গল্প: ধর্ম বিশ্বাস
গল্প:
ধর্ম বিশ্বাস
সন্ধ্যা নেমে এসেছে ঢাকার ব্যস্ত শহরে। রাস্তার ধারে মোড়ের মসজিদে আজান শোনা যায়। পুরনো ধাঁচের মসজিদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন রফিক সাহেব। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন, রোজ কুরআন তিলাওয়াত করেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা বিরক্তি কাজ করছে। পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে এক ভিক্ষুককে সজোরে ধমক দিচ্ছেন দোকানদার কাদের, কারণ সে কিছু খাবার চেয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে - মানুষ তো ধর্ম-কর্ম করছে, কিন্তু কেন সবার মধ্যে দয়া-মায়ার এত অভাব?
রফিক সাহেব একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন, তার চোখে ভিক্ষুকটির অবস্থা অসহায় মনে হলো। তিনি নিজের পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ভিক্ষুকটির হাতে দিয়ে দিলেন। আশ্চর্যভাবে, ভিক্ষুকটির মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। সে কৃতজ্ঞতায় হাতজোড় করে ধন্যবাদ জানালো। এই ছোট কাজটির পর রফিক সাহেবের মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি এল। তার মনে হলো, এটাই হয়তো আল্লাহর গুণগুলোর একটি, দয়া দেখানোর গুরুত্ব।
রাতের খাবার খেয়ে ঘরে বসে, রফিক সাহেব কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন - "আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন," যেটি সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। কিন্তু আজ মনে হলো, শুধু মুখে পড়লেই কি তা যথেষ্ট? তিনি ভাবতে লাগলেন - যদি আল্লাহ মহান হন, দয়ালু হন, তাহলে আমরাও তো মানুষ হিসেবে সেই গুণগুলোর অনুশীলন করতে পারি।
পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন, এক যুবক একটি ছোট পাখির ডানা ভেঙে দিয়েছিল নিছক আনন্দের জন্য। রফিক সাহেব দেখে ব্যথিত হলেন এবং যুবককে কড়া ভাষায় বললেন, "ভাই, ধর্ম তো আমাদের অন্যের প্রতি দয়া করতে শেখায়। তোমার কী লাভ হলো এমন নিষ্ঠুরতা করে?" যুবকটি একটু লজ্জিত হলো, আর রফিক সাহেব পাখিটিকে নরম হাতে তুলে নিয়ে একটা গাছের ছায়ায় রাখলেন।
সময় চলতে থাকে। ধীরে ধীরে, রফিক সাহেব লক্ষ্য করলেন তার চারপাশের লোকদের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বদল আসছে। তার নিজের মনেও এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নামাজ এখন শুধু রুটিনের অংশ নয়, বরং যেন এক ধরনের আত্মিক শান্তি ও দায়িত্ববোধের জায়গা। তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহর প্রশংসা কেবল মুখে উচ্চারণ নয়, বরং সেই গুণাবলির প্রতিফলন নিজ জীবনে আনার মাধ্যমেই প্রকৃত অর্থে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়।
এভাবেই চলতে থাকে রফিক সাহেবের যাত্রা। একদিন রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে এক পরিচিত হিন্দু ব্যবসায়ীকে চা খেতে ডাকলেন। তাদের মধ্যে গভীর কথা হয় - ধর্ম, মানবতা আর একে অপরের প্রতি সহানুভূতির বিষয় নিয়ে। ব্যবসায়ীটি অবাক হয়ে বললেন, "আপনার ভেতর এত খাঁটি মানবতা আছে, যা অনেকেই আজকাল ভুলে গেছে।"
রফিক সাহেব হাসিমুখে বললেন, "মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখানোই আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা প্রকাশ। নামাজ কেবল একটি পথ দেখায়; মূল কথা হলো সেই পথে হেঁটে যাওয়া।"
গল্পের শেষবার্তা
এটি কেবল মুখস্ত শব্দগুলো জপে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন নয়, বরং প্রতিটি বাক্যের গভীর তাৎপর্য হৃদয়ে গ্রহণ করা, যা আমাদের জীবনের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিতে পারে। ধর্মের প্রতিটি শিক্ষা আমাদের আরও মানবিক ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠার জন্যই।

Comments
Post a Comment