দূরত্বের প্রাচীর

 দূরত্বের প্রাচীর





নন্দিতা আর সুমিতের বিয়ের সম্পর্কটা তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে   হয়েছিল।  সবকিছু যেন ঠিকঠাক চলছিল। দুজনের স্বপ্ন ছিল বিয়ের পর নতুন জীবনে একে অপরের হাত ধরে চলবে। কিন্তু জীবন তো আর সিনেমা নয়।


বিয়ের প্রথম বছরটা বেশ ভালোই কাটল। নন্দিতা সুমিতের ছোটখাটো ভুলগুলো এড়িয়ে যেত, আর সুমিত নন্দিতার আবদারগুলো হাসিমুখে মেনে নিত। কিন্তু ধীরে ধীরে তুচ্ছ বিষয়গুলো বড় হয়ে উঠতে শুরু করল।


একদিন নন্দিতা আবিষ্কার করল, সুমিতের অফিসের এক সহকর্মী মেয়ে । যদিও সুমিত এটাকে, বারবার বুঝিয়ে বলতো এসব অফিসে চাকরি  ছেলে - মেয়ে একসাথে করে।  তবু নন্দিতার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। সে প্রতিদিন সুমিতকে এ নিয়ে প্রশ্ন করত, আর সুমিত প্রতিবার বিরক্ত হয়ে উত্তর দিত, "তুমি কি আমায় বিশ্বাস করতে পারো না?" নন্দিতা ছিলো প্রচুর সন্দেহ প্রবণ।  তার সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি রকম সন্দেহ ছিলো। 


অন্যদিকে, সুমিত অভিযোগ করত যে নন্দিতা তার পরিবারের ব্যাপারে খুবই উদাসীন। সে নন্দিতাকে বোঝাতে চেষ্টা করত, "তোমার দায়িত্ব কেবল আমায় নিয়ে নয়, আমার মা-বাবার প্রতিও।" কিন্তু নন্দিতা বলত, "তোমার মা-বাবা, ভাই- বোন তো আমাকে কখনো আপন করে নেয়নি। আমি কীভাবে তাদের খুশি করব?" সুমিত ছিলো পরিবারের প্রতি একনিষ্ঠ। স্ত্রী, ভাই-বোন, মা-বাবা সবাইকেই সমান ভালোবাসতো। তাদের সুমিতের প্রতি অবহেলা থাকলেও সে  ধরা দিতো না। বা তার স্ত্রীকে বকাঝকা করলেও প্রতিবাদ করতে পারতো না। 


এভাবে একে অপরের ওপর চাপ বাড়াতে লাগল। প্রতিদিনের ছোটখাটো তর্ক গড়াতে লাগল বড় ঝগড়ায়।



একদিন রাতে, তুমুল ঝগড়ার পর সুমিত চিৎকার করে বলল, "তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, এই সম্পর্কের আর কোনো মানে নেই।" নন্দিতা আরও উচ্চ গলায় উত্তর দিল, "তুমি তো আমার বিশ্বাস ভেঙেছো, আমি কেন তোমার অবিশ্বাসের বোঝা টানব?"


এরপর থেকে দুজন দুজনার সঙ্গে কম কথা বলত। এক ছাদের নিচে থেকেও তারা যেন দুই ভিন্ন জগতে বাস করত। সম্পর্কের তিক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, তাদের একে অপরকে দেখা মাত্রই বিরক্তি আসত।


কয়েক মাস পর, নন্দিতা আর সুমিত আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিল। কেউ কাউকে দোষ দিল না, কারণ তারা জানত, তাদের ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের জন্য উভয়েই দায়ী।



এখন দুজনেই আলাদা, কিন্তু মাঝে মাঝে স্মৃতিরা ফিরে আসে। একাকী রাতে নন্দিতা ভাবে, "কেন এমন হলো?" আর সুমিত জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, "সবকিছু ঠিক রাখতে পারতাম যদি একটু বেশি সহনশীল হতাম।"


সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বাস আর সহনশীলতা কতটা প্রয়োজন। বিশ্বাস আর বোঝাপড়ার অভাব যেন ভালোবাসার দুর্বল শিকড়ে আঘাত হেনে সব ভেঙে দেয়।

Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই