গল্প : এলোমেলো চিঠির কথা
গল্প :
এলোমেলো চিঠির কথা
: অর্পন রহমান
১.
চিঠি, এই শহরে এখন আর কেউ লেখে না। সৌম্য লেখে। বহুদিন পর, হাত কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে ঠিক সেই পুরোনো ছন্দে—সাদা কাগজে কালো কালি। তার শব্দের নিচে লেগে থাকে অপরাধবোধ, আর কাঁপা কাঁপা একটা সাহস।
চিঠিটা সে পাঠিয়েছিল ঠিক সেই ঠিকানায়—এক বন্ধুর হাতে।
নীনাক্ষীর হাতে এসে পৌঁছায় চিঠিটি। সন্ধ্যার আলোয় বসার ঘরে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ মুহূর্তে সে খুলে পড়ে।
নীনাক্ষী,
আমি জানি, হঠাৎ এভাবে চিঠি লিখে তুমি অবাক হবে। আমরা দুজনই জানি—সব শেষ হয়ে যায়নি, শুধু ছেঁড়া হয়ে গিয়েছে সময়ের বাঁধন।
তোমার কথা খুব মনে পড়ে।
এমন নয় যে সব ভুলে গেছি।
বরং দিন যত যাচ্ছে, ভেতরের সেই অদেখা ব্যথাটা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
তোমার ওপর রাগ করতাম, কিন্তু আজ বুঝি, আসলে রাগ করতাম নিজের ওপরেই।
তোমাকে যে ভালোবেসেছিলাম,
তা কখনো শব্দে বলিনি
—এই অপরাধই আমাকে ঘিরে ধরে এখন।
আমার জীবনে অনেককিছু বদলেছে।
এখন অন্য শহরে, অন্য জীবন… অথচ কিছুই যেন ঠিকভাবে শুরু হচ্ছে না।
তোমার অভাব, বা বলা ভালো—তোমার “অনুপস্থিতি” প্রতিটি সকালকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।
আমি পালাই বার বার যেন দুরত্বে
আমাদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারে।
তুমি যদি এখনো আমার কথা ভাবো, তাহলে আর কারো মুখ থেকে আমার সম্পর্কে কিছু শুনে সিদ্ধান্ত নিও না।
আমার সম্পর্কে যা জানার, সরাসরি আমার মুখ থেকেই জানো।
তোমাকে দেয়া সব চিঠি শুধু একটা বস্তু নয়, ওগুলো সব ছিল আমার মনের এক সাহসী প্রকাশ।
আমি জানি না, তোমার মধ্যে এখনো আমার জন্য কোনো অনুভব আছে কিনা।
তবু এটুকু জানি—আমি আজও চাই তুমি ভালো থাকো। এমন ভালো থাকা, যেখানে আমার কোনো ছায়া এসে ঝাপসা করে না তোমার আলো।
তুমি যদি চাও, লিখো আমাকে।
না চাইলে, এটুকু জানাও যে আমি লিখেছিলাম—তোমাকে, শেষবারের মতো।
আমার শেষ বিশ্বাস সেই প্রথম ভালোবাসার মত, আজও তোমাতেই রয়েছে।
সৌম্য
*
চিঠির উত্তর দিতে সময় নেয়নি নীনাক্ষী। তার প্রতিটি শব্দ যেন ভিজে ছিল পুরোনো অভিমানে, চাপা কান্নায়। চিঠির কাগজে এমন এক উত্তরের ছাপ ছিল, যা একই সঙ্গে ব্যথার এবং মুক্তির।
নীনাক্ষীর চিঠি (উত্তর)
সৌ,
তুমি কেমন আছো? আমি কি যে ভীষণ বিপদে আছি তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি যে গিফট পাঠিয়েছো তাতে তোমার নাম লেখা ছিলো। তাও আবার পড়েছে আপুর হাতে। চিন্তা কর আমার অবস্থাটা। তুমি দূরে গেলেই যেন একের পর এক বিপদে পড়ি আমি।
আর রাখো তোমার হেয়ালি, আমি ভয়ে বাঁচি না। আর তুমি আছ হেয়ালি নিয়ে। তোমাকে কে বলতে বলেছে "ভালোবাসি "৷ এই শব্দটি না বললেও আমি তা জানি।
চিঠিতে তুমি যে দুটো শর্তের কথা লিখেছো, তা মানা আমার পক্ষে কঠিন কিছু নয়। এতেই যদি ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয় তবে আমি চেষ্টা করব এই শর্ত মেনে চলার। তুমি কারও কাছ থেকে কোনো তথ্য পেয়েই বিশ্বাস করে কষ্ট পেও না। আমি সর্বান্তঃকরণে চাই তুমি ভালো থাকো।
তখনো তোমার চিঠিটা পড়িনি। একজন নয়, দু’জনের কাছ থেকে জানতে পারলাম তুমি নাটোরে। যখন আমি তোমার অপেক্ষায় থাকি, তখন তুমি থাকবে বহুদূরে—আমাকে কষ্ট দেওয়ার যেন নতুন এক ফন্দি। তুমি যে যাচ্ছো, সেই কথাটাও আমাকে জানাতে নিষেধ করেছো।
এই কথাগুলো আমার জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। কিন্তু তোমার চিঠি পড়ার পর কথাগুলো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। তোমার মনে যদি এমন কিছু থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই চিঠিতে তার আভাস থাকত। তাছাড়া যাওয়ার সময়, তুমি নিজেই তো বলেছিলে...
আমার শেষ বিশ্বাস—সেই প্রথম ভালোবাসার মতো—তোমাতেই আছে। তাই তোমাকে অবিশ্বাস করতে পারছি না।
— নীনাক্ষী
২.
নাটোর স্টেশন তখনও ঝিম ধরা দুপুরে নিশ্চুপ। রেললাইন ধরে হেঁটে চলেছে সৌম্য। মাথায় ছিল হালকা ঝাঁকড়া চুল, গায়ে ছেঁড়া জিন্সের শার্ট, পিঠে একটা পুরনো ব্যাগ। নীনাক্ষীর চিঠিটা সে তখনও বারবার পড়ছে — প্রতিটি শব্দ যেন গায়ে গায়ে দাগ কেটে যাচ্ছে।
বনলতার শহরে এসে নীনাক্ষী নামের আরেক বনলতা, শুধুই ভেতরে নাড়িয়ে দিচ্ছে সব।
সে জানে, ওকে এমন অবস্থায় ফেলে রেখে চলে আসাটা অন্যায়। কিন্তু কিছু কিছু সময় মানুষ পালাতে বাধ্য হয় — নৈতিকতা, দায়, ভালোবাসা— সব কিছু থেকেও।
নীনাক্ষীকে সে যা লিখেছিল, তার প্রতিটি শব্দ ভেবে ভেবেই লিখেছিল:
নী,
আমি নাটোরে — হ্যাঁ, তোমার অজান্তেই। বনলতার শহর..
নীনাক্ষী মানে তো সুন্দর চোখের।
জীবনানন্দ যা দেখেছিলো বনলতাতে।
জানি, তুমি কষ্ট পাবে, জানি অভিমান হবে।
কিন্তু আমাকে বুঝতে চেষ্টা কোরো।
আমি ভেঙে যাচ্ছি, নী।
বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক দেখাই না কেন,
ভেতরে আমি শূন্য।
এই শহরে, এই দেয়ালের ভেতরে,
আমি দম বন্ধ হয়ে আসা মানুষ হয়ে গেছি।
তোমার সাথে সব কিছু ভাগ করে নিতে চেয়েছি সব সময়। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি চাই না,
তুমি এই কষ্টটা ভাগ করে নাও।
তোমাকে ভালোবাসি বলেই চাই তুমি ভালো থাকো — আমার দূরত্বে হলেও।
তোমার আপুর হাতে যদি আমার পাঠানো উপহার পড়ে যায় — ক্ষমা করে দিও।
ধরা পড়ে যাবে বুঝিনি,
আর সেটা তোমার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
আর হ্যাঁ, দুটো শর্ত আমি রেখেছি —
একটা তোমার জন্য, আরেকটা আমার।
প্রথমত, তুমি কারও মুখের কথায় আমাকে বিচার করবে না।
দ্বিতীয়ত, তুমি নিজেকে আমার অনুপস্থিতিতে দোষ দেবে না।
এই দুটো শর্ত যদি রাখো, তাহলে আমরা দুজন আলাদা থেকেও একসাথে থাকতে পারি।
যাওয়ার আগে তোমাকে বলিনি
— কারণ আমি জানি, তুমি আমাকে আটকে রাখতে চাইতে।
আর আমি জানি, তখন আমি থেমে যেতে পারতাম।
তুমি জানো না, আমার থেমে যাওয়াটা তোমার জন্য কতটা ক্ষতিকর হতো।
তুমি ভালো থেকো, নী।
ভালো থেকো, আমার মতো করে নয় — তোমার মতো করে।
সৌম্য
*
নীনাক্ষী জানালার ধারে বসে ছিল অনেকক্ষণ ধরে। বাইরের বৃষ্টি জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসছে, যেন চোখের অশ্রুর মতো। চিঠিটা ওর বিছানার পাশে খোলা — সৌম্যের হাতের লেখা। প্রতিটি শব্দ কাঁপা কাঁপা, কিন্তু তাতে ছিল গভীর দৃঢ়তা।
সে কিছুতেই বোঝে না — এমন চুপিসারে চলে যাওয়ার কারণ কী ছিল?
সৌম্যটা চিরকালই এমন পাগলাটে। কখনও কখনও অকারনে পালিয়ে বেড়ায়।
সৌম্য যখন বলেছিল, "এই শহরে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে", তখন কি সে বুঝেছিল নিজের মতো করে মুক্তি খুঁজছে?
না কি সে সত্যিই পালাচ্ছে?
নীনাক্ষী জানে, সৌম্য সব সময় এলোমেলো কথার মানুষ ছিল ।
তার চোখ, আর তার নীরবতা — এটাই ছিল তার সত্যি বলার ভাষা।
আর অকারনে আবোলতাবোল বলা ওর একটা পাগলামি।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল:
"তুমি ভালো থেকো, আমার মতো করে নয় — তোমার মতো করে।"
এই একটা বাক্য তাকে যেন উল্টো পুড়িয়ে দিচ্ছে।
সে চুপচাপ উঠে আলনাটা খুলে একটা ছোট বাক্স বের করল। ভিতরে সৌম্যের দেওয়া কিছু ছোটখাটো স্মৃতি —
একটা পুরোনো টিকিট,
একটা শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ, কতগুলো শুকনো শিউলী আর পুরোনো হয়ে যাওয়া বকুলের মালা থেকে আজও সেই ঘ্রান।
একটা চকলেটের মোড়ক, শো- পিচ টুংটাং শব্দ।
আর সেই কাগজের নৌকাটা — যেটা এক বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সৌম্য বানিয়ে বলেছিল,
"আমরা হারিয়ে গেলেও, চিঠিটা ভেসে থাকবে..."
নীনাক্ষী জানে, ভুল বোঝাবুঝি সহজে কাটে না।
কিন্তু সে চায় না, সৌম্য ওকে ভুল বুঝে দূরে থাকুক।
চায় না, ওর ভালোবাসাকে পালানো বলে মেনে নিক কেউ।
*
সে একটা খাতা টেনে নিল। নতুন চিঠি লেখা শুরু করল।
সৌ,
চিঠি পড়ে বুঝলাম তুমি আর আমি একই রকম একা হয়ে গেছি। তুমি যাকে "মুক্তি" বলছো, আমি তাকে "ভাঙন" বলছি।
তুমি নাটোরে চলে যাও, অথচ আমায় না জানিয়ে — এটাকে তুমি আমাকে রক্ষা করা বলছো।
কিন্তু জানো, আমি যদি কষ্ট পেতাম বড় কোন আঘাতে
তোমার চোখে চোখ রেখে
সেটুকু মেনে নিতে পারতাম,
তাহলে সেটা আমার কাছে "ভালোবাসা" হতো।
তোমার শর্ত দুটো আমি রাখব।
আমি কারও কথা শুনে তোমাকে বিচার করব না।
আর নিজেকে দোষী ভাবব না,
কারণ আমি জানি — আমরা দুজনই নিজের মতো করে ভালোবাসতে শিখছিলাম।
কিন্তু একটা কথা তোমাকে বলতে চাই —
আমি অপেক্ষা করব না।
কারণ আমি জানি,
যে ভালোবাসে সে ফিরে আসবেই
— না ফেরা মানেই, সে নিজের পথ খুঁজে পেয়েছে।
যদি কখনো ফিরে আসো, জেনো—
এই শহরের এক ভেজা জানালার ওপারে
তোমার জন্য একটা গল্প এখনও অসম্পূর্ণ পড়ে আছে।
নীনাক্ষী
চিঠিটা শেষ করেই সে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি থেমেছে।
তবে কোথাও একটা শব্দ এখনও কাঁপছে—
স্মৃতি, অভিমান আর অপেক্ষার…
*
নী
তুমি যদি জানতে আমি কী করে থাকি এখানে—
তোমার চিঠির প্রতিটি শব্দ আমার ভেতর গেঁথে আছে। বিশ্বাস করো, আমি চেয়েছি বলি, চেয়েছি ব্যাখ্যা দেই, কিন্তু কিছু চলে যাওয়ার পর, ভাষা আর পথ খুঁজে পায় না। আমি পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি নাটোরে আসিনি তোমাকে কষ্ট দিতে।
আমি এসেছি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে।
এমন এক জায়গায়, যেখানে তোমার চোখ, তোমার হাসি, তোমার স্পর্শ—কোনো কিছুই আমাকে না ছুঁয়েও ছুঁয়ে যেতে পারে।
তুমি ভালো থেকো—তবে জানবে, আমি এখন প্রতিদিন তোমার জন্য চিঠি লিখি। পাঠাই না, তবু লিখি।
সৌম্য
চিঠিটা শেষ করে সৌম্য খামে ভরে জানালার ধারে রেখে দেয়। বাতাসে চিঠির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নাটোরের সেই কুয়াশা-ঢাকা রাতেও, কোনো এক চাঁদের আলোয় হয়ত নীনাক্ষীর মুখ ভেসে ওঠে।
সৌম্য জানে—প্রতিটি চিঠি, প্রতিটি শব্দ, একেকটি অসমাপ্ত অপেক্ষা।
সকালের আলো এখনও পুরোপুরি ঝাঁকায়নি। সৌম্য চায়ের কাপ হাতে, জানালার পাশে বসে আছে। নাটোরের এই ছোট্ট ভাড়া বাড়িটার পুরনো জানালায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ওপারে সে যেন প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখে—ঢাকার কোনো এক ব্যস্ত রাস্তা, যেখানে একটা মেয়ে হালকা ওড়না সামলে রিকশা ধরার চেষ্টা করছে। মেয়েটার চোখে অভিমান, কিন্তু তার চেয়ে বড় কিছু—অপেক্ষা।
নীনাক্ষী....
এ শহরে সে নেই। তার কণ্ঠ নেই, রাগ নেই, হঠাৎ করে ফোন কেটে দেওয়ার মতো অভিমান নেই। তবু, সব আছে। সৌম্যের ভেতরে।
সেদিন, অনেক ভেবেচিন্তে লেখা চিঠিটা সে পাঠায়নি।
চিঠিটা এখনও টেবিলের ডায়েরির পাতার মাঝে গুঁজে রাখা।
সাহস হয় না।
৩.
স্মৃতি যখন আসে, সেটা কখনও ধীরে ধীরে নয়—বরং একরকম ঝড়ের মতো।
ঢাকায় কাটানো সেই দিনগুলো হঠাৎ করে ফিরে এলো।
ঢাকা, বছরখানেক আগের এক বিকেল
নীনাক্ষী তখন ইংরেজি সাহিত্যের শেষ বর্ষে পড়ছে, আর সৌম্য মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে বড় ভাইয়ের ব্যবসা দেখাশোনা করছে।
নীনাক্ষী মাঝে মাঝে বলে ফেলত —
"এই শহরে কোনো কিছুই স্থায়ী না।"
আর সৌম্য হেসে বলত —
"তুমি থাকলেই তো আমি আছি, সব আছে ।"
ওদের প্রিয় জায়গা ছিল "ধানমন্ডি লেক" “লালবাগ ফোর্ট” আর টিএসসির ভেতরের গাছতলা। ভিড় কম থাকলে ওরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। নীনাক্ষী কবিতা পড়ত, আর সৌম্য চুপচাপ তাকিয়ে থাকত।
একদিন নীনাক্ষী হঠাৎ বলেছিল,
"তুমি যদি কখনও চলে যাও, আমি কী করব?"
সৌম্য বলেছিল,
"আমি যদি চলে যাই, তাহলে চিঠি লিখে যাব। আর তুমি চিঠির উত্তর লিখে রেখো, আমার জন্য।"
নীনাক্ষী হেসে বলেছিল,
"তাহলে তোমার কাছে থাকবে আমার সব না বলা কথার চিঠি?"
"হুম। আর চিঠি পড়তে পড়তেই বাঁচব আমি।"
সেই কথাগুলোর পর যেন সব কিছু বদলে গেল। সৌম্য ঢাকায় কিছু জটিলতায় পড়ে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েন, পরিবার থেকে চাপ, আর তার সঙ্গে নীনাক্ষীর ভাইয়ের সন্দেহ-ভরা দৃষ্টিতে সম্পর্কটা একরকম এলোমেলো হয়ে পড়ে ।
সব শেষে, যখন সে নাটোরে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়—তখন সে কাউকে কিছু বলে না।
এমনকি নীনাক্ষীকেও না।
শুধু একটা চিঠি রেখে যায়।
*
এসব ভাবতে ভাবতে সৌম্য জানালার পাশে বসেই ডায়েরির সেই পুরনো চিঠির নিচে আরেকটি ছোট্ট নোট লিখে।
“তোমার লেখা চিঠি আমার প্রতিদিনের প্রার্থনার মতো।
তুমি বলেছিলে: ‘তোমাকে অবিশ্বাস করতে পারছি না।’
জানি, পারবে না।
আমি এখন প্রতিদিন চিঠি লিখে যাই… হয়তো একদিন এগুলো তোমার হাতে পৌঁছবে।
তোমার অপেক্ষাতেই আছি— তোমারই অজান্তে।”
চিঠিগুলো একদিন পৌঁছে যায় নীনাক্ষীর কাছে।
৪.
(সাদা কাগজ, তাড়াহুড়ো করে লেখা, কিছু জায়গায় অশ্রুর দাগ)
সৌম্য,
মা সব জেনে গেছে…
তোমার দেওয়া সেই উপহারের বাক্সটায় তোমার নাম লেখা পাবার পর,
তুমি যে চিঠি রেখে গিয়েছিলে - এবার তা ও আপুর হাতে পড়েছিল,
আর আপু… আপু তো সবই বলে দিল মাকে।
আর বোঝাতে হয়নি কিছু।
মায়ের চোখে প্রথমবারের মতো আমি অপরাধী হয়ে উঠলাম।
তুমি তো চাওনি তোমার জন্য ,
আমি কারও বিরুদ্ধে যাই,
মুখ তুলে কিছু বলি…আমি বলিনি।
তুমিই তো বলেছিলে, ‘‘প্রেমটা আমাদের মধ্যে থাকুক,
বাইরের কেউ না জানুক, না বুঝুক…’’
সেই না বলা টা আজ আমার অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিচ্ছে ।
আর তুমি চাইলে না আমাকে।
হয়তো ভেবেছিলে, তোমার যাওয়া মানেই আমাদের ভবিষ্যৎকে একটা ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
হয়তো ভয় পেয়েছিলে,
অথবা... হয়তো আমি তোমার মতো করে চাইতে পারিনি তোমাকে।
কিন্তু আমি একবারও তোমার নামে কিছু বলিনি মাকে।
শুধু চুপ করে ছিলাম, যেমন তুমি চুপ করে চলে গিয়েছিলে।
তুমি চলে আসো তাড়াতাড়ি
তুমি যদি সত্যিই চাও আমাকে ,
আর যদি না আসো
তাহলে আমি চলে যাবো!
চলে যাবো সৌম্য
ক্ষমা করে তোমায়,
নীনাক্ষী
সৌম্য চিঠিটা হাতে পেয়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ ছিল।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
হাতের কাঁপুনি থামছিল না, আর চোখের ভেতর জমে থাকা শব্দগুলো যেন বের হওয়ার জায়গা খুঁজছিল।
চিঠির একপাশে ছোট করে একটা বাক্য লিখল সে—
“চিঠি তুমি লিখলেও, ব্যথাটা যেন আমিই দিয়েছিলাম...”
(ছেঁড়া খামে ভরা, কালি ছড়িয়ে যাওয়া অক্ষর… কিন্তু শব্দগুলো তীক্ষ্ণ, গভীর, ধাক্কা দেওয়া)
নী,
তুমি বললে, আমি চাইনি তোমাকে।
তুমি বললে, আমি পালিয়ে গেছি।
কিন্তু আমি তো তোমার কাছেই এসেছিলাম বারবার।
শুধু হাত বাড়িয়ে বলিনি—“চলো পালাই।”
তুমি জানো, ঢাকা আমার কাছে শুধু একটা শহর ছিল না।
সেখানে প্রতিটা রাস্তার মোড়,
প্রতিটা বিকেল,
প্রতিটা চুপ থাকা—তুমি ছিলে।
আমি যখন নাটোরে এলাম,
তখন আমার চারপাশে সব ছিল—
ঘর, মাঠ, নদী, আকাশ, রাজবাড়ি,
জীবনানন্দ, বনলতা… সব... সব ছিলো
শুধু তুমি ছিলে না।
তোমার মায়ের সেই চোখ রাঙানো, তোমার আপুর সেই অস্বস্তি আমি মুছে দিতে পারবোনা।
আমি জানি, তুমি আমায় ক্ষমা করে দেবে হাজারবার…
তুমি চলে যাচ্ছো বললে—কোথায় যাচ্ছো? কার কাছে যাচ্ছো?
এই পৃথিবীর যত দূরেই যাও না কেন, আমার চিঠির পথ কখনো তোমাকে হারিয়ে ফেলবে না।
আমি আসছি..
সৌম্য
৫.
ঢাকায় ফিরে এসেছিল সৌম্য ।
সব কিছুর অবসান ঘটিয়েও,
সব কিছুর শুরু যেন অপেক্ষায় ছিল।
তারা দুজন—সৌম্য আর নীনাক্ষী—
যাদের জীবনে ভালোবাসা কখনো ছিল না কোন ঘোষণা,
ছিল এক নীরব বোঝাপড়া।
একটি নিষিদ্ধ নাম ধরে ডাক না দিয়েই,
একটি ঠিকানা হয়ে ওঠা।
তারা একবার নয়, বারবার বিদায় জানিয়েছিল একে অপরকে।
কিন্তু বিদায়টা যেন কখনোই শেষ হয়নি।
নীনাক্ষীর চোখে যে আগুনের শিখা,
সেটা কোনোদিন নিভেনি।
সৌম্য যখন বলত, "পালাই",
নীনাক্ষী থেমে যেত,
কিন্তু চোখের গভীরে উঁকি দিত এক অদম্য সাহস—
এক পলকেই বোঝা যেত,
সে চাইছে সত্যিই পালিয়ে যেতে।
বলত—
"চলো।"
সেই “চলো” শব্দটা
ছিল সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে বিশুদ্ধ।
তাদের দেখা হতো মাঝে মাঝে—
কড়া পাহারায় মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে।
কোনো কিছু চাওয়ার জন্য নয়,
শুধু কিছু না বলা কথা ভাগ করে নেওয়ার জন্য।
সৌম্যের শেষ উপহার একটা ডায়েরি—
পাতায় পাতায় লেখা কবিতা, গান, এলোমেলো কথায় ভরা।
আর নীনাক্ষী দিয়েছিল অঝোর অশ্রু ধারা—
নিঃশব্দে ঝরে পড়া,
কিন্তু হৃদয়ের গভীরতম চিৎকার হয়ে থাকা।
সেই অশ্রু পান করেছিলো একজন.. অজান্তেই।
তাদের ভালোবাসার সংজ্ঞা আলাদা ছিল,
তবু এক ছিল সেই যন্ত্রণা,
এক ছিল সেই শূন্যতা।
তাদের গল্প চলছিল
চিঠি দিয়ে, চোখের ভাষায়,
আর একদিন হয়তো ঠিকই পালিয়ে যেত তারা...
সেই চলো বলাটা যদি
সৌম্য আর একবার বলত,
আর নীনাক্ষী আর একবার চোখে আগুন নিয়ে তাকাত।
চিঠি
(ডায়েরির ভাঁজে গুঁজে রাখা চিঠির মতো)
নীনাক্ষী,
আমি জানি, আমরা বিদায় বলেছি।
কিন্তু তুমিও জানো, বিদায়গুলো কখনো শেষ হয় না।
তুমি যখন বলো ‘চলো’, আমি বিশ্বাস করি—তুমি সত্যিই চাও।
আমি জানি, তোমার চোখে আগুন।
সেই আগুন আমায় পোড়ায়।
তুমি যদি একদিন সত্যিই চলে আসো...
আমি অপেক্ষা করব।
— সৌম্য
৬.
ঢাকার ব্যস্ত গলির ভেতর,
রাত সাড়ে দশটার মতো বাজে।
চারপাশে যেন অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে।
সৌম্য দাঁড়িয়ে আছে একটা অন্ধকার গলির মোড়ে—
হুডি পরে, মুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর ভয় মিশ্রিত ছায়া।
ফোনে শুধু একটি মেসেজ—
“আমি রেডি। নিচে এসো। পালিয়ে যাই।”
নীনাক্ষী বারান্দা থেকে নিচে তাকায়,
সৌম্যকে দেখে, যেন চোখে বিশ্বাসই হচ্ছে না।
এতদিন ধরে যে পালানোর কথা বলেছিল,
আজ সত্যিই কি সেটা ঘটতে চলেছে? এই সৌম্য যে সব কিছু থেকে পালিয়ে বেড়ায়, সে আজ সাহস করে পুরুষের মত এসে দাড়িয়েছে, আমাকে নিয়ে পালাবে?
নীনাক্ষী নীরবে সিঁড়ি বেয়ে নামে।
হাতে একটা ছোট ব্যাগ, তাতে শুধু দরকারি কিছু জামা-কাপড়,
আর ডায়েরিটার শেষ পাতায় রাখা সেই চিঠিটা।
যেটা সৌম্য লিখেছিল অনেকদিন আগে—
"তুমি যদি একদিন সত্যিই চলে আসো, আমি অপেক্ষা করব।"
নিচে নেমে এসে সৌম্যর দিকে তাকায় সে।
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর সৌম্য ফিসফিস করে—
"তুমি সত্যিই এসেছো?"
নীনাক্ষী মাথা নেড়ে বলে—
"তুমি ডেকেছো আর আমি আসিনি এমন কি কখনো হয়েছে?"
তারা হেঁটে যেতে থাকে রেলস্টেশনের দিকে।
মনের ভেতর উত্তেজনা, ভয়, অপরাধবোধ—সব একসাথে।
কিন্তু তবুও কোথায় যেন একরকম শান্তি।
ট্রেন ধরার মাত্র ১৫ মিনিট বাকি।
হঠাৎই নীনাক্ষীর ফোনে এক কল—
"আপু, মা খুব কাঁদছে। তুই কোথায়?"
এক মুহূর্তে সব কিছু থমকে যায়।
সৌম্য থামে।
সৌম্যের চোখে সংশয়।
সৌম্য নীনাক্ষী দিকে তাকায়—
কোনো কথা নেই।
শুধু চোখে সেই পুরোনো আগুন।
নীনাক্ষী বলে
"আজ আমি সব কিছু ছেড়ে এসেছি। সকল বন্ধন ছিন্ন করে। আজ আর আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
বলো, চলো।"
সৌম্য তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
চুপ করে, খুব ধীরে, গভীর স্বরে বলে—
সৌম্য :
"তুমি এসেছো, এটাই অনেক বড় পাওয়া…
তুমি আমায় ভালোবাসো।
কিন্তু আজ নয়, নীনাক্ষী।
এখনো নয়।"
নীনাক্ষী (কাঁপা গলায়):
"কেন? আজ না হলে আর কবে?"
সৌম্য:
"কারণ তুমি জানো, পালিয়ে গেলেই সব ঠিক হবে না।
আর আমি… আমি চাই না তুমি তোমার মাকে কাঁদিয়ে বিদায় নাও।"
ট্রেনের হুইসেল আরও কাছে আসে।
নীনাক্ষী থেমে যায়।
চোখ ফেটে জল গড়ায়।
সৌম্য তার হাত ধরে—নরম করে, নিশ্চিন্তভাবে।
সৌম্য:
"চলো না, নীনাক্ষী।
আজ ফিরে যাই।
আবার আসবো একদিন, চোখে জল নয়—জয়ে।
সেদিন আমরা সত্যিই পালিয়ে যাবো।
কারও হাত ধরে নয়, নিজেদের হাত ধরে।"
নীনাক্ষী মাথা নিচু করে।
চোখে সেই আগুন, কিন্তু এবার তা আলো হয়ে ফুটে ওঠে।
হঠাৎ রাস্তায় একদিন দেখা
সে সৌম্যের হাতে নিজের লেখা একটা চিঠি গুঁজে দেয়,
ডায়েরির ভাঁজে।
*
সৌম্য,
আমি এসেছিলাম…
তোমার সেই পুরোনো "চলো" ডাক শুনতে,
কিন্তু তুমি আমায় ফিরিয়ে দিলে।
জানো, এই প্রথম আমি বুঝলাম ভালোবাসা মানে সবসময় ধরে রাখা নয়—
কখনো কখনো দূরে চলে যাওয়াটাও ভালোবাসা।
আমি ফিরছি, কিন্তু আমার ভিতরে আজ এক অন্যরকম মুক্তি।
তুমি পাশে থেকো, দূর থেকে হলেও।
তুমি বলেছিলে, একদিন সত্যিই পালাবো—
আমি সে দিনের প্রতীক্ষায় থাকবো।
— নীনাক্ষী
(চলবে)
#arponrahman #অর্পন_রহমান #armystique #razonnamystiverse #saidurrahmanarpon

Comments
Post a Comment