ইফ্রিতের প্রতিশোধ আমরা বলি কবুল করিনি



 ইফ্রিতের প্রতিশোধ আমরা বলি কবুল করিনি




অন্ধকার রাতে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরেও, চারদিকে যেন একধরনের রহস্যময় আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল। গ্রামের মানুষজন ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু খান বাড়ির উঠোনে আলো জ্বলছে। খান পরিবারে আজ অদ্ভুত কিছু ঘটেছে। বড় মেয়ে সুনয়না হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার-কবিরাজ কিছুতেই তার অসুখ বুঝতে পারছে না। পঞ্চাশোর্ধ্ব মৃণাল খান নিজে গিয়ে গ্রামের ওঝাকে ডেকে এনেছে।


ওঝা এসে খান বাড়ির আঙিনায় বসলো। চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়তে পড়তে তিনি বললেন,

"তোমাদের ওপর অশুভ শক্তি ভর করেছে। বলি দেয়া হয়নি সঠিকজনকে। যে বলি চেয়েছিল, সে খুব রেগে গেছে।"


মৃণাল খান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

"বলি তো দিয়েছিলাম! আমার মেয়ের বদলে আমার ভাইয়ের মেয়েকে বলি দিয়েছি। এতে কী ভুল হলো?"


ওঝা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন,

"ইফ্রিত প্রতারণা সহ্য করে না। বড় মেয়ে ছিলো তার দাবি। তুমি প্রতারণা করেছ। আর এখন সেই ইফ্রিতের প্রতিশোধ আসবে।"


মৃণালের শরীর কেঁপে উঠলো। মনে পড়লো সেই রাত। এক বছর আগে, শস্য কাটার উৎসবে গ্রামের পুরনো কুয়ো থেকে এক জিন বেরিয়ে এসেছিল। ইফ্রিত তার নাম। সে জানিয়েছিল, তাদের জমিতে এক অভিশাপ লেগে আছে, আর তা দূর করতে হলে বড় মেয়েকে বলি দিতে হবে। কিন্তু মৃণাল তার নিজের মেয়েকে দিতে পারেনি। তাই নিজের ভাইয়ের মেয়েকে বলি দিয়েছিল।


ওঝা বললেন,

"ইফ্রিত বলেছে, এখন সে তোমাদের সব শেষ করে দেবে।"





মৃণাল খানের প্রতারণা: স্মৃতির অধ্যায়


পাঁচ বছর আগের রাত


মৃণাল খানের মনে এখনও সেই রাতের স্মৃতি তাজা। গ্রামে শস্য কাটার উৎসব চলছিল, কিন্তু সেদিনই এক অভিশপ্ত ঘটনা ঘটে। মৃণালের জমির পাশের পুরনো কুয়ো থেকে বের হয় কালো ধোঁয়া। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে এক ভয়ানক কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ ছিল ইফ্রিতের—পুরানো কুয়োতে আটকে থাকা এক প্রাচীন জিন, যে বহু বছর ধরে প্রতীক্ষায় ছিল মুক্তির।


ইফ্রিত তখন গ্রামের সবাইকে ঘোষণা করে,

"তোমাদের পরিবার অভিশপ্ত। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হবে বলি। এবং সেই বলি দিতে হবে পরিবারের বড় মেয়েকে। নইলে, আমি সবাইকে শেষ করব।"


মৃণাল খান ভয় পেয়ে তখনই সিদ্ধান্ত নেন, ইফ্রিতকে সন্তুষ্ট করতে হবে। কিন্তু তার নিজের মেয়ে সুনয়নাকে বলি দেওয়া তার কাছে অসম্ভব।


পরিবারে দ্বন্দ্ব


সেই রাতে মৃণাল তার স্ত্রীকে বললেন,

"আমি সুনয়নাকে বলি দিতে পারবো না। কিছু একটা উপায় বের করতেই হবে।"


স্ত্রী নলিনী ভয়ে চুপ হয়ে গেলেও বললেন,

"কিন্তু ইফ্রিত বলেছে বড় মেয়েকে বলি দিতে হবে। তুমি যদি তা না করো, সে আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে।"


মৃণালের মনে তখন এক ভয়ংকর চিন্তা এলো। তার ভাইয়ের মেয়ে রেশমা, যে তাদের বাড়িতে থাকে এবং দেখতে প্রায় সুনয়নার মতোই। মৃণাল মনে মনে ভাবলেন, যদি রেশমাকে বলি দেওয়া হয়, তবে ইফ্রিত হয়তো সেটা বুঝতে পারবে না।

রেশমার বলি


মৃণাল আর নলিনী মিলে চক্রান্ত করলেন। রেশমাকে কোনো কিছু বুঝতে না দিয়ে গভীর রাতে তাকে কুয়োর কাছে নিয়ে যান। কুয়োর ধারে মন্ত্র পড়ে ওঝা মন্ত্রোচ্চারণ করে। মৃণাল কাঁপতে কাঁপতে রেশমাকে বললেন,

"এটা আমাদের গ্রামের জন্য করতেই হবে।"


রেশমা ভয় পেলেও বিশ্বাস করেছিল, চাচা-চাচি তাকে ভালোবাসেন। তাই কোনো প্রশ্ন না করেই সে সেদিন তাদের কথা শুনেছিল।


কুয়োর ধারে রেশমার বলি দেওয়ার পর কালো ধোঁয়া মিলিয়ে গেল। মনে হলো, ইফ্রিত শান্ত হয়েছে। মৃণাল খান আশ্বস্ত হলেন যে, তার মেয়ে সুনয়না বেঁচে গেছে।

অশান্তি শুরু


কিন্তু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কয়েকদিন পর থেকেই সুনয়নার শরীরে অদ্ভুত সব উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করলো। সে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করতো, যেন কেউ তাকে কুয়োর ধারে ডাকছে। মৃণাল খান বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু গ্রামের ওঝা বললেন,

"তোমরা ইফ্রিতকে প্রতারণা করেছ। সঠিক বলি না দিলে তার ক্রোধ এখন বাড়বে।"


মৃণাল চুপ করে রইলেন, কারণ তার আর কিছু করার ছিল না।

অভিশাপের প্রথম আঘাত


কয়েক মাস পর গ্রামের মানুষজন অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করলো। গবাদি পশুর মৃত্যু বাড়তে থাকলো। কুয়োর পাশে কেউ গেলেই সেখানে আগুনের ঝলক দেখা যেত। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারলো, ইফ্রিত এখনো তৃষ্ণার্ত।


মৃণালের মনে তখন প্রতিদিনই একধরনের ভয় কাজ করতো। তিনি জানতেন, প্রতারণার মূল্য তাকে একদিন দিতে হবে। কিন্তু তিনি নিজের মেয়ে সুনয়নাকে রক্ষা করার জন্য কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না।



এই স্মৃতিগুলোই মৃণালের জীবনে এক দুঃস্বপ্ন হয়ে রয়ে গেল। পাঁচ বছর পর যখন ইফ্রিত ফিরে আসে, মৃণালের প্রতারণার সেই ভয়ানক অধ্যায় আবার সামনে আসে। কিন্তু এবার আর পালানোর পথ ছিল না।


ইফ্রিত জানে প্রতারণার শাস্তি কীভাবে  দিতে হয়।


ইফ্রিতের প্রতিশোধের রাত


রাত গভীর হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ির চারপাশের অন্ধকার যেন গাঢ়তর হচ্ছে। হঠাৎ এক বিকট শব্দে বাড়ির দরজা খুলে গেল। বাতাসের ঝাপটায় ঘরের বাতি নিভে গেল। খান পরিবারের সবাই আতঙ্কে চিৎকার করতে লাগলো।


এক রহস্যময় কণ্ঠ শোনা গেল,

"আমরা বলি কবুল করিনি। এই পরিবারে বড় কন্যা চাই। তোর মা ছিলো বড়। কিন্তু তোরা ধোঁকা দিয়েছিস। এবার আমরা ধ্বংস আনবো।"


সেই কণ্ঠ ছিলো ইফ্রিতের। তার ভয়াল উপস্থিতি পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে তুলছিল। চারদিকে ঝড় শুরু হলো। মৃণাল তার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চাইতে লাগলো।


ইফ্রিতের ভয়াল রূপে সারা বাড়ি ভরে গেল। তার লালচে চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিল। তার চারপাশে কালো ধোঁয়া আর আগুনের স্রোত। ইফ্রিত চিৎকার করে বললো,

"বলি নাও, নইলে আমি সবাইকে শেষ করে দেবো।"

বাঁচার শেষ চেষ্টা


ওঝা আবার মন্ত্র পড়া শুরু করলো। তিনি বললেন,

"এখনও সময় আছে। যদি তুমি সঠিক বলি দাও, তবে ইফ্রিত শান্ত হবে।"


মৃণাল চিৎকার করে বললো,

"আমার মেয়ে বাঁচাতে আমি সবকিছু করব।"


তখনই সুনয়নার ছোট বোন আরতি সামনে এসে বললো,

"না, বাবা। যদি এই বলি সত্যি আমাদের রক্ষা করতে পারে, তবে আমিই বলি দিতে রাজি।"


মৃণাল আর তার স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু ইফ্রিত গর্জে উঠলো,

"আমি বলেছিলাম বড় মেয়েকে চাই। ছোট নয়। প্রতারণা এবার শেষ।"

শেষ পরিণতি


ইফ্রিত তার প্রতিশোধ সম্পন্ন করলো। তার ক্রোধে পুরো খান পরিবার ভস্ম হয়ে গেল। শুধু বাড়ির ছাই আর পোড়া গন্ধ রেখে ইফ্রিত মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।


এই ঘটনার পর থেকে কেউ আর খান বাড়ির ধ্বংসাবশেষে যেতে সাহস পায় না। গ্রামের মানুষ বলে, সেখানে রাত হলে ইফ্রিতের কণ্ঠস্বর শোনা যায়—

"প্রতারণার শাস্তি আমি দিয়েছি। আর কেউ যদি প্রতারণা করে, তারও এই পরিণতি হবে।"





ইফ্রিতের অভিশাপ: দ্বিতীয় অধ্যায়


ইফ্রিতের ক্রোধে খান বাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার অভিশাপ এখানেই শেষ হয়নি। গ্রামজুড়ে সেই রাত থেকে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করে। গ্রামের মানুষজন রাত নামার পর বাড়ির বাইরে বেরোতে ভয় পেতে লাগলো। কেউ বলতো কুয়োর পাশ থেকে কান্নার শব্দ আসে, আবার কেউ বলতো, লাল আগুনের আলো দেখা যায়।


পাঁচ বছর পর...

ধ্বংসস্তূপে পরিণত খান বাড়ি এখন বনজঙ্গলে ঢাকা। কিন্তু সেই জায়গা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে কৌতূহল বাড়তে থাকে। অনেকেই বিশ্বাস করে, খান পরিবারের বলি পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় ইফ্রিত তার অভিশাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে একদিন গ্রামের এক তরুণ গবেষক, আদিত্য, সিদ্ধান্ত নেয় এই রহস্য উন্মোচন করবে।

আদিত্যের অভিযান


আদিত্য গ্রামের স্কুলে পড়ায়। তার ছোটবেলা থেকেই ভূত-প্রেত আর জিনের কাহিনির প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ। তিনি জানতে পারেন, খান পরিবারের কুয়োটিই এই সব সমস্যার উৎস। সে তার বন্ধুদের নিয়ে সেই কুয়োর কাছে পৌঁছায়।


রাতের বেলা, মশাল হাতে কুয়োর চারপাশ খুঁজতে খুঁজতে আদিত্য দেখতে পায়, কুয়োর পাড়ে কিছু শিলালিপি খোদাই করা আছে। পুরনো লিপি পড়তে পারার জন্য আদিত্য সেটা বুঝতে পারলো। শিলালিপিতে লেখা ছিল,

"যে পরিবার প্রতারণা করবে, তার পরিণতি হবে চিরন্তন।"


এটি পড়ে আদিত্য বুঝলো, বলি শুধু ইফ্রিতকে শান্ত করতেই দেওয়া হয়নি। এটি একটি অতিপ্রাকৃত চুক্তির অংশ ছিল। খান পরিবার সেই চুক্তি ভেঙেছে, আর এই কারণেই অভিশাপ সক্রিয় হয়েছে।

ইফ্রিতের উপস্থিতি


শিলালিপি পড়া শেষ হতেই, হঠাৎ কুয়ো থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে লাগলো। আদিত্য ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেল। সেই ধোঁয়ার মধ্যে ইফ্রিতের বিশালাকৃতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। লালচে চোখ, আগুনের মতো চুল, আর শরীর থেকে বের হওয়া ধোঁয়া যেন তার ভয়াবহতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল।


ইফ্রিত গর্জে উঠলো,

"তোর সাহস হলো কুয়োতে আসার? জানিস না, আমি এখনো আমার প্রতিশোধ শেষ করিনি?"








আদিত্য ভয় পেলেও, সে দৃঢ় কণ্ঠে বললো,

"তুমি বলি চেয়েছিলে। কিন্তু বলি সঠিকভাবে হয়নি বলে পুরো গ্রাম কেন শাস্তি পাবে? এতে কি ন্যায় হচ্ছে?"


ইফ্রিত হেসে উঠলো। তার হাসি যেন পুরো পরিবেশকে কাঁপিয়ে দিলো।

"ন্যায় চাইলে বলি সম্পূর্ণ করতে হবে। সঠিক বলি দিতে পারলেই গ্রাম মুক্তি পাবে। কিন্তু সাহস করবে কে?"


নতুন বলি: প্রতিশোধের শেষ অধ্যায়


গ্রামে ফিরে আদিত্য এই কাহিনি সবাইকে জানায়। গ্রামের মানুষজন আতঙ্কে আবারো জমায়েত হয়। প্রশ্ন আসে, এই বলি দেবে কে? গ্রামের কেউই নিজের মেয়ে বা প্রিয়জনকে বলি দিতে রাজি নয়।


ঠিক তখন, এক বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বললো,

"আমার মেয়ে সুনয়না তখন ইফ্রিতের বলি হতে পারত। কিন্তু সে বেঁচে গিয়েছিল আর পুরো গ্রাম ধ্বংসের মুখে পড়েছে। আমি আর এই অভিশাপ সহ্য করতে পারছি না। আমি নিজেই ইফ্রিতের সামনে যাব।"


বৃদ্ধার এই সাহস দেখে গ্রামে সবাই অবাক। আদিত্য, তার দল আর গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধাকে নিয়ে কুয়োর কাছে যায়। সেখানে বৃদ্ধা শপথ নেয়,

"আমার মেয়ে ছিল ইফ্রিতের প্রথম দাবি। আজ আমি আমার নিজের জীবন দিয়ে সেই শাস্তি পূরণ করব।"

ইফ্রিতের শান্তি ও রহস্যময় সমাপ্তি


বৃদ্ধার আত্মত্যাগে ইফ্রিত শান্ত হয়। ধোঁয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর কুয়ো থেকে এক ভয়াল কণ্ঠ শোনা যায়,

"তোমাদের প্রতারণা শেষ হলো। এখন আমি মুক্ত।"


সেই ঘটনার পর কুয়োর আশেপাশে কোনো অদ্ভুত ঘটনা আর ঘটেনি। কিন্তু আদিত্য তার ডায়েরিতে লিখলো,

"ইফ্রিত চলে গেলেও এই গ্রামে এক অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে। হয়তো এই কাহিনি এখানেই শেষ নয়।"


শেষ? নাকি নতুন শুরু?


ইফ্রিতের অভিশাপ: তৃতীয় অধ্যায়


বৃদ্ধার আত্মত্যাগ গ্রামকে শান্তি ফিরিয়ে দিলেও, সেই শান্তির মধ্যে যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি লুকিয়ে ছিল। গ্রামবাসীরা ভাবছিল, সবকিছু কি সত্যিই শেষ?


কুয়োর রহস্য পুনর্জাগরণ


কয়েক মাস পেরিয়ে গেল। গ্রামের জীবন স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। কিন্তু একদিন, আদিত্য তার ঘরে বসে ডায়েরি লিখতে লিখতে হঠাৎ অনুভব করল, ঘরের জানালার বাইরে অদ্ভুত একটা ছায়া নড়ে উঠছে। সে উঠে গিয়ে জানালা খুলতেই দেখতে পেল, গ্রামের মাঝখানে সেই অভিশপ্ত কুয়োর ওপর যেন কোনো আলো জ্বলছে।


বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুলল। সে তাড়াতাড়ি তার বন্ধুদের ডেকে বলল,

"আমাদের আবার কুয়োতে যেতে হবে। কিছু একটা ঠিক নেই।"

আদিত্যর নতুন অভিযান


এইবার আদিত্য আর তার বন্ধুরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিল। হাতে মশাল, পকেটে কয়েকটি ধর্মগ্রন্থ আর কিছু লবণ নিয়ে তারা কুয়োর দিকে রওনা দিল। সেখানে পৌঁছেই তারা দেখতে পেল, কুয়োর আশপাশে জমি ফেটে গেছে, আর ভেতর থেকে ধোঁয়ার বদলে এবার অদ্ভুত এক নীলচে আলো বের হচ্ছে।


আদিত্য সাহস করে কুয়োর ধারে বসে আবার সেই শিলালিপি দেখতে লাগল। কিন্তু এবার শিলালিপির লাইনগুলো বদলে গেছে! সেখানে লেখা,

"প্রতিশোধ শেষ হয়নি। চুক্তি মুছে ফেলা হয়নি। ইফ্রিতের উত্তরসূরি আসছে।"

ইফ্রিতের উত্তরসূরির আগমন


কুয়োর ভেতর থেকে আবারো গর্জন শোনা গেল, কিন্তু এবার সেটি ইফ্রিতের চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর ও গভীর। ধোঁয়ার মধ্যে থেকে একটি নতুন আকৃতি ভেসে উঠল। এটি ইফ্রিতের মতো বিশাল হলেও তার গায়ে লালচে আলো নয়, বরং কালো আগুনের শিখা জ্বলছিল। তার কণ্ঠস্বর গভীর ও তীক্ষ্ণ।


"আমি তাজবির, ইফ্রিতের উত্তরসূরি। তোমাদের প্রতারণার চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। এই গ্রামের রক্ত আমাকে তৃষ্ণা মেটাবে।"


গ্রামের মানুষের ভবিষ্যৎ আবার এক গভীর বিপদের মুখে পড়ল।

তাজবিরের অভিশাপ


তাজবির ঘোষণা করল,

"ইফ্রিত যা শুরু করেছিল, আমি তা শেষ করব। এবার শুধু বলি দিয়ে হবে না, তোমাদের পুরো গ্রাম আমার অধীনে থাকবে।"


আদিত্য সাহস করে তাজবিরকে জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কী চাও? আমরা কিভাবে তোমার ক্রোধ থামাতে পারি?"


তাজবির তার ভয়াল কণ্ঠে বলল,

"ইফ্রিতের চুক্তি বাতিলের জন্য আমাকে একটি প্রাচীন মন্ত্র পাঠ করতে হবে। কিন্তু সেই মন্ত্র আনার জন্য তোমাদের এক সাহসীকে জাহান্নামের প্রবেশদ্বারে যেতে হবে।"

জাহান্নামের পথে অভিযাত্রা


আদিত্য সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজেই এই মিশনে যাবে। গ্রামের ওঝার কাছ থেকে সে জানতে পারল, জাহান্নামের প্রবেশদ্বার এই গ্রামের বাইরে এক গভীর বনে লুকিয়ে আছে। সেখানে পঞ্চমুখী গাছের নিচে পাওয়া যাবে সেই দরজা।


আদিত্য তার বন্ধু অনীক ও তার বোন মীরা-কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গভীর বনে গিয়ে তারা পঞ্চমুখী গাছের নিচে এক রহস্যময় দরজা পেল। দরজার ওপরে লাল রঙে লেখা ছিল,

"প্রবেশ করো, তবে ফিরতে চাইলে সাহস নিয়ে এসো।"

জাহান্নামের রহস্য


তারা দরজা খুলে প্রবেশ করতেই নিজেকে এক ভয়ানক জগতে আবিষ্কার করল। এখানে সবকিছু অদ্ভুত লালচে আলোয় ঢাকা, আর বাতাসে জ্বলন্ত সালফারের গন্ধ। তারা দেখতে পেল, একটি বিশাল পাথরের ওপর মন্ত্রটি লেখা আছে। কিন্তু সেই মন্ত্রের পাহারায় ছিল এক ভয়ানক জিন, যার নাম জাহরিল।


শেষ লড়াই


আদিত্য বুঝতে পারল, মন্ত্র পেতে হলে জাহরিলকে পরাজিত করতে হবে। সে তার সঙ্গে আনা লবণ আর ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করে জাহরিলকে আটকে ফেলল। কিন্তু মন্ত্রটি পড়ার সময়, সে টের পেল তার নিজের জীবন এর বিনিময়ে দিতে হবে।


আদিত্য মন্ত্রটি পাঠ করল এবং শেষবারের মতো তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,

"গ্রামের ভবিষ্যৎ আমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে ভুলে যেও না।"

তাজবিরের পরাজয়


মন্ত্র পাঠ হতেই জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, আর তাজবিরের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে গেল। গ্রাম আবার মুক্তি পেল, কিন্তু আদিত্য আর ফিরে আসেনি।




গ্রামের মানুষ তাকে এক বীর হিসেবে স্মরণ করল। কিন্তু কুয়োর ধারে এখনো মাঝেমধ্যে ফিসফাস শোনা যায়, যেন কেউ বলছে,

"সব চুক্তি কি সত্যিই শেষ হয়েছে?"



শেষ? নাকি আবার কোনো নতুন শুরু অপেক্ষা করছে?


শেষ।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই