েছে। স্থানীয় নেতাদের ফোন রেকর্ড, চেম্বারের ভিতরের ক্যামেরা, শহরের বাইরের রিসোর্টে গোপন বৈঠক, এমনকি কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন।


সব জায়গা ঘেঁটে, ধুলো ছেঁকে একটা ফলাফল—


ইমরানকে আক্রমণ করা, বা রঙ্গনকে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে কোনো সরকার দলীয়  নেতা বা মন্ত্রী যুক্ত নেই।


একটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন কামরান।


কোনো রাজনৈতিক হীন চক্রান্ত নয়, নয় কোনও বিরোধী দলের চাল। এটা ব্যক্তিগত। পারিবারিক। রক্তের ভেতরের চিহ্ন।


তিনি চোখ বন্ধ করে ভাবেন—

তাহলে ইমরান?

আপন ভাই?

সে-ই কি?


একসময়, আপন ভাইকে মন্ত্রী বানাতে নিজের ব্যবসার ঝুঁকি নিয়েছিলেন কামরান। তদবির, মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, এমনকি রাজধানীর কয়েকজন সিনিয়র অফিসার পর্যন্ত কিনেছিলেন—সব নিজের টাকা আর প্রভাব খাটিয়ে।


এখন মনে হচ্ছে, সে-ই যেন পিছন থেকে ছুরি চালিয়েছে।


“কারণ ব্যতীত কেউ নিজের রক্তে ছুরি চালায় না।”


এই লাইনটা ঘুরপাক খায় তার মাথায়।


কিন্তু সে জানে—ইমরান কিছু বলবে না, প্রমাণও রাখবে না।

সে শুধু ছায়ার মত কাজ করবে, আর নিজের মুখে বলবে—

“ভাইয়ের জন্য কিছু করিনি, এসব তো রাজনীতির খেলা।”


কামরান জানে, এই খেলা এখন থেকে খেলতে হবে তাকে—শান্তভাবে।

রক্ত গরম করে নয়, ঠান্ডা করে।

এইবার প্রতিশোধ নেওয়া হবে শব্দ ছাড়া, গন্ধ ছাড়া, চিহ্ন ছাড়া।


শেষে শুধু মনে মনে বলেন,

“বাঁচিয়ে রেখেছি, কারণ মা বলেছে।

কিন্তু ছুরি গলায় ঠেকলে, রক্তের রং আর জল আলাদা করতে পারি আমি।”


নিউজটা প্রথম আসে এক ইউটিউব চ্যানেলে—তথ্যচিত্র আকারে।

ক্যামেরা ফোকাস করে একটা দোতলা বাড়ির গেটের ওপর, তারপর ড্রোনে দেখা যায় বিদেশে পাঠানো কোটি টাকার কনসালটেন্সি বিল, আর নিচে ভেসে আসে লাইন—

"বানিজ্য মন্ত্রী ইমরান আজিম চৌধুরীর অর্থ কেলেঙ্কারি: প্রমাণসহ অনুসন্ধান।"


প্রথমে সবাই ভেবেছিল গুজব।

কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে নিউজ চ্যানেল, ফেসবুক লাইভ, এমনকি কয়েকজন সুশীল সমাজের মুখেও সেই ভিডিওর অংশ।

বিরোধী দল সংসদে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে, মিডিয়া তোলপাড় করে।


সরকারি দলের প্রেসার বাড়ে, এবং শেষমেশ প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন।

ইমরান প্রথমে মানতে চাননি,

—“এসব রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র,” বলেছিলেন।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় দ্রুত, এবং প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নীরব ইঙ্গিত আসে।

দিন দুয়েকের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন।


বিকেলবেলা, ছায়াঘেরা কামরানের অফিসে ঢোকে ইমরান।

চোখে ক্লান্তি, মুখে গর্বের শেষ প্রলেপ।


—“তুই তো জানিস, এসব ষড়যন্ত্র আমার বিরুদ্ধে আগেও হয়েছে। কিন্তু এইবারটা যেন ভিন্ন।”


কামরান মাথা নেড়ে, চা অফার করে।


—“আমি কি করা যায় দেখছি ভাইজান।”


ইমরান টেবিলের দিকে ঝুঁকে বলে, —“তুই থাকলে আমার কিছু হবে না। আমার বিশ্বাস তুই আমার পাশে আছিস।”


কামরান তখনও হাসেনি, মাথা হালকা নিচু করে বলল,

—“রক্ত তো এক ভাইজান। আমি তো ভাই। আপন ভাই।”


তারপর চোখটা একটু সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়,

যেখানে হালকা বাতাসে কাচ কাঁপে—

এক অদৃশ্য পরিকল্পনার প্রতিধ্বনি।


আসলে পেছনের পুরো কলকাঠিটাই কামরান নাড়ছে।

নির্বাচনের আগে দলকে পরিষ্কার করতে হলে কিছু বলির পাঁঠা লাগে।

আর রঙ্গনকে আক্রমণের পর তার যে প্রতিক্রিয়া এসেছিল,

কামরান জানত—একদিন না একদিন এই ভাইয়ের দাম দিতে হবে।


কিন্তু কেউ জানে না।

কেউ জানবেও না।


ক্যামেরার পেছনের পরিচালক হয় না কখনো দৃশ্যের অংশ।

সে শুধু জানে কবে আলো জ্বালাতে হয়, আর কবে নিভিয়ে দিতে হয় চিরতরে।



রঙ্গন ঘরের কোণে বসে ছিল। জানালার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকছে, নিঃশব্দে।

নীরা এসে চুপ করে বসে তার পাশে। কিছুক্ষণ তারা কিছু বলে না—শুধু বাতাস আর স্মৃতির শব্দ।


রঙ্গন হঠাৎ বলে ওঠে,

— “তুমি জানো, আমার বড়চাচা আমার জন্য কী ছিল?”


নীরা তাকায়, চুপচাপ। রঙ্গনের গলার স্বরে কাঁপন।


— “ছোটবেলায় আমি প্রায়ই আম্মার সাথে ঝগড়া করে ওদের রুমে চলে যেতাম। বড়চাচা চাচির কোলের ভীতের ঘুমাতাম , আর বলতো—‘এখানে আসলে তোমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।’

 একবার জ্বর হয়ে গিয়েছিল আমার, চাচা সারারাত আমার মাথায় পানি দিয়েছিলো, আমাকে বুকের কাছে নিয়ে কোরআন শরীফ পড়ে শুনিয়েছিল।"


নীরা ধীরে বলে,

— “আমি জানি। বড়চাচা তোমাকে খুব ভালোবাসতেন।”


রঙ্গন মাথা নিচু করে ফিসফিস করে,

— “চাচির সন্তান হয়নি বলে, আমি ছিলাম তাদের সবকিছু। জানো, একবার আমার জন্য ঈদের জামা ছিড়ে গিয়েছিলো,  বড়চাচা নিজে হাতে সেলাই করেছিলেন, বলেছিলেন—‘আমার ছেলে রঙ্গন ঈদে নতুন জামা পরবে আমার হাতের তৈরি।’”


একটু থেমে রঙ্গন বলে,

— “এখন সেই মানুষটা... এইভাবে... হেনস্থা হচ্ছে। সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আমি কিছু করতে পারছি না, শুধু চুপচাপ দেখছি। আমিও কী তখন যেমন কাঁদতাম, আজকেও কাঁদছি। কিন্তু তখন কোলে তুলে নেওয়ার কেউ ছিল... এখন কেউ নেই।”


নীরা তার পাশে একটু এগিয়ে বসে।

তার গলায় শান্ত স্বর,

— “আল্লাহ কাউকে ছেড়ে  দেন না। তোমার  চাচার জন্য তোমার দোয়া থাকবে, তোমার ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহ সেই সত্য জানেন, যা আমরা সবাই দেখি না।”


রঙ্গন চোখ মুছে বলে,

— “তুমি থােকো পাশে নীরা। কখনো কেউ পাশে না থাকলেও তুমি থেকো। আমার মনে হয়, তোমাকে ছাড়া আমি মানুষ হয়ে থাকতেই পারতাম না।”


নীরা চুপ থাকে।

তার চোখের দিকে তাকিয়ে রঙ্গন আবার বলে,

— “আমার চাচা আজ যেই অন্ধকারে, সেটা আমি নিজের চোখে দেখতে পারি না। আর আমি যদি কিছু না করি, তাহলে আমি আর মানুষ কই?”


নীরা ধীরে বলে,

— “তবে কিছু করো। ভালোবাসা দিয়ে, প্রার্থনা দিয়ে, অথবা সঠিক পথ দেখিয়ে।”


রঙ্গন জানালার দিকে তাকায়।

আলো পড়ে তার মুখে, অদ্ভুত নীরবতায় সে ফিসফিস করে।

— “হয়তো এখনো সময় আছে। হয়তো আমার চাচাকে আবার আলোয় ফেরাতে পারব।”


১০


রঙ্গনের গলা ভারী, চোখে ঘুম নেই, কিন্তু এইবার কোনো অদ্ভুত ঘোর নয়—এইবার সে পুরোপুরি জেগে।

বিকেলবেলা বাবার অফিসে ঢোকে সে। কামরান তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন, খুব শান্ত কণ্ঠে। রঙ্গনের পায়ের শব্দে ঘুরে দাঁড়ান তিনি।


— “তুই এসেছিস?”

— “আব্বা… বড় আব্বুর ব্যাপারে শুনেছি।”


কামরান চুপ করে বসে, ইঙ্গিত করে পাশের চেয়ারে বসতে। রঙ্গন বসে, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,

— “তিনি তো আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখেছেন। আমি জানি না উনার দোষ কতটুকু, বা আদৌ দোষ আছে কি না। কিন্তু আপনি যদি পারেন—উনাকে এই জায়গা থেকে বাঁচান।"


— “তুই জানিস আমি রাজনীতি করি না রঙ্গন।”

— “আপনি না করলেও… আপনি তো পারেন।”

রঙ্গনের গলা ভাঙে,

— “আব্বা, বড় আব্বুকে আপনি বাঁচান। দয়া করে।”


কামরান তাকিয়ে থাকে রঙ্গনের চোখে, কিছু বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে,

— “আমি চেষ্টা করব।”


স্মৃতি


রঙ্গনের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায় কামরানের।


তখন ইমরান আজিম আর তার স্ত্রী এই বাড়িতেই থাকতেন।

তাদের বিয়ের কুড়ি বছর কেটে গেলেও সন্তান আসেনি।


তারা যখন প্রথম জানতে পারে রঙ্গনের জন্মের কথা,

তখনই যেন সেই দম্পতির মুখে সত্যিকারের হাসি ফিরেছিল।


রঙ্গনের সব ছোট্ট ছোট্ট বিজয়—প্রথম স্কুলে যাওয়া, নাচার ক্লাসে ভয় পেয়ে ফেরা, শরীর খারাপ হলে রাত জেগে থাকা—সবকিছুর ছায়া ছিল ইমরান-রুখসানার চোখে।

বড় আম্মু বলতেন,

— “রঙ্গন, তুই আমার চোখের আলো। তুই ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি।”


এমনকি রঙ্গনের মা ইপসিত আরা কিছু সময়ের জন্য ঈর্ষাও অনুভব করতেন,

কেন এতটা স্নেহ পড়ে একটা ছেলের ওপরে, যার মা সে নিজে।


এখন সেই মানুষ, সেই ইমরান … ধ্বংসের মুখে।


রঙ্গন জানে না তার বাবা কতটা জড়িত এর পেছনে,

সে শুধু জানে, পরিবারে একজন মানুষ আছেন, যিনি তাঁর চেয়ে বেশি পিতা ছিলেন।


এইবার সে তাকে ফিরিয়ে আনতে চায়।


রক্তে মিশে থাকা বিষ আর ভালোবাসার সন্ধিক্ষণে,

রঙ্গন দাঁড়িয়ে আছে দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য ও মানবিকতার ঠিক মাঝখানে।


কামরান চোখ সরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকায়।

তার নিজের মনের মধ্যে গুঞ্জন তোলে এক অব্যক্ত লড়াই।

তিনি শুধু ফিসফিস করে বলেন,

— “প্রতিশোধ নেওয়া সহজ। ক্ষমা করা কঠিন। কিন্তু কেউ কেউ ক্ষমার যোগ্য হয় না… আর কেউ কেউ, ভুল করেও পরিবার হয়ে যায়।”


তারপর সে বলে,

— “আমি চেষ্টা করব, রঙ্গন। আমি চেষ্টা করব।”


এইবার সেটা ছিল না শুধু প্রতিশ্রুতি।

এটা ছিল একজন বাবার চেষ্টার প্রতিদান,

একজন ভাইয়ের স্মৃতির কাছে সাময়িক মাথা নত করা।

আর একটা ভাঙা সময়কে আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা।


১০


সন্ধ্যার আকাশে ঘন কালো মেঘ, জানালার বাইরে বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে, কিন্তু কামরান চৌধুরীর চোখ স্থির—এক গভীর চিন্তার অতল গহ্বরে ডুবে থাকা এক পুরুষের মতো। চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে, চেয়ারের হ্যান্ডলে তার হাতের আঙুল গুটিয়ে গুটিয়ে বারবার ছোঁয়া দিচ্ছে—একটা অস্থির ছন্দে।


তার বড় ভাই ইমরান আজিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিদিন খবরের শিরোনামে একই নাম—ইমরান আজিম চৌধুরী।

পিএম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, দল বলেছে “ব্যক্তিগত দায়”—সরকার দায় নেবে না।

কোন আশ্বাস নেই, কোন সমর্থন নেই।


এমন সময় এক রাতে কামরান আবার দেখে সেই পরিচিত স্বপ্ন।

তার মা— বিলকিসের মুখে এক অদ্ভুত ধৈর্য, এক গভীর ক্লান্তি।

তিনি এসে মাথার কাছে বসেন, আবার সেই তন্দ্রার মাঝামাঝি সময়ে।

চোখের দৃষ্টি সোজা কামরানের চোখে, বলেন—


— "তুই যা করেছিস, যথেষ্ট হয়েছে,   এখন থাম।  ভাইটা তো তোর রক্ত, কামরান। আমি তোকে বলতে আসিনি যেন তুই ভুল ভুলে যাস। আমি বলি না ওকে মাফ করিস...

কিন্তু ওরে মেরে ফেলিস না।"


সেই স্বপ্ন থেকে উঠে কামরান একটানা বসে থাকে অনেকক্ষণ, চোখে হাত রেখে।


পরদিন


রঙ্গন আসে তার কাছে, নীরব মুখ, চোখের নিচে কালি।

কিছুক্ষণ বসে থেকে বলে—


— “আব্বা, আমি জানি… ওনার ভুল আছে। কিন্তু বড় আব্বু আমার কাছে একটা সময় পিতা ছিলেন। ওঁর জন্য কিছু করা সম্ভব?”


কামরান কিছু বলে না। শুধু ছেলের চোখে দেখে।


ভাইয়ের জন্য ছেলের চোখে জল, আর স্তব্ধ হয়ে থাকা এক পুরোনো সময় যেন আবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়।


ইপসিত আরা এসে বলে " দেখুন এটা আপনাদের বংশের গৌরবের প্রশ্ন ভাইজানের জন্য কিছু করুন।"


রঙ্গন চলে গেলে, কামরান ফোন তোলেন।

একজন বিশ্বস্ত মানুষকে বলেন—

— “মামলা কোথায় আছে, কার কার হাতে আছে, সব খোঁজ নাও। আমি পুরো ফাইল চাই। কাল সকালেই।”


এবং প্রথমবার তিনি নিজে যান এক প্রভাবশালী  ব্যক্তির অফিসে, যে ইচ্ছা করলেই সমস্যটার সমাধান হয়ে যাবে।


— “ভাইয়ের জন্য কিছু করতে চাই।”


জবাব আসে—

— “এখানে টাকা, পরিচিতি আর তথ্যের খেলা। আপনি প্রস্তুত তো?”


কামরান চৌধুরী শুধু মাথা নেড়ে বলেন—

— “এইবার শুধু খেলতে চাই না। জিততে চাই। কারণ এইবার খেলাটা রক্তের।”


তবে তার ভিতরে কোথাও একটা দ্বিধা এখনো কাজ করে।

মা, রঙ্গন, অতীত—সব মিলিয়ে মনে হয় কোনো দৃশ্যপট বদলাচ্ছে।


তিনি বুঝেছেন, প্রতিশোধ শেষ পর্যন্ত আত্মাকে ক্ষয় করে দেয়।

তিনি যাকে নামিয়ে এনেছেন রাজপথ থেকে,

আজ তাকেই আবার ফিরিয়ে আনতে চলেছেন।


তবে তিনি জানেন, এই ক্ষমা চিরকাল থাকবে না।

এই শুধু সময়ের একটা খেলাই মাত্র।

যদি আবার বিশ্বাস ভাঙে, যদি আবার রক্ত চায়—

তবে এইবার সে ভাই বলে নয়,

তবে সে হবে কেবল অপরাধী।


আর কামরান চৌধুরী কখনো দ্বিতীয়বার ভুল করে না।


১১


পরের সপ্তাহে হঠাৎ করেই বদলে যায় সব চিত্র।


জাতীয় এক প্রধান দৈনিকের প্রথম পাতায় শিরোনাম—

"ষড়যন্ত্রের শিকার বানিজ্যমন্ত্রী ইমরান আজিম চৌধুরী: তদন্তে মিলল চক্রান্তের প্রমাণ"


দুদকের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উঠে আসে, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যেসব নথি আগে তুলে ধরা হয়েছিল, তার বড় একটি অংশই ছিল ভুয়া, ভুয়ো সাক্ষর, মনগড়া আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।


সংসদীয় কমিটির এক সদস্য সরাসরি বলেন,

— “আমরা বুঝতে পারছি, এখানে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। এটা ছিল একধরনের চরিত্র হননের কৌশল।”


এই চাপে পড়ে, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সংবাদ সম্মেলনে বলেন,

— “আমরা ইমরান আজিম চৌধুরীর সততা ও দক্ষতায় অবিচল আস্থা রাখি। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, এটা খুবই দুঃখজনক।”


এরপরই ঘোষণা আসে—ইমরান আজিম চৌধুরী আবার পুরনো পদে ফিরছেন, নতুন করে বানিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন পরদিন।


প্রেসফটোতে দেখা যায়, ইমরান মাথা নিচু করে বসে আছেন—চোখে জল, পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ছোট ভাই আলি আজিম চৌধুরী কামরান। কেউ টেরও পায় না, যে কাঁধে হাত রেখে ভাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন কামরান, ঠিক সেই হাতেই কিছুদিন আগেও ছিল বিচারকালি ঠান্ডা প্রতিশোধ।


কিন্তু এখন সে স্থির, নরম।

কারণ, মা বিলকিস স্বপ্নে এসে বলেছিলেন—


 “মাফ করে দে, কামরান। ক্ষমা করাই তো বড় শক্তি।”


আর রঙ্গন?

সে নিজের ঘরে  বসে 

রঙ্গনের বাবা ও বড় চাচার সংবাদ দেখে, নিঃশব্দে বলে ওঠে—


— “আলহামদুলিল্লাহ।”


এ যেন একটা রক্তমাখা গল্পের সাময়িক বিরতি।

নিয়তির বইয়ে পাতা ওলটায়, কিন্তু লেখক বদলায় না।

আর সেই লেখকের নাম—আলি আজিম চৌধুরী কামরান।


© Md. Saidur Rahman Arpon 


#রঙ্গন_জমিদার
#অর্পন_রহমান
#razonnamystiverse
#saidurrahmanarpon


Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

গল্প ভালোবাসার ছাই