ছোটগল্প : রিপার টাইমলাইন থেকে অনুপ্রেরিত কাক ও ময়ূর: মরীচিকা থেকে মুক্তি

 

ছোটগল্প : রিপার টাইমলাইন থেকে অনুপ্রেরিত 

কাক ও ময়ূর: মরীচিকা থেকে মুক্তি






  





একদিন বনের ধারে ঝর্ণার পাশে এক ময়ূর তার রঙিন পালক ঝেড়ে জল পান করছিল। তার সৌন্দর্য দেখে দূরে বসে থাকা একটি কাক মুগ্ধ হয়ে যায়। কাকটি কালো হলেও তার হৃদয়ে ছিল বিশুদ্ধ ভালোবাসার স্রোত। সে ময়ূরকে দূর থেকে দেখত আর ভাবত, “যদি কখনো ময়ূরকে আমার মনের কথা বলতে পারতাম!”


কিন্তু সাহস করতে পারত না। ময়ূরের চারপাশে সবসময় অন্য পাখিদের ভিড় লেগে থাকত। সেও বুঝত, ময়ূরের সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষণ করে। তবু কাক নিজের ভালোবাসার কথা জানাতে সিদ্ধান্ত নিল। একদিন ভোরবেলায় সে একটি কালো ফুল খুঁজে বের করল—যা তার নিজের মতোই সাধারণ, কিন্তু তার চোখে সেটিই ছিল বিশেষ। সেই ফুলটি একটি হলুদ খামে ভরে ময়ূরের বাসার সামনে রেখে এলো।


ময়ূর যখন সেই খাম খুলে দেখল, তার মন খারাপ হয়ে গেল। “কালো ফুল! এটা তো আমার সৌন্দর্যের প্রতি অপমান।” সে ভাবল, কাকের মতো কালো পাখি কখনো তার মতো রঙিন ময়ূরকে বুঝতে পারবে না।


কাকের সাথে যখন ময়ূরের দেখা হলো, তখন সে বলল, “তোমার রুচি কেমন, সেটা এই কালো ফুলই প্রমাণ করে। তুমি তো কালো বলেই হয়তো সুন্দর রঙের অর্থ বোঝ না।”


কাক কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল। তার হৃদয়ে ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা।




সময়ের স্রোত


বছর ঘুরে গেল। ময়ূর তার চারপাশের প্রশংসা ও ভক্তির স্রোতে ভেসে বেড়াতে থাকল। কিন্তু মাঝেমধ্যে ঝর্ণার ধারে বসে সে ভাবত, “কাকটা কোথায় গেল?” যদিও সে কখনো খুঁজে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি।


অনেক দিন পর, এক ঝড়বৃষ্টির দিনে, কাক ও ময়ূরের হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। ময়ূর এবার কাককে দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে বলল, “তুমি আমাকে ভালোবাসতে, তাই না? আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে তুমি আমাকে জয় করতে চেয়েছিলে। তবে কেন এত সহজে হার মেনে চলে গেলে?”


কাক হালকা হাসল। তার চোখে ছিল একরাশ শান্তি। সে বলল, “তোমার সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসা জন্মেছিল ঠিকই, কিন্তু যখন দেখলাম তুমি শুধু বাইরের রূপ দিয়ে জিনিসের বিচার করো, তখনই বুঝেছিলাম তুমি মরীচিকা। সেই ভুল পথ ছেড়ে সত্যিকারের জীবনের সন্ধানে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি।”


ময়ূর বিস্মিত হয়ে বলল, “তাহলে কি এখন তোমার কাছে কোনো সৌন্দর্যের মূল্য নেই?”


কাক উত্তর দিল, “সৌন্দর্য তখনই অর্থবহ, যখন তার সাথে সৌন্দর্যের মতো একটি মন থাকে। চোখের নেশা কেটে গেলে বাইরের সৌন্দর্যও ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যায়। জীবনের গভীরতা তখন বুঝতে পারি। সেই গভীরতাই আমাকে পথ দেখিয়েছে। এখন আর কোনো মরীচিকার পেছনে ছুটতে চাই না।”


ময়ূর কিছু বলল না। প্রথমবারের মতো তার মন খারাপ লাগল। সে বুঝতে পারল, কাক হয়তো তাকে তার চেয়েও বড় কিছু শিখিয়ে দিয়েছে—জীবনের প্রকৃত অর্থ।



বিদায় ও শিক্ষা


কাক আর ময়ূর আলাদা পথে হাঁটা শুরু করল। ধীরে ধীরে তারা একে অপরের দৃষ্টিসীমা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।


তারা দু’জনই নিজেদের পথে নতুন কিছু শিখল। ময়ূর শিখল, বাইরের রূপ কখনোই যথেষ্ট নয়, আর কাক শিখল, সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু মরীচিকার পেছনে ছুটে নয়, বরং বাস্তবতাকে গ্রহণ করেই পাওয়া যায়।


এভাবেই জীবনের সমুদ্র থেকে তারা নিজেদের মুক্তা সংগ্রহ করতে লাগল।

Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই