গল্প: তুমিও তেমনটা ভেবে নিও

 গল্প: তুমিও তেমনটা ভেবে নিও



রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় আরোহী মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তার ছোট্ট হৃদয় বোঝে, কিছু একটা ঠিক নেই। ঘুম আসতে চায় না। কান্না আটকে রাখার জন্য সে মায়ের আঁচল মুঠো করে ধরে থাকে। তন্ময়া বারবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু নিজেও জানে, এই শান্তি সাময়িক।


অন্যদিকে, অনিকের বুকের ভেতর চাপা কান্নার বন্যা বইছে। ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। স্ক্রিনে বারবার তন্ময়ার নাম ভেসে ওঠে। কিন্তু সে জানে, তন্ময়া থেকে আর কিছু আশা করা বৃথা। তন্ময়ার ক্ষমা চাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ—আরোহীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তন্ময়ার কোনো সচেতনতা নেই।


অনিক ফিসফিস করে বলে, “আম্মু, তোমার কান্না আমার কান্নার সাথে মিশে কি হবে? যে কান্নায় সব বদলাতে পারে, তার মনেই কোনো আক্ষেপ নেই। কোনো সংশোধনের ইচ্ছা নেই। তুমি মাফ করে দাও। আমি আর ফিরবো না। অনেক মানুষ জন্ম থেকেই মা-বাবা হারা হয়। কেউ বাবা-মা থেকেও পায় না। আরোহীও তেমন ভাবুক।”


আরোহীর নিঃসঙ্গতা


পরের দিন সকালে, আরোহী মায়ের পাশে বসে ভাত খেতে চায় না। ছোট্ট মেয়েটার চোখে ঘুমহীন রাতের ক্লান্তি।

“মা, বাবা কবে আসবে?”

তন্ময়া চুপ থাকে। ছোট্ট আরোহীর সরল প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তার কাছে। সে জানে, অনিক আর ফিরবে না।


আরোহী একসময় ভাতের প্লেট সরিয়ে বলে, “বাবা আমাকে আর ভালোবাসে না?”

তন্ময়ার চোখ ভিজে যায়। নিজেকে সামলে সে বলে, “না মা, এমন কিছু নয়। বাবা ব্যস্ত আছে। তোমার জন্য অনেক কিছু করতে হবে তো।”

আরোহী মায়ের কথাগুলো বিশ্বাস করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার ছোট্ট মন বুঝতে পারে, বাবা যেন দূরে চলে গেছে—খুব দূরে।


অনিকের স্বপ্নের কবর


অনিকের জীবন একঘেয়ে হয়ে গেছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবে, তন্ময়া হয়তো একটা মেসেজ পাঠাবে। কিন্তু দিন যায়, রাত যায়, কিছুই আসে না।


বোনেরা এসে তাকে বলে, “তুমি তন্ময়া আর আরোহীকে নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করো। তুমি তো তাদের ছাড়া বাঁচতে পারো না। বাচ্চাটার জন্য হলেও তুমি ফিরে যাও।”

অনিক উত্তর দেয় না। তার ভেতরে তন্ময়ার বলা সেই তীক্ষ্ণ কথাগুলো আবার গুঞ্জন করতে থাকে—“তুমি একটা ব্যর্থ মানুষ। তোমার কারণে আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে।”


তারপরই মনে পড়ে আরোহীর মুখটা। তার ছোট্ট মেয়ে, যার হাসি একসময় তার জীবনের সব ক্লান্তি দূর করত। কিন্তু এখন সেই হাসি কল্পনায়ও আসে না।


অনিক মনে মনে বলে, “আমার মেয়েটা অনেক ছোট। হয়তো একদিন সব ভুলে যাবে। বাবাকে না পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু আমি? আমি কীভাবে ভুলব? আমার ভেতরে যে শূন্যতা, তা কে পূরণ করবে?”


তন্ময়ার অপরাধবোধ


তন্ময়া এখন প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমি কি ভুল করেছি? আমি কি নিজেই সব শেষ করে দিয়েছি?”

তার আত্মীয়রা, বোনেরা এখন তন্ময়াকে বোঝায়, “অনিকের মতো মানুষ আর পাবি না। তাকে ফিরিয়ে আন। বাচ্চাটার জন্য হলেও ফিরিয়ে আন।”

তন্ময়া মুখে কিছু বলে না, কিন্তু মনের ভেতরে একধরনের চাপ অনুভব করে।


আরোহী একদিন ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে, “বাবা! বাবা!”

তন্ময়া তাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু তার বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা আরও গভীর হয়।


শেষ কথা


অনিকের কাছে বোনেরা যখন তন্ময়ার কথা তোলে, সে একটাই উত্তর দেয়, “ফিরে গিয়ে লাভ নেই। মানুষ যখন শিকল ভাঙার আনন্দ পায়, তখন তাকে আর কিছু আটকাতে পারে না। তন্ময়া তার অহংকার আর হিংসার জন্য আমাকে হারিয়েছে। মেয়েটাকে মানুষ করো, আমার মেয়েকে অহংকার আর ঘৃণার শিক্ষা দিয়ো না।”


অনিক ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। আরোহীর কথা মনে পড়ে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে জানে, তার মেয়েটা কাঁদছে, বাবা-বাবা বলে ডাকছে। কিন্তু তার কোনো উপায় নেই।


আরোহী তার ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের আঁচল চেপে ধরে। তন্ময়া জানে, এই শূন্যতা আরোহীর ছোট্ট মনকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু তন্ময়া নিজেও তো এক শূন্যতার গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।


একটা দুই রুমের বাসায় একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন আর অনিকের মনে কোনো জায়গা করে নেয় না। তার স্বপ্নের কবর রচিত হয়েছে তন্ময়ার অহংকারে, আর সেই কবরের উপরে দাঁড়িয়ে আরোহীর নিষ্পাপ কান্না বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই