সেপারেশন ম্যারেজ

সেপারেশন ম্যারেজ









  


মিথিলা আর শুভর বিয়েটা হয়েছিল বেশ আয়োজন করে। পরিবারের সবাই ভেবেছিল তারা একসাথে সুখে সংসার করবে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের মাঝে এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিল। মিথিলা কাজের প্রয়োজনে সব সময় শহরের বাইরে, আর শুভর অফিসের কারণে তাকে শহরেই থাকতে হয়। দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত, আর এই ব্যস্ততা তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলছিল। একসাথে সময় কাটানো তো দূরের কথা, দেখা করাই যেন বিরল হয়ে গিয়েছিল।




প্রথম দিকে তারা সম্পর্কটাকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যত দিন গড়াচ্ছিল, ততই তাদের মধ্যে মতের অমিল বাড়তে লাগল। একদিন মিথিলা বলল, "শুভ, তুমি কি জানো জাপানে এখন নতুন এক ধরনের বিয়ের ট্রেন্ড চলছে—'সেপারেশন ম্যারেজ'? স্বামী-স্ত্রী বিয়ের পরেও আলাদা থাকে, সপ্তাহে একদিন দেখা করে।"


শুভ কিছুটা অবাক হয়ে বলল, "সত্যি? কিন্তু আমাদের দেশে তো এটা অসম্ভব।" মিথিলা একটু হাসল, "অসম্ভব না হলেও, আমাদের পরিস্থিতির জন্য এটা বরং ভালো সমাধান হতে পারে।"



প্রথমবারের মতো আলাদা থাকা


একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল, দুজনেই আলাদা থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একসাথে সময় কাটাবে, আর বাকি দিনগুলো নিজের মতো থাকবে। তাদের এই সিদ্ধান্তে পরিবার অবাক হলেও মিথিলা আর শুভ দুজনেই অনেকটা হালকা বোধ করল। এই ব্যবস্থায় তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত জায়গা বজায় থাকল, কিন্তু সম্পর্কটাও টিকে রইল।


প্রথম মাসে তারা নিজের মতো করে জীবন কাটাতে থাকল। শুভ তার কাজের চাপ সামলে নিজের জন্য সময় বের করল। মিথিলা তার পেশাগত ব্যস্ততা সামলে তার জন্য প্রিয় কিছু কাজ করতে লাগল। এর ফলে তারা দুজনেই নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করল।



সাপ্তাহিকের একদিন


প্রতি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তারা নতুন কোনো জায়গায় বেড়াতে যেত, নতুন কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যেত। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক নতুন রঙ পেল। এই সময়টা তাদের মধ্যে নতুন এক উত্তেজনা নিয়ে আসল। আলাদা থাকায় তাদের মধ্যে আগের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়াও কমে গেল।


শুভ হাসতে হাসতে বলত, "দেখো মিথিলা, এইভাবে যদি সবকিছু সুন্দর থাকে, তবে আমার মনে হয় আমাদের সম্পর্কটা বেশ ভালোভাবেই টিকে থাকবে।" মিথিলাও মনে মনে এই সিদ্ধান্তে খুশি ছিল।



পারিবারিক চাপে পরিবর্তন


তবে একসময় তাদের এই আলাদা থাকার বিষয়টি নিয়ে পরিবার থেকে চাপ আসতে শুরু করল। মিথিলার মা একদিন তাকে বলল, "এভাবে কতদিন থাকবে? একসাথে সংসার করতে শিখতে হবে। সংসারের দায়িত্ব শুধু নিজেরটা দেখলেই হয় না।"


মিথিলা চুপ হয়ে গেল। শুভর পরিবার থেকেও শুভকে তাগিদ দিল একসাথে থাকার। তবে শুভ আর মিথিলা দুজনেই জানত যে, তারা একসাথে থাকার মতো মানসিক প্রস্তুতি এখনও তৈরি করতে পারেনি।



সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত


একদিন মিথিলা জানতে পারল, তার মা গুরুতর অসুস্থ। সে তৎক্ষণাৎ ছুটে গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াল। শুভও তার পাশে দাঁড়াল। এসময় শুভকে পাশে পেয়ে মিথিলা অনুভব করল যে, একসাথে থাকার মধ্যে সম্পর্কের একটি অন্য রকম মাধুর্য আছে। তবে এটা কেবল তীব্র সংকটের মুহূর্তেই বুঝতে পারা যায়।


মিথিলা ভাবল, 'আমাদের সম্পর্কের জন্য আলাদা থাকার নিয়মটা হয়তো কাজে আসছে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে এই "সাপ্তাহিক সংসার" কি আসলেই টেকসই হতে পারে?' শুভকে সে তার মনের কথা বলল।


শুভও তখন বলল, "তুমি ঠিক বলছো মিথিলা। হয়তো সম্পর্কের স্থায়িত্বের জন্য আমাদের মাঝে আরও গভীর সংযোগ প্রয়োজন।"



আবারও একত্রে বসবাসের সিদ্ধান্ত


তারা সিদ্ধান্ত নিল, এবার তারা একসাথে থাকবে, তবে আগের মতো নয়। তাদের সম্পর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত জায়গা থাকবে, কিন্তু তারা একসাথে সংসার করবে। এবার থেকে তারা নিয়মিত সময় কাটাবে, কিন্তু যখন একে অপরের ব্যক্তিগত জায়গার প্রয়োজন হবে, তখন তারা সময় নিয়ে আলাদা থাকবে।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই