গল্প: নীরা এবং কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর কবিতা অবলম্বনে
গল্প: নীরা এবং কবি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর কবিতা অবলম্বনে
প্রথম অধ্যায়: প্রথম দেখা
নীরা আর কবির প্রথম দেখা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর রাস্তার ধারে একটা পুরনো কাঠের বেঞ্চিতে বসেছিল নীরা। তার হাতে ছিল একটা বই, চোখে অদ্ভুত শান্তি। কবি তাকে দূর থেকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তে নীরা যেন এক জীবন্ত কবিতা হয়ে উঠেছিল।
কবি কাছে গিয়ে বলেছিল,
“তোমার দিকে তাকালে মনে হয় তুমি সরস্বতী। যদিও তুমি মানুষ, তবু দেবীর মতো মনে হয়। তোমার কি জানা আছে তুমি কে?”
নীরা হেসেছিল, সেই হাসিতে মিশে ছিল রহস্য।
“আমি দেবী নই। আমি কেবল নীরা। আপনি কি সবসময় এমন কথা বলেন?”
“আমি কবি। যা মনে আসে তাই বলি। কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হয়, আশীর্বাদ চাইতে ইচ্ছে করে। দেবীর মতো আশীর্বাদ দাও।”
নীরা অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিল,
“আশীর্বাদ চাইতে হলে আগে দেবী হতে হয়। আর আমি তো কিছুই নই।”
কবি শুধু বলেছিল,
“তুমি আছো, এই সত্যটাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।”
দ্বিতীয় অধ্যায়: সম্পর্কের সূচনা
এরপর শুরু হয় তাদের কথোপকথন। নীরা এবং কবি, দুই ভিন্ন জগতের মানুষ। নীরা বাস্তবের মাটিতে পা রেখে চলতে চায়, আর কবি সবকিছুতেই রূপক খুঁজে পায়। নীরা হাসে,
“আপনি এত কল্পনা করেন কেন? সবকিছু এত জটিল নয়।”
কবি বলে,
“তোমাকে দেখার পর আমার সরলতাও কোথায় হারিয়ে গেছে।”
নীরা অনেক সময় অবাক হয় কবির কথায়। তার মনে প্রশ্ন জাগে,
“আমি কি সত্যিই এমন কিছু যা কবির কল্পনায় দেবীর জায়গা পেয়েছে? নাকি এটা তার কল্পনার ফাঁদ?”
তৃতীয় অধ্যায়: দূরত্ব এবং অভিমান
একদিন কবি নীরার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল,
“তোমার ভিতরের ‘তুমি’কে দেখতে ইচ্ছে করে। এই সাজসজ্জা, এই মুখোশের আড়ালে যে তুমি, সে কি সত্যিই তুমি?”
নীরা অবাক হয়। তার অভিমান হয়।
“আপনি কি আমাকে বুঝতে পারেন? আমি কি শুধুই আপনার কল্পনার মানুষ?”
কবি জবাব দেয় না। সে জানে, তার কথাগুলোই হয়তো দূরত্ব তৈরি করছে। তবুও তার পক্ষে চুপ থাকা সম্ভব নয়।
নীরা একদিন কবিকে প্রশ্ন করে,
“আপনার আসল ইচ্ছে কী? আপনি কী চান?”
কবি মৃদু হেসে বলে,
“শুধু তোমার স্নেহ। আমি মেহের কাঙাল।”
নীরা বিরক্ত হয়।
“আপনার এসব কথা আমি বুঝি না। এত পাগলামি কেন?”
কবি থেমে যায়। কিন্তু তার মন জানে, নীরা তাকে পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।
চতুর্থ অধ্যায়: শেষ দেখা
একদিন নীরা এবং কবির দেখা হয় এক সিঁড়ির উপর। নীরা লাল শাড়ি পরে এসেছে। তার মুখে ছিল এক নিঃশব্দ অভিমান। কবি অনেকক্ষণ তার দিকে চেয়ে থাকে।
“তুমি জানো না, নীরা, তোমাকে দেখে মনে হয়, সময় থেমে গেছে। তোমার এই ছবি আমার মৃত্যুর পরও থাকবে।”
নীরা বলে,
“আপনি সবসময় মৃত্যুর কথা বলেন কেন? এটা কি আপনাকে শান্তি দেয়?”
কবি বলে,
“না। তবে তোমার আশীর্বাদ দিলে আমার মৃত্যুও মধুর হয়ে উঠবে।”
নীরা বিরক্ত হয়।
“আপনার পাগলামি আর ভালো লাগে না। আমি যদি সরে যাই, আপনি কী করবেন?”
কবি চুপ করে থাকে। নীরা চলে যায়।
পঞ্চম অধ্যায়: কবিতায় বেঁচে থাকা
কবি নীরার স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। তার প্রতিটি কবিতায় নীরার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।
নীরা আর কবির মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু তাদের হৃদয়ের গভীরে এক অপরিচিত টান রয়ে যায়। যেন এক অসম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক্ষায়।
একদিন নীরা কবির একটা লেখা পড়ে। সেখানে লেখা ছিল,
“তুমি আছো, তুমি আছো, এর চেয়ে বড় সত্য নেই। তুমি যদি ভুলে যাও, আমি তবুও তোমায় মনে রাখব। কারণ তুমি আমার জীবনের একমাত্র কবিতা।”
নীরা দীর্ঘক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে জল এসে যায়। সে বুঝতে পারে, কবি তাকে যা দিয়েছিল, তা কোনোদিন হারানোর নয়।
সমাপ্তি:
নীরা আর কবির গল্পটা শেষ হয় না। এটা শুধু সময়ের পরত জমা হওয়া এক কাব্য। দুজনের জীবন চলতে থাকে, কিন্তু তাদের স্মৃতিগুলো থেকে যায়। এক অপরূপ কবিতা হয়ে।

Comments
Post a Comment