তন্ময়া সিরিজ গল্প: অচেনা অতিথি ৩য় পর্ব
তন্ময়া সিরিজ
গল্প: অচেনা অতিথি ৩য় পর্ব
অতীত
তন্ময়া জানত, তার অতীতের সাথে জড়িয়ে থাকা অন্ধকার শক্তির অস্তিত্ব একদিন তার কাছে ফিরে আসবে। সেই দিনটা আজ এসে পড়েছে। তার ভেতরের অশরীরী শক্তি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছিল, যেন কোনো সময় সীমা বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল না। সেগুলো তার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল।
কিন্তু তন্ময়ার কাছে এই শক্তির উৎস কী? তার এই অদ্ভুত ক্ষমতা কি জন্মগত? নাকি এটি কোনো প্রাচীন অভিশাপের ফলস্বরূপ? কোনো রহস্যময় ঘটনার শিকার হয়ে সে এই শক্তি পেয়েছে? তার পেছনে রয়েছে এমন কোনো গোপন ইতিহাস যা তাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে?
তন্ময়ার অতীতের অন্ধকার দাগগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করল। তার মুখে দৃঢ়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠছে।
ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই তাকে আজকের তন্ময়া বানিয়েছে।
প্রথম রক্ত তন্ময়ার বয়স তখন মাত্র আট। পাশের বাড়ির ড্রাইভার সুভাষ তাকে খেলনা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কাছে ডেকেছিল।
সুভাষের স্পৰ্শ প্ৰথমে তন্ময়াকে বিভ্রান্ত করেছিল, তারপর আতঙ্কিত করেছিল। সেই দিন বিকেলে মায়ের কিচেনথেকে ধারালো ছুরি নিয়ে সুভাষকে শেষ করেদেয় তন্ময়া।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কেউ কখনো সন্দেহ করেনি, এই খুনটা তন্ময়ার কাজ। তার ঠাণ্ডা মাথার কাজ দেখে সবাই ভেবেছিল, এটা কোনো পেশাদার কাজ।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় খুন
কিছুদিন পরে স্কুলের এক সিনিয়র ছেলে তন্ময়াকে বিরক্ত করেছিল। ছেলেটা প্রতিদিন স্কুলের পর তার পিছু নিত। একদিন, বাড়ির সামনের রাস্তার পাশেই ছেলেটা নিখোঁজ হয়ে গেল। তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল এক সপ্তাহ পর। মৃত্যুর কারণ কেউই খুঁজে বের করতে পারেনি।
তৃতীয় খুন ছিল আরও ঠাণ্ডা মাথায়। তার চাচার এক বন্ধু তাকে একদিন জোর করে একটা পার্টিতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সেই বন্ধুর গাড়িতে ব্রেকফেল করানোর প্ল্যান করেছিল তন্ময়া। পরের দিন সকালে লোকটার গাড়ি রাস্তার পাশের খাদে পড়েছিল।
চতুর্থ ও পঞ্চম শিকার
তার চতুর্থ খুন ছিল তার গ্রামের এক পীরবাবাকে,যিনি অন্ধবিশ্বাস আর লোভ দেখিয়ে গ্রামের মানুষকে শোষণ করতেন, নি:সন্তান দম্পতি কে লোভ দেখিয়ে স্ত্রীকে রেপ করতে।
তন্ময়া তখনো ছোটছিল, কিন্তু তার মাথায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। পীরবাবাকে তার খাবার পানিতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল সে।
পঞ্চম খুনটা ছিল আরও ভয়ংকর। তার এক খালাতো ভাইকে, তার খালাতো ভাই মাদকাসক্ত ছিলো, এমন কোন ঘৃনিত কাজ নেই যা করেনি। খালার পরিবারকে বাঁচাতে সেই ভাইকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তন্ময়া সরাসরি শ্বাসরোধে হত্যা করেছিল।
অতীতের প্রভাব এই পাঁচটি খুন তন্ময়ার বয়স মাত্র পনেরো পেরোনোর আগেই ঘটে। প্রতিবার সে বুঝতে পারত, তার ভেতরে অন্যরকম একটা শক্তি কাজ করছে। কেউ তাকে শিখিয়েছে তা নয় , কিন্তু তার কাজের ধরণ ছিল ঠাণ্ডা মাথার এবং নিখুঁত।
যেন কোনোঅদৃশ্য শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করত।
সাম্যর প্রশ্ন সাম্য একদিন তন্ময়ার অতীত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলল, "তুমি যে এতটা নিঃসংশয় আর ঠাণ্ডা মাথার সেটা কি জন্মগত, নাকি কিছু ঘটেছিল ছোটবেলায়?"
তন্ময়া একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, "আমার জন্ম স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী হয়েছিলো।
কিন্তু পাঁচটা খুন? তুমি কি কখনো নিজেকে দোষ দাও?" তন্ময়ার চোখে হালকা দুঃখের ছায়া নেমে এলো। "না। দোষ দিই না। কারণ আমি জানি, ওরা যা করেছে, তার পরিণতি এটাই হওয়া উচিত ছিল।"
নতুন রহস্য
তন্ময়া এবার নিজেকে নিয়ে ভাবতে লাগল। তার ভেতরের শক্তি কি জন্মগত, নাকি এই খুনগুলোর ফলেই তাকে অশরীরী শক্তির হাতিয়ার বানানো হয়েছে?
তার ভেতরের প্রশ্নগুলো একে একে মাথায় আসতে লাগল। সে ঠিক করল, তার অতীতের গভীরে আরও ঢুকতে হবে। হয়তো উত্তর সেখানেই লুকিয়ে আছে।
সাম্য ও তার দল, যারা কিছুদিন ধরেই তন্ময়ার সাথে কাজ করছিল, তার অতীতের নানা দিক সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। কিছু সদস্য তন্ময়াকে বিশ্বাস করতে চাইছিল, কিন্তু অন্যরা তার অতীতকে ভয় পাচ্ছিল এবং সন্দেহ করছিল। তার অতীতের খুনের ঘটনা এবং অশরীরী শক্তির গোপন রহস্য দলের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছিল। কিছু সদস্য তন্ময়াকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, অন্যরা তাকে বিপদজনক মনে করছিল।
তন্ময়ার সেই অন্ধকার অতীত একসময় আরও এক চ্যালেঞ্জের জন্ম দিলো—ব্ল্যাক ওয়েবের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং, যারা তন্ময়াকে ধ্বংস করার জন্য পেছনে লাগলো। তন্ময়ার বিরুদ্ধে পরিকল্পনা শুরু হলো। শত্রুরা জানতো না, তন্ময়া তাদের কৌশলগুলোর সবটা ভেঙে ফেলবে, কিন্তু সে কি তাদের পরিকল্পনা জানতো?
এদিকে, তার নিজের দলের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতকতা হতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ তন্ময়াকে নিজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছিল, আর কেউ চেয়েছিল তাকে ধ্বংস করে ফেলে নিজের শক্তি বাড়াতে। সে বুঝতে পারছিল, সে যে কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না, কারণ যে কোনো সময় তার নিজের মানুষও তার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে।
তন্ময়া এখন এমন এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যতের মাঝে এক ভয়ংকর দ্বন্দ্ব চলছে। তাকে তার ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জানতে হবে। তার অতীতের সব খুন, রক্তাক্ত ঘটনাগুলো তাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
শেষ খেলা শুরু হতে চলেছে। তন্ময়া কি তার অশরীরী শক্তির প্রকৃত উৎস খুঁজে পাবে? কীভাবে সে এই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে? নাকি এই শক্তি তাকে পুরোপুরি গ্রাস করবে?
এই সংকটের মধ্যে তন্ময়ার ভবিষ্যত এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ হয়তো তার জীবন বা মৃত্যু নির্ধারণ করবে।
তন্ময়া জানত, তার সামনে যে যুদ্ধ এসেছে, তা শুধুমাত্র তার শরীরের নয়, মনেরও। ব্ল্যাক ওয়েবের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং তাকে হত্যার জন্য আগেভাগেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। তাদের এই চক্রান্ত এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তন্ময়া জানতো, সে একা নেমে পড়লে এই যুদ্ধ তার জন্য শেষ হতে পারে। কিন্তু তার ক্ষমতার উৎসের রহস্য উন্মোচন না হলে, সে কখনই শান্তি পাবে না ।
সাম্য, তন্ময়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, তাকে সতর্ক করেছিল—“তুমিই আমাদের শেষ আশ্রয়। যদি
তুমি অশরীরী শক্তির হাতে চলে যাও, তাহলে আমরা সবাই হারিয়ে যাব।” তবে, তন্ময়া জানতো, এভাবে চললে তার জীবন কোনোদিন শান্ত হবে না।
তাকে এই শক্তির খোঁজ নিতে হবে,একে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অথবা তার চক্রান্তের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। সন্ধ্যার দিকে, যখন সব কিছু শান্ত ছিল, তন্ময়া তার দলের সাথে একটা সুরক্ষিত জায়গা মিলিত হয়। তবে সে জানতো, একটাও ভুল পদক্ষেপ তার দলকে বিপদের মধ্যে ফেলতেপারে।
আচমকা, বাইরে থেকে গুলি চালানোর শব্দ এলো। পাল্টা তন্ময়ার দলও গুলি শুরু করলো। গুলি চালাচ্ছিল দুই দল একে অপরের ওপর।
এই ক্রসফায়ারের মধ্যে তন্ময়া আটকা পড়েছিল।
শত্রুরা যদি তন্ময়াকে বন্দি করতে পারে, তাহলে ব্ল্যাক ওয়েবের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে, তন্ময়া একা শত্রুদের জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তার শরীরের ভিতরে সঞ্চিত অশরীরী শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়ে গিয়েছিল যে, সে কখনও না চেয়েও যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছিল।
একদিকে শত্রুদের গুলি, অন্যদিকে তন্ময়ার অশরীরী শক্তির বিস্ফোরণ। ক্রস ফায়ারে অদৃশ্য শক্তি এমনভাবে হস্তক্ষেপ করছিল যে, কিছু মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেল।
গুলি চলছিল, রক্ত ঝরছিল, কিন্তু তন্ময়া তখনো নিজের শক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখছিল।
তন্ময়ার মৃত্যু
যুদ্ধ থামেনি। ক্রস ফায়ারের মাঝে তন্ময়ার যুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠছিল। সে জানত, শত্রুদের কৌশল তাকে শেষ করতে পারবে না, তবে তার নিজস্ব অশরীরী শক্তির নিয়ন্ত্রণ হারানো এক বড় বিপদ। সে জানতো, যত বেশি শক্তি সে ব্যবহার করবে, ততই তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
ব্ল্যাক ওয়েবের শত্রুরা একে একে পিছু হটতে শুরু করল, তন্ময়ার অবিশ্বাস্য শক্তির সামনে। তন্ময়া জানতো, এরা খুব শীঘ্রই পুনরায় ফিরে আসবে, তবে তখন হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—"আমি কি এই যুদ্ধে বেঁচে ফিরব, নাকি শক্তির ক্ষয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব?"
শত্রুরা পিছিয়ে গেলেও, তন্ময়ার মনের অন্ধকার সেই মুহূর্তে আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। তার অশরীরী শক্তির আসল রহস্য এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব বুঝে সে একের পর এক আত্মবিশ্বাসের সাথে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। তবে, তার শরীর আর সেই শক্তি সহ্য করতে পারছিল না।
তন্ময়ার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সাম্য। তার চোখে অস্থিরতা, উদ্বেগ ছিল। "তন্ময়া, থামো। তোমার শরীর আর এসব সহ্য করতে পারছে না," সাম্য বলল, তার কণ্ঠে চাপ অনুভূত হচ্ছিল।
"আমি থামব না," তন্ময়া শক্ত হয়ে বলল। "এটা শেষ করতে হবে। এভাবে চলে গেলে আমার অতীত আমাকে কখনো শান্তি দেবে না।"
তারপরই, এমন এক ঘটনা ঘটল যা তন্ময়াকে চিরকাল বধির করে দিল। ব্ল্যাক ওয়েবের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং তার শেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল—একটি বিষাক্ত অস্ত্র, যা তন্ময়ার অশরীরী শক্তির উৎসকে দুর্বল করতে সক্ষম ছিল। তারা জানত, যদি তন্ময়া আর শক্তি ব্যবহার করতে না পারে, সে তখন মরিয়া হয়ে পরিণতি বরণ করবে।
একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটল। তন্ময়ার শরীর থেকে অশরীরী শক্তি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগল, কিন্তু সেই শক্তি তাকে আরও দুর্বল করে তুলেছিল। তন্ময়ার চোখে যন্ত্রণা এবং হতাশার ছাপ ছিল। তার অবশ হয়ে আসা শরীরের সাথে, তার মনেও অন্ধকার জমছিল।
“কী হলো, তন্ময়া? তুমি কি থেমে যাবে?” সাম্য তার কাছে গিয়ে বলল, কিন্তু তন্ময়া আর কোনো জবাব দিতে পারল না। তার শ্বাস সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। তন্ময়ার মাথায় শেষ মুহূর্তে এক চমক দিল, যেন সে মনে করছিল, এটাই তার জীবনের শেষ অধ্যায়।
অবশেষে, তন্ময়া এক ঝটকায় পড়ে গেল। তার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল, এবং তার অশরীরী শক্তির প্রবাহ হারিয়ে গেল। সমস্ত গহীন অন্ধকার, যা তাকে শক্তি দেয়, তা নিঃশেষ হয়ে গেল। তন্ময়া হারিয়ে গেল। তাকে নিয়ে আসা শক্তি, রহস্য এবং অন্ধকার এক দুঃস্বপ্নের মতো পৃথিবী থেকে চিরকাল বিদায় নিল।
সাম্য হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে তন্ময়ার শেষ মুহূর্তে বলা কিছু কথার স্মৃতি, যা তাকে জীবনের শেষ পর্যন্ত তাড়া করবে। "তুমি কখনো আমাকে বিশ্বাস করেছিলে না," তন্ময়ার মুখে ছিল সেই শেষ যন্ত্রণাদায়ক কথা। “তোমরা কখনো জানবে না, কেন আমি এই পথে হাঁটলাম…”
এটা ছিল তন্ময়ার শেষ যুদ্ধ। কিন্তু তার মৃত্যু, তার অতীত এবং তার ক্ষমতার রহস্য আরও অনেক বেশি প্রশ্ন রেখে গেল—এক প্রশ্ন যা হয়তো কোনোদিন সমাধান হবে না।
তন্ময়ার মৃত্যু পরবর্তী পৃথিবীকে অশান্ত করে তোলে। তার অতীত, তার ক্ষমতা, এবং তার অনুসৃত পথের সব কিছুই মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। আর সেই অন্ধকারের পথ দিয়ে যারা হেঁটে চলেছে, তারা জানে, তন্ময়ার মতো আরও অনেক অচেনা অতিথি তাদের ভবিষ্যতে আসবে।
.webp)
nc
ReplyDelete