প্রেমের গল্প হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে মন বাড়িয়ে ছুঁই

প্রেমের গল্প

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে

মন বাড়িয়ে ছুঁই







নিশিথের আঁধারে নদীর পাড়ে নেমে এলো তারা। সাদিক আর তার স্ত্রী রূপা। গ্রামের পুরোনো মাঝি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল নৌকাটা নিয়ে। সাদিকের এক পা পাড়ে, অন্য পা নৌকায়। হাত বাড়িয়ে রূপাকে নৌকায় ওঠালো। রূপা চিরকাল সাঁতার জানত না, কিন্তু নদীর টানে, নৌকার ভ্রমণে তার অদ্ভুত মুগ্ধতা ছিল।


“একটু সাবধানে বসো, নৌকাটা ডুবতে পারে।” সাদিকের কথায় মৃদু হাসল রূপা।


নৌকাটা ধীরে ধীরে নদীর মাঝখানে ভেসে চলল। চাঁদের আলোয় নদীর জল রুপোর মতো ঝলমল করছে। হালকা বাতাসে রূপার চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিলো সে। মন চলে গেল অতীতে—যেখানে ছিল প্রেম, সুখ আর অশ্রুভেজা বিদায়।




তখন রূপার বয়স সবে কুড়ি। শহরের ব্যস্ত জীবনের বাইরে, গ্রামের স্কুলের মাঠে প্রথম দেখেছিল আবিদকে। আবিদ ছিল মৃদুভাষী, গম্ভীর কিন্তু অদ্ভুত এক আকর্ষণ ছিল তার চোখে। তাদের প্রেম জমে উঠেছিল ঠিক নদীর মতো—শান্ত কিন্তু গভীর।


এক রাতে আবিদ তাকে বলেছিল, “তোমার নৌকায় ওঠার এত শখ! আমি তোমাকে একদিন এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে শুধু তুমি আর আমি, আর মাঝখানে নদী থাকবে।”


সেই রাতে তারা গিয়েছিল নদীর পাড়ে। আবিদের হাত শক্ত করে ধরেছিল রূপা। নৌকায় উঠে সে ভয়ে কেঁপে উঠেছিল, কিন্তু আবিদের আলিঙ্গনে তার সমস্ত ভয় দূর হয়ে গিয়েছিল। তাদের প্রেম সেই নদীর জলের মতো প্রবাহিত হয়েছিল—অকৃত্রিম, নিরবচ্ছিন্ন।


কিন্তু রূপার পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি। তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। আবিদ চিরতরে হারিয়ে যায় তার জীবন থেকে।



আজ এত বছর পর, সাদিকের সঙ্গে নৌকায় বসে রূপার মনে পড়ছিল আবিদের কথা। আবিদের হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শ যেন এখনো অনুভব করছিল। সাদিক তখন ব্যস্ত মাঝির সঙ্গে কথা বলতে।


রূপা তাকিয়ে দেখল নদীর ঢেউ। চাঁদের আলোয় সেই পুরোনো রাতের স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠল তার মনে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। সে বুঝতে পারল না, তার দম বন্ধ লাগছে কেন।


“সাদিক...” রূপা কাঁপা গলায় ডাকল।


সাদিক ফিরে তাকানোর আগেই রূপা নৌকা থেকে পানিতে পড়ে গেল।




মাঝি চিৎকার করে উঠল, “বউমা পানিতে পড়ে গেল!”


সাদিক দ্রুত পানিতে ঝাঁপ দিল। কিন্তু নদীর স্রোত যেন সেই রাতের মতোই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সাদিকের হাত বারবার ফসকে যাচ্ছিল। রূপার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল।


তার চোখের সামনে এক ঝলক ভেসে উঠল আবিদের মুখ। 
আদিব সব সময় নির্মলেন্দু গুনের একটা কবিতা শোনাতো রুপাকে। সেই কবিতাটাই কানে বাজতে রইলো।

 হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,                                মন বাড়িয়ে ছুঁই,

দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই৷
হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই

তুই কেমন করে যাবি?

পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি৷
তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই৷
তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জাড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,

তুই উঠবি আমার নায়ে,

আমার বৈতরনী নায়ে৷
নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব৷
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দু:খ দিয়ে ছোঁব৷

তুই কেমন করে যাবি?



যেন আবিদ অপেক্ষা করছিল তাকে নদীর ওপারে    নিয়ে যাওয়ার জন্য।                                                        রূপার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটল।


শেষবারের মতো তার চোখ বন্ধ হল। নদীর বুকেই তার চিরশান্তি মিলল।

Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই