গল্প: আরোহীর জন্য চিঠি

 গল্প: আরোহীর জন্য চিঠি








বাবার শেষ চিঠি


সন্ধ্যার আলো ম্লান হতে শুরু করেছে। আরোহী ঘরের কোণে ছোট্ট চেয়ারে বসে আছে। তার চোখে জল, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। তার সামনে টেবিলে একটি চিঠি রাখা। তন্ময়া রান্নাঘরে ব্যস্ত, কিন্তু তার মনও আজ ভারী। আরোহী সেই চিঠি বারবার হাতে নেয়, খোলে, পড়ে, কিন্তু কিছুতেই বাবার কথা মনে করে কান্না থামাতে পারে না।


চিঠিতে লেখা:


> আমার প্রিয় আরোহী,


তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ। আমি জানি, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ। কিন্তু, আম্মু, তুমি শক্ত হতে হবে। পৃথিবীটা অনেক কঠিন জায়গা। এখানে যারা নরম, তাদের জন্য কোনো জায়গা নেই।


আমি তোমার মার কাছে নরম হয়ে দেখেছি, কী পেয়েছি? অপমান, অবহেলা। আরোহী, আমি চাই না তুমি আমার মতো কষ্ট পাও। তুমি শক্ত হও।


তুমি কাঁদলে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু আম্মু, বাবারা কাঁদে না, বাবারা সন্তানদের কাঁদতে দেখে নিজেকে শেষ করে ফেলে। আমি চেয়েছিলাম তোমার জন্য সবকিছু ঠিক করে দিতে, কিন্তু সেটা আর সম্ভব হলো না। তাই আমি তোমাকে তোমার সবচেয়ে আপন মানুষ, তোমার মায়ের কাছে রেখে এসেছি।


তোমার মা হয়তো আমার অনেক দোষ-ত্রুটি বলবে। তুমি শুনবে। কিন্তু মনে রেখো, তোমাকে নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। তুমি আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।


ভালো থেকো। শক্ত থেকো। কারো জন্য কাঁদবে না। আমি হয়তো তোমার পাশে থাকতে পারলাম না, কিন্তু আমার দোয়া সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে।


ইতি, তোমার বাবা।




আরোহীর কান্না


চিঠির প্রতিটি শব্দ আরোহীর হৃদয় ভেঙে দিচ্ছিল। তার ছোট্ট হাত দিয়ে সে চিঠি আঁকড়ে ধরে বলল,

"বাবা, তুমি আমাকে ছেড়ে কেন গেলে? আমি তো শক্ত হতে চাই না, বাবা। আমি তো তোমাকে চাই!"


তন্ময়ার অপরাধবোধ


তন্ময়া রান্নাঘর থেকে এসে আরোহীর কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। মেয়ের কাঁপতে থাকা কণ্ঠ আর বাবার চিঠি দেখে তার বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠল।

"আমি কি এমন কিছু করেছি যে অনিক আর ফিরতে চায় না? আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম?"


তন্ময়া আরোহীর পাশে বসে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল। তার চোখেও জল। সে বুঝতে পারল, অনিক চিঠিতে যা লিখেছে তা শুধু আরোহীর জন্য নয়, বরং তার নিজের জন্যও একটি বার্তা।


অনিকের অনুপস্থিতি


অনিক হয়তো দূরে কোথাও বসে আছে। তার চোখেও জল। কিন্তু সে জানে, ফিরে গেলে সবকিছু আবার আগের মতোই হবে। অপমান, তিক্ততা, এবং আত্মসম্মানের লড়াই। সে নিজেকে শক্ত রাখে, কিন্তু মনের ভেতরে আরোহীর সেই ছোট্ট মুখটা তাকে কুরে কুরে খায়।


অনিকের মন বলে,

"আমি চলে এসেছি। কিন্তু আমার মেয়েটা? সে কি আমাকে ভুলে যাবে? নাকি একদিন তন্ময়া তাকে বলবে, আমি কেমন ছিলাম?"


শেষ অধ্যায়


তন্ময়া নিজেকে প্রতিজ্ঞা করল, সে আরোহীকে এমনভাবে মানুষ করবে যে তার বাবার অভাব সে অনুভব না করে। আরোহী জানবে তার বাবার কষ্ট আর ভালোবাসার গল্প। কিন্তু তন্ময়ার মনও এক গভীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে—

"আমি কি সত্যিই অনিককে হারিয়ে দিলাম? নাকি এই লড়াইয়ে সবাই হেরে গেল?"


আরোহী বাবার চিঠিটা শক্ত করে ধরে আর বলে,

"বাবা, আমি শক্ত হব। কিন্তু আমি তোমাকে খুব মিস করি।"


নিঝুম রাতের ট্রেন


রাত গভীর। ট্রেন ছুটছে অজানা শহরের দিকে। জানালার পাশে বসে অনিকের চোখ স্থির হয়ে আছে অন্ধকারে। সারা কামরা নিঃশব্দ, যাত্রীরা গভীর ঘুমে। কিন্তু অনিকের চোখে ঘুম নেই। মনে ভাসছে হাজারো স্মৃতি, বুকের গভীরে জমে থাকা অব্যক্ত কান্না।


তন্ময়ার মুখটা এক মুহূর্তের জন্যও তার মন থেকে সরছে না। কেমন করে ভুলবে সে? সেই হাসি, সেই অভিমান, সেই অগণিত ঝগড়ার মুহূর্ত। কিন্তু আজ তন্ময়া তার জীবনের আরেক বাস্তবতার অংশ। তন্ময়া, যার জন্য এত কিছু সহ্য করেছে অনিক, আজ তার থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে।


অনিক জানে, তন্ময়া তাকে কখনোই ঠিকমতো বুঝতে পারেনি।  কিন্তু অনিক চুপ। সে তন্ময়ার সম্মানহানির প্রতিশোধ নিতে নয়, নিজের কষ্ট বুকে চেপে দূরে যেতে বাধ্য হয়েছে।


ট্রেনের শব্দ যেনো এক এক করে তার স্মৃতির সুরগুলো জাগিয়ে তুলছে। তার মেয়ে আরোহীর ছোট্ট মুখটা মনে পড়ে। "আম্মু, তুমি কাঁদবে না। এই পৃথিবীতে শক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।" অনিক জানে, তার কথা একদিন বুঝবে আরোহী। সে তন্ময়ার যত্নে বড় হবে, কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি হয়তো ওকে নতুনভাবে জীবন চিনতে শেখাবে।


জানালার বাইরে একটা গভীর অন্ধকার ছুটে চলেছে। ট্রেনের জানালার শীতল কাঁচের উপর মাথা রেখে অনিক ভাবে, যদি তন্ময়া কখনো বুঝত যে, তার এই দূরে সরে যাওয়া তন্ময়ার ভালো থাকার জন্য। হয়তো সে ক্ষমা চাইত, কিন্তু তার অহংকার তাকে সেই পথে যেতে দেবে না।


অনিক নিজের চোখ বন্ধ করে। দূরের শহর তাকে ডাকছে, যেখানে সে শুরু করবে এক নতুন জীবন। কিন্তু তন্ময়া আর আরোহীর স্মৃতি কি তাকে কখনো শান্তি দেবে? প্রশ্নটা ট্রেনের শব্দে হারিয়ে যায়।


রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়। ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও অনেক সময়। কিন্তু অনিক জানে, তার গন্তব্য আর কখনো তন্ময়ার কাছে ফিরে যাওয়ার নয়। তন্ময়া তাকে ভুল বুঝেছে, এবং সেই ভুল আর কখনো সংশোধনের সুযোগ পাবে না।


নিঝুম রাতের ট্রেন চলতে থাকে। আর অনিক, তন্ময়া আর আরোহীর স্মৃতিকে বুকে চেপে, যাত্রাপথে হারিয়ে যায়।


সমাপ্ত।


Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই