গল্প: শেষ না হওয়া শিকল

 গল্প: শেষ না হওয়া শিকল




আরোহির কান্না


আরোহি জানে না কেন তার বাবা আর আসেন না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দরজার দিকে তাকায়, বাবার ডাক শোনার আশায়। প্রতিদিন রাতের খাবার খাওয়ার সময় সে বাবার জন্য প্লেটে একপাশে খাবার তুলে রাখে।


“মা, বাবা কবে আসবে?”


তন্ময়া চুপ করে থাকে। তার মুখে কোনো উত্তর নেই। প্রথমে সে মেয়েকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল।

“বাবা কাজে গেছে। তোমার জন্য নতুন পুতুল নিয়ে আসবে।”


কিন্তু দিন পেরিয়ে সপ্তাহ গড়িয়েছে। আরোহি বুঝে গেছে, বাবার ফেরার কথা আর নেই।


সে সারাদিন বাবার স্মৃতিতে কাঁদে। খেলনা হাতে বসে বাবার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে করে। ঘুমানোর আগে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে বলে,

“বাবা, তুমি কেন আসো না? আমি তো খারাপ মেয়ে না। তোমার কথা শুনি সবসময়। তুমি রাগ করেছ?”


তন্ময়ার ভ্রান্ত চেষ্টা


তন্ময়া বুঝতে পারে, মেয়ের কষ্ট কতটা গভীর। কিন্তু সে জানে, অনিক আর ফিরবে না। অনিকের মনের যে ঘৃণার চিহ্ন সে রেখে গেছে, তার সামনে ক্ষমা কিংবা অনুশোচনার কোনো মূল্য নেই।


তন্ময়া প্রতিদিন আরোহিকে ভুলানোর চেষ্টা করে। তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলে,

“বাবা দূরে আছে, কিন্তু সে তোমাকে খুব ভালোবাসে। তুমি হাসলে, সে আকাশ থেকে দেখবে। তুমি যদি কান্না করো, বাবা কষ্ট পাবে।”


আরোহি হয়তো কিছুক্ষণ চুপ থাকে। কিন্তু মায়ের এই কথাগুলো তার প্রশ্ন মেটাতে পারে না।


“বাবা কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল? তুমি কি ওকে বলেছিলে চলে যেতে?”


তন্ময়া মেয়ের প্রশ্ন শুনে থমকে যায়। তার মনে পড়ে যায় অনিকের মুখ। সেই বিষণ্ণ চোখ, ক্লান্ত শ্বাস। তার মনে পড়ে যায়, কতবার সে অপমান করেছিল। কতবার বলেছিল,

“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। তোমার মতো মানুষের সঙ্গে বিয়ে করাটা অভিশাপ।”


অনিকের নীরব যন্ত্রণা

আল্লাহ আজকের রাতটা পার করে দেও। আজ খুব কষ্ট হচ্ছে। আরোহী মা আমি তোমাকে ছাড়া মৃত এক প্রান। 

অনিক এই কষ্টের চক্র থেকে বের হতে পারেনি। তার প্রতিটি মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয় আরোহির মুখ। মেয়ের হাসি, বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর অভ্যাস, তার ছোট ছোট পায়ের শব্দ—সবই যেন এক ভয়ংকর অভাব হয়ে ঘিরে থাকে।


কিন্তু অনিকের মন বলে,

“আমি ফিরতে পারব না। তন্ময়ার মুখের সেই নোংরা কথা আমাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায়। সে শুধু আমার আত্মসম্মানই ভাঙেনি, আমার হৃদয়টাও বিষাক্ত করে দিয়েছে। তার সামনে দাঁড়ানোর শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি।”


অনিক রাত জেগে আরোহির ছবি দেখে। চোখের কোণায় জমে থাকা চোখের জল মোছে। কিন্তু নিজেকে বোঝায়,

“আমার ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমি যদি ওর কাছে ফিরে যাই, তাহলে আবার সেই একই বিষাক্ত পরিবেশে ফিরতে হবে। আমি আর পারব না। শুধু প্রার্থনা করি, আরোহি যেন ভালো থাকে।”

অনেক গুলো ঘুমের ওষুধ খায়, তবুও চোখে ঘুম নেই।


তন্ময়ার অনুশোচনা ও ভ্রান্তি


তন্ময়া দিন দিন বুঝতে পারে, তার মেয়ের চোখের জল তাকে আরও বেশি একা করে দিচ্ছে। কিন্তু সে নিজেকেও ক্ষমা করতে পারে না। তার নিজের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন অভিশপ্ত।


বোনেরা, যারা তাকে একসময় উপদেশ দিয়েছিল অনিককে ছেড়ে দেওয়ার, এখন তার দুর্বলতা নিয়ে হাসে। তার মেয়ের সামনে তন্ময়াকে অপমান করে। তাদের সন্তানদের সামনে আরোহিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে।


“তোমার বাবাকে তো তোমার মা তাড়িয়ে দিয়েছে। তোমরা এখানে বেশি ঘোরাফেরা করো না, আমাদের সময় নেই।”


আরোহি এসব কথা শুনে কিছু বলতে পারে না। তার ছোট্ট মন শুধু অনুভব করে, তার আর কোনো জায়গা নেই।


তন্ময়া মেয়ের চোখের দিকে তাকায়, আর নিজেকে বলে,

“আমিই এই অভিশপ্ত জীবনের জন্য দায়ী। আমার অহংকার আর রাগ আমার মেয়েকেও অসহায় করে তুলেছে।”


সমাপ্তি নয়, শিকল আরও ভারী


তন্ময়া এক রাতে আরোহির ঘরে গিয়ে দেখে, মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে জলের দাগ। তন্ময়া পাশে বসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।


আরোহি চোখ খুলে ফিসফিস করে বলে,

“মা, বাবাকে একবার ডাকবে? আমি শুধু একবার কথা বলতে চাই।”


তন্ময়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“তোমার বাবা... সে অনেক দূরে। কিন্তু তুমি জানো, সে তোমাকে কত ভালোবাসে।”


আরোহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

“বাবা কেন আসবে না? তুমি তাকে ভুল বুঝিয়েছ, তাই না?”


তন্ময়া এবারও উত্তর দিতে পারে না। সে জানে, মেয়ের প্রশ্নগুলো তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।


অন্যদিকে, অনিক আরোহির স্মৃতি নিয়ে নিজের ভাঙা জীবনটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। তার প্রতিটি দিন বিষণ্ণতায় ভরা, প্রতিটি রাত তার মেয়ের কষ্টের মুখ মনে করিয়ে দেয়।


এই দূরত্ব তাদের একে অপরের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। আরোহি, তন্ময়া, এবং অনিক—তিনটি প্রাণ শিকলবদ্ধ থাকে এক অভিশপ্ত ভালোবাসার অতীতের মধ্যে।


শেষ পর্যন্ত, এই গল্পের শিকল কেউ ভাঙতে পারে না।


Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই