গল্প : ঘৃণা


গল্প : ঘৃণা






তন্ময়া আর অনিকের সম্পর্ক একসময় স্বপ্নের মতো ছিল। প্রথম পরিচয়ের দিন অনিকের মিষ্টি হাসি আর তন্ময়ার উচ্ছল কথাগুলো যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল। তারা দুজনেই ভেবেছিল, এই ভালোবাসা কখনো মলিন হবে না। কিন্তু জীবন তো আর সবসময় স্বপ্নের মতো চলে না।



অধিকার আর অভিযোগ


বিয়ের পরদিন থেকেই তন্ময়ার মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা দিল। তার কথাগুলো হয়ে উঠল তীক্ষ্ণ, অভিযোগে ভরা। ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু হলো। একসময় যেসব কথা হাসির কারণ হতো, সেগুলো এখন কটূক্তি হয়ে ফিরে আসতে লাগল।


“তুমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারো না,” তন্ময়া প্রায়ই বলত।

অনিক চুপ করে থাকত। সে ভাবত, হয়তো তন্ময়া সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে। কিন্তু বদল হলো না।

সে ভেবেছিল, তন্ময়ার জন্য সব কিছু করবে। কিন্তু তন্ময়া শুধু অপমানই দিয়েছে। আজ তার জীবনের শূন্যতায় ঘৃণার বীজ জন্ম নিয়েছে।


তন্ময়া হয়তো বুঝতে পারেনি, তার প্রতিটি কথা অনিকের মনে একধরনের বিষ ছড়াচ্ছে। অনিক চুপ করে থাকতে থাকতে একসময় নিজের ভেতরেই দূরত্ব তৈরি করে ফেলল।

দিনের পর দিন তন্ময়ার কথায় একটা অদ্ভুত তিক্ততা জমতে লাগল। ছোটখাটো ভুলগুলো বড় করে দেখা, সবকিছুতে খুঁত খোঁজা, এমনকি অনিকের ভালোবাসার প্রকাশকেও একসময় তন্ময়া অবজ্ঞা করতে শুরু করল।


“তুমি কি সত্যিই আমাকে বোঝো? আমার জীবনের প্রয়োজনগুলো কি তোমার চোখে পড়ে?”

অনিক বলার চেষ্টা করত, “তোমার জন্যই তো সব করি। তোমার জন্যই তো বাঁচি।”

কিন্তু তন্ময়া কখনো শুনত না।



তিক্ততা আর ঘৃণা বিষাদের শুরু


তন্ময়া আবার বলল, "আমি জানি তুমি আজকাল আর কিছুতেই মন দিচ্ছ না। কিন্তু তোমার ছেলের কথা ভেবে অন্তত আমাদের এই সম্পর্ক চালিয়ে যাও।"


“তুমি এমন কেন? তোমাকে ছাড়া   আমি বাঁচব না ভেবেছিলাম। এখন তুমিই আমার জীবনের সবথেকে বড় যন্ত্রনা”

তন্ময়ার এই চিৎকারে অনিক স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রথমবার সে অনুভব করল, তন্ময়ার কথাগুলো শুধু তিক্ত নয়, এতে তার প্রতি ঘৃণাও আছে।

একদিন, তন্ময়া কথা বলার মাঝেই চিৎকার করে উঠল।

“তুমি একটা আধপাগল! কেউ তোমাকে সহ্য করতে পারে না। তোমার পরিবার তোমার ভাই-বোন কারো কাছেই তোমার মূল্য নেই। তোমার মতো মানুষের সঙ্গে বিয়ে হওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”


অনিকের মনে ধীরে ধীরে জমতে লাগল তন্ময়ার প্রতি ঘৃণার অনুভূতি। সে বারবার ভাবত,

“তন্ময়া কি কখনো আমাকে ভালোবাসেনি? নাকি তার কাছে ভালোবাসার অর্থ শুধুই দম্ভ আর ক্ষমতার প্রদর্শন?”


বিয়ের পর থেকে তন্ময়া যেন প্রতিদিন তার আত্মসম্মানকে আঘাত করত।

“তুমি একজন অযোগ্য মানুষ, অনিক। তোমার কারণে আমি আজ এ অবস্থায়।”

এই কথাগুলো এখন অনিকের স্মৃতিতে দগ্ধ হয়ে আছে।


তন্ময়ার মিথ্যা সন্দেহ, প্রতিনিয়ত ছোটোখাটো বিষয়ে গালাগালি, এমনকি তার ভাইবোনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার—সবকিছুই অনিক সহ্য করেছিল। কিন্তু তন্ময়া কখনো বুঝতে চায়নি, তারও ভুল ছিল। একদিন তন্ময়াদের বাড়িতে বসে রাগের মাথায় অনিকের কলার ধরে টান দিয়েছিল, বাড়ির সামনে সবাই দেখেছিল।


অনিকের মনে পড়ল সেই রাত, যেদিন তন্ময়া তার বুকে লাথি মেরে ছিল। সেদিনের পর থেকে অনিক তন্ময়াকে কখনো গায়ে হাত তোলেনি। তন্ময়ার সম্মানের কথা ভেবে নিজের অপমান গিলে ফেলত। কিন্তু তন্ময়া তা বোঝেনি।


একসময় অনিক স্থির করল, সে আর তন্ময়ার সঙ্গে থাকবে না। তার ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে নয়, বরং তন্ময়া তা বিষাক্ত করে তুলেছে।


তন্ময়া ঘরের অন্য পাশে বসে আছে। সে জানে অনিক কিছু বলবে না। আজকাল তাদের কথার প্রয়োজন নেই; চোখে চোখ রাখারও প্রয়োজন নেই। যে সম্পর্ক একসময় ছিল ভালোবাসায় ভরা, তা এখন দমবন্ধ করা নিরবতায় ভেঙে গেছে।


তন্ময়া বরাবরই নিজের মতো ছিল। তার কথাগুলো ছিল ছুরির মতো ধারালো। প্রতিটি ঝগড়ার পরে, অনিক চেষ্টা করত শান্ত থাকার। কিন্তু দিনের পর দিন, তন্ময়ার তীক্ষ্ণ কথাগুলো তার মনকে বিষাক্ত করে তুলেছিল।

অনিক কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তার ভাঙা মন যেন এই অপমানের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে মেনে নিল। তার চোখের কোণে জমতে থাকা অশ্রু আড়াল করার চেষ্টা করল। 

অনিক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে বিষন্নতার ছাপ।

"তন্ময়া, আমি অনেক চেষ্টা করেছি। তোমার জন্য, আমাদের সন্তানের জন্য। কিন্তু তুমি আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছ, যেখানে আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি। আমার কাছে আর কিছু নেই দেওয়ার।"



অনিক একদিন গভীর রাতে বসে ছিল জানালার পাশে। বাইরের আকাশ ছিল নীরব। তার হাতের কাছে ছিল তাদের মেয়ের একটি ছবি। সে মনে মনে বলল,

“তোমার জন্যই তো এতদিন সহ্য করেছি। কিন্তু আর পারছি না।”


সেদিন প্রথমবার অনিক বুঝতে পারল, তন্ময়া তাকে শুধু দূরত্বে ঠেলে দেয়নি; তার হৃদয়ে একটা গভীর শূন্যতাও তৈরি করে দিয়েছে।কিন্তু সত্যি কথা হলো, অনিক ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিল।


কিন্তু তন্ময়ার সেই ঘৃণার বীজ এখন বিষাদের অরণ্য হয়ে অনিকের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে।

তন্ময়ার অভিযোগ বাড়তে থাকল। একসময় অনিক আর প্রতিবাদও করত না। তন্ময়া হয়তো ভাবত, অনিকের এই নীরবতাই তার জয়ের প্রমাণ। 


তন্ময়ার ঝগড়াগুলো তখন আর সম্পর্কের সমাধান খুঁজে বের করার জন্য ছিল না। বরং সেগুলো হয়ে উঠল এমন এক অস্ত্র, যা তাদের দুজনের মধ্যকার ভালোবাসার শেষ চিহ্নগুলোও ধ্বংস করে দিল।

তিক্ততা, ঘৃণা আর বিষাদের শুরু এখান থেকেই,

এই তিক্ততা তাদের ভালোবাসাকে শেষ করে দিয়েছে।

তন্ময়া নিজের আচরণে তা বুঝতে না পেরে নিজেই তৈরি করেছে সেই দূরত্ব, যা আর কখনো মিটবে না।

অনিক জানত না, সে কোথায় যাবে। তার কাছে কোনো গন্তব্য ছিল না। শুধু জানত, তন্ময়ার জীবন থেকে দূরে চলে যেতে হবে।


শেষ সিদ্ধান্ত


একদিন, গভীর রাতে, অনিক ব্যাগ হাতে তন্ময়ার সামনে দাঁড়াল। ঘরের ভেতর নীরবতা। তার মেয়েটি ঘুমাচ্ছে। তন্ময়া জানে, অনিক চলে যাবে।


অনিক ধীরে ধীরে বলল, “তোমার স্বপ্নে তুমি বাঁচো। আমি আমার স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলেছি। এবার নিজের জন্য বাঁচতে চাই।”

তন্ময়া চুপ থাকে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে, অনিক সত্যিই চলে যেতে চায়।


"তুমি আমাকে দোষ দিচ্ছ?" তার কণ্ঠস্বর কাঁপে।

"না, তন্ময়া। দোষের কথা বলার সময় পেরিয়ে গেছে। সম্পর্কের শুরুর দিনগুলো আমি আজও ভুলিনি। কিন্তু সেই দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল, জানো? তোমার কথার তিক্ততায়, তোমার ঝগড়ার শব্দে। আমি এই দূরত্ব চাইনি, তন্ময়া। তুমি নিজেই তা তৈরি করেছ। আর আমি শুধু বেঁচে থাকার পথ খুঁজেছি। আজ সেই পথ খুঁজে পেয়েছি—দূরে, বহুদূরে।"

রাতের শেষ প্রহরে অনিক ব্যাগ হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

 তার মেয়েটি ঘুমাচ্ছে। 

একবার মনে হলো, তাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাবে। কিন্তু সে জানে, এই বিদায় তার জন্য নয়। মেয়েটির জন্য বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে,  তবুও অনিক তাকে জড়িয়ে ধরলো না।

তন্ময়াও তাকে থামানোর চেষ্টা করল না।

একসময় মাথা নিচু করে তন্ময়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

 রাতের আকাশে চাঁদ ডুবতে বসেছে। সামনে অজানা পথ, অজানা গন্তব্য। সে জানে না কোথায় যাবে, শুধু জানে এই দূরত্বই তার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।




তন্ময়ার একাকীত্ব


তন্ময়া একা হয়ে গেল। প্রথমে তার মনে হলো, সে তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু রাত গভীর হলে, নীরবতার মাঝে অনিকের মুখ ভেসে উঠত। তার চোখে ভাসতো  অনিকের সেই নীরব চাহনি। কানে বাজতো।


“তুমি কি কখনো আমার হতে চেয়েছিলে?”


“তুমি কি কখনো আমার হতে চেয়েছিলে?”


“অনিক তো আমায় ভালোবাসত। আমি কি কখনো তার ভালোবাসাকে বুঝতে পেরেছি? নাকি আমার অভিমান আর রাগ তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে?”



ঘরের ভেতর তন্ময়া একা বসে থাকে। তার চোখে জল নেই। শুধু এক শূন্যতা।


অনিক হারিয়ে গেছে। তন্ময়া জানে, সে আর কখনো ফিরে আসবে না।


শূন্যতার বৃত্ত


তন্ময়া জানে না, অনিক কোথায়। অনিক জানে না, তন্ময়া তাকে নিয়ে আজও ভাবে। তাদের মধ্যে শুধু তিক্ততা আর দূরত্বের দীর্ঘ পথ।


তন্ময়া একা বসে নিজের ভুলগুলোর হিসাব কষে। তার চোখে জল নেই, শুধু এক শূন্যতা।


তার মনে পড়ে অনিকের শেষ কথাগুলো—

"তোমার স্বপ্নে তুমি বাঁচো। আমি আমার স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলেছি। এবার নিজের জন্য বাঁচতে চাই।"

“তুমি তিক্ততা ভালোবেসেছ। আমি দূরত্ব বেছে নিয়েছি।”

তন্ময়া হয়তো নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার অন্তরের গভীরে একধরনের অনুশোচনা শুরু হলো।


তন্ময়ার চারপাশে সেই নীরবতা, যা সে নিজেই তৈরি করেছিল। এই নীরবতা তাকে শান্তি দেয় না। বরং প্রতিটি মুহূর্ত তাকে অনিকের স্মৃতি দিয়ে দগ্ধ করে।


অনিক কোথায়

তন্ময়া আর অনিকের জীবন একসময় একসঙ্গে জড়িত ছিল, কিন্তু তাদের সম্পর্ক এখন কেবল এক শূন্য বৃত্তের মতো। অনিক তন্ময়াকে মনের গভীরে রেখে চলে গেছে, আর তন্ময়া একা বসে নিজের ভুলগুলোর হিসাব কষতে বসেছে।


তন্ময়া জানে না, অনিক কোথায়।

অনিক জানে না, তন্ময়া তাকে নিয়ে আজও ভাবে।

তাদের মধ্যে শুধু তিক্ততা আর দূরত্বের দীর্ঘ পথ।


অনিক হারিয়ে গেল। কোথায় গেল, কেউ জানল না। কেউ জানতেও চাইল না।


এই দূরত্ব কি কোনোদিন মিটবে? নাকি তাদের গল্প এখানেই শেষ হয়ে যাবে, শূন্যতার বৃত্তে হারিয়ে?


তন্ময়া তুমি আমাকে চেনো না, আমি দরকার হলে পৃথিবীর সব ছাড়বো।  কিন্তু যেখানে অবিশ্বাস, অপমান,  ঘৃনা, তিক্ততা,  সেখানে আর ফিরবো না। 


কষ্ট শুধু একটাই  "আমার মেয়েটা"

তুমি ওকে তোমার সত বানিও না।  ওকে মানুষ বানাও যার ভীতর অহমিকা নয় মানবিকতা থাকবে। ওকে আকাশের মত বানাও। দম্ভহীন, মানুষের প্রতি ঘৃনাহীন,  উদার। 

যদিও তোমার কাছ থেকে এইটা শিক্ষা পাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব  না, কিন্তু ওর বাবার কিছুটা হলেও ও যেন পায়। এই প্রার্থনা।


অভিশপ্ত জীবন

তন্ময়ার জীবন ক্রমশ এক অভিশপ্ত গহ্বরে নিমজ্জিত হলো। অনিকের চলে যাওয়ার পর তার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন এক অনন্ত শাস্তি।



তন্ময়ার চাকরির চাপ, আরুহির দেখাশোনা, আর নিজের ভেতরের শূন্যতা—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন হয়ে উঠল এক দুঃসহ যন্ত্রণার ঘূর্ণি।


তার মনে হতো, অনিক চলে যাওয়ার পর জীবন থেকে রঙ মুছে গেছে। চারপাশের প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাকে ব্যঙ্গ করে।


মাঝে মাঝে তন্ময়া ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে পুড়ত।
“আমি কি একাই এই দূরত্ব তৈরি করিনি? আমার অহংকার, আমার কথার তীব্রতা কি আমাদের সুখকে গ্রাস করেনি?”


কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই তার দিনগুলো আবার নীরবতায় ডুবে যেত।
আরুহির অসুস্থতা
একদিন আরুহি প্রচণ্ড জ্বরে ভুগতে শুরু করল। ছোট্ট মেয়েটি কাঁপছে, তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
তন্ময়া ছুটে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার বলল, “ওর শরীর খুব দুর্বল। মানসিক চাপও হয়তো ওর রোগকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।”


তন্ময়া বুঝতে পারল, আরুহি তার বাবার অভাব সহ্য করতে পারছে না।
মেয়েটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তন্ময়ার হাত ধরে বলল,
“মা, আমি বাবার কাছে যেতে চাই। বাবা কি আমাকে দেখতে আসবে?”


তন্ময়ার চোখ ভিজে গেল। সে বলল, “তোমার বাবা অনেক দূরে, মা। কিন্তু সে তোমাকে খুব ভালোবাসে। তুমিই তার পৃথিবী।”
আরুহি চোখ বন্ধ করল। তার ছোট্ট মুখটা তপ্ত জ্বরের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।


তন্ময়ার অনুশোচনা


তন্ময়া মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিজের জীবনের প্রতিটি ভুলের হিসাব কষে।

“আমি কেন এমন করলাম? কেন অনিকের ভালোবাসাকে তুচ্ছ করলাম? কেন আমি নিজের অহংকারের কাছে হেরে গেলাম?”


এই প্রশ্নগুলো প্রতিদিন তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
অনিকের কথা মনে পড়া
রাত গভীর হলে তন্ময়া জানালার পাশে বসে থাকত। বাইরে তাকিয়ে সে শুনতে পেত সেই কথাগুলো, যেগুলো অনিক শেষবার বলেছিল।


“তুমি তিক্ততা ভালোবেসেছ। আমি দূরত্ব বেছে নিয়েছি।

তন্ময়া তুমি আমাকে চেনো না, আমি দরকার হলে পৃথিবীর সব ছাড়বো।  কিন্তু যেখানে অবিশ্বাস, অপমান,  ঘৃনা, তিক্ততা,  সেখানে আর ফিরবো না। "


তার মনের গহীনে এক চিৎকার উঠে আসত, “অনিক, আমি ভুল করেছি। কিন্তু তুমি কেন মেয়েটার জন্যও ফিরে এলে না?”


অনিকের দূরত্ব যেন তন্ময়ার জন্য অভিশাপ হয়ে রইল।


“তুমি ঠিক বলেছিলে, অনিক। তিক্ততাই আমার ভালোবাসা ছিল। আর আজ এই তিক্ততা আমার জীবনটাকেই ধ্বংস করে দিল।”




 নীরব শাস্তি

তন্ময়া এখন একা। চার দেয়ালের মধ্যে দিন কাটে। ঘরের কোণে আরুহির খেলনা, তার পোশাক, তার ছোট ছোট জুতা। প্রতিটি জিনিস তার জন্য একেকটা শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।
তন্ময়া নিজেকে বলে,
“আমি এক অভিশপ্ত মা। আমার অহংকার, আমার ঘৃণা, আমার দূরত্ব আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি আর কখনো মুক্তি পাব না।”
তন্ময়া জানে, এই অভিশাপ তার জীবনসঙ্গী হয়ে থাকবে—একটি জীবন্ত দগদগে ক্ষতের মতো।


তন্ময়ার অভিশপ্ত জীবন: এক বিষাদময় অধ্যায়


তন্ময়ার জীবনে যেন অভিশাপ চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসে। যে বোনদের পরামর্শে সে অনিকের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করেছিল, সেই বোনদেরই অত্যাচারে আজ তার জীবন বিভীষিকাময়।


তন্ময়ার দুই বড় বোন, রিমা আর তৃণা, ছিল তার অভিভাবকসম। অনিকের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের সময় তারা প্রায়ই বলত,

"তুমি কেন এত সয়ে যাচ্ছ? নিজের মর্যাদা বোঝো। ও যদি তোমায় ভালোবাসত, এতদিনে তোমার সব শর্ত মেনে নিত।"

তাদের কথায় তন্ময়া নিজেকে শক্ত করতে গিয়ে ভুল বুঝেছিল অনিককে। তাদের কারণেই তিক্ততার দেয়াল এতটা উঁচু হয়েছিল যে, একদিন অনিক চলে যায়।


কিন্তু আজ সেই বোনরাই তন্ময়াকে সাহায্য করা দূরে থাক, তাকে বারবার অপমান করে। রিমার গলায় প্রায়ই বিদ্রূপ শোনা যায়,

"তোমার স্বামীও তোমাকে ছেড়ে গেছে। এর মানে তুমি ভালো বউ হতে পারোনি। আমাদের সঙ্গে এসে থাকতে চাইলে এই দুঃখি মুখে অভিনয় বন্ধ করো।"

তৃণা আরও নির্মম। তার গলায় সুর চড়া, "তোমার মেয়েটার জন্য যদি আমাদের কাছে আসতে হয়, তবে আমার ছেলেকে তোমার মেয়ে যেন হাত না দেয়। তোমার মতো ওর জীবনও বোধহয় বরবাদ হবে।"


সমাজের চাপ আর লোলুপ দৃষ্টি


তন্ময়া যেখানে যায়, সেখানেই তার প্রতি সমাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে পাড়ার মানুষজন পর্যন্ত তার অতীত নিয়ে মন্তব্য করতে ছাড়ে না।

"অনিক তো বেশ ভালো ছেলে ছিল, কেন ওকে যেতে দিলে?"

"মেয়েদের যদি স্বামীকে ধরে রাখতে না পারে, তাহলে এমনই হয়।"

তন্ময়া জানে না, কার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেবে।


তন্ময়ার ঘরের মালিক, এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি, প্রায়ই তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়।

"আপনার মেয়ের জন্য অনেক কষ্ট করেন। আমি চাইলে কিছু সাহায্য করতে পারি।"

তন্ময়া জানে, তার এই কথার পেছনে কতটা কদর্য ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।



মেয়েটির কষ্ট

মেয়ের কষ্টের অন্ত নেই

তন্ময়া প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে মেয়ের জন্য নাস্তা তৈরি করে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে তার মনে পড়ে অনিকের কথা।

“অনিক কি এখন কোথাও সুখে আছে? নাকি আমার মতোই তিক্ততার ভারে পিষ্ট হচ্ছে?”

কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর সে পায় না। তার দিনগুলো কাটে কেবল মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। মেয়েটি যেন অনিকের ছায়া—একই চোখ, একই হাসি।

পাঁচ বছরের ছোট্ট আরুহি বাবাকে ভুলতে পারেনি। তার মন ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন। স্কুলের অনুষ্ঠানে বাবা-মায়ের একত্র উপস্থিতি দেখে সে বাড়ি ফিরে কাঁদে।

"মা, বাবা কি আমাকে আর ভালোবাসে না?"

তন্ময়া চুপ করে মেয়ের চোখের জল মুছে দেয়। সে বলতে চায়, "তোমার বাবা তো আমায় ছেড়ে গেছে, তোমায় নয়।" কিন্তু এই সত্য কিভাবে সে তার মেয়েকে বোঝাবে?


তন্ময়ার পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে, আরুহি, বাবাকে প্রায়ই খোঁজে।
“মা, বাবা কবে আসবে? তুমি বাবাকে আনবে না?”
তন্ময়া কেবল মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। উত্তর দিতে পারে না।
একদিন আরুহি স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ বসে ছিল।
তন্ময়া জিজ্ঞেস করল, “কী হলো মা, কিছু বলছ না কেন?”


আরুহি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আজ সবার বাবা-মা স্কুলে এসেছিল। বাবার হাত ধরে সবাই খেলল। আমার বাবা কোথায় মা? তুমি বলেছিলে বাবা আসবে।”


তন্ময়ার বুকটা ফেটে গেল। সে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু আরুহির ছোট্ট বুকের কান্না থামল না।


তন্ময়া কেবল বলতে পারল, “তোমার বাবা তোমায় অনেক ভালোবাসে। কিন্তু সে দূরে আছে। একদিন ঠিক আসবে।”
কিন্তু তন্ময়া জানত, অনিক আর কখনো ফিরে আসবে না।

[তন্ময়া তুমি আমাকে চেনো না, আমি দরকার হলে পৃথিবীর সব ছাড়বো।  কিন্তু যেখানে অবিশ্বাস, অপমান,  ঘৃনা, তিক্ততা,  সেখানে আর ফিরবো না। ]


অসুস্থ মেয়ের লড়াই


আরুহি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। তার শরীর দুর্বল, প্রায়ই জ্বর আসে। ডাক্তার তন্ময়াকে জানায়,

"আপনার মেয়ের মানসিক চাপ শরীরের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলছে। ওর মন থেকে এই দুঃখ সরাতে হবে।"

তন্ময়া জানে, এই দুঃখ সরানো তার ক্ষমতার বাইরে। একদিন রাতে আরুহি ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠে বলে,

"মা, আমি বাবার কাছে যাব। তুমি কেন আমাকে ওর কাছে যেতে দাও না?"

তন্ময়া তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "তোমার বাবা খুব দূরে, মা। কিন্তু সে তোমায় ভালোবাসে। তুমি শক্ত হও, মা।"





অভিশপ্ত জীবনের যন্ত্রণা


তন্ময়ার প্রতিদিনের জীবন এক বিষাদময় শাস্তি। সকালে কাজে যাওয়ার আগে মেয়েকে দেখে সে ভয় পায়। "আজ যদি কিছু হয়ে যায়? আমি কী করব?"

অনিককে ফোন করার জন্য তার অজস্র চেষ্টা বিফলে যায়। প্রতিবারই নম্বর বন্ধ।


তন্ময়ার মনে হয়,

"আমি একসময় অনিককে ভালোবাসতাম। আর এখন সেই ভালোবাসার স্মৃতিই আমাকে তিলে তিলে শেষ করছে।"

বোনদের পরামর্শে সে অনিককে ছেড়েছিল, কিন্তু এখন তারাই তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—তন্ময়ার মতো স্বামী-পরিত্যক্ত নারীরা সমাজের বোঝা ছাড়া আর কিছু নয়।


তন্ময়া ফোনটা হাতে ধরে বসে আছে। অনিকের মেসেজটা বারবার পড়ছে। তার হাত কাঁপছে, চোখের কোণে জল। অনিকের শেষ কথাগুলো তার মনের ভিতর ঝড় তুলে দিয়েছে।


"আমি চলে যাচ্ছি, কষ্ট হচ্ছে মেয়েটির জন্য খুব। কিন্তু আরোহীর স্মৃতি নিয়ে ভালো থাকবো। আমাকে ফোনে, মেসেঞ্জারে খোঁজার চেষ্টা করো না। মানুষ যদি একবার শিকল ভাঙার আনন্দ পায়, তাহলে তাকে আর কিছু আটকাতে পারে না। 

তন্ময়া তুমি আমাকে চেনো না, আমি দরকার হলে পৃথিবীর সব ছাড়বো।  কিন্তু যেখানে অবিশ্বাস, অপমান,  ঘৃনা, তিক্ততা,  সেখানে আর ফিরবো না। 


ইতি, অনিক।"


তন্ময়ার মনে হলো, এই কয়েকটি বাক্যই তার জীবনকে ভেঙে চুরমার করে দিল।

কোনো অভিযোগ নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কেবল একটা বিদায়ের ঘোষণা।


তন্ময়ার প্রতিক্রিয়া


মেসেজটা পড়ার পর তন্ময়া চুপ হয়ে গেল। মনে মনে সে ভেবেছিল, হয়তো একদিন অনিক ফিরে আসবে। কিন্তু এই মেসেজ যেন সেই শেষ আশাটাও ছিনিয়ে নিল।


সে আবার মেসেজটা পড়ল, শব্দগুলো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

"শিকল ভাঙার আনন্দ..."

অনিকের জন্য সে কি শিকল ছিল?


তন্ময়া ধীরে ধীরে ফোনটা বিছানায় রেখে মেয়ের দিকে তাকায়। আরুহি জানে না, এই মেসেজের অর্থ কী। তার ছোট্ট মন বাবাকে শুধু ফিরে পেতে চায়।


আরুহি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

"মা, বাবাকে ফোন করো। আমি কথা বলব।"

তন্ময়া কিছু বলতে পারে না। কণ্ঠ যেন আটকে গেছে।


অভিশপ্ত অনুভূতির গভীরে ডুব


রাত গভীর হয়, কিন্তু তন্ময়ার মনে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়।

সে জানালার পাশে বসে থাকে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরোনো দিনগুলো। অনিকের সঙ্গে কাটানো সুখের মুহূর্তগুলো, বিয়ের প্রথম দিন, আরোহির জন্মের সময়ের উত্তেজনা।


এই প্রশ্নগুলো তার ভেতরে অনুশোচনার আগুন জ্বালায়।


আরোহির প্রতি মায়ের প্রতিজ্ঞা


তন্ময়া গভীর শ্বাস নেয়। আরোহি ঘুমিয়ে আছে, মুখে ম্লান এক প্রশান্তি। সে জানে না, তার বাবা তাদের জীবনে আর ফিরবে না।

তন্ময়া মেয়েকে দেখে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে,

"তুমি আমার সব। আমি তোমার জন্য লড়ব, বেঁচে থাকব। "


তবে তন্ময়ার মন জানে, এই লড়াই সহজ হবে না। লড়াইতে হেরে গেছে তন্ময়া জানে। সে অনিককে আটকাতে পারেনি। সমাজ, অভাব, অপমান—সবকিছু তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করবে। কিন্তু কিভাবে সে আরোহির বাঁচাবে। ও যে বাবা ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না।


তন্ময়ার মনে একবার প্রশ্ন ওঠে—

"অনিক কি সত্যিই শিকল ভেঙে মুক্তি পেয়েছে, নাকি সে নিজেও অনুশোচনায় পুড়ছে?"

কিন্তু সে এই প্রশ্নের উত্তর কখনো জানতে পারবে না।


তন্ময়া আবারও সেই মেসেজটা খুলে পড়ে। অনিকের বিদায় বাণী যেন তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—

"মানুষ যদি একবার শিকল ভাঙার আনন্দ পায়, তাকে আর কিছু আটকাতে পারে না।"


এটা কি সত্যিই আনন্দ, নাকি কেবল একটি অজুহাত?


প্রশ্ন: তন্ময়ার জীবন কি সত্যিই এই অন্ধকারেই শেষ হবে, নাকি কোনো একদিন সে নিজেই নিজের জীবনের নতুন দিশা খুঁজে পাবে? তার মেয়ের জন্য, নিজের জন্য?

 ভালোবাসা যদি তিক্ততায় হারিয়ে যায়, তবে সেই সম্পর্কের স্মৃতিই কি একমাত্র শাস্তি হয়ে থাকে? নাকি নতুন করে বাঁচার কোনো পথ থাকে, যা তন্ময়ার মতো কেউ কখনো খুঁজে পায় না?



সমাপ্ত।



Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই