প্রেমের গল্প অনুভূতির মাদকতা


প্রেমের গল্প

অনুভূতির মাদকতা







রমা আর অভি একই কলেজে পড়ত। সেই সময় থেকেই তাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল। বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্ক, সম্পর্ক থেকে গভীর বন্ধনে তারা দুজন আবদ্ধ। কিন্তু জীবন তাদের একসাথে রাখেনি। অভি বিদেশে চাকরি নিয়ে চলে যায়, আর রমা রয়ে যায় কলকাতায়। মাঝেমধ্যে তাদের মধ্যে মেসেজে কথোপকথন হয়, কিন্তু সেই গভীর অনুভূতির কথাগুলো যেন তারা বলতে পারে না।


একদিন রমা পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরতে যায়। সেখানে এক শান্ত নদীর ধারে বসে সে মন ছুঁয়ে যাওয়া একটি কবিতা লেখে, যা অভির কাছে পাঠাতে ইচ্ছে করে। সে বুঝতে পারে, তাদের দূরত্বের মাঝেও তাদের বন্ধন অটুট রয়েছে। অভি সেই কবিতা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। একরাশ স্মৃতি তাকে ঘিরে ধরে। তারপর সে রমাকে ফোন করে।




অভি: "রমা, তোমার কবিতাটা পড়লাম। সত্যি বলছি, মনে হলো তোমার মনের মধ্যে এত গোপন কথা লুকানো, যা আমিও জানতাম না।"


রমা: "আমার মনের অনেক কিছুই আমি জানি না অভি। তবে জানি, তোমার সুরে একটা অদ্ভুত মাদকতা আছে, যা আমার ভেতরকে জাগিয়ে তোলে। আমার সব ভাবনা যেন সেই সুরের ঢেউয়ে ডুবে যায়।"


রমা: "আমিও মাঝে মাঝে শুনতে পাই, আমাদের সম্পর্কের সেই পুরোনো সুর যেন কানে বেজে ওঠে। কেমন আছো রে?"


রমা: "শান্ত নদীর মতোই আছি। প্রতিদিন তোমার সুরে স্নান করি, সেই প্রিয় স্মৃতিগুলো নিয়ে বেঁচে থাকি। তোমার কথা মনে হলে সব কোলাহল থেমে যায়, আর আমি একা বালিকা হয়ে যাই, অনুভব করি, তুমি যেন আমার পাশে আছো।"


অভি: "তুমি কি মনে করো, এই দূরত্ব আমাদের বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে? আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা কি আদৌ একে অপরের জন্য ছিলাম?"


রমা: (একটু চুপ থেকে) "দেখো অভি, নদীর স্রোত সবসময় একই গতিতে চলে না। কখনো সে শান্ত, কখনো উত্তপ্ত। তেমনি আমাদের বন্ধনও। দূরত্ব হয়তো আমাদের আলাদা রেখেছে, কিন্তু সেই সুর, সেই মাদকতা আমাদের মনের ভেতর রয়েছে। আর সেটা তোমার উপস্থিতি ছাড়াই অনুভব করতে পারি।"


অভি: "তুমি সত্যি বলছো  রমা? তুমি কি সত্যি আমার জন্য এমনভাবে অনুভব করো?"


রমা: "হ্যাঁ অভি। আমরা যে দুজন, সুরের বন্যায় ভেসে যাচ্ছি, এটা তুমি জানো। তুমি আমার কাছে সেই শান্ত নদী। তোমার সুর আমাকে শীতল করে, আমার অভ্যন্তরে সেই গভীর প্রশান্তি এনে দেয়।"


অভি: "তুমি কি জানো, আমি মাঝেমধ্যে তোমার সেই সুর শুনতে পাই? সব কোলাহল থেমে গেলে, এই গভীর রাতে মনে হয় তুমি পাশে বসে আছো। তোমার অনুভূতির প্রতিটি শব্দ যেন আমার জীবনের সাথে মিশে থাকে।"


রমা: "আমি তো তোমার কাছে দূরে নই। আমি আছি তোমার স্মৃতিতে, তোমার মনের গহীনে। এই ভালোবাসা, এই অনুভূতি কখনো শেষ হবে না।"





কিছুদিন পর, অভি আবার ফোন করে রমাকে। এইবার তাদের কথোপকথনে কিছুটা গভীরতা আসে।


অভি: "রমা, আমি ভাবছিলাম... আমাদের সম্পর্কটা যেন ছায়ার মতো। আমি যখন পাশে থাকি না, তখনও তুমি আমার অনুভব করো। কীভাবে পারো তুমি? আমি তো এখানে নিজের মধ্যে শুধু তোমার অস্তিত্ব অনুভব করি।"


রমা: "আমাদের সম্পর্ক তো অনুভূতির বাইরে, অভি। আমরা একে অপরকে স্পর্শ করতে না পারলেও, মনের ভেতর সেই অনুভূতিটা রয়েই যায়। আমি সেই অনুভূতিকে নিজের মধ্যে লালন করি। আমি জানি, তুমি সুর হয়ে ঢেউয়ের মতো আমার পাশে আছো।"


অভি: "আমি আজকাল মাঝরাতে একা বসে তোমার কথা ভাবি। তোমার কবিতার সেই নদীর কথাই মনে হয়। তোমার সেই শান্ত নদীর স্রোতের ঢেউয়ের মতো আমার মনের গভীরে অনুভব করি। আমি জানি না, এই অনুভূতি কেন শেষ হয় না।"


রমা: "এই অনুভূতি শেষ হবে না, অভি। ভালোবাসা তো একরকমের স্রোতের মতো, কখনো শান্ত, কখনো গভীর। আমার মধ্যে তোমার সুর গুনগুন করে বেজে ওঠে। এটাই তো আমাদের সম্পর্ক।"


অভি: "কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন রমা। আমরা দুজন আলাদা শহরে আছি, আলাদা জীবন নিয়ে। তুমি কি মনে করো, আমাদের একসাথে থাকা উচিত ছিল?"


রমা: "হয়তো আমাদের একসাথে থাকা ভাগ্যে নেই। কিন্তু তুমি আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে থাকবেই। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তোমার সেই মধুর সুর আমাকে পথ দেখায়। যেমন আকাশের প্রভাতের আলো অন্ধকারকে গ্রাস করে, তেমনি তুমি আমার জীবনের অন্ধকারে আলোর দিশা হয়ে থাকো।"




এক সন্ধ্যায়, রমা নদীর ধারে বসে অভির ফোনের অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ অভি ফোন করল।


অভি: "আজ নদীর ধারে যাচ্ছো, তাই না?"


রমা: "হ্যাঁ অভি। তুমি তো জানো, নদীর স্রোতের শব্দ, ঢেউয়ের ছন্দ আমার মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়। সেই শান্ত ঢেউয়ের মাঝে তোমার সুর শুনতে পাই, তোমার উপস্থিতি অনুভব করি।"


অভি: "তুমি জানো, অনেক দূরে থেকেও আমি তোমাকে অনুভব করি। আমাদের জীবনে কিছু সম্পর্ক হয়তো এমনই। যাকে স্পর্শ করতে পারি না, তবু তাকে মনের ভেতরে অনুভব করি।"


রমা: "তুমি ঠিকই বলেছো। আমরা একে অপরকে কখনো হারাইনি, অভি। আমাদের মাঝে সেই সুর, সেই প্রেম মিশে আছে।"


অভি: "হয়তো আমাদের সম্পর্ককে কোনো নামে বাঁধা যাবে না। কিন্তু আমরা বুঝি, আমরা একে অপরের জন্য আছি।"


রমা: "হ্যাঁ অভি, আমরা একে অপরের জন্য আছি। শুধু প্রভাতের আলোর মতো একটুখানি। অনেক আলো চাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমাদের সেই সুরেই জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।"



শেষটা

রমা  আর অভি দুজনেই জানে যে তারা বাস্তবে একে অপরের কাছে নেই, কিন্তু তাদের সুর, তাদের অনুভূতি তাদের বন্ধন অটুট রেখেছে। রমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে অভির সেই সুর, সেই ঢেউ তাকে প্রশান্তি দেয়। তাদের ভালোবাসা হয়তো দূরত্বে থেকে গেছে, কিন্তু সেই ভালোবাসার গভীরতা, সেই অনুভূতির মাদকতা তাদের জীবনভর সাথেই থাকবে।


Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই