গল্প : শূন্যতার শেষ প্রান্তে

 গল্প : শূন্যতার শেষ প্রান্তে






অনিকের ঘরে এখন গভীর নীরবতা। প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে ফোনটা হাতে তুলে নেয় সে। মনে মনে ভাবে, তন্ময়া হয়তো কোনোদিন মেসেজ করবে। হয়তো একটা “ক্ষমা চাই” বা “আরোহীর কথা ভেবে ফিরে আসো”—এই শব্দগুলোই তার সমস্ত যন্ত্রণা মুছে দেবে।


অনিকের মনোজগৎ ঘুরে ফিরে সেই পুরনো স্মৃতিগুলোতে আটকে থাকে। আরোহীর ছোট ছোট পায়ের দৌড়, তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরার মুহূর্তগুলো যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। সে ভাবে, তন্ময়া একদিন বোঝার চেষ্টা করবে। হয়তো সেদিন তারা একসঙ্গে আবার শুরু করবে।


একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন


একটি ছোট্ট দুই রুমের বাসা। সেখানে থাকবে অনিক, তন্ময়া, আরোহী। খুব সাধারণ জীবন হবে, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। হয়তো তন্ময়া আর অহংকার করবে না। হয়তো সে বুঝবে, অনিক তাকে কতটা ভালোবেসেছে। এই চিন্তা অনিককে কিছু সময়ের জন্য শান্তি দেয়। কিন্তু তার স্বপ্ন প্রতিদিনই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তন্ময়ার নীরবতায়।


তন্ময়া এখনো তার আত্মীয়দের কথার ওপর নির্ভরশীল। সেই আত্মীয়রা, যারা অনিক আর তন্ময়ার সম্পর্ক ভাঙার নেপথ্যে ছিল। বোনেরা বারবার অনিককে বলে,

“ভাই, তন্ময়া ভুল বুঝেছে। তুমি একটু আগ বাড়াও।”

কিন্তু অনিক জানে, তন্ময়ার অহংকার আর একগুঁয়েমি তাকে এগোতে দেবে না।


অনিকের দিনগুলোর কষ্ট


দিনগুলো অনিকের জন্য একইরকম। অফিস থেকে ফিরে অন্ধকার ঘরটাতে ঢোকে। আরোহীর ছবিটা ধরে বলে,

“তোমার মা যদি একটু পরিবর্তন হতো, তবে আমরা আজ একসঙ্গে থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি আর কিছু করতে পারি না, মা।”

তার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে।


সে জানে, আরোহী এখন ছোট। তার কষ্ট প্রকাশ করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সে তা বুঝে উঠতে পারবে না। হয়তো সে সারাদিন কাঁদে। হয়তো সে বাবার কাছে ফিরে আসার আকুতি করে। কিন্তু তন্ময়া কি তাকে বোঝায়? ভুলিয়ে রাখে?


তন্ময়ার অহংকার আর বাস্তবতা


তন্ময়া এখনো নিজের গোঁ ধরে আছে। তার আত্মীয়রা তাকে বোঝায়,

“তুমি কেন তাকে ফোন করবে? সে তো চলে গেছে। তোমার সম্মান কোথায়?”

তন্ময়া ভাবে, হয়তো সে সঠিক। কিন্তু রাতের গভীর নীরবতায় তার মধ্যেও প্রশ্ন জাগে। আরোহীর চোখের জিজ্ঞাসা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।


“বাবা কখন আসবে?”—আরোহীর সরল প্রশ্ন তাকে একধরনের অপরাধবোধে ফেলে।

কিন্তু তন্ময়া নিজেকে শক্ত রাখে। তার অহংকার তাকে ভাঙতে দেয় না।


অনিকের শূন্যতা আর আরোহী


অনিক প্রতিদিন ফোনের স্ক্রিনে তন্ময়ার নাম খোঁজে। কিন্তু কোনোদিনই কোনো বার্তা আসে না। সে নিজের শূন্যতার সঙ্গে লড়াই করে।

আরোহী, যে হয়তো এখন বাবার আদর ছাড়া বেড়ে উঠছে, তার কষ্ট প্রকাশিত হয় কান্নায়। তার মা হয়তো তাকে বোঝায়,

“তোমার বাবা চলে গেছে। তার দরকার নেই।”

কিন্তু এই কথাগুলো এক শিশুর হৃদয়ের গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।


অনিক রাতে ঘুমানোর আগে বলে,

“আরোহী, একদিন তুমি বড় হবে। হয়তো বুঝবে, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। কিন্তু আমি আর ফিরে আসব না। তোমার মায়ের অহংকার আর আমার জন্য ঘৃণা আমাকে তোমাদের কাছে যেতে দেয় না।”


অনিক জানে, এই শূন্যতা তার জীবনের শেষ পর্যন্ত থেকে যাবে। আরোহীকে নিজের কাছে এনে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করার স্বপ্ন তার শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে যাবে।


শেষ ভাবনা


তন্ময়া হয়তো একদিন বুঝবে, তার অহংকার কী ধ্বংস করে দিল। অনিক হয়তো একদিন মেনে নেবে, এই সম্পর্কের ফাঁক আর মেটানো যাবে না। আরোহী সেই দূরত্বের শিকার হয়ে বেড়ে উঠবে।

কিন্তু অনিকের মন থেকে শূন্যতা মুছে যাবে না।

আরোহী হয়তো বড় হয়ে বাবার কষ্ট বুঝবে। তখন কি সে মাকে প্রশ্ন করবে?

“মা, কেন আমাদের পরিবারটা ভেঙে গেলে? কেন আমি বাবার কাছে থাকতে পারিনি?”


এই প্রশ্নের উত্তর তন্ময়া কখনো দিতে পারবে কি?

অনিকের স্বপ্নের সেই দুই রুমের বাসা হয়তো কোনোদিন বাস্তব হবে না। আরোহী শুধু শূন্যতা নিয়ে বড় হবে, আর তার বাবা এই স্মৃতি নিয়ে প্রতিদিন একা বাঁচবে।


Comments

Popular posts from this blog

গল্প তোমাদের জন্য এই তো যথেষ্ট

রঙ্গন জমিদার : অর্পন রহমান

গল্প ভালোবাসার ছাই