হরর গল্প কালোযাদু

 

হরর গল্প

কালোযাদু 








 


অনেক দিন আগের কথা। এক ছোট্ট গ্রামে বাস করত নিরঞ্জন নামে এক পরিশ্রমী এবং সৎ যুবক। সে এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বেশ কিছু জমি কিনে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিল। নিরঞ্জনের সাফল্যে গ্রামের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করত, এবং নিজের সুনামের জন্য সে অন্যদের সহায়তায় সবসময় এগিয়ে আসত। কিন্তু, তার উন্নতির কারণে কিছু আত্মীয়-স্বজন হিংসা অনুভব করছিল। বিশেষ করে তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী, মানে তার ভাবি শ্যামা, লোভী আর ষড়যন্ত্রকারী স্বভাবের ছিল। সে মনে মনে সবসময় নিরঞ্জনের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করত।



শ্যামার মনের ভেতর দিন দিন এক ধরনের ঈর্ষা এবং লোভ জন্মাতে থাকল। নিরঞ্জনের সম্পত্তি হাতানোর জন্য সে এক অশুভ পরিকল্পনা করল। তার বিশ্বাস ছিল, সরাসরি কোনো কিছু করলে নিরঞ্জন বুঝে যাবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল, কালো জাদুর মাধ্যমে নিরঞ্জনের জীবনকে ধ্বংস করবে।

শ্যামা শহর থেকে এক তান্ত্রিক ডেকে আনল। সেই তান্ত্রিক ছিল মধ্যবয়সী, মাথার চুল ঘন কালো, কিন্তু দাড়ি সাদা। তার চোখে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল যা কাউকে তাকাতেই ভয় পাইয়ে তুলতে পারে। তার নাম ছিল ভবেশ। ভবেশ কালো জাদু ও অশুভ বিদ্যার দক্ষ এক পাণ্ডিত। শ্যামা তাকে গোপনে তাদের বাড়িতে এনে বলল,


শ্যামা: “ভবেশ, আমি চাই নিরঞ্জন আর আমার পরিবারের জন্য বাধা না হয়ে থাকে। তার উন্নতির কারণেই আমার স্বামী আর ছেলে কিছুই করতে পারছে না। ওকে সরিয়ে দিলে এই সম্পত্তি সব আমাদের হবে।”


ভবেশ: (হাসি দিয়ে) “তুমি সঠিক জায়গায় এসেছো। কিন্তু মনে রেখো, কালো জাদুর দাম দিতে হয়। তুমি প্রস্তুত তো?”


শ্যামা: “আমি প্রস্তুত। আমার কোনো দ্বিধা নেই। যত কিছু লাগুক না কেন, আমি দেবো।”


এরপর তান্ত্রিক ভবেশ মন্ত্রপাঠ করে একটি অন্ধকার রাত্রির সুযোগে নিরঞ্জনের ছবি এনে তার উপর কালো তেল ছিটিয়ে একটি অশুভ মন্ত্র পাঠ করতে লাগল। মন্ত্রপাঠের সময় তান্ত্রিক চিৎকার করে নিরঞ্জনের আত্মাকে দুর্বল করে দেওয়ার মন্ত্র উচ্চারণ করল। কিছুক্ষণ পর, ভবেশ বলল,


ভবেশ: “তোমার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে নিরঞ্জনের জীবনে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করবে, এবং সে ধীরে ধীরে তার শক্তি হারিয়ে ফেলবে।”


দেখতে দেখতে কয়েকদিনের মধ্যেই নিরঞ্জনের জীবনে সেই অদ্ভুত ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করল। প্রথমে সে প্রতিদিন রাতে এক অজানা শীতলতা অনুভব করত। তার ঘুম ভেঙে যেত, এবং অন্ধকারে সবসময় মনে হত, কেউ যেন তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কয়েকদিন পর থেকে তার শরীরেও বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসতে লাগল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখের নিচে কালো দাগ দেখা দিতে শুরু করল। কোনো চিকিৎসক তাকে সুস্থ করতে পারছিলেন না। এভাবে, তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকল।


একদিন নিরঞ্জন স্বপ্নে দেখতে পেল, যেন এক বিশাল অন্ধকার ছায়া তার দিকে ধেয়ে আসছে। সে আর্তনাদ করে ঘুম থেকে উঠে বসে দেখল, তার বিছানার চারপাশে কালো ছায়ার মতো কিছু অন্ধকারময়তা ভেসে উঠছে। সে ভীত হয়ে তার মা এবং বড় ভাইয়ের কাছে সব বলল। কিন্তু তার বড় ভাই তার কথায় মনোযোগ না দিলেও তার মা খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।


তারা ঠিক করলেন গ্রামের পুরোহিতের কাছে যাবেন। পুরোহিত ছিলেন এক জ্ঞানী মানুষ, যিনি এ ধরনের অদ্ভুত ঘটনা সম্পর্কে ভালো জানতেন। পুরোহিত সব ঘটনা শুনে বুঝতে পারলেন, এটি কালো জাদুর কাজ।


পুরোহিত: “নিরঞ্জন, তোমার উপর কালো জাদু করা হয়েছে। এই জাদুর মাধ্যমে কেউ তোমার জীবনকে ধ্বংস করতে চায়।”


নিরঞ্জন: (চিন্তিত হয়ে) “কিন্তু, কে এমন করবে? আমাদের তো কারো সঙ্গে শত্রুতা নেই!”


পুরোহিত: “এমন মানুষ হয়তো তোমার কাছেই আছে, যাকে তুমি চেনো, কিন্তু সে তোমার প্রতি ঈর্ষান্বিত। তোমার সাফল্য তার কাছে অপছন্দের।”


এরপর পুরোহিত তাকে রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করতে বললেন এবং প্রতিদিন শিব ও হনুমান চালিশা পাঠ করার পরামর্শ দিলেন। তবে, পুরোহিত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন,


পুরোহিত: “তোমার আশেপাশের আত্মীয়দের দিকে নজর রাখো। কে জানে, তাদের মধ্যে কেউ এর পেছনে থাকতে পারে।”


নিরঞ্জন পুরোহিতের কথা মেনে শিব লিঙ্গের পূজা শুরু করল এবং রুদ্রাক্ষের মালা ধারণ করে দুর্গা মাতার কাছে প্রার্থনা করতে থাকল।


এর কিছুদিন পর, শ্যামা এবং তান্ত্রিক ভবেশ বুঝতে পারলেন তাদের জাদুতে বাধা আসছে। তখন তারা কালো জাদু আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করল। ভবেশ আবারও গোপনে এসে অশুভ মন্ত্র উচ্চারণ করল এবং নিরঞ্জনের বিরুদ্ধে আরও জোরালো জাদুর প্রভাব ফেলল। শ্যামা নিশ্চিত হল, এবার নিরঞ্জনের কোনো রক্ষা নেই।


অন্যদিকে নিরঞ্জনের মা বুঝতে পারলেন, তাদের পরিবারের ভেতরে কোনো শত্রু রয়েছে। তিনি আরও বেশি সতর্ক হলেন। একদিন রাতে, তিনি লক্ষ্য করলেন, শ্যামা গোপনে একটি প্যাকেট নিয়ে ঘর থেকে বেরোচ্ছেন। অনুসরণ করে তিনি দেখলেন, শ্যামা একটি গাছের নিচে সেই প্যাকেট রেখে আবার ঘরে ফিরে এলেন।


পরদিন পুরোহিতকে সব ঘটনা জানানো হলে, পুরোহিত সেই গাছের নিচ থেকে প্যাকেটটি তুলে এনে দেখলেন, তাতে ছিল কিছু অশুভ মন্ত্র লেখা কাগজ, কালো তেল, এবং নিরঞ্জনের ছবি। পুরোহিত সব বুঝলেন এবং তখনই পুরো গ্রামের সামনে এই ষড়যন্ত্র উন্মোচন করলেন।


পুরোহিত: “শ্যামা, তুমি নিজের আত্মীয়ের জীবন ধ্বংস করতে গিয়ে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপী হয়ে গেছো। কালো জাদুর কোনো ক্ষমতা নেই যে সে ভগবানের শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারে।”


 




Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই