গল্প: ঘৃণা এবং বিষাদ
গল্প: ঘৃণা এবং বিষাদ
![]() |
| বাবার খোঁজে রুপা |
অধ্যায় ১: পালানোর পথ
রাতের গভীরতায় চারদিকে কেবল শূন্যতা। সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে ছেলেটি, নাম রাজন, শেষমেশ নিজের স্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিল। তার স্ত্রী, নীলা, তাকে দেখে প্রথমে অবাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর নীলা বলল,
“তুমি এখানে কেন এসেছ? তুমি কি জানো, পুলিশ তোমার পেছনে?”
রাজন নিরুত্তর। তার মনে তখন শুধু একটাই ভাবনা, “এই পৃথিবীতে আমার জায়গা কোথায়? কেউ কি আমাকে নিজের বলে ভাবতে পারবে?”
অধ্যায় ২: সম্পর্কের ফাটল
রাজন বলল “তুমি কখনো আমার হতে চাওনি, হওনি, আর কোনোদিনও হতে পারবে না।
নীলা আর সহ্য করতে পারল না। তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো বিষাক্ত শব্দ,
তুমি একটা আধপাগল! কেউ তোমাকে সহ্য করতে পারে না। তোর সাথে বিয়ে হওটাই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
রাজন চুপ। তার ভাঙা মন আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তার চোখের কোণে অশ্রু জমছিল, কিন্তু কাঁদতে পারল না। একসময় চুপচাপ মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
অধ্যায় ৩: শূন্য জীবনের বৃত্ত
রাজন হারিয়ে গেল। কোথায় গেল, কেউ জানে না। তার অন্তরে জমতে শুরু করল নীলার প্রতি ঘৃণা। নীলা তাকে কখনো ভালোবাসেনি। বিয়ের পরও তাকে প্রতিনিয়ত অপমান করেছে, ছোট করেছে। রাজনের মনের গভীরে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠল।
এদিকে নীলার কাছে তার সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত। সে একা হয়ে গেল, কিন্তু রাজনের কথা মনে হলে তার মনে ঘৃণার চেয়েও একধরনের অনুশোচনা শুরু হলো।
অধ্যায় ৪: সন্তানের ভবিষ্যৎ
রাজন আর নীলা, তাদের দুই বছরের একটি সন্তান রয়েছে। ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে, নাম রূপা। রূপার ভবিষ্যৎ কী হবে? রাজন নিজের পিতৃত্বের দায়িত্ব থেকে পালালেও, রূপা তো নির্দোষ। নীলা একা হাতে তার ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, কিন্তু সমাজ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয় না। সবাই নীলাকে প্রশ্ন করে,
“তোমার স্বামী কোথায়? তার মেয়ের খোঁজ কি সে রাখে না?”
অধ্যায় ৫: প্রতিশোধের ছায়া
একদিন হঠাৎ, রাজনের কথা নীলা জানতে পারল। সে শহরের এক চাচার বাড়িতে লুকিয়ে আছে, পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে। নীলা তাকে দেখতে গেল। সেখানে গিয়ে তার মনে হলো, এই মানুষটি একসময় তাকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসার জায়গায় আজ এই মানুষটার চোখে বিষাদ আর ঘৃণা।
নীলা রাজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে বলল,
“তুমি পালিয়ে গিয়ে কি প্রমাণ করতে চাও? তুমি কি জানো, তোমার মেয়ে প্রতিদিন তার বাবাকে খোঁজে? তুমি কি তাকে এইভাবে বঞ্চিত করবে?”
রাজন কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে জল, কিন্তু তাতে ঘৃণার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা ব্যথাও ছিল।
অধ্যায় ৬: বাবাকে ভুলে
রাজন আর নীলা কেউ কারও কাছে ফিরে এল না। রাজন এক অজানা শহরে অদৃশ্য হয়ে গেল, আর নীলা একা তার মেয়েকে নিয়ে সংগ্রাম করতে থাকল। রূপা বাবাকে ভুলে গেল, কিন্তু তার মায়ের চোখের দুঃখ সে কখনো বোঝেনি।
এভাবেই ঘৃণা আর প্রতিহিংসার এই গল্প অসমাপ্ত রয়ে গেল। সম্পর্কগুলো শেষ হলেও, তাদের রেখে যাওয়া ক্ষত থেকে কখনো মুক্তি মেলে না।
অধ্যায় ৭: সত্যের মুখোমুখি
রূপা বড় হয়েছে। তার বয়স এখন বিশ। মায়ের দেওয়া প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার কারণে তার শৈশবটা বিষাদময় ছিল। বাবার অভাব, চাচা-ফুপুদের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া, এবং মায়ের কঠোর শাসন—এসব নিয়ে তার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
একদিন সে নীরার পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পেল। ডায়েরির পাতায় লেখা ছিল নীরার ভেতরের ভয়, সন্দেহ আর রাগের গল্প। সেখানে রূপা জানতে পারল, তার বাবা রাজন কখনো তার মাকে ছেড়ে যেতে চাননি। বরং নীরা ছিল সেই ব্যক্তি, যে বিয়ের পর থেকেই আলাদা থাকতে চেয়েছিল।
নীরার অভিযোগ ছিল, রাজন তার ভাইবোনদের প্রতি এতটাই দায়িত্ববান ছিল যে, তাদের নিয়ে নিজের জীবনের স্বপ্নগুলো পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে রাজি ছিল।
আসলে এমনটা নয়। প্রতিটা মানুষের যেমন ভাই-বোনদের প্রতি ভালোবাসা থাকে, অথবা নীলার নিজেরও যেমন মমতা ভাই-বোনের প্রতি, তেমনটাই ছিলো রাজনের।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল,
"রাজনের ভালোবাসা পেয়েছিলাম, কিন্তু নিজের অহংকার আর সন্দেহের কারণে তাকে হারালাম। এখন রূপাকেও হারানোর ভয় পাচ্ছি।"
রূপার মনে তখন একটাই প্রশ্ন জাগল, "তাহলে বাবা কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেল?"
অধ্যায় ৮: মায়ের প্রতি ঘৃণা
রুপা ডায়েরি পড়ে জানতে পারলো দোষটা তার বাবার নয়, তার মায়ের । বাবা তার মাকে ভালো বাসতো । নীরা বিয়ের পর থেকেই আলাদা থাকতে চেয়েছিলো। মেয়েটিকেও তার চাচা ফুপুদের সাথে মিশতে দেয় নি।
ডায়েরি পড়ার পর রূপার ভেতরে ভয়ানক রাগ জন্মালো।
"তুমি আমার বাবাকে হারিয়েছ, আমাকে আমার নিজের পরিবারের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত করেছ," রূপা চিৎকার করে বলল।
নীলা নির্বাক। মেয়ে যে একদিন তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তা সে কখনো ভাবেনি। রুপা নীরাকে ঘৃনা করতে শুরু করলো। এমন ঘৃনা মেয়ের কাছ থেকে পেলো যা কল্পনার বাইরে।
রূপার চোখে আগুনের শিখা। এই শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যাবে নীলার বাকিটা জীবন।
রুপার কাছে মনে হলো মায়ের বাবার প্রতি ভালোবাসা, মায়ের করা দু:খের অভিনয়, বাবার করা মাকে নির্যাতনের যে গল্প শুনে বড় হয়েছে তার সবটাই মায়ের ভণ্ডামি।
"তুমি শুধু নিজের সুখটা দেখেছ, মা! বাবার কোনো দোষ ছিল না। বাবার প্রতি তোমার অন্যায় আমি মেনে নিতে পারি না।"
নীলার চোখ দিয়ে জল ঝরল, কিন্তু রূপার চোখে তখন একটাই সিদ্ধান্ত—বাবাকে খুঁজে বের করতে হবে।
![]() |
| বাবা আমার বাবা কোথায় |
অধ্যায় ৯: বাবার খোঁজে
রূপা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। বাবাকে খুঁজতে শহরের অলি-গলি চষে ফেলল। রাজনের পরিচিত কেউ জানে না, সে এখন কোথায়। কেউ বলল, সে নাকি অন্য শহরে গেছে। কেউ বলল, হয়তো বেঁচেও নেই। কিন্তু রূপা হাল ছাড়ল না।
সে প্রতিদিন থানায় যায়, বাস স্ট্যান্ডে যায়, ভবঘুরে মানুষের ভিড়ে খোঁজ করে। তার বাবার ছবিটা হাতে নিয়ে সে সবার কাছে জিজ্ঞেস করে,
"আপনারা এই মানুষটিকে দেখেছেন?"
কিন্তু উত্তর সবসময়ই হতাশার।
অধ্যায় ১০: আধা-পাগল বাবার শেষ স্মৃতি
একদিন রূপা খবর পেল, এক ভবঘুরে মানুষকে নাকি তার বাবার মতো দেখতে। সে ছুটে গেল সেই জায়গায়। লোকটা রাস্তায় শুয়ে ছিল, আধা-পাগল আর বিধ্বস্ত। রূপা কাছে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু সেটা তার বাবা নয়।
তবুও, লোকটার চোখে সে তার বাবার যন্ত্রণা দেখতে পেল। নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেলল। মনে হলো, বাবাকে যদি সে এভাবে খুঁজে না পায়, তাহলে তার জীবনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
অধ্যায় ১১: শেষ পরিনতি
নীলা বাড়িতে একা হয়ে গেল। রূপার জন্য সে অপেক্ষা করতে থাকল, কিন্তু রূপা আর ফিরে এল না।
কিন্তু রূপার এই ঘৃণা কেবল নীলাকে ভেঙে দেয়নি, তাকে আরও একা করে তুলেছিল। নীলা একা বসে ভাবল,
"আমি কি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে, আমার মেয়েকেও হারিয়ে ফেললাম?"
নীলা বুঝতে পারল, মেয়ের মনে তার প্রতি যে ঘৃণা জন্মেছে, সেটা তার নিজের কর্মের ফল।
রূপা তার বাবাকে খুঁজছে , তার বাবা কোথায় আছে কেমন আছে, তা কেউ জানে না।
পিতাকে খুঁজে যাচ্ছে তার মেয়ে প্রতি নিয়ত। এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।
আর নীলা একলা ঘরে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে যেতে থাকল।
এ গল্পের শেষ ছিল না প্রতিটি বাঁকে ছিল বিষাদের ছায়া।
শেষ।
.webp)

Comments
Post a Comment