কাল ভৈরবী: রক্ত ও প্রেমের সাধনা : অর্পন রহমান
কাল ভৈরবী: রক্ত ও প্রেমের সাধনা
: অর্পন রহমান
ভূমিকা :
আলো এবং অন্ধকার—দুটিই আমাদের অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু আমরা কেবল আলোকে গ্রহণ করি, আর অন্ধকারকে ভয় পাই। যে পথে পা রাখলে ভয় জাগে, শিহরণ ওঠে মেরুদণ্ড বেয়ে, সেই পথেই লুকিয়ে থাকে আত্মার গভীরতম সত্য।
এই উপন্যাস সেই অন্ধকার পথেরই অন্বেষণ।
"কাল ভৈরবী: রক্ত ও প্রেমের সাধনা" কোনো প্রচলিত প্রেমগাথা নয়। এটি প্রেম ও মৃত্যু, কাম ও তপস্যা, রক্ত ও মুক্তির এক অদ্ভুত সাধনার কাহিনি। এখানে দেবতা কেবল উপাস্য নন—তিনিই ধ্বংস, তিনিই প্রেম, তিনিই রক্তপিপাসু, তিনিই পরম আশ্রয়।
অনিরুদ্ধ—এক নিঃসঙ্গ পথিক, যার জীবন শ্মশানের ছাই আর মৃত্যুর গন্ধে মোড়া। হেমাবতী—এক ভয়ঙ্কর ভৈরবী, যার শরীর নারী, কিন্তু আত্মা দেবীর। আর অঘোষ নাথ—এক তান্ত্রিক গুরু, যে পিশাচিনী ও দেবতাদের সঙ্গে কথা বলে, এবং তার সাধনার লক্ষ্য প্রেম নয়, মুক্তি নয়—বরং চরম রূপান্তর।
এই উপন্যাসে আপনি পাবেন কর্ণপিশাচিনীর কাহিনি, যিনি মৃতের কর্ণ ছিঁড়ে নিয়ে তাদের গোপন কথা শোনেন। পাবেন ছিন্নমস্তা দেবীর রক্তমুখী রূপ, যিনি নিজেরই মাথা কেটে তিন রমণীকে রক্তপান করান। কিন্তু সর্বোপরি, আপনি অনুভব করবেন এক নিষিদ্ধ প্রেমের রূপ—যেখানে ভালোবাসা মানেই আত্মোৎসর্গ, যেখানে কাম মানেই মৃত্যুর দ্বারপথ, এবং যেখানে ভক্তি মানেই বিভীষিকা।
এই রচনা কল্পনা এবং পুরাণের সীমারেখা ঘুঁচিয়ে এক নতুন ধারায় প্রবেশ করেছে—তান্ত্রিক রিয়েলিজম। এটি পাঠকের মনে জাগাবে ভয়, স্নায়ুতে দেবে শিহরণ, এবং হৃদয়ে ছুঁয়ে যাবে এক অলৌকিক ভালোবাসার দাগ।
এই উপন্যাস শুধু পড়ার নয়—এটি এক অভিজ্ঞতা।
শুরু করুন, যদি সাহস থাকে।
কারণ এই পথে একবার পা রাখলে, আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না।
পুনশ্চঃ গল্পটি প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য। কারন তন্ত্র সাধনায় এমন কিছু আছে যা ছোটদের জন্য একদম নিষিদ্ধ।
তাই অপ্রাপ্ত বয়স্করা গল্পটি পড়া থেকে বিরত থাকুন।
সাধনার স্তরভেদ:
তান্ত্রিক সাধনা সাধারণত তিনটি স্তরে বিভক্ত:
1. পাচারাত্রিক (পঞ্চ-মকার) – মদ্য, মাংস, মীন, মৈথুন, মুদ্রা। অনেক তন্ত্রে এটি রূপকার্থেও ব্যবহৃত হয়।
2. দক্ষিণাচার – শান্ত, নিয়মাবদ্ধ, ব্রাহ্মণিক সাধনা (যেমন ত্রিপুরসুন্দরী, লক্ষ্মী সাধনা)।
3. বামাচার – তেজস্বী, ভয়ংকর, শ্মশানভিত্তিক, যেখানে ভয়কে জয় করতে হয় (যেমন কালী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী)।
দশ মহাবিদ্যা সাধনা শুধুমাত্র বাহ্যিক নয়, এটি এক গভীর অন্তর্জগতের অন্বেষণ। ভয়, কামনা, ক্রোধ, জ্ঞান, প্রেম — সবকিছুকে রূপান্তরিত করে উচ্চতর চেতনার দিকে পৌঁছানোর একটি রূপান্তরময় পথ। এ বিদ্যা গুরুমুখী বিদ্যা।
যদিও আমি অনেক স্থান থেকে ভালগার কথা না লিখে...অন্যভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। যেখানে গল্প এগিযে নেয়ার জন্য একদম না দিলে হয় না সেখানে শব্দ গুলো যতটা পারি কম দিযেছি।
— লেখক
১.
কালযুগের অতল গহ্বরে, যখন সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন প্রকৃতি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেই কালেই সৃষ্টি হয়েছিল ভৈরব, মহাপ্রলয়ের আগমনী পুরুষ। ভৈরব ছিলেন রুদ্র রূপে মহাদেবের অবতার, যার রক্তিম চোখে ঝরে পড়ত অতলে প্রবাহিত আগুন।
তার প্রেক্ষিতে জন্ম হয়েছিল ভৈরবী—সৃষ্টি এবং সুমঙ্গলের দেবী, যার সৌন্দর্য পৃথিবীর সমস্ত ফুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।
একদিন, ভৈরব বনেদির উপত্যকায় প্রবেশ করল, যেখানে গগনচুম্বী বৃক্ষের নিচে বসেছিল সুন্দরী ভৈরবী। তার চোখে ছিল নদীর স্নিগ্ধতা, আর হাসি যেন চন্দ্রের কোমল আলো। ভৈরব যখন প্রথম তাকে দেখল, তখন তার অন্তর স্পন্দিত হলো।
ভৈরবী: "হে অচিন্ত্য, তুমি কে যে এ বনেদির প্রান্তরে এসেছো? তোমার চোখে লুকিয়ে আছে অগ্নির দীপ্তি।"
ভৈরব: "আমি ভৈরব, মহাদেবের রুদ্র রূপ। পৃথিবীর কলঙ্ক দূর করতেই এসেছি আমি। আর তোমার মতো সুমঙ্গলিনী কাকে দেখে মনে হল তোমার কাছে এসে কথা বলব।"
ভৈরবী: "তোমার রূপে যেমন অগ্নি, তেমনি তোমার কথায় অনুভব করলাম শান্তির সুর। বল, তোমার হৃদয়ে কী আছে?"
ভৈরব তখন ধীরে ধীরে বলল, "আমার হৃদয় বেজে ওঠে ন্যায় আর ধ্রুব সত্যের সুরে। কিন্তু আজ তোমার মতো স্নিগ্ধারূপা দেখে আমার মন বাঁধা পড়ল প্রেমের বেণুতে।"
ভৈরবীর চোখে ঝলমল করল জলের ঝিলিক। "প্রেম? তুমি কি জানো প্রেমের অর্থ? প্রেম মানেই শুধু সুখ নয়, এটি অন্তরাত্মার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।"
"হ্যাঁ," ভৈরব বলল, "আমি জানি প্রেমে রয়েছে আত্মার একত্ব, যা দেবতাদেরও মুগ্ধ করে।"
বহু বহু কাল পরের কথা যশোর শ্মশান ঘাট, সালটা ১৯১৮ ইং। তান্ত্রিক গুরু অঘোষ নাথ শব সাধনায় মগ্ন। তার পাশে এক রূপবতী নারী নাম হেমাবতী। অঘোষনাথের প্রিয় শিষ্য বা শিষ্যা যাই বলি না কেন। যদিও এর আগে হেমাবতী নিজে অনেকবার শব সাধনা করেছে।
মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে হেমাবতী দেখছে গুরুকে। শবের উপড়ে বসে মন্ত্র পড়ছে। অপঘাতে মৃত এক লাশ, বিষপানে আত্মহত্যা করেছিলো, গতকাল মাটিচাপা দিয়ে রেখে গেছে পরিবার।
হঠাৎ শব নড়ে উঠলো পরক্ষণেই উঠে বসলো মৃত দেহটি, গুরু মন্ত্র পড়তেই আবার শুয়ে পড়লো। হেমাবতী অবশ্য ভয় পায় না, এসব করতে করতে এবং ছোটবেলা থেকে দেখতে দেখতে অভস্ত্য হয়ে গেছে।
রাত্রির আকাশে চাঁদ নেই। অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠেছে নদীর পাড়ে বিস্তৃত শ্মশানে। ঝিঁঝিঁ পোকার কণ্ঠস্বর আর দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের হুংকার মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অজানা সুর—মৃত্যুর সুর।
অঘোষ নাথ, যিনি চন্দ্রগ্রহণে পিশাচ আহ্বান করে নিজের ছায়া খাওয়ান, যিনি নিজের পাঁজর ভেঙে তৈরি করেছেন ‘অন্তিম যন্ত্র’।
তার কুটির শ্মশান বনের একেবারে গহীনে, যেখানে পাঁচটি চিতার ছাই এখনো উষ্ণ।
পরদিন রাতেও হেমা প্রস্তুত হচ্ছিল, আজ ছিল বিশেষ রাত্রি—অমাবস্যা।
এই রাতেই সে করবে ভৈরবীর মূল সাধনা।
সিদ্ধি লাভ না করলে, সে পিশাচ হয়ে যাবে।
আর যদি পারে, তবে... সে হবে ভয়ংকর। দেবী নিজে ভর করবে তার উপড় ।
অঘোষ নাথ বলেছিলেন, “তোর শরীর এখন শুধু পাত্র, হেমা। আজ রাত্রিতে তুই নিজেকে দে, তাহলে মা নিজে আসবে। ভৈরবী মা আমার। ”
২.
ভৈরবী সাধনার প্রস্তুতি ছিল নিষ্ঠুর, কঠোর এবং অতিন্দ্রিয়। হেমাবতী জানত, একটি ভুল মানে আত্মার চিরধ্বংস।
অঘোষ নাথ মন্ত্রশিক্ষা দিয়েছিলেন সাত বছর ধরে। তাকে তৈরি করেছিলেন এই বিশেষ রাত্রির জন্য। পূজা পদ্ধতির প্রতিটি স্তরে ছিল রক্ত, আগুন, ভয়, এবং অচেনা ছায়াদের ছোঁয়া।
ভৈরবী সাধনার পূজা পদ্ধতি:
১. রাত ১২টা ১ মিনিটে শুরু করতে হয়। ২. উত্তরমুখে বসতে হয় কঙ্কালবৃত মণ্ডলের কেন্দ্রে। ৩. পাঁচমুন্ডির চক্র রচনা করতে হয় – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র ও নিষাদ জাতির কঙ্কাল দিয়ে। ৪. কপালচূর্ণ দিয়ে আঁকা হয় চক্র, তার মধ্যে রক্তে লিখতে হয় ৮টি গোপন মন্ত্র। ৫. প্রেতযন্ত্র স্থাপন করে তার উপরে বসে সাধককে জপ করতে হয় নির্দিষ্ট ভৈরবী মন্ত্র।
রাত্রিকালীন মূল মন্ত্র: “ॐ ऐं ह्रीं क्लीं चामुण्डायै विच्चे। ॐ भैरवप्रिया भैरवी भगवती क्रीं स्वाहा।”
এই মন্ত্র জপ করতে হয় ১,০০৮ বার। প্রতিবার রক্তচন্দনের তিলক দিয়ে, গরুড়মূত্রে ধৌত পাত্রে জল স্পর্শ করে।
হেমাবতীর চোখ ছিল রক্তবর্ণ, ঠোঁট নীলচে। তার মাথার চুল খুলে রাখা, আর শরীরে কেবল একখণ্ড লাল কাপড়। তার নিচে ছিল ত্রিপিড়ি—তিন মৃত দেহের উপর বসা।
৩.
শ্মশানে ভীতর বনের এক কোণে আগুনের আলোয় হঠাৎ দেখা যায় এক যুবক, নিতান্তই ভবঘুরে।
তার নাম অনিরুদ্ধ। চোখে নিঃসঙ্গতা, গায়ে ছেঁড়া চাদর, হাতে একটা কাঠের লাঠি।
এই রাতে সে হাঁটছিল শ্মশানের গা ঘেঁষে, যেখানে জীবিতরা যায় না, আর মৃতরা ফিরেও দেখে না।
তবে সে ফিরছিল এক বিশেষ কারণেই — সে খুঁজছিল হেমাবতীকে।
অনিরুদ্ধের বয়স তখন ষোলো। এক বর্ষার বিকেলে সে ভৈরব নদীর ধারে বসে ছিল, ভেজা মাটি আর কদম ফুলের গন্ধে চারদিক ভরে ছিল। হঠাৎই তার চোখে পড়ল একটি মেয়েকে। নদীর ওপার থেকে ভিজে কাপড়ে সে হেঁটে আসছিল, হাতে ছিল বেলি ফুল। তার ভেজা চুল পিঠের উপর ছড়িয়ে ছিল, আর চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা, যা তার বয়সের সাথে ঠিক মানাচ্ছিল না। সেই মেয়েটিই ছিল হেমা।
প্রথম দেখাতেই অনিরুদ্ধের কিশোর মনে এক অজানা অনুভূতি জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল, এটা শুধু মুগ্ধতা নয়, এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
হেমা যখন নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল, অনিরুদ্ধ সাহস করে তার পিছু নিল। সে দেখল, হেমা মাঝে মাঝেই থমকে দাঁড়াচ্ছিল, যেন কারোর জন্য অপেক্ষা করছে। একসময় সে একটি পুরনো বটগাছের নিচে বসে পড়ল। তার কোলে ছিল একটি লাল কাপড়, আর তার মধ্যে জড়ানো কিছু জিনিস।
অনিরুদ্ধ দূর থেকে দেখল, হেমা মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে। তার চোখে ছিল এক বিষণ্ণতা, যা অনিরুদ্ধের মন ছুঁয়ে গেল।
পরের কয়েক মাস, অনিরুদ্ধ প্রতিদিন বিকেলে সেই নদীর ধারে আসত। সে হেমার জন্য অপেক্ষা করত। একসময় হেমাও বুঝতে পারল যে কেউ একজন তাকে অনুসরণ করছে। একদিন সে অনিরুদ্ধের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল শুধু এক শান্ত দৃষ্টি। "তুমি রোজ এখানে আসো কেন?" সে জিজ্ঞেস করল।
অনিরুদ্ধের বুক কাঁপছিল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। হেমা মৃদু হেসে বলল, "ভয় পেয়ো না। আমি জানি তুমি কেন আসো। তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না?"
সেই শুরু। তাদের প্রেম ছিল প্রচলিত প্রেমের মতো নয়। তারা সিনেমা দেখেনি, হাতে হাত ধরে হাঁটা হয়নি তাদের। তাদের ভালোবাসা ছিল শুধু চোখে চোখে। তাদের প্রেম বেড়ে উঠেছিল শ্মশানের ধোঁয়া আর নদীর শান্ত জলের সাক্ষী হয়ে।
অনিরুদ্ধ জানত, হেমা সাধারণ মেয়ে নয়। সে ছিল এক সাধিকার কন্যা, যে জীবনের গভীর এক রহস্যের মধ্যে বসবাস করত। তার চোখ ছিল এক রহস্যময় জগৎ। তবুও, অনিরুদ্ধ তাকে ভালোবাসত। তাদের প্রেম ছিল এক নির্বাক, নিবিড় সম্পর্ক।
একবার শ্মশানে একটি শবদাহ জ্বলছিল। চারদিকে শোক আর বিষাদের সুর। অনিরুদ্ধ হেমাকে জিজ্ঞাসা করল, "তুমি কি ভয় পাও না?" হেমা শান্তভাবে উত্তর দিল, "মৃত্যু তো জীবনেরই অংশ। এখানে ভয় কেন? এখানে তো শুধুই মুক্তি।" সেই রাতে, অনিরুদ্ধ প্রথম বুঝতে পারল যে হেমার ভালোবাসা সাধারণ কোনো মেয়ের ভালোবাসা নয়।
তার ভালোবাসা ছিল এক সাধনার মতো, যেখানে ভয়কে জয় করতে হয়। তাদের প্রেম ছিল শ্মশানের আগুনের মতো, জ্বলন্ত কিন্তু পবিত্র। সেই পবিত্রতা অনিরুদ্ধের মনে এক গভীর দাগ কেটেছিল।
তখন সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল, হয়তো মন্ত্রের মোহে, আর বিড়বিড় করে কি যেন বলছিলো। সেই মুহূর্তেই অনিরুদ্ধ বুঝেছিল—এই মেয়েটা মানুষ না, অন্তত সাধারণ কোনো নারী না। তার চোখে যে আগুন, তার ঠোঁটে যে মন্ত্র—তা ভালোবাসার হতে পারে না।
অনিরুদ্ধ সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছিল—"সে কি ভালোবাসা? হেমার জন্য আমি যা অনুভব করি, তা কি প্রেম, না ভয়?"
তারা একে অপরকে কখনো তুমি কখনো তুই সম্বোধন করতো।
তার মনে পড়ে, যখন প্রথম সে হেমাকে অনুসরণ করে কুটিরের কাছাকাছি এসেছিল, তখন হেমা হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে বলেছিল—"এভাবে তুই মরবি একদিন, জানিস?"
তবুও সে থামেনি।
হেমা তাকে ভয় দেখায়নি।
সে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
৪.
অঘোষ নাথ কুটিরে বসে মন্ত্র জপছিলেন— “ॐ भैरवप्रिया भैरवी भगवती क्रीं स्वाहा।”
তার সামনে রাখা হেমার প্রতিমা—যেখানে হেমার চুল কেটে তৈরি করা হয়েছে ‘কেশযন্ত্র’, তার নখ দিয়ে আঁকা ‘রক্তমুদ্রা’।
তিনি জানতেন, আজ রাতটা নির্ণায়ক।
হেমা যদি আজ জাগাতে পারে মা ভৈরবীকে, তবে সে নিজের শরীর, আত্মা, সব কিছু হারাবে।
কিন্তু সে পাবে এক নতুন রূপ — এক ভয়ঙ্কর সুন্দরী, যাকে ছুঁতে সাহস পাবে না কেউ।
রাত্রি ঘন হয়ে এসেছে। বাতাস ভারী, পাখির ডাক স্তব্ধ। হেমা চক্রে বসে, চোখ বন্ধ করে একনাগাড়ে জপ করতে থাকে মন্ত্র। তার মুখে মৃদু হাসি, যেন কারও অপেক্ষায় আছে।
শ্মশানের বাতাসে ধোঁয়ার মত একটা ঘন ছায়া ঘুরপাক খেতে শুরু করে। চিতার আগুন হঠাৎ নিভে যায়। সব দিক থেকে যেন কিচিরমিচির আওয়াজ — প্রেতাত্মার নৃত্য শুরু হয়েছে।
সেই মুহূর্তে হাজির হয় অনিরুদ্ধ। হেমাকে এমন অবস্থায় দেখে তার শরীর কেঁপে ওঠে। কিন্তু তবুও, সে এগিয়ে যায়। সে জানে না, এই একটি ভুলে সমগ্র তান্ত্রিক চক্র ভেঙে যাবে।
হেমা তখন মন্ত্রে লীন। তার শরীরের চারপাশে আগুনের রেখা। অনিরুদ্ধের পায়ের শব্দে তার ধ্যান ভাঙে না, কিন্তু চক্রে ফাটল ধরে। হঠাৎই তার মুখের ভাষা বদলে যায়। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলে —
“কে এলি এখানে? আমি মা ভৈরবী! এখন হেমা নেই। এই শরীর আমার। প্রেম নয়, রক্ত চাই!”
আকাশে বাজ পড়ে। পেছনের চিতা থেকে এক মৃতদেহ উঠে দাঁড়ায়। পিশাচিনী হাসি দিয়ে বলে — “আমাকে ডাকছিস, মা?”
৫.
অঘোষ নাথ ছুটে আসে। সে চিৎকার করে বলে — “অনিরুদ্ধ, দূরে যা! তোকে বলেছিলাম—এই সাধনার সময় কাছে আসবি না!”
ঠিক সেই মুহূর্তে, হেমার চোখ খুলে যায়। সে গর্জে ওঠে
"আমাকে কে ডেকেছিস? তুই কে আমার ধ্যান ভাঙ্গালি/ "
অনিরুদ্ধ বলে-
—“হেমা, আমি তোরই অনিরুদ্ধ ! প্রেম যদি পাপ হয়, তবে আমি সেই পাপ নিয়ে তোর পথেই হাঁটবো।”
চারদিক কাঁপে। কুটিরের ছাদ ফেটে যায়। এক নারী-আকৃতি জাগ্রত হয় হেমার শরীরে। চোখ রক্তবর্ণ, কণ্ঠে আগুন।
সে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি তোর হেমা নই - আজ থেকে আমিই ভৈরবী ।”
অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু চোখে ভয় নেই। সে বলে —
“আমি ভালোবাসি হেমাকে। সে ভৈরবী হোক, প্রেতিনী হোক—আমি তার কাছে আসবই।”
ভৈরবী রূপে হেমা চিৎকার করে ওঠে — “তুই সাহসী! তবে এই সাহসের মূল্য দিতে হবে।”
সে অনিরুদ্ধের দিকে এগিয়ে আসে। তার শরীর থেকে বেরোতে থাকে ধোঁয়া, আগুন, ছায়া।
ভৈরবী চক্র ছেড়ে বেড়িয়ে এলো। বাতাস ভারী, আগুন নিভে যাচ্ছে।
তবুও অনিরুদ্ধ এগিয়ে যায়।
সে হেমার দিকে তাকিয়ে বলে—“তুই যেই হোস, আমি তোকে ভালোবাসি।”
ভৈরবী থেমে যায়।
এক মুহূর্ত, যেন সময় থেমে যায়।
সে বলে—“ভালোবাসা কি চায় রক্তে ভেজা ঠোঁট চুম্বন করতে?”
অনিরুদ্ধ বলে—“হ্যাঁ, যদি তুই হেমা হোস, আমি মৃত্যুকেও চুমু দেবো।”
তখন, হেমার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক আশ্চর্য শান্ত হাসি।
তার চোখে আগুন কামনার।
হেমার কাছে আসতেই অনিরুদ্ধকে একলাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। দেবী কালি যেমন মহাদেবের বুতের উপড় পা দিয়ে দাড়ায়, তেমনি হেমা নামের ভৈরবীও এক পা বুকের উপড় দিয়ে চিৎকার দিয়ে- অজ্ঞান হয়ে অনিরুদ্ধের বুকের উপড় পড়ে যায়। মন্ত্র থেমে যায়। চারপাশে বাতাস হালকা হয়ে যায়।
ভৈরবী নিঃশব্দ।
৬.
কিন্তু অঘোষ নাথের এত দিনের সাধনা দেবী ভৈরবীকে পাওয়ার, বৃথা যেতে দেবে না।
অঘোষ নাথ চুপ ছিলেন না। তিনি বের করেন এক গোপন মন্ত্র, যা তিনি শিখেছিলেন রত্নেশ্বরী শ্মশানে এক মৃত তান্ত্রিকার আত্মার কাছ থেকে।
তিনি উচ্চারণ করেন: “ॐ नमो मृत्युंजयी मातृकायै, बन्धनं कुरु स्वाहा।”
মন্ত্রটি বায়ুর মতো চারদিকে ছড়িয়ে যায়। হেমার দেহ কেঁপে ওঠে। চোখে যন্ত্রণার ছায়া। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
তার চারপাশে অদৃশ্য শিকল গাঁথা হতে থাকে, যা শুধুমাত্র মন্ত্রশক্তিতেই বাঁধা যায়। হেমার চেতনা স্তব্ধ হয়ে পড়ে, সে পড়ে যায় অনিরুদ্ধের সামনে।
অঘোষ নাথ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, অনিরুদ্ধকে অদৃশ্য শক্তিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। এবং হেমাকে কাঁধে তুলে নেয়।
এই শ্মশান নয়। অন্য এক গোপন স্থান—যেখানে দেবী চামুণ্ডার এক পরিত্যক্ত মন্দির আছে, সেই 'রক্তশ্মশানে' নিয়ে যায় সে।
অনিরুদ্ধ যখন জ্ঞান ফিরে পায়, তখন চারপাশ শূন্য। কুটির নেই, হেমা নেই, এমনকি সেই রক্তচিহ্নও মুছে গেছে।
সে জানত, এটা অঘোষ নাথের কৌশল। এবং সে বুঝতে পারে, হেমাকে পেতে হলে তাকে নিজেরও পথ বেছে নিতে হবে। সে হাঁটা শুরু করে...
অন্যদিকে, রক্তশ্মশানে, হেমাকে রাখা হয়েছে একটি অষ্টকোণ যন্ত্রের মাঝে। আটটি কঙ্কাল তাকে বেষ্টন করে রেখেছে, আট দিক থেকে আট তান্ত্রিক প্রহরী মন্ত্রপাঠ করছে যেন সে না পালাতে পারে।
অঘোষ নাথ আবার শুরু করলেন— “এবার তুই নিজেকে হারাবি, আর পাবি এক শুদ্ধ রূপ। ভৈরবী তখন তোকে গ্রহণ করবে। কিন্তু প্রেমের চিন্তা থাকলে... তুই চিরতরে শেষ।”
দিন যায়, রাত আসে। হেমা শুধু চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু তার ভেতরে যুদ্ধ চলে—ভয়ংকর এক দ্বন্দ্ব।
সে জপ করে, সে কান্না করে, সে হাসে। মাঝে মাঝে নিজের হাত কামড়ে ধরে, যেন শরীরটা তার না। সে জানে, এই রূপান্তর তাকে দেবী বানাবে—কিন্তু সে কি তখনও মানুষ থাকবে?
৭.
এক রাতে, আকাশে বজ্র নামে। এক অদ্ভুত আওয়াজে আট কঙ্কাল ভেঙে পড়ে যায়। মাটিতে আগুন জ্বলে ওঠে। হেমার দেহ ঘিরে জেগে ওঠে এক আগুনবৃত শক্তিচক্র।
সে উঠে দাঁড়ায়। তার মুখে বজ্রের আলো, চুল দাঁড়িয়ে উঠেছে আগুনের মতো, চোখ লাল। গলায় উঠে এসেছে গর্জন—
“ভৈরবী আমি, আমি চামুণ্ডা, আমি মৃত্যুর অগ্নিরূপ!”
তার সামনে দাঁড়ায় অঘোষ নাথ। ভয়ে নয়, গর্বে। সে হাসে—“মা ও মা আমি তো তোমাকেই চেয়েছিলাম।”
কিন্তু হেমা চুপ করে না। সে বলে, “তুই আমায় বেঁধেছিলি। এখন আমি মুক্ত। এবার তোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুই কি আমার শত্রু, না আমার সন্তান?
না কি আমার ভৈরব? অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সেই হাসিতে মন্দির কাপে। ভেঙ্গে পড়ে পুরোনো পলেস্তারা।
অঘোষ নাথ নতজানু হয়। তার চোখে দেখা যায় অশ্রু। “ মা আমি তোমার সন্তান মা। আমি তো নিজেকে , হেমাকে তোমার সাধনায় বিসর্জন দিয়েছি।।
তুমি আমার সাধনা, মা। তোমাকে আমি ডেকেছিলাম। তুমি তো এখন আমার ভৈরবী মা।”
রাত্রি তখন মাঝপথে। হেমাবতীর ভৈরবী চক্রের চারপাশে আগুন জ্বলছে, মন্ত্র থেমে গেছে। চক্রটি ভাঙার পরেও আগুন নিভছে না, বরং রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে কিছু একটার গন্ধ—না, কেবল ধূপ নয়, কোনো প্রাচীন কামনার গন্ধ।
ভৈরবী-রূপী হেমার কণ্ঠ আর আগের মতো গুরুগম্ভীর নয়। তার ঠোঁট এবার আলতো হাসে। শরীর থেকে বের হয় এক কোমল কুয়াশা, কিন্তু সেই কুয়াশার মধ্যেই আছে কিছু অতল স্পর্শ—যা প্রেমের নয়, লালসার।
রাত্রির শেষে, হেমা একা দাঁড়ায় শ্মশানের মাঝে। তার ভেতর থেকে ক্রমশ উঠে আসে নতুন এক অনুভব। প্রেম নয়, বিশুদ্ধতা নয় শুধু কামনা জাগ্রত হয়।
হেমা অঘোষনাথ কে ডাকে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে। অঘোষ আমি তোর মা হতে আসিনি। আমি তোর ভার্যা হতে চাই।
আয় কাছে আয়।
অঘোষ নাথ বুঝে যায়। কোন একটা সমস্যা হয়েছে। মা ভৈরবীর তো এমন করার কথা না।
আবার তার মাঝে কে যেন তার কানে ফিসফিস করে কথা বলে। তার ভেতরে শিহরণ জাগায়।
অঘোষ নাথ ভয় পেয়ে যায় এ কেমন অনাচার। অন্য তান্ত্রিকদের নিয়ে মন্দিরের আলাদা এক কক্ষে আলোচনায় বসে। কেন মা ভৈরবী তাকে কামনার লোলুপ দৃষ্টিতে চাইছে! নিশ্চয়ই কোন অনিষ্ট হয়েছে।
রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত শরীরে জ্ঞান ফিরে অনিরুদ্ধ সেই রাতেই মন্দিরটির উদ্দেশ্যে রওয়ান। কারন অনিরুদ্ধ আগে থেকেই চিনতো এই মন্দিরটি, এই মন্দিরে অঘোষ নাথ ও হেমাকে অনেকবারই দেখেছে।
অনিরুদ্ধ কে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেখে, হেমা তার দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই কি এখনও আমায় ভালোবাসিস?”
অনিরুদ্ধ ক্লান্ত গলায় বলে, “ভালোবাসা এখন আর তখন নেই। ভালোবাসা সব সময়ই এক । তুই যখন যেমন , তখনই তেমন আমার ভালোবাসা।”
হেমা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। তার চোখে এখনো আগুন, কিন্তু ঠোঁটে এক মৃদু হাসি। সে অনিরুদ্ধের শরীর চায়।
সে বলে— “তাহলে চল, এবার অন্য এক যাত্রা শুরু করি—তন্ত্র, প্রেম আর মৃত্যু একসাথে নিয়ে।”
৮.
কর্ণ পিশাচিনীর ঘন কামনাচক্রে একসময় যখন অনিরুদ্ধ আর তার শরীরের পার্থক্য থাকে না, দেবী ভৈরবীর শক্তি কোনও একজন নয়, একাধিক রূপে ভাগ হয়ে গেছে।
নিশীথের গাঢ় অন্ধকারে কর্ন পিশাচিনী তার অদ্ভুত সেক্সুয়াল আকর্ষণে যেন মায়াবী অগ্নি জ্বালায়। তার চোখের গভীরে লুকানো সেই অবর্ণনীয় লালাসা, যা শরীরের প্রতিটি কোষকে স্পর্শ করে, আর নিঃশব্দে চাহনির মাধ্যমে এক অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে ফেলে।
কর্ন পিশাচিনির ছোঁয়া এক ধরনের রহস্যময় অনুভূতি তৈরি করে, যা মানবিক স্পর্শের বাইরে গিয়ে এক প্রেতাত্মার আকর্ষণে পরিণত হয়।
তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া মানে একদম অজানা বিপদে পতিত হওয়া, যেখানে কামনার তীব্রতা আর ভয়াবহয়তা একসাথে রঙ মেখে দেয় নিঃসঙ্গ রাত্রির পটে।
সে যখন চক্রে চোখ মেলে দেখে, অনিরুদ্ধের চোখে আর জীবন নেই, বরং একধরনের অশুভ শূন্যতা—যা কাম থেকে নয়, আসে আত্মার মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা থেকে।
অনিরুদ্ধ শোয়া অবস্থায় , স্থির চোখে দেখছে হেমাকে।
এ কি হেমা?
হঠাৎই হেমার কণ্ঠ থেকে আরেকটি কণ্ঠ বেরিয়ে আসে—নাম না জানা, কিন্তু চেনা, যেন কারো স্বপ্নের গভীর স্তর থেকে উঠে আসা এক নারীকণ্ঠ—
“তুই আমায় ডাকলি কেন অনিরুদ্ধ? তোর প্রেমে আমার জন্ম …”
অনিরুদ্ধ ধাক্কা খায় শব্দে। হেমার মুখ পাল্টে যায়। চোখ জ্বলছে, কিন্তু তাতে প্রেম নেই—আছে উপভোগের হিংস্র ক্ষুধা।
“আমি ভৈরবী না। আমি কর্ণ। কর্ণ পিশাচিনী। আমি কান দিয়ে ঢুকি—যেখানে প্রেম আর কাম মিশে এক হয়ে যায়। যেখানে মন্ত্র ফিসফিসিয়ে বলে—স্পর্শ কর, ছুঁয়ে দেখ, অধিকার কর।”
তার আঙুল ছুঁয়ে যায় অনিরুদ্ধের বুকে। আগুন যেন প্রবাহিত হয় সারা শরীরে।
অনিরুদ্ধ কাঁপে—“তুই হেমা না!”
সে হাসে। ঠোঁট লালচে, কিন্তু রক্তে নয়—চুল ছড়ানো, কিন্তু বাতাসে নয়। সে এগিয়ে আসে, তার দেহে আগুনের ঘূর্ণি।
“হেমার ভিতর আমি জেগে উঠেছি। তুই যে প্রেম করেছিস, সেই প্রেম ছিল ভ্রান্ত। কারণ, তুই চেয়েছিলি তাকে ছুঁতে, তাকে পেতে। আর আমি সেই ইচ্ছার ভিতরেই লুকিয়ে থাকি। এখন আমাকে দে—সং...গ...ম। তাহলেই আমি তোর হেমাকে জীবিত রাখব। না হলে, হেমাকে ছিন্ন করে তোর চোখের সামনে তার হৃদয় খাব।”
তার চারপাশে উঠতে থাকে মৃত আত্মাদের আওয়াজ—“সং..."
অনিরুদ্ধ কাঁপছে। তবুও সে বলে—“তুই পিশাচ। আমার প্রেম পবিত্র ছিল!”
কর্ণ হেসে ওঠে—“তোর প্রেমের ভিতরই আমি ছিলাম। চোখে চোখ রেখে বল, তুই হেমাকে কখনো কামনা করিসনি?”
এক মুহূর্ত... স্তব্ধতা...
অনিরুদ্ধের মুখে কোনও উত্তর নেই।
হঠাৎ কর্ণ তার ঠোঁটে চুমু আঁকে—আগুনের মতো, কিন্তু শীতল। একসাথে কাম এবং মৃত্যুর স্বাদ।
তার শরীর ঘিরে অদৃশ্য অঙ্গুলির ছোঁয়া, শরীর বাঁধা পড়ছে, দেহে ঢুকছে ঘূর্ণির মতো কুয়াশা। কর্ণ বলে—
“আমি তোর কামনার ফল। তুই যদি আমাকে গ্রহণ করিস, তবে আমি তোর হবে—রাত্রির শেষ পর্যন্ত। কিন্তু মনে রাখিস, এই সংগমের পরে, তুই মানুষ থেকেও হবি আমার পুরুষ—পিশাচের রাজা।”
হঠাৎ দূর থেকে বাজ পড়ে।
হেমার মুখ থেকে কর্ণ পিশাচিনীর ছায়া একটু সরে যায়।
তখনই হেমার আসল কণ্ঠ শোনা যায়—
“অনিরুদ্ধ... পালা! আমি লড়ছি... করো না... আমাকে... স্পর্শ... করো না...”
কর্ণ গর্জে ওঠে—“তোর প্রেম, তোর কামনা, সবই আমার! আজ রাত্রির দেবী আমি!”
হেমার চোখ জ্বলে ওঠে রক্তরঙে।
৯.
অনিরুদ্ধের দেহ শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তার চোখ দুটো ফাঁকা, কিন্তু তার শরীর তীব্র উত্তাপে কাঁপছে। কর্ণ পিশাচিনী, যার দেহ কোনো শরীর নয়—ধোঁয়া, আগুন আর ঘামে মেশা এক অদৃশ্য ছায়া—তাকে ঘিরে রেখেছে।
তার ঠোঁট ছিল অনিরুদ্ধের কানের পাশে, কেবল ফিসফিস করে বলছিল—
"আমি তোর কাম, আমি তোর ছায়া, আমি তোর ঘুমহীন রাত্রির গোপন চিন্তা। এখন আমি তোর, আর তুই আমার!"
কর্ণ পিশাচিনী বারবার.... করতে থাকে—একবার নয়, বারবার। প্রতিবার তার স্পর্শে, অনিরুদ্ধের শরীরের ভেতর এক ফাটল ধরে।
তার হৃদয় কামনায় নয়, যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠে।
তার মুখ দিয়ে কোনও ভাষা বের হয় না। কেবল হুহু শব্দ। চোখে জল নেই, ঠোঁটে রক্ত।
সে দেখতে পায়, তার হৃদয়ের গভীরে কেউ একজন চিৎকার করছে— হেমা!
"অনিরুদ্ধ! থামো! এটা আমি না! ও আমাকে দখল করেছে!"
কিন্তু কর্ণ থামে না। তার ঠোঁট আগুন, তার বুক.. মুখ.. কুয়াশা, তার দেহ এক ঘূর্ণিপাক—যার মধ্যে অনিরুদ্ধের আত্মা গলে যাচ্ছে।
তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে আসে। মাথার চুল ছেঁড়া, দেহ রক্তাক্ত, সে আর বুঝতে পারে না সে কে।
সে হয়ে ওঠে এক পিশাচ—চোখে শুধুই কাম, রক্ত ও হেমার আর্তনাদ।
ঠিক তখনই, এক বজ্রপাত হয়।
শ্মশানের বুকে ফেটে পড়ে অগ্নিশিখা।
এক প্রবল আওয়াজে—
“ॐ ह्रीं कालभैरवाय नमः।।”
অঘোষ নাথ এসেছেন। তার শরীর আগুনে আলোকিত, হাতে ত্রিশূল, কপালে অশ্মতিলক।
তিনি গর্জে ওঠেন—
"কর্ণ! তুই তন্ত্রের ছায়া, কিন্তু তোর সীমা আছে! এই প্রেমের ভিতর দিয়ে তোকে জন্ম দিয়েছি, আবার প্রেম দিয়েই তোকে শেষ করবো!"
তিনি তুলে ধরেন এক অষ্টবক্র কঙ্কাল-ত্রিশূল, যার ডগা গরম হয়ে উঠছে নিজের মন্ত্রশক্তিতে। তিনি নিক্ষেপ করেন সেই ত্রিশূল ঠিক কর্ণের বুকের মধ্যে।
এক চিৎকার—পৃথিবী কেঁপে ওঠে।
কর্ণ পিশাচিনী থেমে যায়। তার চোখ বিস্ফারিত, ঠোঁট রক্তাক্ত, কণ্ঠ ভাঙা।
“না... না... সে তো আমায় চেয়েছিল! সে তো আমায় ডাকছিল... তার প্রেমেই তো আমি...!”
আর কিছু বলার আগেই কর্ণ হেমাকে ছেড়ে দেয়—শূন্য হয়ে যায় হেমার শরীর।
শুধু বাতাসে থেকে যায় সেই কামনার তীব্র গন্ধ, এক পচা ঘামে মিশে থাকা অবদমিত আকাঙ্ক্ষা।
অনিরুদ্ধ পড়ে আছে মাটিতে, নিস্তেজ। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেগে আছে এক অস্পষ্ট ভয়। সে কাঁদছে না, শুধু শ্বাস নিচ্ছে।
অঘোষ নাথ ধীরে ধীরে এগিয়ে যান হেমার দিকে।
হেমা তখনো জড়িত কর্ণের ছায়ায়, কিন্তু ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। তার চোখ দুটো কাঁপছে, মুখে অশ্রু।
তিনি হাত রাখেন তার কপালে—
শিষ্য , আমি জানতাম প্রেম তোমার দুর্বলতা হবে। কিন্তু আজ আমি জানি—এই প্রেমই তোমার শক্তি। কর্ণ এসেছে তোমার মধ্য দিয়ে, কিন্তু অনিরুদ্ধ ছিল তোমার জন্য প্রতিরোধ।"
হেমা কাঁপা গলায় বলে—“আমি কি এখনো মানুষ?”
অঘোষ নাথ বলেন—“তুই মানুষ নয়, তুই দেবী। কিন্তু তোর ভেতরে এখনও প্রেম আছে, সেটাই তোর জয়।”
তিনি মাটি থেকে অনিরুদ্ধকে তুলে নেন। অনিরুদ্ধ চোখ খুলে হেমাকে দেখে। দৃষ্টি অস্পষ্ট, কিন্তু স্পষ্ট একটি শব্দ বলে—
"তুই এখনও হেমা?"
হেমা একটুও না ভেবে বলে—
"না, আমি হেমা নই। আমি ভৈরবী নই আমি কর্ণ পিশাচিনীও নই।"
অঘোষ নাথের দিকে তাকিয়ে বলে।" গুরু আমি কে?"
অঘোষ নাথ তখন বলে উঠেন— তুই মা ভৈরবী।
“চলো, এবার তোমাদের প্রস্তুত হতে হবে। কর্ণ গেছে, কিন্তু আরও গভীর ছায়ারা জেগে উঠেছে এই প্রেমের ঘ্রাণে। পরবর্তী রাত্রি হবে রক্তচিহ্নিত।
১০.
রাত্রি গড়িয়ে ভোরের আগের সেই কালচক্রে, যখন সময় আর অসময়ের সীমানা মিলিয়ে যায়, হঠাৎ শ্মশানজুড়ে জাগে এক ভয়াল গর্জন।
হেমাবতীর শরীর নিস্তেজ, তবু তার কপালে এখনো রক্তচিহ্ন জ্বলছে। কর্ণ পিশাচিনী দূর হয়েও রেখে গেছে তার ছায়া।
আর অনিরুদ্ধ?
সে কাঁপছে। তার ঠোঁটে ফেনা, চোখে রক্ত। কর্ণ পিশাচিনীর বারবারের সংগমে তার শরীর যেন জীবনের ছায়াও হারিয়ে ফেলেছে।
তার দেহ পুড়ছে না, কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ভিতর থেকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে শ্মশান চক্রে, আগুনের কুয়াশার ভেতর, শ্মশান কাঁপে সাথে পুরো ব্রক্ষ্মান্ড জেগে ওঠে ভৈরবী।
চারদিকে শকুন উড়ে যায়।
ভৈরবী নিজের রূপে ডাকে ভৈরবকে—
তন্ত্র কলুষিত!
প্রেমে ঢুকেছে কাম, কামে এসেছে অপবিত্র আত্মা।
এসো ভৈরব!
এসো, পিশাচে রক্ত নেও। তান্ত্রিক প্রেমে শুদ্ধি আনো।"
না, এ আর হেমা নয়। এ দেবী, আগুনের রূপে।
তার কণ্ঠ হঠাৎ আকাশ ফাটিয়ে গর্জে ওঠে—
“এ কেমন অপবিত্রতা! প্রেমের ছলে পিশাচেরা আমার মন্ত্রচক্রে প্রবেশ করেছে! তন্ত্র কলুষিত! আমি ভৈরবী, আমি কামনাকে ভয় পাই না, তবে অপবিত্র কামনার বীজ পুড়িয়ে ফেলব!”
তার চোখে আগুন, জিভ বেরিয়ে পড়েছে। সে গর্জে উঠে বলে—
“হে ভৈরব, এসো! আমাদের মন্ত্র অপবিত্র হয়েছে! এসো, মৃত্যু খেলায় নেমে পড়ি!”
আকাশে বজ্র পড়ে।
ভূমির নিচে ফাটল ধরে।
চক্রের ঠিক উত্তর দিক থেকে এক ভয়ংকর পুরুষরূপ উদ্ভাসিত হয়—ভৈরব!
চোখে রুদ্রদৃষ্টি, হাতে খড়গ, গলায় পিশাচের হাড়ের মালা।
ভৈরব চক্রে প্রবেশ করেন, আর ভৈরবী হাওয়ার মতো উঠে এসে তার সঙ্গে লিপ্ত হন এক অদ্ভুত তাণ্ডবে—না, সেটা কাম নয়, সেটা মৃত্যুর যুগল তাণ্ডব।
তাদের মিলনে উঠে আসে ধ্বংসের সুর।
রক্তছাপ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।
যেখানেই কর্ণ পিশাচিনীর ছায়া থেকে আরও যারা লুকিয়ে ছিল, সেই সব কামনাপিশাচেরা জেগে ওঠে আর একে একে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ভৈরব-ভৈরবীর মিলনের আগুনে।
চারপাশে কেউ কিছু দেখতে পায় না—এই তাণ্ডব চোখে দেখা যায় না।
শুধু অঘোষ নাথ—একজন মাত্র মানুষ—দাঁড়িয়ে দেখছিল সেই “অদৃশ্য মৃত্যু খেলা”।
তার চোখে জল, কিন্তু সেটা ভয় বা বিস্ময়ের নয়—তা ছিল বিপন্ন সাধনার ধ্বংস দেখে একজন গুরুর শোক।
১১.
ভৈরব-ভৈরবীর মৃত্যু খেলা শেষ হলে, চক্রে পড়ে থাকে নিস্তেজ দুটি দেহ—
একদিকে হেমা, শ্বাস নিচ্ছে কিন্তু আর কিছু বোঝে না।
অন্যদিকে অনিরুদ্ধ—নগ্ন, রক্তাক্ত, নিঃশ্বাসহীন।
অঘোষ নাথ এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করেন—
“তোমরা প্রেম করেছো, বুঝি! কিন্তু তন্ত্রে প্রেম নয়, আত্মাহুতি চলে। কাম যদি প্রবেশ করে চক্রে, তবে শুধু দেবতা নয়, পিশাচও জেগে ওঠে!”
তার চোখে ক্ষোভ। তিনি মাটি থেকে এক মুঠো ছাই তুলে হেমার কপালে ছুঁড়ে মারেন।
“আমি তোর গুরু ছিলাম, হেমা। আজ তুই আমার লালিত শক্তিকে ধ্বংস করেছিস।”
তারপর সে এগিয়ে যায় অনিরুদ্ধের দিকে।
“তুই মানুষ হয়ে দেবীর প্রেমে পড়েছিস। জানিস না, দেবী শুধু পূজার যোগ্য? তুই তাকে প্রেম করতে গিয়েছিস... আর আজ তুই মৃতপ্রায়।”
তিনি মন্ত্রোচ্চারণ করেন, কিন্তু সেই মন্ত্র আর আগের মতো শুদ্ধ নয়।
তিনি বলেন—
“এই প্রেমের ভেতরে কাম আর মৃত্যু লুকিয়ে ছিল। এখন তোরা দুজনেই পিশাচ জন্ম দিয়েছিস। এখন তোরা একা নয়—তোদের পেছনে দংশন করতে আসবে আরও ছায়ারা। আরও কর্ণ, আরও রক্ত।”
তিনি পেছনে তাকিয়ে হাঁটা শুরু করেন।
১২.
ভোরের আগের আবছা আলোয় যশোর শ্মশান ঘাট। কাল রাতের ধ্বংসযজ্ঞের পর চারদিকে এক থমথমে নীরবতা। পুড়ে যাওয়া চিতার ছাই বাতাসে মিশে এক ধূসর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
ভৈরব নদীর শান্ত স্রোতও আজ যেন বিষণ্ণ। নদীর পাড়ের ঘাসগুলো পুড়ে কালো হয়ে আছে, তাতে এখনো কাল রাতের আগুনের হলকা লেগে আছে।
হেমাবতী মাটিতে পড়ে ছিল। তার মুখ থেকে সেই বিকৃত হাসিটা মুছে গেছে। চোখ দুটো অর্ধেক খোলা, তাতে জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। সারা শরীর ছাই আর রক্তের ছোপে ঢাকা।
অঘোষ নাথ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে ভয় নয়, এক গভীর শূন্যতা। তিনি তার জীবনের সব সাধনা, সব বিশ্বাস এই একটি রাতে ভেঙে যেতে দেখেছেন। তার প্রিয় শিষ্য, যাকে তিনি ভৈরবী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, সে আজ এক অচেনা সত্তার দেহ। আর অনিরুদ্ধ, যে প্রেমের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিল, তার পরিণতিও কী ভয়ংকর।
হেমার দেহ হঠাৎ কেঁপে উঠল। তার চোখ ধীরে ধীরে পুরো খুলে গেল। সেই চোখে আর কোনো অন্ধকার নেই, কোনো আগুন নেই। আছে শুধু এক অতলান্ত শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল, "আমি কে?"
অঘোষ নাথ তার দিকে এগিয়ে গেলেন। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, "তুমি... তুমি হেমা।"
হেমার ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, "হেমা? সে কি আমি ছিলাম? না কি এটা অন্য কারও স্মৃতি?"
সে অনিরুদ্ধের দেহের দিকে তাকাল। কোনো আবেগ নেই, কোনো কষ্ট নেই। শুধু এক শীতল কৌতূহল। সে অনিরুদ্ধের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। গত রাতের কর্ণ পিশাচিনীর বার বার ইন্টেমিটের অনিরুদ্ধ ক্ষত বিক্ষত। , হেমা অনিরুদ্ধের ক্ষত স্থানে হাত রাখল। সেই স্পর্শে অনিরুদ্ধের শরীর থেকে এক মৃদু আলো বিচ্ছুরিত হলো, যা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বাতাসে। অনিরুদ্ধের জ্ঞান ফিরে এলে পানি খেতে চাইলো। অঘোষনাথ দৌড়ে এসে পানি দিলো অনিরুদ্ধকে।
হেমাবতী এবার উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি নদীর ওপারে, যেখানে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। সে বলল, "আমার মনে হচ্ছে, আমার আর এখানে থাকার দরকার নেই।"
অঘোষ নাথ তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন, "কোথায় যাবে তুমি?"
হেমা উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল, শ্মশান ছেড়ে, নদীর দিকে। তার নগ্ন পায়ে ছাই মাখছিল, কিন্তু সে দিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার পেছনে পড়ে রইল এক সাধকের স্বপ্ন, এক প্রেমিকের করুণ পরিণতি এবং এক দেবীর জন্ম ও ধ্বংসের চিহ্ন।
অঘোষ নাথ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন, নীরব সাক্ষী হয়ে। সে শুধু এক শূন্যতা, যা সবকিছুর শেষে জন্ম নেয়।
পরের দিন
শ্মশানের আগুন নিভে গেছে।
তন্ত্রচক্রে ছাই ছাড়া আর কিছু নেই। বাতাসে আর কোনো মন্ত্র নেই, শুধু নিস্তব্ধতা।
হেমা পড়ে আছে মাটিতে, নিস্তব্ধ, নিঃস্পন্দ। তার কপালের লাল টিপ মিলিয়ে গেছে, কিন্তু দেহে এখনো জ্বলে আছে অদৃশ্য এক আগুন।
অঘোষ নাথ দূর থেকে তাকিয়ে আছেন। তিনি কিছু বলতে পারছেন না। এই শিষ্যা, যে ভৈরবী হয়েছিল, আজ যেন আর কিছুই নয়।
তবে তার অভ্যন্তরে কিছু রয়ে গেছে।
না, এটা কর্ণ পিশাচিনীর ছায়া নয়।
না, ভৈরবীও নয়।
কিন্তু... কে যেন আসে।
মাটির নিচে অদৃশ্য কিছু নড়ে ওঠে।
হেমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ তার দেহে এক শীতল কাঁপুনি দেখা দেয়। তার চোখ খুলে যায়।
কিন্তু সেই চোখ হেমার চোখ নয়। এতকাল যে চোখে ছিল লাল শক্তি, এখন সেখানে অন্ধকার। গভীর এক আলোহীন গহ্বর।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসে।তার ঠোঁট ফাঁকে এক চাপা শব্দ—
"আমি... কে?"
অঘোষ নাথ পিছিয়ে যান।
তিনি অনুভব করেন, এটা হেমা নয়, এটা ভৈরবীও নয়, এটা এমন এক কিছু যা তন্ত্রচক্রে কোনোদিন ডাকা হয়নি।
কোনো মন্ত্রে যার নাম নেই।
এ এক সত্তা, যা জন্মেছে—
হেমার প্রেমের ভিতর থেকে, অনিরুদ্ধের মৃত্যুর গভীর থেকে, ভৈরবী ও কর্ণ পিশাচিনীর ধ্বংসাবশেষ থেকে।
এ এমন এক সত্তা, যা আগে কখনও শ্মশানে আসেনি।
না পুরুষ, না নারী, না দেবতা, না দানব।
এক অজ্ঞাত চেতনা, যা হেমার শরীর বেছে নিয়েছে।
তার কণ্ঠ বদলে গেছে। এখন সে হাসে—এক বিকৃত হাসি।
"মা ভৈরবী আমাকে ডাকে না। কর্ণ পিশাচিনী আমায় স্পর্শ করে না। ওরা সবাই চলে গেছে।
এখন এই দেহ শুধু আমার, আমি এসেছি, এবার সব আমার হবে।
কে আমি? ? হা: হা: হা:।"
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে হেমা।
অঘোষ নাথ চোখ বন্ধ করেন।
তিনি জানতেন, প্রেমে কাম এলে পিশাচ আসে।
কিন্তু আজ বুঝলেন,
যদি প্রেমে মৃত্যু আসে, কামে ঈর্ষা মিশে যায়—
তাহলে জন্ম নেয় এক ‘তৃতীয় সত্তা’—নামের অতীত এক ভয়।
১৩.
ঘুটঘুটে শ্মশান। ভোর হয়নি এখনও। শবদাহের আগুন নেভার আগে যেমন এক দম বন্ধ করে দেওয়া স্তব্ধতা নামে, ঠিক তেমন নৈঃশব্দ্য ছড়ায় চারদিকে।
অঘোষ নাথ শ্মশানের উত্তর কোণে চক্র আঁকা চামরের উপর বসে আছে, চোখ খুলে তাকিয়ে আছে দূর দিকে।
শ্মশানের অন্ধকারে সে দেখে—
হেমা বসে আছে মৃত জোনাকির মতো। নিথর, অথচ কাঁপা আলোয় যেন জ্বলছে। ওর শরীর থেকে যে ধোঁয়া উঠছে—তা ধোঁয়া নয়, যেন কোনো পুরাতন তপস্যার গন্ধ, রক্তে-লেখা মন্ত্রের রেশ।
অঘোষ চুপচাপ বলে ওঠে,
— “এখন ও হেমা নয়। ওর ভিতরে এসেছিস, না ছিন্নহস্তা? না বীভৎসা যোগিনী?”
হেমার চোখ খুলে যায়। না, সে হেমা নয়।
চোখজোড়া দগ্ধ, লালাভ, যেন ব্রহ্মচক্রের আগুনে চুম্বিত। মুখে অচেনা হাসি, ঠোঁটের নিচে পুরু এক রক্তরেখা।
সে দাঁড়িয়ে যায়।
তখন তার গায়ের কাপড় ছিঁড়ে বাতাসে উড়ে যায় হাওয়ার মতো। নগ্ন শরীরটায় উদ্ভাসিত হয় সাতটি চক্রের দ্যুতি — মুলাধার থেকে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত সব জেগে উঠেছে।
একটু দূরে শুয়ে আছে অনিরুদ্ধ।
শরীর নিথর। কর্ণ পিশাচিনীর কামনার চূড়ান্ত পর্বে সে প্রায় অচেতন, অথচ বেঁচে আছে।
হেমা নয়— এই পিশাচিনী-যোগিনী এগিয়ে যায় তার দিকে।
তার পায়ের ছোঁয়ায় মাটি চেঁচিয়ে ওঠে, যেন শ্মশানের মাটি নিজেই সঙ্কেত দিচ্ছে, "এ মৃত্যু নয়, এ জন্ম..."
যোগিনী মৃদু গলায় বলে ওঠে,
— “এই পুরুষ, যে শ্মশানে ঘুমায়, তার ঘুম আমি ভাঙাবো।
কিন্তু সে ফিরবে না মানুষ হয়ে। সে জাগবে তন্ত্রজাগ্রত হয়ে...”
অনিরুদ্ধের কপালে হাত রাখে যোগিনী। মুহূর্তেই তার চোখ কেঁপে ওঠে।
সে চিৎকার করে,
— “আমি... আমি দেখতে পাচ্ছি... আগুন... মা... মা নয়... কে তুমি!”
যোগিনী হাসে।
— “আমি অভিশপ্তা। একদা ষোড়শ যোগিনীর মধ্যে ছিলাম।
এক অহংকারী সাধক আমায় বশ করতে চেয়েছিল...
তার প্রাণ আর মন আমি ছিঁড়ে খেয়েছি।
আজ তোমাকেও তাই দিচ্ছি—
তোমার তৃতীয় চক্ষু খুলে দিচ্ছি আমি!”
তার হাত উঠতেই, হেমার পেছনে এক ভয়ঙ্কর মূর্তি দাঁড়িয়ে যায়। ছিন্নহস্তা, আধা নগ্ন, দগ্ধ দেহ। মাথায় কপালমালা। মুখে বিষাক্ত হাসি।
অঘোষ নাথ সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পড়েন, হাতে ত্রিশূল নিয়ে।
কণ্ঠে মন্ত্র—
"ওঁ হ্র্রীং কালীম কালীম পিশাচিনীং তাড়য় তাড়য় স্বাহা!"
যোগিনী ঘুরে তাকায়, তাকে থামানো যাবে না এখন।
সে এক বারের জন্য হেমার দিকে ফিরে চায়।
সেই চাহনিতে আর কোনো নারী নেই।
নেই প্রেম, লজ্জা, সংযম, আছে শুধু— শক্তি, আগুন, এবং এক তীব্র তৃষ্ণা — মুক্তির তৃষ্ণা।
অঘোষ চিৎকার করে ওঠে,
— “তুই ওর শরীর থেকে বের হ! তুই যোগিনী, পিশাচিনী—মুক্তিসাধ্য নয়!”
কিন্তু হেমার চোখে তখন হিম শীতল আগুন।
সে বলে,
— “এই প্রেম, এই তপস্যা, এই কামনা— এই সব এক চক্রের অংশ। এই পুরুষ আমারও, দেবীরও, মৃত্যুরও।
আমার নাম ভুলে যেয়ো না...
আমি ছিন্নমস্তা। আমি যোগিনী।"
শ্মশানের দগ্ধ আকাশে এক হুহু হাওয়া বয়ে যায়।
দূরে চিতার আগুন হঠাৎ নিভে যায়।
অনিরুদ্ধের কপালে ফুটে ওঠে একটি চোখ, আবার হারিয়ে যায়।
হেমার শরীর থেমে যায় হঠাৎ, সে পড়ে যায় মাটিতে।
অঘোষ এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে, তার মুখে একটাই প্রশ্ন—
"এ জন্মে, তুমি কে, হেমা?
এক নারী?
না এক দেবী?"
১৪.
রাত নেমেছে ভৈরবের পারে, যশোর শ্মশানে। সেদিনকার আকাশ কালো ছিল, যেন প্রকৃতিও এক ভয়ঙ্কর ঘটনার অপেক্ষায়। অঘোষ নাথ, যিনি নিজেকে তন্ত্রের অধিপতি ভাবতেন, তিনি তখনও জানতেন না, যে আগুন তিনি জ্বালিয়েছেন, তা আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। হেমাবতীর শরীরে তখন দুটো সত্তা। একদিকে ছিন্নমস্তা আর কর্ণ পিশাচিনীর রক্তপিপাসু রূপ, অন্যদিকে ভৈরবী হওয়ার অদম্য শক্তি।
অনিরুদ্ধের ভালোবাসা ছিল হেমার জন্য, কিন্তু সেই রাতে হেমা আর ভালোবাসা গ্রহণ করার মতো অবস্থায় ছিল না। তার শরীরটা ছিল কেবল এক আগ্নেয়গিরি, যা বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত। হঠাৎ, হেমার গলা থেকে এক বিকট শব্দ বের হলো।
সেটা কোনো নারীর কণ্ঠস্বর ছিল না, যেন দশ দিক থেকে পিশাচেরা একসঙ্গে গর্জন করছে।
"তোমরা ভোগ চেয়েছো? সাধনা চেয়েছো? আমার দেহ দিয়ে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা মিটিয়েছো? তবে শোনো, এই দেহের রক্তই হবে তোমাদের শেষ আশ্রয়।"
হেমার চোখে তখন আগুনের ঝলকানি। ত্বক থেকে রক্ত ঝরছে, তবুও তার মুখে এক ভয়ংকর হাসি। সে অনিরুদ্ধকে কাছে টেনে নিল, প্রেমিকার মতো গভীর আলিঙ্গনে। অনিরুদ্ধ তখনো কাঁদছিল, ভয়ে কাঁপছিল, "তুমি কে... হেমা না ভৈরবী...?"
উত্তর সে পায়নি। পরের মুহূর্তে হেমার নখের আঘাতে অনিরুদ্ধের বুক চিরে তার হৃদপিণ্ড বেরিয়ে এল। এক ফোঁটা রক্ত ঠোঁটে নিয়ে হাসল সে। অঘোষ নাথ চিৎকার করে উঠলেন, "না! এ সাধনা নয়! এ অন্য কিছু!"
কিন্তু তার চিৎকার বাতাসে মিলিয়ে গেল। হেমার মাথার চুল উড়ছিল, শরীর ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন। চারপাশে মাটিতে আগুনের এক বৃত্ত জ্বলে উঠেছিল, সেই আগুনের আলোয় তার হাসিটা আরও ভয়ংকর লাগছিল। সেই হাসি ছিল মৃত্যুর হাসি।
অঘোষ নাথ পালাতে পারেননি। হেমা তাকে তাড়া করে কনুইয়ের এক আঘাতে তার ঘাড় ভেঙে দিল। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলল, "তুমি আমার গুরু ছিলে, কিন্তু তুমি ভুল বুঝেছো—তুমি চেয়েছিলে আমার শক্তি দিয়ে নিজের কাজ করতে, কিন্তু আমি নিজেই এখন সেই শক্তি।"
অঘোষ নাথের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে চক্রের বাইরে গড়িয়ে পড়ল। তার মুখ থেকে শেষ শব্দ বের হলো, "কাল ভৈরব..."
এরপর হেমা হাঁটু গেড়ে বসল, চোখ বন্ধ করে কিছু মন্ত্র জপ করল। চারিদিকে অসংখ্য চিতার ছাই ঘূর্ণির মতো আকাশে উঠে গেল। প্রকৃতি, আকাশ, নদী, বাতাস—সব যেন একসঙ্গে চিৎকার করছিল।
হঠাৎ, হেমার শরীর থেকে এক তীব্র আলো আকাশের দিকে ছুটে গেল। তার চুলগুলো হাওয়ায় উড়তে লাগল, ত্বকে ফুটে উঠল অদ্ভুত কিছু চিহ্ন। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
সে আর হেমা ছিল না। সে ছিল ভৈরবী। এক নগ্ন, রক্তমাখা, চিতার ছাইয়ে ঢাকা শ্মশানচারিণী। তার পায়ের ছাপে শ্মশানের ছাই জ্বলে উঠছিল, চোখ থেকে বের হচ্ছিল কালো ধোঁয়া। তার নাভির নিচে আঁকা এক ত্রিভুজ, যার অর্থ কেউ জানে না।
সেই রাতেই তাকে প্রথম দেখা গিয়েছিল ভৈরব নদীর ধারে, যশোর শ্মশানে। স্থানীয় এক বৃদ্ধ তাকে দেখে ফেলে। সে বলে, "একটা মেয়ে... না না... মেয়ে না... কিছু একটা... নগ্ন, লম্বা চুল, মুখে ছাই মাখা... হেঁটে চলেছে চিতার ভেতর দিয়ে..."
পরদিন সকালে শ্মশানে পাওয়া গেল এক বিশাল অগ্নিচিহ্ন, ছড়ানো ছাইয়ের স্তূপ, আর দুটি পাথরের উপর রক্তের দাগ। কেউ জানত না সেগুলো কোথা থেকে এসেছে। কেউ কেউ বলল, "ওটা অঘোষ নাথ আর অনিরুদ্ধের রক্ত।"
তারপর থেকেই গল্প শুরু হলো—ভৈরবী এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানে ঘুরে বেড়ায়। প্রতি অমাবস্যা রাতে সে কোথাও না কোথাও দেখা দেয়। কখনও ঝাড়গ্রামের গভীর অরণ্যে, কখনও রাজশাহীর তপোবনে, আবার কখনও চট্টগ্রামের পুরনো তান্ত্রিক ঘাটে। মানুষেরা তাকে ভয় পায়। তবুও কেউ কেউ জানে, সে কিছু খুঁজছে, কাউকে ডাকছে। হয়তো সে এখন আর দেবতা নয়, এক অভিশাপ। এক অদৃশ্য যুদ্ধ, প্রেম আর সাধনার মধ্যে।
একদা যে হেমা তার প্রেমিককে খুঁজত, আজ সেই ভৈরবী প্রেমিককে খুঁজে নেয় নিজের মধ্যেই, আর ত্রাসের মাঝে বসে রাজত্ব করে শ্মশানের ছায়ায়। তার চুল উড়ে বেড়ায় অন্ধকারে, পায়ের ছাপে জ্বলে ওঠে মৃত আত্মার আর্তনাদ। আর তার তৃতীয় নয়নে কেবল এক দ্যুতি—প্রেমের ধ্বংস, সাধনার পরিণতি। কেউ তাকে দেখলে চিৎকার করে না, কারণ কারো চোখে হেমার চোখ পড়লেই সে মানুষ মরে যায়। কেউ তাকাতে পারে না তার চোখে, যেখানে এখনও বন্দি আছে অনিরুদ্ধের শেষ চাহনি।
সমাপ্ত প্রথম খন্ড।
#arponrahman #অর্পন_রহমান #armystique #razonnamystiverse #saidurrahmanarpon

Comments
Post a Comment