শেষ প্রহর (প্রথম পর্ব) : অর্পন রহমান

 শেষ প্রহর

(প্রথম পর্ব)




: অর্পন রহমান





১.


বৃষ্টির রাতে কুষ্টিয়ার আকাশ যেন অশুভ কোনো ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল।

আলোর রেখাগুলো ভিজে বাতাসে কাঁপছিল—যেন অদৃশ্য কোনো হাত সেগুলো নিভিয়ে দিতে চাইছে।

কলেজের পুরনো গেটের পাশে প্রথমবার রোদেলা দেখেছিল রিয়নকে।

কালো রেইন কোট থেকে পানি টপটপ ঝরছে, আর চোখে ছিল এমন এক অদ্ভুত উষ্ণতা—যা রোদেলার ভেতরের শূন্যতা ভরে দিয়েছিল।


তাদের প্রেম ছিল নীরব কিন্তু গভীর।

তবে সেই নীরবতা পরে হয়ে উঠেছিল অস্থিরতার উৎস।

রোদেলার পরিবারের চোখে রিয়ন ছিল অযোগ্য—

কথাগুলো ধারালো ছুরির মতো রোদেলার মন ছিঁড়ে ফেলছিল।

রিয়ন চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সমাজের চোখে সে চিরকাল অপূর্ণ।


তারপর একদিন…

বর্ষার রাতে, রিয়নকে পাওয়া গেল তার ভাড়া বাসায়—

ছাদের পাখার সাথে ঝুলন্ত, চোখ দুটো অদ্ভুত ফাঁকা।

তার ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্তের রেখা,

আর জানালার বাইরে ক্রমাগত বাজ পড়ছিল—

প্রতিটি বাজ যেন রোদেলার বুকের ভেতর ছিঁড়ে দিচ্ছিল কিছু।


রিয়নের মৃত্যুর পর রোদেলা বদলে গেল। 

প্রথম দিকে কেবল কাঁদত,

তারপর ধীরে ধীরে হাসতে শুরু করল—

একটা অদ্ভুত, ভাঙাচোরা হাসি, যা শোনার পর মানুষের গায়ে কাঁটা দিত।


রাতগুলো হয়ে উঠল দীর্ঘ, নিস্তব্ধ, আর ভয়ানক।

রোদেলা বলত—

সে জানালার ধারে বসলে রিয়নের ছায়া আসে।

ভেজা গন্ধ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,

তার ঠান্ডা হাত দিয়ে রোদেলার কাঁধ ছুঁয়ে দেয়।

এক রাতে সে দেখল—আয়নার ভেতর তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে রিয়ন,

কিন্তু তার চোখ দুটো নেই।

ফাঁকা কোটরের ভেতর কালো পানি ঘূর্ণায়মান।


শহরের মানুষ লক্ষ্য করল—

রোদেলা ভোরে কবরস্থানে যায়,

ঘন্টার পর ঘন্টা রিয়নের কবরে বসে কিছু ফিসফিস করে।


কিন্তু রিয়নের প্রতি উত্তর  ছিল গলায় দম বন্ধ হওয়া মানুষের মতো।

গলা চেপে ধরা, কাঁপা, আর শ্বাসরুদ্ধ।


বৃষ্টির রাতগুলোতে রোদেলার ঘরের জানালা নিজে থেকেই খুলে যায়।

ভেতরে ঢোকে পচা মাটির গন্ধ,

আর দেয়ালে জমে ওঠে আর্দ্রতার মধ্যে অস্পষ্ট হাতের ছাপ।

রোদেলা ধীরে ধীরে শহরের চোখে হয়ে উঠল “পাগলি রোদেলা”—

কিন্তু কেউ জানত না, তার মাথার ভেতর সত্যিই কে কথা বলে।


 ডাক্তাররা বললো—“স্কিজোফ্রেনিয়া। এটি মনের এমন এক রোগ, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমানা ধূসর হয়ে যায়।”

কিন্তু রোদেলা জানতো, তার ভেতর যা ঘটে তা কোনও মনস্তাত্ত্বিক রোগের চেয়ে অনেক গভীর। 


রাতের নিস্তব্ধতায় সে শুনতে পেত সেই গলার ফিসফিসানি, গলাতেই আটকে থাকা শ্বাস আর কাঁপা কণ্ঠের হাহাকার।


২.


এক রাতে, যখন রোদেলা নিজের ঘরে একাকী বসে ছিল, হঠাৎ দরজার ওপর ঝমঝম করে তুরকি শুরু করল। সে দৌড়ে দরজার কাছে গেলো, কিন্তু সেখানে কাউকে দেখল না। কিন্তু বাতাসে একটা ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করলো—যেমন অদৃশ্য কোনো আঙুল তার গলায় ছোঁয়াচ্ছে।


পরদিন, সে ডাক্তারকে আবার দেখালো। ডাক্তার তার মস্তিষ্কের পরীক্ষা করল, মনের অবস্থা যাচাই করল, কিন্তু সব ফলাফল ‘স্বাভাবিক’। “তাহলে কেন,” রোদেলা ভাবত, “আমার ভেতরে সেই ভয় কি থেমে না?”


রাতগুলো আরও অন্ধকার হয়ে এলো। রোদেলার ঘরের চারপাশে যেন অদৃশ্য অশুভ ছায়ারা ঘুরে বেড়াচ্ছে—কখনো জানালার সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো বিছানার পাশে হঠাৎ অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া বইয়ে দিয়ে। একদিন সে দেখতে পেলো, আয়নার মধ্যে রিয়নের মুখ না, বরং এক কালো,  খেলা, নাকি সে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির শিকার? সে গ্রন্থাগারে গিয়ে পড়লো পুরনো তন্ত্রকথা আর প্রেতাত্মার উপাখ্যান, যেখানে মানুষের আত্মা যখন নিষ্প্রাণ হয়ে যায়, তখন তার ভয়ের অনুভূতি শয়তানের মতো অন্য কোনো শক্তির হাত ধরে ফিরে আসে।


এক রাতে, বৃষ্টির গর্জনে মিলিয়ে রোদেলা আবার সেই পুরনো কলেজ গেটের কাছে গেলো। সেখানে বাতাসে এল এক ফিসফিসানি—“আমি আছি… আমি ফেরত এসেছি।”

তার চারপাশে অদ্ভুত আলোর ঝলকানি শুরু হলো। ছায়ারা তার চারপাশে নাচতে লাগল, আর রোদেলার কণ্ঠ থেকে বের হলো এক অচেনা ভাষায় শব্দ, যা কোনো মানুষের বোধগম্য ছিল না।


 

৩.


বৃষ্টি থামলো না, বরং আরও জোরালো হয়ে উঠলো। কুষ্টিয়ার আকাশ এখন যেন শুধু কালো মেঘের সমুদ্র নয়, বরং এক জীবন্ত দানবের মুখাবয়ব। বাতাস বুনো শিয়ালের কান্নার মতো সিসি দিয়ে উঠছিল, আর গাছগুলো যেন নিজেরাই দোল খাচ্ছিল—কোনো অদ্ভুত জোরে, যাকে দেখলেই মন কাঁপে।


রোদেলা তখন পুরনো কলেজ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তার রেইন কোটে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছিলো। চারপাশের বাতাস হঠাৎ থেমে গেল, যেন পৃথিবী নিজেই নিশ্বাস আটকে রেখেছে। তারপর এক মুহূর্তে বাতাসে এল এক ঝনঝনানি, কিন্তু বাজ এখন আর সাধারণ ছিল না। সে বাজ যেন কোনও প্রাচীন অভিশপ্ত মন্ত্রের মতো শব্দ ছড়াচ্ছিল চারদিকে।


হঠাৎ গেটের পাশে জমে থাকা মাটির নিচ থেকে ধোঁয়ার মতো কালো কুণ্ডলী উঠে আসতে লাগলো। সে কুণ্ডলী অন্ধকারের বৃত্ত গড়ে রোদেলার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যেন তাকে ঘিরে রাখছে। রোদেলার চোখে তখনও কিছু বোঝা যেত না, শুধু ভয়ের একটা গভীর ছায়া ঘিরে ধরেছিল তার অন্তর।


আবার সে দেখলো, আকাশ থেকে লাল-লাল শঙ্খকার বাজ ভেসে আসছে, আর গাছের শাখাগুলো যেন জীবন্ত শূন্যদাঁত হয়ে তার দিকে আছাড় দিচ্ছে। এক মুহূর্তে তার সামনে অদ্ভুত এক ছায়ামূর্তি নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে রিয়ন না, তবে তার শরীর কাঁচের মতো পুরু একটি বরফ দিয়ে ঢাকা, আর চোখ থেকে ধোঁয়ার মতো বাষ্প বের হচ্ছিল।


রোদেলা চিৎকার দিতে গেল, কিন্তু কণ্ঠস্বর বের হলো না, তার গলা যেন কাঁচের বৃত্তে আটকে গিয়েছে। ছায়ামূর্তির ঠোঁটে তখন এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল, যে হাসি ছিল সম্পূর্ণ শূন্যতা আর অতল গহ্বরের প্রতিচ্ছবি। ছায়ামূর্তিটি হাত বাড়িয়ে রোদেলার দিকে স্পর্শ করতে চাইল, আর তার স্পর্শে বাতাস থমকে গেলো।


পেছন থেকে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা কুয়াশা ধীরে ধীরে রোদেলার শরীরে প্রবেশ করলো। সে অনুভব করলো, তার শরীর এক অদ্ভুত শূন্যতায় নিমজ্জিত হতে লাগল, যেখানে সময় থমকে গেছে, আর মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে কোনো পার্থক্য রইল না।


বাইরে বৃষ্টির গর্জন যেন এক বিশাল প্রেতাত্মার কন্ঠস্বর হয়ে উঠলো, আর বাতাসে লুকানো অদৃশ্য চোখগুলো এখন তার প্রতি নজর রাখছিল। রোদেলার শরীর আরেকবার ঝাপসা হয়ে গেলো, যেন সে কোনো স্বপ্নের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।


৪.

আশেপাশের বাড়িগুলোর আলো তখনো নেভেনি। কুষ্টিয়ার এই পুরনো পাড়ায় রাত গভীর হলেও মানুষের আনাগোনা পুরোপুরি থেমে যায় না। কিন্তু সেই রাতে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, যা কেবল ঝড় আসার আগের বাতাসের শান্ত হওয়ার মতোই ভয়াবহ। রোদেলার বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের বাড়িটায় থাকতো পাঁচ বছরের ছোট্ট অয়ন। খেলার সময় তার হাসির আওয়াজ রোদেলার ঘরের জানালা দিয়ে ভেসে আসত। রোদেলার মানসিক অস্থিরতার মধ্যে সেই হাসি কখনো কখনো বড্ড জ্বালা ধরাত, আবার কখনো বা মনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিত।


এক রাতে অয়নকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মা, সুমনা, ঘরের প্রতিটি কোণে খুঁজে হয়রান। অয়নের বাবা, তাপস, ছুটে গিয়েছিল প্রতিবেশীদের বাড়ি। সবাই মিলে যখন অয়নকে খুঁজছে, তখন সুমনার কান্নার শব্দে পাড়ার বাকিরাও ঘুম থেকে উঠে এলো। তাদের সকলের মনে একটাই প্রশ্ন, "এত রাতে একটা বাচ্চা কীভাবে গায়েব হয়ে যায়?"


তাপস যখন রোদেলার দরজায় কড়া নাড়ল, সে দরজা খুলল না। সবাই জানত রোদেলাকে। তার অস্বাভাবিক আচরণ আর অদ্ভুত চলাফেরা নিয়ে পাড়ার মানুষের মধ্যে ফিসফিসানি লেগেই থাকত। কিন্তু কেউ তার দরজায় আঘাত করতে সাহস পেল না, কারণ রোদেলার ঘরের ভেতর থেকে এক ধরনের চাপা, অদ্ভুত শব্দ আসছিল। যেন কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে, কিন্তু তা কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর নয়।


সুমনা যখন অয়নের নাম ধরে চিৎকার করছিল, তখন হঠাৎ বাতাস থেমে গেল। গাছের পাতা আর নড়ল না, যেন কেউ অদৃশ্য হাত দিয়ে সব কিছু থামিয়ে দিয়েছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে এক শীতল বাতাস বয়ে গেল, যা শীতের রাতের চেয়েও অনেক বেশি হিমশীতল ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রোদেলার বাড়ির খোলা জানালা থেকে একটি ক্ষীণ আলোর রেখা ভেসে এল, আর তার সঙ্গে মিশে ছিল একটা শিশুর হাসির শব্দ—সেই হাসি যা অয়নের।


সুমনা সেই হাসির শব্দ শুনে রোদেলার বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। তার বাবা, তাপস, তাকে টেনে ধরল, "ওখানে যেও না, সুমনা। ওই বাড়িতে কিছু একটা আছে!" কিন্তু মায়ের মন কি মানে? সুমনা ছুটে গেল। রোদেলার ঘরের জানালা দিয়ে সে দেখল, রোদেলা মেঝেতে বসে আছে, আর তার সামনে একটি কালো ছায়া। সেই ছায়াটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার মধ্যে যেন কেউ নড়ছে। সেই ছায়া থেকে অয়নের হাসির শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে এল। সুমনা দেখতে পেল, রোদেলার শরীরটা একবার কেঁপে উঠল, আর তার মুখ থেকে অয়নের কণ্ঠস্বর বের হচ্ছে, "মা, আমি এখানে..."

সুমনার শরীর জমে গেল। তার মনে হলো, সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। সে রোদেলার দিকে তাকাল, রোদেলার চোখ তখন শূন্য, কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটি অদ্ভুত হাসি। তার গলায় তখন আর নিজের কণ্ঠস্বর নেই, বরং অয়নের কণ্ঠস্বর, "মা, ভয় পেও না। আমি খুব ভালো আছি। রিয়ন আমাকে খুব ভালোবাসে।"


সুমনার মনে হল, রোদেলার দেহের ভেতর দিয়ে অয়ন কথা বলছে। তার মনের মধ্যে একটা ভয় আর সন্দেহ সৃষ্টি হলো, যে রোদেলা হয়তো অয়নকে খুন করেছে। কিন্তু তার মন থেকে বের হওয়া প্রতিটি যুক্তি যেন ভেঙে গেল যখন সে দেখতে পেল, অয়নের হাতে থাকা একটি পুতুল রোদেলার বিছানার উপর রাখা। সেই পুতুলটি অয়ন ছাড়া আর কেউ খেলত না। সেই মুহূর্তে সুমনার মাথায় যেন বাজ পড়ল। রোদেলার শরীরের ভেতর থেকে সে শুনল, "অয়নের খেলা শেষ হয়েছে। রিয়ন ওকে নিয়ে গেছে।"


সকাল হলে যখন পুলিশ এল, তখন তারা রোদেলার ঘরের মেঝেতে শুধু একটি শিশুর পায়ের ছাপ পেল, যা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। রোদেলার চোখ তখন সম্পূর্ণ শান্ত, যেন কিছুই ঘটেনি। 


পুলিশ যখন তাকে জেরা করছিল, তখন সে কেবল একটি কথাই বলেছিল, 


"শেষ প্রহর এসেছে।"


কয়েকদিন পর, অয়নের লাশ পাওয়া গেল কুষ্টিয়ার নদীর ধারে। লাশটি ছিল সম্পূর্ণ শুকনো, যেন তার শরীরের সব জল শুষে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানত না, এই মৃত্যুর কারণ কী। কিন্তু রোদেলার ঘরের ভেতরে পাওয়া কালো ছায়ার ছবি, আর অয়নের কণ্ঠস্বর—তা এখন পর্যন্ত এক অমীমাংসিত রহস্য। 


৫.


অয়নের মৃত্যুর পর কুষ্টিয়ার বাতাসে যেন এক শীতল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। এরপর আরও কয়েকটি রহস্যময় মৃত্যু ঘটল, যার কোনো কারণই পুলিশ খুঁজে পেল না। প্রতিটি লাশের শরীর ছিল একইভাবে শুকনো, যেন তাদের প্রাণশক্তি কোনো অদৃশ্য শক্তি শুষে নিয়েছে। এই মৃত্যুগুলোর সঙ্গে রোদেলার অস্বাভাবিক আচরণের যোগসূত্র দেখতে পেয়ে পুলিশ তাকে মানসিক চিকিৎসার জন্য একটি ক্লিনিকে পাঠালো। বেডে এক হাত বাঁধা।  


এই ক্লিনিকের দায়িত্বে এলেন ডা. এ রহমান—একজন অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে মনের অসুস্থতার পাশাপাশি অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়েও গবেষণা করেছেন। তিনি জানতেন, রোদেলার সমস্যা শুধু মনের ভেতরকার বিভ্রম নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও কিছু।

ডা. রহমান যখন রোদেলার সাথে প্রথম দেখা করলেন, তখন রোদেলার চোখে কোনো ভাব ছিল না। সে শুধু জানালা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখছিল। 


ডা. এ রহমান তার সামনে বসতেই রোদেলা ফিসফিস করে বলল, "বৃষ্টি থামবে না, ডাক্তার। শেষ প্রহরের বৃষ্টি কোনো দিন থামে না।"


ডা. এ রহমান মৃদু হেসে বললেন, "রোদেলা, আমি জানি তোমার ভেতরে কী চলছে। তুমি একা নও।" 


রোদেলার চোখ তখন প্রথমবার জীবন্ত হয়ে উঠল, তাতে ছিল অবিশ্বাস আর ভয়। ডা. রহমান তাকে জানালেন, তিনি এমন অনেক কেস দেখেছেন, যেখানে মানুষ মনের রোগের আড়ালে কোনো অশুভ শক্তির কবলে পড়েছে।


চিকিৎসার প্রথম কয়েক দিন রোদেলা কোনো কথা বলল না। সে কেবল আপন মনে হাসত, কখনোবা ফিসফিস করে কিছু বলত যা বোঝা যেত না। কিন্তু ডা. রহমান লক্ষ্য করলেন, রোদেলা যখন কথা বলত, তখন তার কণ্ঠস্বর বদলে যেত। কখনো রিয়নের মতো গভীর, কখনো অয়নের মতো কোমল, আবার কখনোবা এক অচেনা, ভয়ংকর ফিসফিসানি।


এক রাতে, ক্লিনিকের সব আলো হঠাৎ নিভে গেল। ঝড়ের রাতে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু ডা. রহমানের মনে হলো, এটি কেবল বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়। তিনি দ্রুত রোদেলার ঘরের দিকে গেলেন। দরজার বাইরে থেকে তিনি শুনতে পেলেন, রোদেলার ভেতর থেকে আসা একাধিক কণ্ঠস্বর এক সাথে কথা বলছে।


 একটি কণ্ঠ বলল, "ও আমাদের নিতে এসেছে... ও তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না।"


ডা. এ রহমান প্রথমে দোয়া পড়ে নিজের শরীর বন্ধ করলেন। তারপর যখন দরজা খুললেন, তখন দেখলেন রোদেলা তার বিছানায় বসে আছে, তার চারপাশ ঘিরে এক হিমশীতল বাতাস বইছে। 


তার চোখগুলো বন্ধ, কিন্তু মুখ দিয়ে অয়নের কণ্ঠস্বর বের হচ্ছে, "উনি আমাদের দেখতে পান, রিয়ন। ইনি তোমার খেলা নষ্ট করে দেবেন।"


ডা. এ রহমান বুঝতে পারলেন, তিনি শুধু একজন মানসিক রোগীর চিকিৎসা করছেন না, তিনি এমন এক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন যা রোদেলার শরীরকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি রোদেলার পাশে বসলেন, তার হাতে হাত রাখলেন। 


সাথে সাথে রোদেলার শরীর কেঁপে উঠল। সে বলল, "আপনি কী করছেন? আপনি আমাদের জায়গা নষ্ট করছেন।"


ডা: এ রহমান হাত ছাড়লো না, সে রুকাইয়া করা শুরু করলো। একের পর এক পবিত্র কুরআনের সুরা, আয়াত পড়তে লাগলো।


ডা. এ রহমান এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আমি জানি তোমার ভেতর কে আছে। রিয়ন, তুমি এই দেহ থেকে চলে যাও। অয়ন, তুমিও তোমার জায়গায় ফিরে যাও।"


হঠাৎ রোদেলার মুখ দিয়ে এক বিকট চিৎকার বের হলো। তার শরীরটা যেন শক্ত হয়ে গেল, আর তার চোখ দুটো খুলে গেল। কিন্তু সেই চোখ রোদেলার ছিল না। চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ কালো, যেন তার ভেতরের শূন্যতা বাইরে চলে এসেছে।


"তোমার শক্তি এখানে কাজ করবে না," সেই কালো চোখ থেকে এক অচেনা কণ্ঠস্বর বলল, "আমরা বহু পুরোনো। আমরা এই দেহের মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছি। তুমি আমাদের আটকাতে পারবে না।"


ডা. এ রহমান ভয় পেলেন না। তিনি জানতেন, এই অশুভ শক্তিকে কেবল ঐশ্বরিক  শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব। তিনি রোদেলার চোখে তাকিয়ে বললেন, "আমি জানি তোমরা কে। তোমরা শূন্যতা। তোমরা জীবনের বিপরীতে। কিন্তু আমি তোমাদের দুর্বলতাও জানি।"


সেই মুহূর্তে রোদেলার মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল। সেই ধোঁয়া ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত, পচা গন্ধ ছড়াল। ডা. রহমান বুঝতে পারলেন, তিনি সঠিক জায়গায় আঘাত করেছেন। 


তিনি  হাতে থাকা পবিত্র আ্ংটি টি ( যা তার একজন অদৃশ্য জগতের ওস্তাদজীর কাছ থেকে পাওয়া)  বের করে তার কপালে রাখলেন, আর সুরা পড়তে লাগলেন। আংটির  স্পর্শে রোদেলার শরীরটা বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল, আর তার মুখ দিয়ে এক বিকট আর্তনাদ বের হলো।


সেই রাতে ঝড় থামল, আর সেই আর্তনাদের পর রোদেলার ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। সকালে যখন তিনি রোদেলার ঘরে গেলেন, তখন দেখলেন সে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে আছে। তার চোখে সেই শূন্যতা আর নেই, বরং এক নতুন দিনের আলোর মতো উজ্জ্বলতা। 


ডা. রহমান তখন জানতেন না, এই যুদ্ধ কেবল শুরু হলো। রোদেলার ভেতর থেকে সেই অশুভ শক্তি হয়তো চলে গেছে, কিন্তু তার ছাপ এখনো রয়ে গেছে।


পরক্ষণেই রোদেলা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো " তুই এই সামান্য আংটি দিয়ে আমাকে বশ করবি? তোর ওস্তাদদের কাছ থেকে জেনে নে আমি কে?   আর আমার ক্ষমতা  কেমন?" এই বলে এক লাথি মেরে ফেলে দিলো ড. এ. রহমানকে। সে ছিটকে গিয়ে পড়লো ৪-৫ ফিট দুরের দেয়ালে।


নার্সরা ছুটে এসে ড. এ রহমান কে তুললো। ভাগ্যিস রোদেলার হাত  বেডের সাথে বাঁধা ছিলো।


৬. 


ডা. রহমানের আঘাতটা গুরুতর ছিল না, কিন্তু তার অহমিকায় আঘাত লেগেছিল। একজন দুর্বল, মানসিক রোগীকে তিনি অতিপ্রাকৃত শক্তি দিয়ে বশ করার চেষ্টা করছেন, অথচ সেই রোগীই তাকে এভাবে আঘাত করল? রোদেলার বাঁধন না থাকলে যে কী হতে পারত, তা ভেবেই তিনি শিউরে উঠলেন। তার অতিপ্রাকৃত শক্তি নিয়ে করা গবেষণা তাকে শিখিয়েছিল যে এই সত্তাগুলো ভয়ংকর হয়, কিন্তু এমন সরাসরি শারীরিক আঘাতের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।

পরের কয়েকদিন ডা. রহমান আরও সতর্ক হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, এই যুদ্ধ কেবল শারীরিক শক্তির নয়, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক শক্তিরও। তিনি রোদেলার কাছে ফিরে এলেন, হাতে একটি পবিত্র গ্রন্থ আর মনে দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি নিয়মিত রুকইয়ার মাধ্যমে রোদেলার ভেতরের সত্তাকে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত পড়ে ফুঁ দিতেন, আর রোদেলা যন্ত্রণায় কাতরাতো, কিন্তু সেই সত্তা কোনোভাবেই তার পরিচয় দিত না।

এক দুপুরে, যখন ডা. রহমান রুকইয়ার পর ক্লান্ত হয়ে বসেছিলেন, তখন রোদেলা ফিসফিস করে বলল, "তোমার চোখের নিচে কালো দাগ, ডাক্তার। রাতে ঘুম হয় না, তাই না?"

ডা. রহমান অবাক হয়ে রোদেলার দিকে তাকালেন। রোদেলা আবার বলল, "তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তুমি তাকে খুব ভালোবাসতে। তার স্মৃতি তোমাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়, তাই না?"

ডা. রহমানের শরীর হিম হয়ে গেল। তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল অনেক বছর আগে, কিন্তু সেই স্মৃতি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। তিনি কাউকে এই বিষয়ে বলেননি। রোদেলার মুখ দিয়ে সেই সত্তা তার গভীরতম বেদনাকে স্পর্শ করল।

পরেরবার রুকইয়া করার সময় রোদেলা চিৎকার করে বলল, "তোমার বোনের কী হয়েছিল, ডাক্তার? সে ডুবে মরেনি, তাকে খুন করা হয়েছিল। তুমি জানো, কিন্তু তুমি কিছুই করতে পারোনি। সেই স্মৃতি তোমাকে দুর্বল করে রেখেছে।"

ডা. রহমানের হাত থেকে পবিত্র গ্রন্থটি পড়ে গেল। তার ছোট বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু ছিল তার জীবনের এক কালো অধ্যায়। তিনি জানতেন, এটি ছিল নিছক দুর্ঘটনা নয়, কিন্তু প্রমাণের অভাবে তিনি কিছুই করতে পারেননি। এই সত্তা কীভাবে তার জীবনের এই গোপন সত্যগুলো জানে?

রোদেলা তখন অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগল। "তুমি ভাবছ, তুমি শক্তিশালী। কিন্তু তুমি দুর্বল। তোমার অতীত তোমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তোমার ভেতরে থাকা ভয় আর যন্ত্রণা আমাদের শক্তি যোগায়।"

ডা. রহমান উঠে দাঁড়ালেন। তার রাগ হলো, কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, এটাই সেই সত্তার কৌশল। সে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে চাইছে, যাতে সে তাকে বশ করতে না পারে। তিনি গভীর শ্বাস নিলেন, নিজেকে শান্ত করলেন। "তুমি আমার দুর্বলতা জানো, কিন্তু তুমি আমার বিশ্বাস জানো না। আমার বিশ্বাস আমার জীবনের চেয়েও শক্তিশালী।"

রোদেলা তখন হাসতে হাসতে বলল, "বিশ্বাস? তোমার বিশ্বাস তোমাকে বাঁচাতে পারবে না, ডাক্তার। তোমার বোনকে বাঁচাতে পারেনি, তোমার বাবাকে বাঁচাতে পারেনি, আমাকেও পারবে না। আমার নাম জানার চেষ্টা করো না। আমার নাম জানলে তুমি আর এই পৃথিবীতে বাঁচতে পারবে না।"

ডা. রহমান তখন বুঝতে পারলেন, এই সত্তার নাম বা পরিচয় জানা তার জন্য এক চরম পরীক্ষা হতে চলেছে। কারণ, এই সত্তা শুধু রোদেলার নয়, তার নিজের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এই যুদ্ধ এখন শুধু রোদেলার শরীরের নয়, ডা. রহমানের মনেরও।

 


চলবে....

#arponrahman #অর্পন_রহমান #armystique #razonnamystiverse #saidurrahmanarpon

Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই